যে তন্ত্রের মাধ্যমে রক্ত প্রবাহিত হয় তাকে রক্ত সংবহনতন্ত্র বলে। ঘাস ফড়িং-এর রক্ত সংবহনতন্ত্র মুক্ত ধরনের (ঘাসফড়িং, আরশোলা, চিংড়ী, মশা, মাছি, মাকড়শা, শামুক, ঝিনুক, অক্টোপাস)। যে সংবহনতন্ত্রে রক্ত হৃৎযন্ত্র থেকে অস্টিয়া বা নালিকার মাধ্যমে দেহগহŸর বা সাইনাসে মুক্ত হয় এবং পুনরায় অস্টিয়া বা নালিকার মাধ্যমে হৃৎযন্ত্রে ফিরে আসে তাকে মুক্ত রক্ত সংবহনতন্ত্র বলে। ইহা চারটি প্রধান অংশ দ্বারা গঠিত। হিমোলিম্ফ বা রক্ত, হিমোসিল, পৃষ্ঠীয় বাহিকা এবং সহায়ক স্পন্দনশীল অঙ্গ।
১। হিমোলিম্ফ বা রক্ত (Hemolymph)ঃ ঘাস ফড়িং-এর রক্ত দুটি উপাদান দ্বারা গঠিত। প্লাজমা ও হিমোসাইট।
(i) প্লাজমা বা রক্তরসঃ রক্তরস হলো বর্ণহীন তরল পদার্থ। এতে হিমোগ্লোবিন থাকে না। এতে প্রোটিন, শর্করা, গিøসারল, অ্যামাইনো এসিড, গ্লুকোজ, জৈব এসিড, এস্টার, স্টেরল, ট্রাইগিøসারাইড, ইউরিয়া, ইউরিক এসিড, নাইট্রোজেন, সোডিয়াম, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, পটাশিয়াম, ফসফেট, হিমোজ্যান্থিন, ট্রিহ্যালোজ, ডাইগিøসারাইড, টাইরোসিন, ট্রাইহ্যালেস প্রভৃতি থাকে।
(ii) হিমোসাইট বা রক্তকণিকাঃ ঘাস ফড়িং-এর রক্তে শুধুমাত্র শ্বেত রক্তকণিকা বা হিমোসাইট (১৫,০০০-৬০,০০০) থাকে। এতে লোহিত রক্তকণিকা থাকে না। হিমোসাইটকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়। প্রোহিমোসাইট, ট্রানজিশনাল হিমোসাইট ও বৃহদাকার হিমোসাইট। প্রোহিমোসাইট ৬-৯ mµ (২৩%), ট্রানজিশনাল হিমোসাইট ৯-১৯ mµ (৬৮%) ও বৃহদাকার হিমোসাইট ১৯-২৩ mµ (৯%)।
হিমোলিম্ফের কাজ
(i) হিমোলিম্ফ পানির আধার হিসেবে কাজ করে। এতে ৯২% পানি থাকে।
(ii) ইহা খাদ্যসার, খনিজলবণ, হরমোন রেচন পদার্থ পরিবহন করে।
(iii) দেহে পানির ভারসাম্য রক্ষা করে।
(iv) ডানা সঞ্চালন ও খোলস মোচনে সাহায্য করে।
(v) হিমোসাইট ফ্যাগোসাইটোসিস প্রক্রিয়ায় জীবাণু ভক্ষণ করে। ফলে রোগ প্রতিরোধ হয়।
(vi) হিমোসাইট রক্ত জমাট বাঁধা এবং দেহের ক্ষত নিরাময় করে।
(vii) হিমোসাইট মিউকোপলিস্যাকারাইড নিঃসরণ করে যোজক কলা গঠন করে।
২। হিমোসিল (Haemocoel)ঃ গ্রিক শব্দ haema অর্থ রক্ত এবং coel অর্থ গহ্বর নিয়ে haemocoel শব্দটি গঠিত। হিমোলিম্ফ দ্বারা পরিপুর্ণ দেহগহ্বরকে হিমোসিল বলে। এদের হিমোসিলকে মিক্সোসিল বলা হয়। ইহা পৃষ্ঠীয় পর্দা ও অংকীয় পর্দা দ্বারা তিনটি প্রকোষ্ঠ বা সাইনাসে বিভক্ত। এগুলো হলো-
(i) পেরিকার্ডিয়াল সাইনাসঃ ইহা পৃষ্ঠীয় পর্দার উপরের অবস্থিত। এতে হৃৎযন্ত্র থাকে।
(ii) পেরিভিসেরাল সাইনাসঃ ইহা পৃষ্ঠীয় পর্দার নিচের অবস্থিত। এতে পৌষ্টিকনালী অবস্থান করে।
(iii) পেরিনিউরাল সাইনাসঃ ইহা অংকীয় পর্দার নিচে অবস্থিত। এতে স্নায়ুরজ্জু থাকে।
৩। পৃষ্ঠীয় বাহিকাঃ পৃষ্ঠীয় বাহিকা তিনটি অংশ নিয়ে গঠিত। এগুলো হলো-
(i) ডর্সাল অ্যাওর্টাঃ হৃৎযন্ত্রের প্রথম প্রকোষ্ঠ সরু হয়ে নলাকার অংশ গঠন করে। একে ডর্সাল অ্যাওর্টা বা মহাধমনী বলে। ইহা অগ্রবক্ষ হতে মাথা পর্যন্ত বিস্তৃত। এতে অস্টিয়া থাকে না।
(ii) হৃৎপিন্ড বা হৃৎযন্ত্রঃ ঘাসফড়িং এর হৃৎযন্ত্র পেরিকার্ডিয়াল সাইনাসে অবস্থিত। ইহা কয়েকটি ফানেলাকার প্রকোষ্ঠ দ্বারা গঠিত। প্রথম ৩টি প্রকোষ্ঠ বক্ষে এবং শেষ ১০টি প্রকোষ্ঠ উদরে অবস্থিত। দুটি প্রকোষ্ঠের মধ্যবর্তী অঞ্চলে হৃৎযন্ত্রের প্রাচীর উভয় পাশর্^ হতে ভাঁজ হয়ে হৃৎপিন্ডের গহ্বরে প্রবেশ করে। প্রতিটি ভাঁজে একটি করে ছিদ্র থাকে। একে অস্টিয়া বলে। প্রতিটি প্রকোষ্ঠ অস্টিয়া দ্বারা পেরিকার্ডিয়াল সাইনাসের সাথে যুক্ত থাকে। পরপর অবস্থিত দুটি প্রকোষ্ঠের মধ্যবর্তী ছিদ্রপথকে আন্তঃপ্রকোষ্ঠ ছিদ্র বলে।
(iii) অ্যালারি পেশি (Alary muscle)ঃ হৃৎযন্ত্রের সাথে যে ত্রিকোণাকার পেশি থাকে তাকে অ্যালারি পেশি বলে। এসব পেশি টার্গামের অঙ্কীয় তল হতে উৎপন্ন হয়। এর প্রশস্ত প্রান্ত হৃৎযন্ত্রের সাথে যুক্ত থাকে। অ্যালারী পেশী (মোট ৬ জোড়া) হৃৎযন্ত্রকে সংকুচিত ও প্রসারিত করে।
৪। সহায়ক স্পন্দনশীল অঙ্গঃ অ্যান্টেনা, পা ও ডানার গোড়ায় সহায়ক অঙ্গ থাকে। প্রতিটি উপাঙ্গে একটি অ্যাম্পুলা ও একটি নালিকা থাকে। এরা স্পন্দনের মাধ্যমে হিমোলিম্ফকে সাইনাস থেকে উপাঙ্গে প্রবেশ করায়।