স্টার্চের সংজ্ঞা, বৈশিষ্ট্য, গঠন ও ব্যবহার (Starch)

জার্মান শব্দ Starch অর্থ মজবুত বা শক্ত বা কঠিন বা  অনমনীয়। স্টার্চ হলো একটি জটিল হোমোপলিস্যাকারাইড। এর আণবিক সংকেত (C6H10O5)n। সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন শর্করা বা চিনি স্টার্চে রুপান্তরিত হয় এবং জমা থাকে। ধান, গম, আলু, ভুট্রা, কলা, বার্লি প্রভৃতি হলো স্টার্চের প্রধান উৎস। এ সব উপাদানে ৭০-৮০% স্টার্চ থাকে। গোল আলুর স্টার্চ কণা সবচেয়ে বড় এবং 100µm । চালের স্টার্চ কণা সবচেয়ে ছোট এবং 2µm। প্লিনি দ্যা এলডার (Pliny the Elder, 77-78 AD) বর্ণিত Natural History-তে উদ্ভিদ থেকে স্টার্চ আহরণের প্রথম তথ্য পাওয়া যায়। ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

 

স্টার্চের বৈশিষ্ট্য /ধর্ম

(i) স্টার্চ স্বাদহীন, গন্ধহীন ও বর্ণহীন পদার্থ।

(ii) ইহা সাদা অদানাদার পাউডার জাতীয় জৈব রাসায়নিক পদার্থ।

(iii) ইহা পানি, অ্যালকোহল ও ইথারে অদ্রবণীয়।

(iv) স্টার্চ আয়োডিন দ্রবণে নীল বর্ণ ধারণ করে।

(v) ইহা উচ্চ তাপমাত্রায় ভেঙ্গে বড় বড় ডেক্সটিন কণায় পরিনত হয়।

(vi) স্টার্চ ফেহলিং দ্রবণকে বিজারিত করতে পারে না।

(vii) স্টার্চের অ্যামাইলোজের সাথে আয়োডিন বিক্রিয়া করে কালো বা কালো-নীল বর্ণ ধারণ করে।

(viii) স্টার্চের অ্যামাইলোপেকটিনের সাথে আয়োডিন বিক্রিয়া করে লাল বা পার্পল বর্ণ ধারণ করে।

 

স্টার্চের রাসায়নিক গঠন

স্টার্চ হলো একটি জটিল পলিস্যাকারাইড। অ্যামাইলোজ ও অ্যামাইলোপেকটিন দ্বারা স্টার্চ গঠিত হয়। এতে  অ্যামাইলোজ ২২% এবং  অ্যামাইলোপেকটিন ৭৮% থাকে। অ্যামাইলোজ ২০০-১০০০ অণু এবং অ্যামাইলোপেকটিন ২০০০-২,০০,০০০ অণু গ্লুকোজ দ্বারা গঠিত। অসংখ্য গ্লুকোজ অণু  α-1-4 গ্লাইকোসাইডিক বন্ধনী দ্বারা যুক্ত হয়ে স্টার্চ গঠন করে। তবে গ্লুকোজ অণুগুলো α-1-6 বন্ধনে যুক্ত হতে পারে। স্টার্চকে হাইড্রোলাইসিস করলে গ্লুকোজে পরিনত হয়।

 

স্টার্চের ব্যবহার

(i) সঞ্চিত খাদ্যঃ স্টার্চ উদ্ভিদ দেহে সঞ্চিত খাদ্য হিসেবে জমা থাকে। উদ্ভিদের বীজ, ফল ও কন্দের স্টার্চ সঞ্চিত খাদ্য হিসেবে অবস্থান করে। ধান, গম, ভূট্রা, ক্যাসাবা, কর্ণ ও গোল আলুতে সঞ্চিত স্টার্চ মানুষের খাদ্য হিসেবে ব্যবহার হয়।

(ii) শক্তির উৎসঃ ইহা জীবদেহে শক্তির উৎস হিসেবে কাজ করে। স্টার্চ গ্লুকোজে পরিনত হয়ে জীবদেহে শক্তি ও কার্বন অণু সরবরাহ করে। ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

(iii) শ্বসনেঃ ইহা শ্বসনে তাপ ও শক্তি উৎপন্ন করে।

(iv) গবেষণায়ঃ স্টার্চ পরীক্ষাগারে গ্লুকোজ ও অ্যালকোহল তৈরীতে ব্যবহার হয়।

(v) কাগজ শিল্পেঃ কাগজ শিল্পের প্রধান উপাদান হলো স্টার্চ।

(vi) আঠা তৈরীঃ বিশুদ্ধ স্টার্চ গরম পানিতে মিশিয়ে আঠা তৈরী করা হয়। ইহা করোগেটেড বোর্ডের আঠা তৈরীতে ব্যবহার হয়।

(vii) টাইট্রেশনেঃ টাইট্রেশনের সময় স্টার্চ নির্দেশক হিসেবে ব্যবহার হয়।

(viii) কাপড়ে ব্যবহারঃ স্টার্চ থেকে ওয়ার্প সিজিং এজেন্ট উৎপন্ন হয়। ওয়ার্প সিজিং এজেন্ট কাপড় বুননের সময় সূতা ছিড়ে যাওয়ার হার কমায়। কাপড়ে মার (লন্ডি) দেওয়ার কাজে স্টার্চ ব্যবহার হয়। ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

(ix) তেল সন্ধানঃ তেল অনুসন্ধানে পিচ্ছিলকারী তরল ড্রিলিং ফ্লুইডের সান্দ্রতা বাড়ানোর জন্য স্টার্চ ব্যবহার হয়।

(x) প্রসাধনী তৈরীঃ ট্যালকম পাউডার এবং অন্যান্য প্রসাধনী তৈরীতে স্টার্চ ব্যবহার হয়।

(xi) খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণঃ খাদ্য প্রক্রিয়াজাত করার সময় খাদ্যের ঘনত্ব বৃদ্ধি করতে স্টার্চ ব্যবহার হয়।

(xii) পলিমার উৎপাদনঃ পরিবেশ বান্ধব বায়োপ্লাস্টিক এবং অন্যান্য সিনথেটিক পলিমার তৈরীতে স্টার্চ ব্যবহৃত হয়।

(xiii) জ্বালানী উৎপাদনঃ গাঁজন প্রক্রিয়ায় স্টার্চ থেকে জৈব জ্বালানী কর্ন ইথানল উৎপাদন করা হয়।

(xiv) বংশবৃদ্ধিঃ উদ্ভিদের ফল, বীজ, রাইজোম ও কন্দালে সঞ্চিত স্টার্চ পরবর্তী ঋতুতে বংশধর উৎপাদনে অংশ নেয়।

(xv) ওষুধ শিল্পেঃ ওষুধ শিল্পে স্টার্চ সক্রিয় উপাদানের বাহক, ট্যাবলেট ডিসইন্টিগ্রেন্ট এবং বাইন্ডার হিসেবে ব্যবহার হয়।

(xvi) ক্লথিং স্টার্চঃ বিশুদ্ধ স্টার্চ পানির সাথে মিশিয়ে তরল ক্লথিং স্টাচ তৈরী করা হয়। ইহা গার্মেন্টসে এবং লন্ড্রিতে ব্যবহার হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *