ঘাস ফড়িং-এর বাহ্যিক গঠন । Grasshopper External features । ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

ঘাস ফড়িং আকারে বড়। এরা লম্বায় ৮-৯ সেমি। এদের দেহ লম্বাটে, সুচালো এবং দ্বিপার্শ্বীয় প্রতিসম। দেহের রং অনেকটা হলদে-সবুজ (হলুদাভ) অথবা বাদামী বর্ণের। তবে কিছু প্রজাতি উজ্জ্বল নীল হলুদ বর্ণের হয় (Poekilocerus pictus)। এদের দেহে ডোরাকাটা দাগ থাকায় সহজেই পরিবেশের সাথে মিশে যায় এবং শত্রুর হাত থেকে রক্ষা পায়। ঘাস ফড়িং-এর দেহ তিনটি অংশ নিয়ে গঠিত। মাথা, বক্ষ ও উদর।
১। মাথা (Head)ঃ পতঙ্গের মস্তক সম্মুখ প্রান্তে নিচের দিকে নির্দেশিত অবস্থায় থাকে বলে একে হাইপোগন্যাথাস্ বলা হয়। মস্তক নাশপাতি আকৃতির। মস্তকের বহিঃকঙ্কালকে হেড ক্যাপসুল বা এপিক্রেনিয়াম বলে। ইহা ছয়টি খন্ডক নিয়ে গঠিত। তবে পুর্ণাঙ্গ প্রাণীতে খন্ডক গুলোর কোন চিহ্ন নাই এবং একক গঠন বলে মনে হয়। এবং । মস্তকের পৃষ্ঠীয় ত্রিকোনাকার অঞ্চলকে ভার্টেক্স, পিছনের দিকের পাতের মতো অংশকে অক্সিপুট, সামনের অংশকে ফ্রন্স, পার্শ্বীয় অঞ্চলকে জেনা এবং নিচের আয়তাকার পাতকে ক্লাইপিয়াস বলে। মস্তকের উপাঙ্গ গুলো নিচে উল্লেখ করা হলো-
(i) অ্যান্টেনা (Antenna)ঃ মাথার দু’পাশে পুঞ্জাক্ষির সামনে দুটি সংবেদনশীল অ্যান্টেনা থাকে। ইহা নলাকার, সূত্রাকার, অশাখ এবং বহু খন্ডযুক্ত। প্রতিটি অ্যান্টেনা তিনটি অংশ নিয়ে গঠিত। স্কেপ, পেডিসেল ও ফ্লাজেলাম। অ্যান্টেনার গোড়ার অংশ হলো স্কেপ। পেডিসেল খাটো ও অবিভক্ত। ফ্লাজেলাম লম্বা এবং ২০-২৫টি খন্ডকে বিভক্ত। প্রতিটি খন্ডকে সংবেদী কোষ ও স্নায়ুরোম থাকে। অ্যান্টেনা স্পর্শ, ঘ্রাণ ও শব্দ তরঙ্গ অনুভব করে।
(ii) পুঞ্জাক্ষি (Compound eye)ঃ মাথার দু’পাশে অবৃন্তক এবং সীমের বীজের মতো দু’টি পুঞ্জাক্ষি থাকে (কালো, উত্তল, বৃহৎ)। প্রতিটি পুঞ্জাক্ষিতে অসংখ্য বহুকোণা বিশিষ্ট প্রকোষ্ঠ থাকে। এদের প্রতিটিকে ওমাটিডিয়াম বলে। ঘাস ফড়িং-এর দৃষ্টি শক্তি যে কোন আর্থ্রোপোড অপেক্ষা উন্নত। এরা পুঞ্জাক্ষি দিয়ে রং শনাক্ত করতে পারে।
(iii) ওসেলাস (Ocelli)ঃ দু’টি পুঞ্জাক্ষির মাঝখানে তিনটি সরলাক্ষি বা ওসেলাস থাকে। প্রতিটি ওসেলাস লেন্স ও এক গুচ্ছ আলোক সংবেদী কোষ দ্বারা গঠিত। প্রতিটি লেন্স পুরু, স্বচ্ছ ও কিউটিকল দ্বারা গঠিত। সংবেদী কোষ গুলো রঞ্জক পদার্থ যুক্ত। এতে কনিয়াজেন কোষ, রেটিনুলার কোষ, র‌্যাবডোম, রঞ্জক আরবণ ও স্নায়ুকোষ থাকে। ওসেলাসের সাহায্যে ঘাসফড়িং আলোর তীব্রতার পরিবর্তন অনুধাবন করে। অনেকে মনে করেন, এর মাধ্যমে একক প্রতিবিম্ব গঠিত হয়।
(iv) মুখোপাঙ্গ (Mouth parts)ঃ মুখের চারদিকে যে নড়নক্ষম সন্ধিযুক্ত উপাঙ্গ থাকে তাকে মুখোপাঙ্গ বলে। ঘাস ফড়িং-এর মুখোপাঙ্গ কচিপাতা বা কচিকান্ড চর্বনে ব্যবহৃত হয় বলে একে চর্বন উপযোগী বা ম্যান্ডিবুলেট মুখোপাঙ্গ বলে। ইহা পাঁচটি অংশ দ্বারা গঠিত। ল্যাব্রাম, ম্যান্ডিবল, ম্যাক্সিলা, ল্যাবিয়াম ও হাইপোফ্যারিংক্স।
২। বক্ষ (Thorax)ঃ ম্যান্ডিবলের পরবর্তী অংশকে বক্ষ বলে। ইহা তিনটি অংশে বিভক্ত। অগ্রবক্ষ বা প্রোথোরাক্স, মধ্যবক্ষ বা মেসোথোরাক্স ও পশ্চাৎ বক্ষ বা মেটাথোরাক্স। প্রতিটি অংশ কাইটিন নির্মিত কিউটিক্ল দ্বারা আবৃত থাকে। একে স্কেরাইট বলে। বক্ষের স্কেরাইট তিনটি অংশ নিয়ে গঠিত। টার্গাম, প্লিউরন এবং স্টার্ণাম।
(i) টার্গামঃ বক্ষের পৃষ্ঠীয় স্কেরাইটকে টার্গাম বলে। বক্ষের টার্গাগুলোকে নোটাম বলে। প্রোথোরাক্স-এর টার্গামকে প্রোনোটাম, মেসোথোরাক্স-এর টার্গামকে মেসোনোটাম ও মেটাথোরাক্স-এর টার্গামকে মেটানোটাম বলে। প্রোনোটাম বড়, চওড়া ও প্রসারিত। পৃষ্ঠীয় টার্গাম চারটি স্কে¬রাইট নিয়ে গঠিত। প্রিস্কুটাম, স্কুটাম, স্কুটেলাম ও পোস্টস্কুটেলাম।
(ii) প্লিউরনঃ বক্ষের পার্শ্বীয় স্কেরাইটকে প্লিউরন বলে। প্রতি পাশের প্লিউরন তিনটি স্কেরাইট নিয়ে গঠিত। এপিস্টার্নাম, এপিমেরন এবং প্যারাটেরন।
(iii) স্টার্ণামঃ বক্ষের অংকীয় স্কেরাইটকে স্টার্ণাম বলে। স্টার্ণাম একটিমাত্র স্কেরাইট নিয়ে গঠি।
ঘাসফড়িং এর বক্ষ অঞ্চলের উপাঙ্গ গুলো উল্লেখ করা হলো।
(i) শ্বাসরন্ধ্র (Spiracle)ঃ বক্ষ অঞ্চলে দুই জোড়া শ্বাসরন্ধ্র থাকে। অগ্র ও মধ্য বক্ষের মাঝে এক জোড়া শ্বাসরন্ধ্র এবং মধ্য ও পশ্চাৎ বক্ষের মাঝে আরেক জোড়া শ্বাসরন্ধ্র থাকে। এর মধ্যে দিয়ে বায়ু দেহাভ্যন্তরে প্রবেশ করে।
(ii) ডানা (Wings)ঃ ঘাস ফড়িং-এর বক্ষ অঞ্চলে দুই জোড়া ডানা থাকে। মধ্যবক্ষীয় বা সামনের ডানা এবং পশ্চাৎ বক্ষীয় বা পিছনের ডানা। সামনের ডানা দুটি ছোট, সরু ও শক্ত। এরা উড়তে সাহায্য করে না। এ গুলো শুধু মাত্র পিছনের ডানাকে ঢেকে রাখে। তাই এদের এলিট্রা বা ডানার আবরণ বা টেগমিনা বলে। পিছনের ডানা দুটি বড়, চওড়া, স্বচ্ছ এবং পর্দার মতো। এরা উড়তে সাহায্য করে। বিশ্রামের সময় পিছনের ডানা দুটি গুটানো অবস্থায় থাকে। প্রতিটি ডানা অসংখ্য ছোট নালি ও রক্তপুর্ণ শিরা-উপশিরা দ্বারা গঠিত। এদেরকে নার্ভিউর বলে।
(iii) পা (Legs)ঃ বক্ষ অঞ্চলের তিন জোড়া হাঁটিয়ে পা থাকে। পতঙ্গের দেহে ছয়টি পা থাকে বলে এদেরকে হেক্সাপোডা বলা হয়। প্রতি পায়ে পাঁচটি খন্ডক থাকে। কক্সা, ট্রোক্যান্টার, ফিমার, টিবিয়া ও টার্সাস। কক্সা স্থুল ও ত্রিকোণাকার। ট্রোক্যান্টার ক্ষুদ্র ও ত্রিভুজাকার। ফিমার লম্বা, নলাকার ও দৃঢ়। ফিমার বড় ও মাংসাল। টার্সাস তিনটি ছোট ছোট উপখন্ডে বিভক্ত। এ উপখন্ড গুলোকে টার্সোমেয়ার বলে। দুটি টার্সোমেয়ারের সংযুক্ত স্থানে প্লান্টুলা নামক মখমলের মতো নরম গদি থাকে। টার্সাসের শেষ খন্ডকে প্রিটার্সাস বলে। প্রিটার্সাসের অগ্রভাগে একজোড়া বাঁকা নখর থাকে। নখর দুটির মাঝখানে পালভিলাস নামক নরম ও রোমযুক্ত গদি থাকে। এদের পায়ের ফিমার লম্বা ও মাংসল হয় যা লাফিয়ে চলার উপযোগী। এই ধরনের পা কে স্যালটাটোরিয়াল পা বলে।
৩। উদর (Abdomen)ঃ ঘাস ফড়িং-এর দেহের শেষ অংশকে উদর বলে। ইহা লম্বা, সরু, নরম ও খন্ডক যুক্ত। এর উদর ১১টি খন্ডক দ্বারা গঠিত। উদরের পৃষ্ঠদেশে টার্গাম এবং অংকীয়দেশে স্টার্ণাম থাকে। তবে এত প্লিউরন থাকে না। এর প্রথম খন্ডকটি অসম্পুর্ণ। এতে শুধু টার্গাম থাকে। উদর অঞ্চলের অঙ্গ গুলো হলো-
(i) টিম্পেনাম (Tympanum)ঃ প্রথম উদরীয় খন্ডকে শ্রবণ থলী বা টিম্পেনাম থাকে। শ্রবণ থলীকে ঘিরে একটি ডিম্বাকার টিম্পেনিক পর্দা থাকে।
(ii) শ্বাসরন্ধ্র (Spiracle)ঃ উদরের প্রথম থেকে অষ্টম খন্ড পর্যন্ত প্রতিটি খন্ডকে এক জোড়া করে মোট ৮ জোড়া শ্বাসরন্ধ্র থাকে। এর মধ্যে দিয়ে বায়ু দেহাভ্যন্তরে প্রবেশ করে।
(iii) পায়ু ও জনন অঙ্গঃ পুরুষের নবম খন্ডকে সাবজেনিটাল প্লেট, ১০ম খন্ডকে অ্যানাল সারকি এবং ১১তম সুপ্রা অ্যানাল প্লেট ও পায়ু ছিদ্র থাকে।
থাকে। তবে কোন অ্যানাল স্টাইল থাকে না। উদরের ১১তম খন্ডকে পায়ু ছিদ্র এবং অ্যানাল প্লেট থাকে। স্ত্রীফড়িং-নবম খন্ডকে ডিম পাড়ার অঙ্গ ওভিপজিটর থাকে। ওভিপোজিটর ৪টি সুচালো কপাটিকা দ্বারা গঠিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *