ভাইরাসের অপকারী ভূমিকা

১। মানুষের রোগ সৃষ্টিঃ ভাইরাস মানুষের বসন্ত, হাম, পোলিও, জলাতঙ্ক, ইনফ্লুয়েঞ্জা, জন্ডিস, হার্পিস, ডেঙ্গু, হেপাটাইটিস, ইবোলা, এইডস্, সার্স, সোয়াইন ফ্লু, ক্যান্সার প্রভৃতি মারাত্মক রোগ সৃষ্টি করে। মানবদেহে ক্যান্সার সৃষ্টিকারী ভাইরাসকে অনকোজেনিক (oncogenic) ভাইরাস বলে। ক্যান্সার সৃষ্টিকারী DNA ভাইরাসকে সাইমিয়ান এবং RNA ভাইরাসকে রেট্রোভাইরাস বলে। হিউম্যান প্যাপিলারি ভাইরাস (HPV) টিউমার সৃষ্টি করে, ক্যাপোসি সারকোমা হার্পেস ভাইরাস (KSHV) ত্বক ক্যান্সার এবং হেপাটাইটিস-সি ভাইরাস লিভার সিরোসিস ঘটায়।

২। উদ্ভিদের রোগঃ উদ্ভিদের মোজাইক রোগ, লিফরোল, টমেটোর বুসিস্ট্যান্ট, ধানের টুংরো, পেঁপের রিং স্পট, কলার বান্চী টপ প্রভৃতি রোগ ভাইরাস দ্বারা সৃষ্টি হয়। প্রায় ৩০০ উদ্ভিদ রোগ ভাইরাস দ্বারা ঘটে এবং ফলন হ্রাস পায়।

৩। গবাদি পশুর রোগঃ গরুর বসন্ত রোগ; গরু, মহিষ, ভেড়া, ছাগল, শুকর প্রভৃতির ফুট এন্ড মাউথ রোগ এবং কুকুর ও বিড়ালের জলাতঙ্ক রোগ ভাইরাসের কারণে হয়ে থাকে।

৪। হাঁস-মুরগির রোগঃ হাঁস-মুরগীর অ্যাভিয়ান, ইনফ্লুয়েঞ্জা, বার্ড ফ্লু, সোয়াইন ফ্লু  প্রভৃতি মারাত্মক রোগ ভাইরাসের কারণে সৃষ্টি হয়।

৫। রেশম পোকার রোগঃ Nuclear polyhedrosis virus (NPV) রেশম পোকার রসা রোগ সৃষ্টি করে। এর ফলে রেশম শিল্পে বিপর্যয় ঘটে।

৬। উপকারী ব্যাকটেরিয়া ধ্বংসঃ ভাইরাস আমাদের অনেক উপকারী ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে।

৭। জমির উর্বরতা হ্রাসঃ Cyanophage virus নাইট্রোজেন সংবন্ধনকারী নীলাভ সবুজ শৈবালকে ধ্বংস করে দেয়। ফলে মাটির উর্বরতা হ্রাস পায়।

৮। শিল্প ক্ষেত্রেঃ মদ বা অ্যালকোহল শিল্পে ব্যবহৃত ঈষ্টকে ধ্বংস করে দেয়। এতে শিল্প বিপর্যয় ঘটে।

৯। ইমার্জিং ভাইরাসঃ যে সব ভাইরাস আদি পোষক থেকে নতুন পোষক প্রজাতিতে রোগ সৃষ্টি করে তাদেরকে ইমার্জিং ভাইরাস বলে। বার্ড ফ্লু ও ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের আদি পোষক পাখি এবং HIV-এর পোষক হলো বানর। এরা পরে মানুষের দেহে রোগ সৃষ্টি করেছে। ১৯১৮-১৯১৯ সালে পৃথিবীতে ২১ মিলিয়নের বেশি মানুষ বার্ড ফ্লুতে মারা গেছে। HIV, SARS, Nile, Ebola প্রভৃতি ইমার্জিং ভাইরাস।

১০। জুওনেটিক ভাইরাসঃ যে সব ভাইরাস মেরুদন্ডী প্রাণী থেকে মানুষের দেহে প্রাকৃতিক ভাবে সংক্রমিত হয় তাদেরকে জুওনেটিক ভাইরাস বলে। জুওনেটিক ভাইরাস গুলো হলো-

(i) সার্স করোনা ভাইরাসঃ Severe acute respiratory syndrome coronavirus দ্বারা সৃষ্ট রোগকে SARS বলা হয়। এই রোগ বাদুর থেকে মানবদেহে সংক্রমিত হয়েছে। ২০০৩ সালে সার্স রোগে চীন, তাইওয়ান, কানাডা প্রভৃতি দেশে প্রায় ৮০০ লোকের মৃত্যু হয়েছে।

(ii) মার্স করোনা ভাইরাসঃ Middle East respiratory syndrome coronavirus দ্বারা সৃষ্ট রোগকে MERS বলা হয়। এই রোগ বাদুর থেকে মানবদেহে সংক্রমিত হয়েছে। ২০০৩ সালে মার্স রোগে মধ্যপ্রাচ্যে অনেক লোকের মৃত্যু হয়েছে।

(iii) সার্স করোনা ভাইরাস-২ঃ Severe acute respiratory syndrome coronavirus-2 দ্বারা সৃষ্ট রোগকে SARS-2 বলা হয়। এই রোগ পৃথিবীব্যাপী COVID-19 নামে পরিচিত। ইহা চীনের উনানের বাদুর থেকে মানবদেহে সংক্রমিত হয়েছে। ২০১৯-২০২৩ সাল পর্যন্ত এই রোগে ছয় মিলিয়ন লোকের মৃত্যু হয়েছে।

১১। মহামারি ভাইরাসঃ অসংখ্য ভাইরাস মহামারী আকার ধারণ করেছে এবং মানুষের মাঝে খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। বিশ^ব্যাপী মহামারী সৃষ্টিকারী ভাইরাস হলো-

(i) HIV : মরণব্যাধি AIDS রোগ সৃষ্টিকারী ভাইরাস হলো HIV। ইহা মানুষের শে^ত রক্তকণিকাকে ধ্বংস করে দেয়। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় বা নষ্ট হয়ে যায়। বাংলাদেশে ক্রমেই এইডস্ রোগীর সংখ্যা এবং মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে।

(ii) ইবোলা ভাইরাসঃ ইবোলা একটি মারাত্বক মরণ ভাইরাস। ১৯৭৬ সালে আফ্রিকার কঙ্গোর ইবোলা নদীর তীরে সর্বপ্রথম একজন কৃষক ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। মৃত কৃষকের চোখ, নাক, কান ও গলায় রক্ত ক্ষরণ হয়েছিল। নদীর নামানুসারে এই ভাইরাসের নামকরণ করা হয়েছে ইবোলা ভাইরাস। আফ্রিকার জায়ার-এ ইবোলা ভাইরাসের আক্রমণে মহামারী দেখা দিয়ে ছিল। ২০১৪-১৫ সালে ইবোলার আক্রমণে গিনি, সিয়েরালিওন ও লাইবেরীতে ২৫০ জন স্বাস্থ্যকর্মীসহ ১১০০০ লোক মারা যায়। ২-২১ দিনের মধ্যে রোগ লক্ষণ প্রকাশ পায়।

(iii) বার্ড ফ্লু ভাইরাসঃ Avian Influenza virus (Hemaglutinin-1 Neuraminidase type-1=H1N1) এর কারণে বার্ড ফ্লু রোগ হয়। ২০০৮ সালে বার্ড ফ্লু বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে মহামারী আকার ধারণ করেছিল। এ রোগে হাঁস-মুরগী আক্রান্ত হয় এবং পোল্ট্রি শিল্প ধ্বংস হয়ে যায়।

(iv) সোয়াইন ফ্লু ভাইরাসঃ Swine Influenza virus দ্বারা সোয়াইন ফ্লু রোগ হয়। Influenza ভাইরাসের H5N1 ও H1N1 এর কারণে এই সোয়াইন ফ্লু হয়ে থাকে। ২০০৯ সালের এপ্রিল মাসে সোয়াইন ফ্লু শনাক্ত হয়। মানুষ এবং শুকর এই ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হয়। বাংলাদেশে প্রতি বছর এই রোগে আক্রান্ত হয়ে হাজার হাজার মুরগী মারা যায়। ভারতে ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে ৩৪,০০০ লোক আক্রান্ত হয়।

(v) জিকা ভাইরাসঃ জিকা ভাইরাস যে রোগ সৃষ্টি করে তার নাম জিকা জ¦র। ১৯৪৭ সালে উগান্ডার জিকা বনে বসবাসকারী রেসাস বানরের দেহে সর্বপ্রথম জিকা ভাইরাস ধরা পড়ে। এটি মশার মাধ্যমে বিস্তার লাভ করে। ২০১৬ সালের মার্চ মাসে বাংলাদেশের চট্রগ্রাম জেলায় জিকা ভাইরাসের সন্ধান পাওয়া যায়।  জিকা ভাইরাসের বাহক Aedes aegypti  I Aedes albopictus মশকী।

(vi) নিপা ভাইরাসঃ ১৯৯৯ সালে মালয়েশিয়ায় শূকরের খামারে সর্বপ্রথম নিপা ভাইরাসের আক্রমণ ঘটে। এই ভাইরাসের বাহক হলো বাদুর। খেজুরের কাঁচা রসের মাধ্যমে ইহা মানবদেহে সংক্রমিত হয়। ইহা একটি RNA ভাইরাস। এই ভাইরাসের আক্রমণে শ্বসনে জটিলতা সৃষ্টি হয়।

(vii) চিকুনগুনিয়াঃ চিকুনগুনিয়া হলো একটি α-ভাইরাস (RNA)। এর বাহক হলো Aedes aegypti এবং Aedes albopictus মশকী। ১৯৫২ সালে আফ্রিকার তানজানিয়ায় সর্বপ্রথম চিকুনগুনিয়া আবিষ্কৃত হয়। ২০০৮ সালে বাংলাদেশে প্রথম ধরা পড়ে। ২০১৭ সালের এপ্রিল-মে মাসে চিকুনগুনিয়া বাংলাদেশে ব্যাপক বিস্তার লাভ করে। চিকুনগুনিয়াকে ল্যাংড়া জ¦রও বলা হয়।

১২। উপকারী অণুজীব ধ্বংসঃ কিছু ভাইরাস উপকারী অণুজীবকে ধ্বংস করে অর্থনৈতিক ক্ষতিসাধন করে। Xymophage ভাইরাস মদ বা অ্যালকোহল শিল্পে ব্যবহৃত ঈস্টকে ধ্বংস করে। Cyanophage ভাইরাস নীলাভ সবুজ শৈবালকে ধ্বংস করে। এতে মাটিতে নাইট্রোজেনের পরিমাণ কমে যায়। T2 ব্যাকটেরিওফায্ মানুষের অন্ত্রে বসবাসকারী E. coli ব্যাকটেরিয়াকে ধ্বংস করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *