যে বীজে ভ্রুণের পূর্ণতা প্রাপ্তির পর সস্য বিদ্যমান থাকে তাকে সস্যল বীজ বলে।
ত্রিমিলন কী ।। Triple fusion কী
ভ্রুণথলীর হ্যাপ্লয়েড শুক্রাণুর সাথে ডিপ্লয়েড সেকেন্ডারী নিউক্লিয়াসের মিলনকে ত্রিমিলন বলে। অর্থাৎ ত্রিমিলনে দুইটি মেরু নিউক্লিয়াস এবং একটি পুংগ্যামিটসহ তিনটি নিউক্লিয়াসের মিলন ঘটে। তাই একে ত্রিমিলন বলে।
সিনগ্যামী কী ।। Syngamy কী
দুইটি শুক্রাণুর মধ্যে একটি ডিম্বাণুর সাথে মিলিত হয়ে একীভ‚ত হয়ে যায়, এই ঘটনাকে সিনগ্যামী বলে। ১৮৮৪ সালে স্ট্রাসবুর্গার (Strasburger) সর্বপ্রথম সিনগ্যামী পর্যবেক্ষণ করেন।
নিষেক ।। দ্বি-নিষেকের গুরুত্ব ।। Importance of double fertilization
১। অষ্টক নিউক্লিয়াস দশায় স্ত্রীগ্যামিটোফাইটের বৃদ্ধি থেমে যায়। দ্বি-নিষেকের পর বৃদ্ধি আবার শুরু হয়।
২। বৃদ্ধি প্রাপ্ত ভ্রুণের পরিপোষকের যোগান দেয় সস্য। জীবনক্ষম বীজ গঠনের জন্য দ্বি-নিষেক অপরিহার্য।
৩। নিষেকের পূর্বে সেকেন্ডারী নিউক্লিয়াস কোষ বিভাজন বন্ধ করে দেয়। ট্রিপল ফিউশন সুপ্ত নিউক্লিয়াসকে বিভাজন ক্ষমতা অর্জনে সাহায্য করে।
৪। দ্বি-নিষেক পুং-উদ্ভিদ ও পোষক কলার বৈশিষ্ট্য নির্ধারণে সাহায্য করে।
নিষেক ।। দ্বি-নিষেক কী ।। Double fertilization
একই সময়ে দুইটি শুক্রাণুর মধ্যে একটি ডিম্বাণুর সাথে এবং অপরটি সেকেন্ডারী নিউক্লিয়াসের সাথে মিলিত হওয়ার প্রক্রিয়াকে দ্বি-নিষেক বলে। দ্বি-নিষেক আবৃতবীজী উদ্ভিদে ঘটে। ১৯৯০ সালে বিজ্ঞানী উইলিয়াম ফ্রেন্ডম্যান (Williams Friendman) নগ্নবীজী উদ্ভিদ Ephedra-তে দ্বি-নিষেক আবিষ্কার করেন। ১৮৯৮ সালে বিজ্ঞানী নওয়াসিন Lilium martagon ও Fritellaria tenella উদ্ভিদে দ্বি-নিষেক পর্যবেক্ষণ করেন। ধান, গম, ভুট্রা, রেড়ি প্রভৃতিতে দ্বি-নিষেক ঘটে।
নিষেকের পর গর্ভাশয় ও ডিম্বকের পরিবর্তন
১। গর্ভাশয়→ফল
২। গর্ভাশয় প্রাচীর→ফলত্বক
৩। ডিম্বক→বীজ
৪। ডিম্বাণু→ভ্রুণ
৫। ডিম্বকরন্ধ্র বা মাইক্রোপাইল→বীজরন্ধ্র
৬। ডিম্বকনাভী বা হাইলাম→বীজনাভী
৭। ডিম্বকনাড়ী বা ফিউনিকুলাস→বীজবৃন্ত
৮। এক্সাইন→টেস্টা/বীজ বহিঃত্বক
৯। ইন্টাইন→টেগমেন বা বীজ অন্তঃত্বক
১০। ডিম্বকত্বক→বীজত্বক
১১। নিউসেলাস (ভ্রুণ পোষক কলা)→নষ্ট হয়/পেরিস্পার্ম
১২। সেকেন্ডারী বা সস্য নিউক্লিয়াস→সস্য বা এন্ডোস্পার্ম
১৩। সাহায্যকারী কোষ বা সিনারজিড→নষ্ট হয়ে যায়
১৪। প্রতিপাদ কোষ বা অ্যান্টিপোডাল→নষ্ট হয়ে যায়
১৫। ডিম্বকমূল বা ক্যালাজা→বীজমূল বা নষ্ট হয়ে যায়
এরিল কী ।। Ariel
ডিম্বক বীজে পরিনত হওয়ার সময় একটি তৃতীয় স্তর গঠিত হয়। একে এরিল বলে। যেমন- লিচু, কাঠলিচু, জায়ফল, শাপলা প্রভৃতি।
নিষেক ।। নতুন জাত সৃষ্টিতে নিষেকের ভূমিকা ।। Roles of new varieties
১। নিষেক প্রক্রিয়ায় পুংকেশরের শুক্রাণু স্ত্রীকেশরের ডিম্বাণুর সাথে মিলন ঘটায়। শুক্রাণু ও ডিম্বাণু ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের হওয়ায় একটি নতুন জাত সৃষ্টির সম্ভাবনা থাকে। নতুন জাতটি মাতৃ উদ্ভিদ হতে ভিন্ন প্রকৃতির হয়।
২। ফিলিপাইনে ইন্দোনেশিয়ার পেটা ধান (Peta) এবং তাইওয়ানের ডিজি উজেন (Dee-gee-woo-gen) ধানের মধ্যে নিষেক ঘটিয়ে ইরি-৮ ধান উদ্ভাবন করা হয়েছে। এ ধানের ফলন একর প্রতি ৯০-১০০ মণ।
৩। ইন্দোনেশিয়ার পেটা ধান, ভারতের টিকেএম-৬ ধান এবং তাইওয়ানের টাইচু-১ ধানের মধ্যে প্রজনন ঘটিয়ে ইরিশাইল ধান উদ্ভাবন করা হয়। এ ধানের ফলন একর প্রতি ৭০-৭৫ মণ। ইরি-৫ ধানের ফলন একর প্রতি ৭০-৭৫ মণ। উচ্চ ফলনশীল ইরি ধান হলো ইরি-২০, ইরি-২৮, ইরি-২৯ ইত্যাদি।
৪। বাংলাদেশ ধান গবেষণা কেন্দ্র BR-২০ এবং BR-৩ এর মধ্যে নিষেক ঘটিয়ে বিরিশাইল ধান উদ্ভাবন করেছে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা কেন্দ্র কর্তৃক উদ্ভাবিত চারটি উফশি জাতের ধান হলো চান্দিনা (BR-১), মালা (BR-২), শাহী বালাম (BR-১৫) এবং শ্রাবনী (BR-২৬)।
৫। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) সংকরায়নের মাধ্যমে ১৭টি উফশি জাতের গম উদ্ভাবন করেছে। উচ্চ ফলনশীল গমের জাত হলো বলাকা, আকবর, কাঞ্চন, বরকত ও সওগাত। এছাড়া BR-27 ও BR-28 গম আরও উন্নত।
৬। বুনো রোগ প্রতিরোধী ফসলের সাথে আবাদি রোগ কাতর ফসলের প্রজনন ঘটিয়ে রোগ প্রতিরোধী জাত উদ্ভাবন করা হয়। মুক্তা (BR-11), গাজী (BR-14), মোহিনী (BR-15) প্রভৃতি ধানের রোগ প্রতিরোধী জাত।
৭। কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে উদ্ভিদের এমন জাত সৃষ্টি করা হয়েছে যা প্রতিকূল পরিবেশে জন্মাতে পারে। এ সব জাত ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের হওয়ায় খরা, বন্যা, লবণাক্ততা প্রভৃতি সহ্য করতে পারে।
৯। কৃত্রিম সংকরায়নের মাধ্যমে ফসলের আবাদকাল ২০-৩০ দিন পর্যন্ত কমানো সম্ভব হয়েছে। নতুন এই জাত প্রতিকূল পরিবেশ শুরুর আগেই ফলন দেয়।
জীববৈচিত্র্য ।। জীববৈচিত্র্য সৃষ্টিতে নিষেকের ভূমিকা ।। Roles of biodiversity
১। নিষেক প্রক্রিয়ায় ভিন্ন বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর মিলন ঘটে। তাই সৃষ্ট নতুন উদ্ভিদটি আকার, আকৃতি ও গঠনে ভিন্ন প্রকৃতির এবং বৈচিত্র্যময় হয়।
২। নিষেকের ফলে রোগ কাতর উদ্ভিদ থেকে রোগ প্রতিরোধী উদ্ভিদ সৃষ্টি হয়। রোগ প্রতিরোধী উদ্ভিদ বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের এবং বৈচিত্র্যের হয়।
৩। নিষেকের মাধ্যমে ভিন্ন দুটি উদ্ভিদের মিলনে এমন জাত সৃষ্টি হয় যা প্রতিকূল সহিঞ্চু। এ সব উদ্ভিদে প্রতিকূল প্রতিরোধী বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের সমাবেশ ঘটে। বৈচিত্র্যময় এসব উদ্ভিদ সহজেই খরা, বন্যা, লবণাক্ততা, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি প্রভৃতি সহ্য করতে পারে।
৪। নিষেক প্রক্রিয়ায় ফসলী উদ্ভিদে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য সৃষ্টি হয়। এসব উদ্ভিদের শস্যদানার আকার, বর্ণ, গন্ধ, স্বাদ প্রভৃতি ভিন্ন রকম হয়।
নিষেক ।। নিষেক ক্রিয়ার গুরুত্ব ।। নিষেকের পরিনতি ।। Importance of fertilization
১। ভ্রুণের পরিস্ফুটনঃ নিষেকের ফলে জাইগোট সৃষ্টি হয়। জাইগোট বিভাজিত হয়ে আদিভ্রুণ (Pro-embryo) গঠন করে। আদিভ্রুণ বিভাজিত হয়ে পূর্ণাঙ্গ ভ্রুণে পরিনত হয়। আদিভ্রুণ বিভাজিত হয়ে বীজপত্র, ভ্রুণকান্ড এবং ভ্রুণমূল সৃষ্টির মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ ভ্রুণ গঠন করে।
২। সস্যের উৎপত্তিঃ জীবজগতের খাদ্যের প্রধান উৎস হলো সস্য। শুক্রাণু সেকেন্ডারী নিউক্লিয়াসের সাথে মিলিত হয়ে এন্ডোস্পার্ম বা সস্য উৎপন্ন করে।
৩। বীজ সৃষ্টিঃ শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর মিলনে জাইগোট সৃষ্টি হয়। জাইগোট সৃষ্টি হওয়ার পর ডিম্বক বীজে পরিনত হয়।
৪। ফল সৃষ্টিঃ নিষেকের পর ফুলের গর্ভাশয় ধীরে ধীরে ফলে এবং গর্ভাশয়ের ত্বক ফলত্বকে পরিনত হয়।
৫। বংশ রক্ষাঃ শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর মিলনের পর ফুলের ডিম্বকটি বীজে পরিনত হয়। পৃথিবীর অধিকাংশ উদ্ভিদ বীজ দ্বারা বংশ বৃদ্ধি করে।
৬। নতুন প্রজাতি সৃষ্টিঃ দুইটি ভিন্ন কোষ শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর মিলনে জাইগোট সৃষ্টি হয়। এতে নতুন বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন নতুন প্রজাতির উদ্ভব হয়।
৭। জীববৈচিত্র্য সৃষ্টিঃ শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর মিলনে জাইগোট সৃষ্টি হয়। জাইগোট থেকে নতুন প্রজাতি সৃষ্টি হয়। নতুন প্রজাতির মাধ্যমে জীববৈচিত্র্যতা সৃষ্টি হয়।
৮। খাদ্য চাহিদা পুরণঃ নিষেকের মাধ্যমে বীজ ও ফল সৃষ্টি হয়। বীজ ও ফল জীবজগতের খাদ্য চাহিদা পূরণ করে। আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, পেঁপে, বেল, তাল, ধান, গম, ভূট্রা, যব, কাউন প্রভৃতি খাদ্য চাহিদা পূরণ করে।
৯। রোগ প্রতিরোধী জাত সৃষ্টিঃ নিষেকের মাধ্যমে উদ্ভিদের রোগ প্রতিরোধী জাত সৃষ্টি করা যায়।
১০। কাক্সিক্ষত বৈশিষ্ট্যের উন্নয়নঃ নিষেক ক্রিয়ার মাধ্যমে উদ্ভিদের কাক্সিক্ষত বৈশিষ্ট্যের উন্নয়ন ঘটানো যায়।
১১। বিবর্তনঃ বিবর্তনের ধারা বর্ণনার জন্য নিষেক গুরুত্বপুর্ণ ভুমিকা পালন করে।
১২। ক্রোমোজোমের ভারসাম্য রক্ষাঃ নিষেক প্রক্রিয়ায় শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর মিলনে ডিপ্লয়েড জাইগোট সৃষ্টি হয়। এতে জীবের ক্রোমোজোমের সংখ্যা স্থির থাকে।

