ছত্রাকের উপকারীতা আলোচনা

১। খাদ্য হিসেবে (Food)ঃ প্রোটিন ও ভিটামিনযুক্ত ছত্রাক মানুষের খাদ্য হিসেবে ব্যবহার হয়। মানুষের খাদ্যোপযোগী ছত্রাক প্রজাতির সংখ্যা প্রায় ২০০। মাশরুম (Agaricus,Volvariella), ট্রাফল, মোরেল (Morchella) প্রভৃতি ছত্রাক বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে খাদ্য হিসেবে ব্যবহার হয়। মানুষের ভক্ষণযোগ্য ছত্রাক হলো Agaricus bisporus এবং Agaricus campestris। এদের পুষ্টিগুণ উন্নত মানের।

২। বিয়োজক (Decomposer)ঃ ছত্রাক বাস্তুতন্ত্রে বিয়োজক হিসেবে কাজ করে। এরা উদ্ভিদ ও প্রাণীর মৃতদেহকে দ্রুত পচিয়ে জৈব বস্তুতে পরিনত করে। তাই এদেরকে রুপান্তরক বলা। এরা মৃতদেহের উপর জন্মে এবং সেখান থেকে খাদ্য গ্রহণ করে। তাই এদেরকে মৃতজীবী বা স্যাপ্রোফাজ (Saprophage) বলা হয়।

৩। ওষুধ তৈরী (Medicine)

(i) Penicillium notatum এবং Penicillium chrysogenum থেকে পেনিসিলিন ও স্ট্রেপটোমাইসিন (অ্যান্টিবায়োটিক) তৈরী করা হয়। Penicillium griseofulvum থেকে গ্রিসিওফুলভিন এবং streptomyces griseus থেকে অ্যাক্টিনোমাইসিটিস তৈরী করা হয়। এছাড়া ক্লোরোমাইসিটিন, নিওমাইসিন, অরিওমাইসিন প্রভৃতি অ্যান্টিবায়োটিক ছত্রাক থেকে তৈরী করা হয়।

(ii) Claviceps purpurea হতে ergot তৈরী করা হয়। ইহা গর্ভপাত ত্বরান্বিত করতে এবং সন্তান প্রসাবের পর রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে ব্যবহার হয়।

(iii) Aspergillus ছত্রাক থেকে স্টেরয়েড ওষুধ তৈরী করা হয়। ইহা আরথ্রাইটিস রোগ নিরাময়ে ব্যবহার হয়।

(iv) Tolypocladium inflatum থেকে সাইক্লোস্পোরিন ওষুধ তৈরী করা হয়। এর বাণিজ্যিক নাম নিওরাল। ইহা মানুষের অঙ্গ ট্রান্সপ্লান্ট করতে ব্যবহার হয়।

(v) মাশরুমের ডায়াবেটিস কমানোর ক্ষমতা আছে। মেজিক মাশরুমে সিলোসিন ও সিলোসাইবিন থাকে। সিলোসিন ও সিলোসাইবিন হলো হ্যালুসিনোজেন-এর মূল উপাদান। হ্যালুসিনোজেন শরীরের বিষন্নতা দূর করে।

৪। বালাইনাশক (Pesticides)ঃ ছত্রাক থেকে বিভিন্ন ধরনের বালাইনাশক (ওষুধ) তৈরী করা হয়। ইহা কীট-পতঙ্গ দমনে ব্যবহার হয়। যেমন- Empusa sepulchralis, Isaria ferinosa, Ascherromyces deyroides.

৫। জৈব এসিড (Organic acid)ঃ Penicillium-এর বিভিন্ন প্রজাতি হতে সাইট্রিক এসিড, ম্যালিক এসিড, ফিউমারিক এসিড, অক্সালিক এসিড, গ্লুকোনিক এসিড প্রভৃতি তৈরী করা হয়। Aspergillus niger হতে ডায়াস্টেজ ও অক্সালিক এসিড, Gibberella fujikuroi হতে জিবেরেলিক এসিড এবং Saccharomyces হতে ইনভারটেজ এনজাইম বা উৎসেচক পাওয়া যায়।

৬। হরমোন (Hormone)ঃ Gibberella fujikuroi ছত্রাক থেকে জিবেরেলিন হরমোন পাওয়া যায়। ইহা উদ্ভিদের বৃদ্ধি ঘটায়।

৭। এনজাইম সংশ্লেষ (Enzyme production)ঃ Aspergillus flavus এবং Aspergillus oryzae ছত্রাকের সাহায্যে ডাইজেটিন, পলিজাইম ও ডায়াস্টেজ এনজাইম প্রস্তুত করা হয়।

৮। প্রোটিন সংশ্লেষ (Protein production)ঃ গুড় ও অ্যামোনিয়া মিশ্রিত কালচার মাধ্যমে Saccharomyces cerevisiae Candida urtilis ছত্রাক চাষ করে ঈস্ট কেক তৈরী করা হয়। ঈস্ট কেক প্রোটিন সমৃদ্ধ। এতে ১৫% আমিষ থাকে।

৯। ভিটামিন তৈরী (Vitamine production)ঃ Ashbya gossypii ছত্রাক থেকে ভিটামিন-বি, Aspergillus niger থেকে ভিটামিন-সি এবং ঈস্ট থেকে ভিটামিন-ডি তৈরী করা হয়।

১০। মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি (Soil fertilities)ঃ মৃতজীবী ছত্রাক মৃত উদ্ভিদ ও প্রাণীর দেহাবশেষ এবং পচনশীল জৈব বস্তু থেকে খাদ্য গ্রহণ করে। এসব ছত্রাক জটিল জৈব যৌগকে ভেঙ্গে সরল অজৈব উপাদানে পরিনত করে। ফলে মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি পায়। ৮ ইঞ্চি উর্বর মাটিতে এক টন ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়া থাকতে পারে।

১১। শিল্পক্ষেত্রে (Industry)ঃ শিল্পক্ষেত্রে ছত্রাকের ভূমিকা হলো-

(i) Saccharomyces-এর বিভিন্ন প্রজাতি ভিটামিন B ও C পাউরুটি, কেক, গিøসারিন প্রভৃতি তৈরীতে ব্যবহার হয়। কোকোর বীজ থেকে উৎপন্ন চকোলেট সুগন্ধি করতে ইহা ব্যবহার হয়।

(ii) মদ তৈরীতে Saccharomyces cerevisiae Aspergillus oryzae ছত্রাক ব্যাপক ভাবে ব্যবহার হয়।

(iii) গাঁজন প্রক্রিয়ায় আখ, খেজুর, তাল ও আঙ্গুর থেকে অ্যালকোহল তৈরীতে Saccharomyces ব্যবহার হয়।

(iv) সুরভিত পনীর তৈরীতে Penicillium camemberti Penicillium rosqueferti ব্যবহার হয়।

(v) শ্বেতসার ভেঙ্গে চিনি তৈরী করতে Mucor rouxii ব্যবহার হয়।

(vi) Odium lactis প্রজাতির ছত্রাক প্লাস্টিক তৈরীতে ব্যবহার হয়।

(vii) Aspergillus Penicillium প্রজাতির ছত্রাক থেকে জৈব এসিড, ভিটামিন ও এনজাইম তৈরী করা হয়।

(viii) বেকারিতে পাউরুটি ও কেক তৈরীতে Saccharomyces ব্যাপক ভাবে ব্যবহার হয়। এজন্য একে Brewer yeast বলা হয়।

১২। শিলা বিচূর্ণীকরণে (Rock pulverised) ঃ ছত্রাক লাইকেনে সহবাসী হিসেবে অবস্থান করে। লাইকেন শিলা বিচূর্ণকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিচূর্ণ শিলা মাটি তৈরীতে ভূমিকা রাখে।

১৩। পরিবেশ সংরক্ষণ (Conservation of environment) ঃ ছত্রাক পরিবেশের দূষক পদার্থকে বিশ্লিষ্ট করে পরিবেশকে দূষণমুক্ত করে। এই প্রক্রিয়াকে বায়োরিমেডিয়েশন (Bioremediation) বলে। ছত্রাক বর্জ্য পদার্থকে বিশ্লিষ্ট করে পরিবেশে কার্বন ও অন্যান্য মৌল ফিরিয়ে দেয় যা পরবর্তীতে সবুজ উদ্ভিদ ব্যবহার করে। ফলে পরিবেশ বিশুদ্ধ থাকে এবং জীবের জন্য নিরাপদ হয়।

১৪। মৌলিক গবেষণায় (Basic reseach) ঃ আণবিক জীববিজ্ঞানের উচ্চতর গবেষণায় Saccharomyces cerevisiae এর AH-109, PJ69-4 alpha, Y187 প্রভৃতি জাত ব্যবহার হয়। এছাড়া Saccharomyces, Ascobolus, Neurospora প্রভৃতি জিনতত্তে¡র গবেষণায় ব্যবহার হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *