শ্বসন ।। শ্বসনের প্রকারভেদ ।। Classification of respiration

অক্সিজেনের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতির উপর ভিত্তি করে শ্বসন প্রক্রিয়াকে দু’টি পর্যায়ে ভাগ করা যায়।

১। সবাত শ্বসনঃ এই শ্বসনে মুক্ত অক্সিজেনের প্রয়োজন হয় এবং বেশি পরিমাণ শক্তি উৎপন্ন হয়। অসংখ্য ব্যাকটেরিয়া, অধিকাংশ ছত্রাক, শৈবাল, ব্রায়োফাইটা, টেরিডোফাইটা, উদ্ভিদ ও প্রাণীদেহে সবাত শ্বসন ঘটে।

২। অবাত শ্বসনঃ এই শ্বসনে মুক্ত অক্সিজেনের প্রয়োজন হয় না এবং কম পরিমাণ শক্তি উৎপন্ন হয়। কিছু ব্যাকটেরিয়া এবং এককোষী ছত্রাক ঈস্টে অবাত শ্বসন ঘটে।

শ্বসন ।। শ্বসনিক বস্তু

যে সব বস্তু বা উপাদান শ্বসন প্রক্রিয়ায় কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার হয় তাদেরকে শ্বসনিক বস্তু বলে। কার্বোহাইড্রেট হলো প্রধান শ্বসনিক বস্তু। তবে প্রোটিন, অ্যমাইনো এসিড, চর্বি, ফ্যাটি এসিড, গ্লিসারল এবং বিভিন্ন ধরনের জৈব এসিড শ্বসনিক বস্তু হিসেবে ব্যবহার হয়। প্রাণীদেহের প্রধান ট্রান্সলোকেটেড সুগার হলো গ্লুকোজ। ইহা সরাসরি শ^সনিক বস্তু হিসেবে ব্যবহার হয়। উদ্ভিদদেহের প্রধান ট্রান্সলোকেটেড সুগার হলো সুক্রোজ। ইহা ভেঙ্গে গ্লুকোজ ও ফ্রুক্টোজ উৎপন্ন হয় এবং শ^সনে ব্যবহার হয়।

শ্বসন ।। শ্বসন কী ।। Respiration কী

ল্যাটিন শব্দ Respirae অর্থ to breathe বা শ্বাস নেওয়া। যে জৈব রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন ধরনের এনজাইমের কার্যকারীতায় জীবকোষস্থ জটিল জৈব যৌগ জারিত হয়ে সরল যৌগে পরিনত হয় এবং স্থিতিশক্তি গতিশক্তিতে রুপান্তরিত হয় তাকে শ্বসন বা রেসপিরেশন বলে। শ্বসন হলো শক্তি সঞ্চারণকারী একটি শক্তিশালী জারণ-বিজারণ প্রক্রিয়া। শ্বসনের ফলে জীবদেহে ATP উৎপন্ন হয়। এই ATP জীবের সকল শারীরবৃত্তীয় কাজে শক্তি যোগায়। কোষের সাইটোপ্লাজম ও মাইটোকন্ড্রিয়ায় শ^সন ঘটে। ইহা দিন-রাত ২৪ ঘন্টা সংঘটিত হয়।

C6H12O6 +6O2+6H2O→ 6CO2+12H2O+36ATP(CH3-CO-COOH)

সালোকসংশ্লেষণ ।। সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় CO2-এর অপরিহার্যতা পরীক্ষা ।। ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

তত্ত¡ (Theory)ঃ ইংরেজি শব্দ Photo অর্থ আলো এবং synthesis অর্থ সংশ্লেষণ নিয়ে Photosynthesis শব্দটি গঠিত। Photosynthesis-এর অর্থ হলো একাধিক বস্তুর সমন্বয়ে কোন যৌগিক পদার্থ সৃষ্টি করা। যে জৈব রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় সবুজ উদ্ভিদ সূর্যালোকের উপস্থিতিতে ক্লোরোফিলের সহায়তায় পানি ও কার্বন ডাই অক্সাইডের রাসায়নিক মিলন ঘটিয়ে শর্করা জাতীয় খাদ্য উৎপন্ন করে এবং উপজাত পদার্থ হিসেবে অক্সিজেন ত্যাগ করে তাকে সালোকসংশ্লেষণ বলে। ১৮৯৮ সালে চার্লস রেইড ব্যারেনস্ (Charles Barnes) সর্বপ্রথম Photosynthesis শব্দটি ব্যবহার করেন।

প্রয়োজনীয় উপকরণ

১। টবসহ লম্বা পাতাযুক্ত একটি সতেজ গাছ, ২। বড় মুখওয়ালা কাঁচের বোতল- ১টি, ৩। ২০% কস্টিক পটাশ দ্রবণ, ৪। পানিসহ পেট্রিডিস- ১টি, ৫। কাটা ছিপি- ১টি, ৬। ভেসেলিন বা মোম, ৭। ৮০% অ্যালকোহল, ৮। ১% আয়োডিন দ্রবণ।

কার্যপদ্ধতি বা কাজের ধারা

১। পরীক্ষার পূর্বে টবসহ গাছটিকে তিনদিন অন্ধকার ঘরে রেখে শে^তসারবিহীন করলাম।

২। টেবিলের উপর বড় মুখওয়ালা বোতল কাত করে রেখে বোতলের ভিতরে কিছু কস্টিক পটাশ দ্রবণ নিলাম।

৩। অন্ধকারে রাখা গাছ থেকে বোটাসহ একটি লম্বা পাতা নিলাম। পত্রফলকের অগ্রভাগ কাটা ছিপির ভিতর দিয়ে বোতলের ভিতর প্রবেশ করিয়ে দিলাম।

৪। পাতার বোটা পানিপূর্ণ পেট্রিডিসে ডুবিয়ে রাখলাম।

৫। বায়ুরোধক করার জন্য ছিপির কাটা অংশে ভেসলিন বা মোমের প্রলেপ দিলাম যাতে ফাঁকা অংশ ভালভাবে বন্ধ হয়ে যায়।

৬। পাতাসহ পরীক্ষণটি সূর্যালোকে রেখে দিলাম।

৭। ৩-৪ ঘন্টা পর পাতাটি বোতল থেকে বের করে ৮০% অ্যালকোহলে সিদ্ধ করলাম। এতে পাতা ক্লোরোফিল মুক্ত হয়ে বিবর্ণ হয়ে গেল।

৮। বিবর্ণ পাতাটি পানিতে ভালভাবে ধুয়ে ১% আয়োডিন দ্রবণে ১ মিনিট ভিজিয়ে রাখলাম।

৯। পাতাটি আয়োডিন দ্রবণ থেকে তুলে পাতিত পানিতে ধুয়ে একটি পরিষ্কার সাদা কাগজের উপর রেখে দিলাম।

 

পর্যবেক্ষণ

পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেল, পাতার যে অংশ বোতলের বাইরে ছিল তা আয়োডিন দ্রবণের সংস্পর্শে নীল বা কালো বর্ণ ধারণ করেছে। কিন্তু বোতলের ভিতরে থাকা পাতার অংশটিতে বর্ণের কোন পরিবর্তন ঘটেনি।

সিদ্ধান্ত

বোতলের ভিতরে পাতার অংশ সূর্যালোক, পানি ও অক্সিজেন পেয়েছে, কিন্তু ঈঙ২ পায় নাই। তাই শে^তসার বা শর্করা তৈরী হয় নাই। সালোকসংশ্লেষণের জন্য ঈঙ২ অপরিহার্য।

সতর্কতা

১। গাছটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অন্ধকারে রেখে ছিলাম।

২। বোতলের মুখ ভেসলিন দিয়ে ভালভাবে বন্ধ করলাম যাতে ফাঁকা না থাকে।

৩। পাতাটিকে ভালভাবে সিদ্ধ করলাম।

৪। রাসায়নিক পদার্থ যাতে শরীরে না লাগে সেদিকে খেয়াল রাখলাম।

৫। ভালভাবে পর্যবেক্ষণ করলাম।

আলোক শ্বসনের গুরুত্ব ।। ফটোরেসপিরেশনের গুরুত্ব ।। ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

১। আলোক শ্বসনে অধিক ঘনত্বের অক্সিজেনে RuBP কার্বক্সিলেজ RuBP অক্সিজিনেজ হিসেবে কাজ করে।
২। সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন খাদ্যবস্তু আলোক শ্বসনে জারিত হয়। তাই ইহা একটি ক্ষতিকর পদ্ধতি।
৩। আলোক শ্বসনে ATP উৎপন্ন হয় না। তাই একে প্রকৃত শ্বসন বলা যায় না।
৪। আলোক শ্বসনে ATP ও NADPH+H+ খরচ হয়।
৫। এই প্রক্রিয়া উদ্ভিদকে পীড়ন থেকে রক্ষা করে।
৬। এই প্রক্রিয়া সালোকসংশ্লেষণের জন্য পরোক্ষ ভাবে উপকারী।
৭। এই পদ্ধতিতে গ্লাইসিন ও সেরিন উৎপন্ন হয়।

আলোক শ্বসন প্রকৃত শ্বসন নয় কেন

আলোক শ্বসনে কার্বন যৌগ ভেঙ্গে CO2 নির্গত হয়। এ প্রক্রিয়ায় কোন ATP উৎপন্ন হয় না। তাই আলোক শ্বসনকে প্রকৃত শ্বসন বলা হয় না।

ফটোরেসপিরেশন কী ।। আলোক শ্বসন কী ।। Photorespiration ।। ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

যে প্রক্রিয়ায় সবুজ উদ্ভিদে আলোর উপস্থিতিতে অক্সিজেন গ্রহণ ও CO2 নির্গত হয় এবং ফসফোগ্লাইকোলেট উৎপন্ন হয় তাকে ফটোরেসপিরেশন বা আলোক শ্বসন বলে। ক্যালভিন চক্র চলাকালে তীব্র আলো ও উচ্চ তাপমাত্রা সৃষ্টি হলে ফটোরেসপিরেশন ঘটে। তীব্র আলো ও অধিক তাপমাত্রায় (৩০ ডিগ্রী সে এর বেশি) পানি সংরক্ষণের জন্য পত্ররন্ধ্র বন্ধ হয়ে যায়। ফলে পাতায় CO2 এর পরিমাণ কমে যায়। এ সময় রাইবুলোজ ১, ৫ বিসফসফেট CO2 এর পরিবর্তে O2 এর সাথে বিক্রিয়া করে ২-কার্বন বিশিষ্ট গ্লাইকোলেট উৎপন্ন করে। তাই এই চক্রকে গ্লাইকোলিক এসিড চক্র বা C2 চক্র বলা হয়। এই চক্রাকার গতিপথকে ফটোসিনথেটিক কার্বন অক্সিডেটিভ (PCO) চক্রও বলা হয়। গ্লাইকোলেট কোষের পারঅক্সিজোমে প্রবেশ করে এবং অক্সিজেনের সাথে বিক্রিয়া করে কিছু দ্রব্য উৎপন্ন করে। এই দ্রব্য গুলো মাইটোকন্ড্রিয়ায় প্রবেশ করে এবং বিক্রিয়া করে CO2 উৎপন্ন করে। তবে বান্ডলসীথ কোষে পর্যাপ্ত CO2 থাকায় আলোক শ্বসন ঘটে না। ফটোরেসপিরেশন C3 উদ্ভিদের সালোকসংশ্লেষণ হার ২৫% পর্যন্ত কমাতে পারে। এই প্রক্রিয়ায় দুইটি অ্যামাইনো এসিড গ্লাইসিন ও সেরিন উৎপন্ন হয়। বিজ্ঞানী কাজাকি (Kazaki) এবং টাকেবা (Takeba, ১৯৯৬)-র মতে, অধিক আলোক তীব্রতা, তাপমাত্রা ও অক্সিজেনের ঘনত্বে আলোক জারণের ফলে সালোকসংশ্লেষণের যে ক্ষতি হতে পারত আলোক শ^সন উদ্ভিদকে তা থেকে রক্ষা করে। অনেক সময় আলোক শ^সনকে পারঅক্সিসোমাল শ^সন বলা হয়।

সালোকসংশ্লেষণ ।। জীবজগতে সালোকসংশ্লেষণের ভূমিকা/গুরুত্ব

১। খাদ্য উৎপাদনঃ সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় সবুজ উদ্ভিদ শর্করা জাতীয় খাদ্য তৈরী করে। C3 চক্রে উৎপন্ন খাদ্য গøুকোজ এবং C4 চক্রে উৎপন্ন খাদ্য হলো পাইরুভিক এসিড।

২। প্রাণীর খাদ্যঃ সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন খাদ্য উদ্ভিদ দেহে সঞ্চিত থাকে। প্রাণীরা উদ্ভিদকে খাদ্য হিসেবে

গ্রহণ করে।

৩। শক্তির রুপান্তরঃ এই প্রক্রিয়ায় সৌর শক্তি রাসায়নিক শক্তিতে রুপান্তরিত হয়। পৃথিবীতে সালোকসংশ্লেষণ হলো শক্তি রুপান্তরের প্রক্রিয়া।

৪। প্রাণীর শ্বসনঃ সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন শর্করা শ্বসনিক বস্তু হিসেবে ব্যবহার হয়।

৫। পরিবেশ দুষণ রোধঃ সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় CO2 গৃহীত হয় এবং O2 নির্গত হয়। ফলে O2 ও CO2 এর ভারসাম্য রক্ষা পায় এবং পরিবেশের দুষণ রোধ হয়।

৬। তাপমাত্রা রক্ষাঃ সালোকসংশ্লেষণের সময় উদ্ভিদ সৌর শক্তি শোষণ করে। এতে পৃথিবীতে তাপমাত্রা আবদ্ধ থাকে। ফলে পরিবেশের তাপমাত্রা সহনীয় হয়।

৭। উদ্ভিদের দৈহিক বৃদ্ধিঃ সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় উদ্ভিদ খাদ্য উৎপন্ন করে। এই খাদ্য উদ্ভিদের দৈহিক বৃদ্ধি ঘটায়। তাই উদ্ভিদের দৈহিক বৃদ্ধিতে সালোকসংশ্লেষণের ভূমিকা রয়েছে।

৮। মানব সভ্যতার বিকাশঃ মানবসভ্যতার অতি প্রয়োজনীয় খাদ্য, বস্তু, ওষুধ, জ্বালানী, আসবাবপত্র, কাগজ প্রভৃতি সালোসংশ্লেষণের অবদান।

৯। উৎপাদকঃ সবুজ উদ্ভিদ হলো উৎপাদক। এরা সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় খাদ্য তৈরী করে। জীবজগত উৎপাদকের উপর নির্ভরশীল।

১০। চিকিৎসায়ঃ চিকিৎসাবিজ্ঞানে ব্যবহৃত মরফিন, কুইনাইন, রেসারপিন, বেলাডোনাসহ অসংখ্য ওষুধ উদ্ভিদ থেকে পাওয়া যায়। এসব ওষুধ সালোকসংশ্লেষণের ফল।

সালোকসংশ্লেষণ ।। সালোকসংশ্লেষণের অভ্যন্তরীণ প্রভাবক কী কী ।। Internal factors কী কী

১। পাতার সংখ্যাঃ উদ্ভিদ দেহে পাতার সংখ্যা বেশি হলে সালোকসংশ্লেষণের পরিমাণ বেশি হয় এবং পাতার সংখ্যা কম হলে সালোকসংশ্লেষণের পরিমাণ কম হয়।

২। পাতার বয়সঃ মাঝারী বয়সের পাতায় অধিক পরিমাণ সালোকসংশ্লেষণ ঘটে। কচি এবং বয়স্ক পাতায় সালোকসংশ্লেষণের পরিমাণ কম হয়।

৩। পাতার অন্তর্গঠনঃ পাতার প্রকৃতি, মেসোফিল কোষের বিন্যাস পত্ররন্ধ্রের সংখ্যার উপর সালোকসংশ্লেষণের হার নির্ভর করে।

৪। প্রোটোপ্লাজমঃ যে পাতার প্রোটোপ্লাজম বেশি তার সালোকসংশ্লেষণের হারও বেশি।

৫। ক্লোরোফিলঃ পাতায় ক্লোরোফিলের পরিমাণ বেশি থাকলে সালোকসংশ্লেষণের পরিমাণ বেশি হয়।

৬। শর্করার পরিমাণঃ পাতায় শর্করা বেশি থাকলে সালোকসংশ্লেষণের হার কম হয়।

৭। পটাশিয়ামঃ পাতায় পটাশিয়ামের পরিমাণ কম হলে সালোকসংশ্লেষণ কমে যায়।

৮। এনজাইমঃ প্রয়োজনীয় এনজাইমের পরিমাণ সালোকসংশ্লেষণের হার নিয়ন্ত্রণ করে।