অনিয়ন্ত্রিত মাইটোসিস ।। ক্যান্সার

কোষের বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন ধরনের ফ্যাক্টরের কারণে অনিয়ন্ত্রিত মাইটোসিস কোষ বিভাজন ঘটে। অনিয়ন্ত্রিত মাইটোসিস ঘটলে দেহে টিউমার ও ক্যান্সার সৃষ্টি হয়। টিউমার সৃষ্টির প্রক্রিয়াকে অঙ্কোজেনেসিস বলে। অনিয়ন্ত্রিত মাইটোসিস বা ক্যান্সার সৃষ্টির কারণ উল্লেখ করা হলো।

১। কোষচক্র নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাঃ কোষচক্রের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় ক্রটি বা বিচ্যুতি ঘটলে কোষের অনিয়ন্ত্রিত সংখ্যা বৃদ্ধি ঘটে এবং টিউমার বা ক্যান্সার সৃষ্টি হয়।

(i) কোষে সাইক্লিন-CDK যৌগের নিয়ন্ত্রণ বিনষ্ট হলে অনিয়ন্ত্রিত মাইটোসিস হয় এবং ক্যান্সার সৃষ্টি হয়।

(ii) কোষের DNA ক্ষতিগ্রস্ত হলে p53 প্রোটিন কোষ চক্র বন্ধ করে দেয়। কোন কারণে p53 প্রোটিন defective হলে কোষচক্র নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। ফলে ক্যান্সার সৃষ্টি হয়। মানুষের অধিক হারে ক্যান্সার সৃষ্টির সম্ভবত এটি একটি কারণ।

(iii) কোষ বিভাজনের জন্য কিছু গ্রোথ ফ্যাক্টর কাজ করে। ক্যান্সার কোষ নিজেই গ্রোথ ফ্যাক্টর তৈরী করে। এ কারণে কোষ বিভাজন দ্রæত হয় এবং ক্যান্সার সৃষ্টি হয়।

(iv) কোষচক্র নিয়ন্ত্রণকারী দুই ধরনের প্রোটিন হলো কাইনেজ প্রোটিন ও সাইক্লিন প্রোটিন। কাইনেজ প্রোটিন ও সাইক্লিন প্রোটিন কোষচক্র নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে ক্যান্সার সৃষ্টি হয়।

২। প্রোটো-অনকোজিনঃ যে সব জিন দেহে পজিটিভ কোষচক্র নিয়ন্ত্রক সৃষ্টি করে তাদেরকে প্রোটো-অনকোজিন বলে। প্রোটো-অনকোজিন মিউটেশনের কারণে অনকোজিনে (Oncogene) পরিনত হয়। Oncogene এর কারণে কোষচক্র নষ্ট হয়ে যায় এবং ক্যান্সার সৃষ্টি হয়। CDK একটি প্রোটো-অনকোজিন।

৩। প্যাপিলোমা ভাইরাসঃ বিভিন্ন প্রকার প্যাপিলোমা ভাইরাস ক্যান্সার রোগ সৃষ্টিতে সহায়তা করে। প্যাপিলোমা ভাইরাসে B6 ও B7 জিন থাকে। এই জিন কোষ বিভাজন নিয়ন্ত্রক প্রোটিন দু’টিকে স্থানচ্যুত করে। এতে স্বাভাবিক কোষ বিভাজন ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। ফলে টিউমার সৃষ্টি হয় যা পরে ক্যান্সার হতে পারে।

৪। টিউমার সাপ্রেসর জিনঃ টিউমার সাপ্রেসর জিন হলো নেগেটিভ কোষচক্র নিয়ন্ত্রক সৃষ্টিকারী জিন। ইহা কোষের অনিয়ন্ত্রিত সংখ্যা বৃদ্ধি রোধ করে। দেহে টিউমার ও ক্যান্সার সৃষ্টি বন্ধ করে।

৫। কারসিনোজেনিক এজেন্টঃ যে সব উপাদান বা এজেন্ট দেহে ক্যান্সার সৃষ্টি করে তাদেরকে কারসিনোজেনিক এজেন্ট বলে। অতিবেগুনি আলোকরশ্মি, সিগারেটের টার, এক্স-রে প্রভৃতি কারসিনোজেনিক এজেন্ট। এসব পদার্থ জিনের মিউটেশন বা পরিবর্তন ঘটায়। মিউটাজেনিক জিন ক্যান্সার সৃষ্টি করে।

৬। মেটাস্ট্যাসিসঃ দেহের বিভিন্ন অংশে ক্যান্সার সৃষ্টিকারী কোষ ছড়িয়ে পড়াকে মেটাস্ট্যাসিস বলে। ক্যান্সার সৃষ্টিকারী ম্যালিগন্যান্ট টিউমার কোষ রক্ত ও লসিকা দ্বারা দেহের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে এবং নতুন ভাবে টিউমার সৃষ্টি করে। Metastasis এর কারণে ক্যান্সার সৃষ্টি ত্বরান্বিত হয়।

৭। কোষের মৃত্যুঃ কোষের মৃত্যু দুটি উপায়ে ঘটে। নেক্রোসিস ও অ্যাপোপটোসিস। পুষ্টি উপাদানের অভাব অথবা বিষাক্ত পদার্থের কারণে কোষের মৃত্যু হলে তাকে নেক্রোসিস বলে। অ্যাপোপটোসিস প্রক্রিয়ায় দেহের অপ্রয়োজনীয় কোষ বা অঙ্গের মৃত্যু ঘটে। মানুষের আঙ্গুলের মাঝখানের টিস্যুর বিলুপ্তি বা মৃত্যু হলো অ্যাপোপটোসিস। অ্যাপোপটোসিসের কারণে লোহিত রক্তকণিকা, শে^ত রক্তকণিকা ও অণুচক্রিকা নির্দিষ্ট সময় পর মারা যায়।

৮। ক্যান্সারঃ Cancer শব্দের অর্থ হলো crab বা কাঁকড়া। ক্যান্সার কোষ চারিদিকে ছড়িয়ে পড়লে কাঁকড়ার সাঁড়াসি পায়ের মতো দেখায়। ক্যান্সার কোষে সাইক্লিন- cdk এর নিয়ন্ত্রণ বিনষ্ট হয়ে যায়। ক্যান্সার কোষ তাদের গ্রোথ ফ্যাক্টর নিজেরাই তৈরী করে অথবা কোষ বিভাজনের জন্য গ্রোথ ফ্যাক্টর দরকার হয় না। তাই ক্যান্সার সৃষ্টির সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

৯। মাইটোটিক ইনডেক্সঃ কোন টিস্যুতে বিদ্যমান মোট কোষের সংখ্যা এবং মাইটোসিস বিভাজনরত কোষের সংখ্যার অনুপাতকে মাইটোটিক ইনডেক্স (MI) বলে। ক্যান্সার সৃষ্টিকারী কোষের মাইটোটিক ইনডেক্স স্বাভাবিক কোষের চেয়ে অনেক বেশি থাকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *