যে তন্ত্রের মাধ্যমে খাদ্য গ্রহণ, পরিপাক ও শোষিত হয় তাকে পরিপাকতন্ত্র বলে। পরিপাকতন্ত্র দুটি অংশ নিয়ে গঠিত। পৌষ্টিকনালি ও পরিপাক গ্রন্থি।
পৌষ্টিকনালি (Digestive tract)
মুখ ছিদ্র থেকে শুরু করে পায়ু পর্যন্ত বিস্তৃত লম্বা নলাকার অংশকে পৌষ্টিকনালি বলে। পৌষ্টিকনালির বিভিন্ন অংশ নিচে বর্ণনা করা হলো।
১। মুখঃ পৌষ্টিকনালির প্রথম অংশকে মুখ বলে। ইহা নাসিকা ছিদ্রের নিচে অবস্থিত।
কাজঃ ইহা খাদ্য বস্তু গ্রহণ করে এবং মুখ গহ্বরে প্রবেশ করায়।
২। মুখ গহ্বরঃ মুখের পরবর্তী অংশ হলো মুখ গহ্বর। ইহাতে দাঁত, জিহ্বা, উপজিহ্বা বা আলজিভ ও লালা গ্রন্থি অবস্থান করে। মিউকাস আবরণী ওরাল মিউকোসা দ্বারা আবৃত থাকায় মুখবিবর সর্বদা ভেজা থাকে। মুখবিবরের মেঝ মাইলোহাইঅয়েড পেশি দ্বারা গঠিত। মুখ গহŸরের পিছনে কোমল তালু থাকে যা খাদ্যকে নাসারন্ধ্রে প্রবেশে বাঁধা দেয়। এখানে খাদ্য ৫-৩০ সেকেন্ড অবস্থান করে।
জিহ্বায় ২০০০-৮০০০টি স্বাদ কুঁড়ি থাকে। স্বাদ কুঁড়িগুলো পাঁচ ধরনের। মিষ্টতা, লবণাক্ততা, টক বা অম্লতা, সুস্বাদুতা বা উমামি এবং তিক্ততা। স্বাদ কুঁড়িগুলো ৫-১০ দিন পরপর নতুন গঠন দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়। প্রতিটি স্বাদ কুঁড়িতে ৫০-১০০টি স্বাদ গ্রাহক বা গাস্টাটরি কোষ থাকে। স্বাদ গ্রাহক কোষগুলো প্যাপিলি আকারে অবস্থান করে।
মুখ গহ্বরের কাজ
(i) জিহ্বা খাদ্যের স্বাদ গ্রহণ ও গিলতে সাহায্য করে।
(ii) দাঁত খাদ্যকে কাঁটা, ছেঁড়া ও পেষনে অংশ নেয়।
(iii) লালা গ্রন্থি লালারস নিঃসৃত করে।
(iv) লাইসোজাইম ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে।
৩। গলবিলঃ মুখগহ্বরের পরবর্তী প্রায় ১২.৫ সেমি দীর্ঘ ও ফানেলাকার অংশকে গলবিল বলে। ইহাতে গালেট নামক ছিদ্র থাকে।
কাজঃ খাদ্য বস্তু গালেট ছিদ্রের মধ্যদিয়ে গলবিল হতে অন্ননালিতে প্রবেশ করে।
৪। অন্ননালিঃ গলবিলের পরে প্রায় ২৩-২৫ সেমি দীর্ঘ পেশি বহুল নলাকার অংশকে অন্ননালি বলে।
কাজঃ পেরিস্ট্যালসিস প্রক্রিয়ায় সংকোচনের মাধ্যমে খাদ্যকে পাকস্থলীতে পৌছায়।
৫। পাকস্থলীঃ ডায়াফ্রামের নিচে এবং উদরের উপরে অবস্থিত ঔ আকৃতির বাঁকানো মাংসল থলীকে পাকস্থলী বলে। এর প্রাচীর অত্যন্ত পুরু ও পেশি বহুল। এর দৈর্ঘ্য ৩০.৫ সেমি এবং প্রস্থ প্রায় ১৫.২ সেমি। পাকস্থলী পাঁচটি অংশ নিয়ে গঠিত। কার্ডিয়াক পাকস্থলী, ফান্ডাস, দেহ, অ্যান্ট্রাম ও পাইলোরিক পাকস্থলী।
(i) কার্ডিয়াক পাকস্থলীঃ পাকস্থলীর যে অংশে অন্ননালি উন্মুক্ত হয় তাকে কার্ডিয়াক পাকস্থলী বলে। অন্ননালি ও কার্ডিয়াক পাকস্থলীর সংযোগস্থলে কার্ডিয়াক স্ফিংক্টার নামক পেশি বলয় থাকে। পেশি বলয় খাদ্যকে অন্ননালিতে প্রবেশে বাধা দেয়।
(ii) ফান্ডাসঃ কার্ডিয়াক পাকস্থলীর কাছে বাম পাশের উত্তল অংশকে ফান্ডাস বলে।
(iii) দেহঃ ফান্ডাসের পরবর্তী পাকস্থলীর মধ্য অঞ্চলকে কর্পাস বলে। ইহা খাদ্যবস্তু ধারণ করে।
(iv) অ্যান্ট্রামঃ কর্পাস এর পরবর্তী অংশকে অ্যান্ট্রাম বলে। খাদ্য অন্ত্রে প্রবেশের আগে অ্যান্ট্রামে সাময়িক ভাবে জমা থাকে।
(v) পাইলোরিক পাকস্থলীঃ পাকস্থলীর যে অংশ ডিওডেনামে উন্মুক্ত হয় তাকে পাইলোরিক পাকস্থলী বলে। ডিওডেনাম ও পাইলোলিক পাকস্থলীর সংযোগস্থলে পাইলোরিক স্ফিংক্টার নামক পেশি বলয় থাকে। পেশিবলয় খাদ্যকে ডিওডেনামে প্রবেশে সাহায্য করে।
পাকস্থলীর কাজ
(i) লালামিশ্রিত, চর্বিত ও আংশিক পরিপাককৃত খাদ্য পাকস্থলীতে ২-২৪ ঘন্টা অবস্থান করে। কার্ডিয়াক স্ফিংটার খাদ্যবস্তুর পশ্চাৎমুখী সঞ্চালন রোধ করে।
(ii) প্যারাইটাল কোষ থেকে নিঃসৃত ঐঈষ জীবাণু ধ্বংস, খনিজ লবণ দ্রবীভূত, অস্থি ক্যালসিয়াম মুক্ত এবং অম্লীয় পরিবেশ সৃষ্টি করে।
(iii) পাকস্থলীতে ১৫-২০ সেকেন্ড পর পর পেরিস্ট্যালসিস প্রক্রিয়ায় খাদ্যের সঞ্চালন ঘটে।
(iv) খাদ্য চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে নরম পেস্টে পরিনত হয়।
(v) পরিপাক রস ও পেস্ট মিশ্রিত হয়ে পিচ্ছিল মন্ড বা কাইম গঠন করে।
৬। ক্ষুদ্রান্ত্রঃ পাইলোলিক স্ফিংক্টার হতে ইলিওকোলিক স্ফিংক্টার পর্যন্ত ৬-৭ মিটার লম্বা নলাকার অংশকে ক্ষুদ্রান্ত্র বলে। এখানে খাদ্য ৩-৫ ঘন্টা অবস্থান করে। ইহা তিনটি অংশে বিভক্ত। ডিওডেনাম, জেজুনাম ও ইলিয়াম।
(i) ডিওডেনামঃ ক্ষুদ্রান্ত্রের প্রথম এবং ট আকৃতির অংশকে ডিওডেনাম বলে। এর দৈর্ঘ্য ২৫-৩০ সেমি।
(ii) জেজুনাম ঃ ডিওডেনামের পরবর্তী প্রায় ২.৫ মিটার লম্বা নলাকার অংশকে জেজুনাম বলে।
কাজঃ ইহা খাদ্যকে পরিপাক ও শোষণ করে।
(iii) ইলিয়ামঃ জেজুনামের পরবর্তী অংশকে ইলিয়াম বলে। এর দৈর্ঘ্য সমগ্র ক্ষুদ্রান্ত্রের তিন-পঞ্চমাংশ। ইলিয়াম ও বৃহদন্ত্রের সংযোগ স্থলে ইলিওকোলিক স্ফিংক্টার নামক পেশি বলয় থাকে।
কাজঃ ইহাতে আঙ্গুলের মতো ভিলাস থাকে। ভিলাস পরিশোষণ অঞ্চল বৃদ্ধি করে।
৭। বৃহদন্ত্রঃ ইলিয়ামের শেষ প্রান্ত হতে পায়ু পর্যন্ত বিস্তৃত প্রায় ১.৫ মিটার লম্বা ও মোটা অংশকে বৃহদন্ত্র বলে। এখানে খাদ্য ১.৫-২.০ দিন অবস্থান করে। বৃহদন্ত্রের তিনটি অংশ রয়েছে।
সিকাম, কোলন ও মলাশয়।
(i) সিকামঃ বৃহদন্ত্রের প্রথম অংশকে সিকাম বলে। ইহা থলী আকৃতির। এর দৈর্ঘ্য ৬ সেমি এবং প্রস্থ ৭.৫ সেমি। সিকামের নিচের দিকে নলের মতো একটি বহিঃবৃদ্ধি অংশ থাকে। একে ভার্মিফর্ম অ্যাপেন্ডিক্স বলে। ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণে অ্যাপেন্ডিক্সের প্রদাহ সৃষ্টি হলে তাকে অ্যাপেন্ডিসাইটিস বলে। ইহা একটি নিস্ক্রিয় অঙ্গ।
(ii) কোলনঃ সিকামের পরের প্রশ্বস্ত নলাকার অংশকে কোলন বলে। এর দৈর্ঘ্য ১০১-১১৪ সেমি। কোলনের চারটি অংশ আছে। উর্ধ্বগামী কোলন, অনুপ্রস্থ কোলন, নিম্নগামী কোলন ও সিগময়েড কোলন।
(১) উর্ধ্বগামী কোলনঃ এ অংশ সিকাম থেকে উপরের দিকে উথিত হয়। এর দৈর্ঘ্য ১৩ সেমি।
(২) অনুপ্রস্থ কোলনঃ এ অংশ আড়াআড়ি ভাবে অবস্থান করে। এর দৈর্ঘ্য ৩৮ সেমি।
(৩) নিম্নগামী কোলনঃ কোলনের যে অংশ নিম্নমুখী থাকে তাকে নিম্নগামী কোলন বলে। এর দৈর্ঘ্য ২৫ সেমি।
(৪) সিগময়েড কোলনঃ মলাশয়ের সাথে যুক্ত কোলনের যে অংশ ফাঁসের মতো গঠন সৃষ্টি করে তাকে সিগময়েড কোলন বলে। এর দৈর্ঘ্য ২৫-৩৮ সেমি।
কাজঃ কোলন খাদ্য পরিপাক ও পরিশোষণ করে।
(iii) মলাশয়ঃ বৃহদন্ত্রের শেষ প্রান্তে অবস্থিত স্ফীত থলির মতো অংশকে মলাশয় বলে। মলাশয়ের নিম্নাংশ স্ফীত হয়ে অ্যাম্পুলা গঠন করে। এর দৈর্ঘ্য ১৩ সেমি। ইহাতে বলয়াকার স্ফিংক্টার বা কপাটিকা থাকে।
কাজঃ বৃহদন্ত্রে মল তৈরী হয়, পানি শোষিত হয়, খাদ্যের গাঁজন ও পাচন ঘটে।
৮। পায়ুঃ মলাশয় যে ছিদ্র পথে বাইরে উন্মুক্ত হয় তাকে পায়ু বলে। ইহা বহিঃস্থ ও অন্তঃস্থ স্ফিংক্টার নামক দুটি কপাটিকা দ্বারা আবদ্ধ থাকে। অন্তঃস্থ স্ফিংক্টারটি মসৃন পেশি বলয় দ্বারা গঠিত এবং অনৈচ্ছিক ভাবে সংকুচিত হয়। বহিঃস্থ স্ফিংক্টারটি অমসৃন পেশি বলয় দ্বারা গঠিত এবং ঐচ্ছিক ভাবে সংকুচিত হয়।
কাজঃ পায়ু স্নায়ু দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়ে উন্মুক্ত ও বন্ধ হয় এবং মল ত্যাগে অংশ নেয়।
পরিপাক গ্রন্থি
যে গ্রন্থি বিভিন্ন ধরনের পাচক রস নিঃসৃত করে খাদ্য পরিপাক করে তাদেরকে পরিপাক গ্রন্থি বা পৌষ্টিকগ্রন্থি বলে। মানব দেহের পরিপাক গ্রন্থি গুলো হলো- লালা গ্রন্থি, যকৃত গ্রন্থি, অগ্ন্যাশয় গ্রন্থি, পাকস্থলীর গ্রন্থি ও ক্ষুদ্রান্ত্রের গ্রন্থি।