১। হ্যাপ্লয়েড উদ্ভিদ উৎপাদন (Haploid plant lines)ঃ পরাগরেণু কালচার করে হ্যাপ্লয়েড উদ্ভিদ উৎপাদন করা হয়। হ্যাপ্লয়েড উদ্ভিদের অভিযোজন, ফলন, পরিপক্ককাল, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা প্রভৃতি উন্নত। ধান টাংফেঙ-১, হুয়াবে-৭০২, গম জিনাখুয়া-১, লুংহুয়া-১, তামাক এফ-২১১, টাংয়ু-১, টাংয়ু-২, টাংয়ু-৩ প্রভৃতি হ্যাপ্লয়েড উদ্ভিদ।
২। অধিক চারা উৎপাদন (Plants production)
(i) টিস্যু কালচার প্রক্রিয়ায় উদ্ভিদের মূল, কান্ড, পাতা, ফুল, ফল, পরাগরেণু প্রভৃতি অঙ্গ থেকে নতুন চারা উৎপাদন করা হচ্ছে।
(ii) টিস্যু কালচার প্রক্রিয়ায় যে কোন ঋতুতে অল্প সময়ে অধিক চারা উৎপাদন করা হয়।
(iii) টিস্যু কালচার প্রক্রিয়ায় বিলুপ্তপ্রায় উদ্ভিদ এবং বীজ উৎপাদন করে না এরুপ উদ্ভিদের চারা উৎপাদন করা হচ্ছে।
৩। বিলুপ্তপ্রায় উদ্ভিদকে রক্ষা (Conservation of endangered plant)ঃ যে সব উদ্ভিদ বিলুপ্তপ্রায় তাদেরকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করা যায়। এসব উদ্ভিদের যেকোন অংশ থেকে নতুন চারা সৃষ্টি করে পৃথিবীতে টিকিয়ে রাখা হচ্ছে। ফলে পৃথিবী থেকে এসব উদ্ভিদ হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা নাই। যেমন- সাইলোটাম।
৪। কৃষি উন্নয়নে অবদান (Contribution of agriculture)
(i) নিরোগ চারা উৎপাদন (Cure plant production)ঃ উদ্ভিদের শীর্ষমুকুলের অগ্রভাগের টিস্যুকে মেরিস্টেম বলে। মেরিস্টেম সব সময় জীবাণু মুক্ত থাকে। টিস্যু কালচার প্রযুক্তির মাধ্যমে মেরিস্টেম কালচার করে জীবাণু মুক্ত নতুন চারা সৃষ্টি করা হয়। এসব জীবাণু মুক্ত চারা রোগাক্রান্ত হয় না। উদ্ভিদে কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক প্রয়োগ করতে হয় না। ফলে উৎপাদন খরচ কম হয় এবং পরিবেশ দূষণ রোধ হয়। ১৯৫২ সালে মোরেল ও মার্টিন সর্বপ্রথম ডালিয়া উদ্ভিদের মেরিস্টেম কালচার করে জীবাণু মুক্ত চারা উৎপন্ন করেন। বর্তমানে এই পদ্ধতিতে আনারস ও টমেটোর চারা উৎপন্ন করা হয়েছে।
(ii) মাইক্রোপ্রোপাগেশন (Micropropagation)ঃ মাতৃ গুণাবলী অক্ষুন্ন রেখে অল্প সময়ে অধিক চারা উৎপাদন হলো মাইক্রোপ্রোপাগেশন। যে সব উদ্ভিদে বীজ উৎপন্ন হয় না অথবা অঙ্গজ জনন ঘটে না তাদের মাইক্রোপ্রোপাগেশন করা হয়। মাইক্রোপ্রোপাগেশনের মাধ্যমে ফুলগাছ- Lilium, Tulipa, Anthurium; সবজি ও মশলা- Allium, Apium, Brassica; ফল ও নাট- Aegle, Ananus, Carica; বনবৃক্ষ- Albizzia, Dalbergia, Pinus প্রভৃতি সৃষ্টি করা হয়েছে। ১৯৫৮ সালে এফ. সি. স্টিওয়ার্ড মাইক্রোপ্রোপাগেশন আবিষ্কার করেন।
(iii) সোমাটিক এমব্রায়োজেনেসিস (Somatic embryogenesis)ঃ যে টিস্যু কালচার প্রক্রিয়ায় উদ্ভিদের দেহকোষ থেকে ভ্রুণ এবং চারা সৃষ্টি করা হয় তাকে সোমাটিক এমব্রায়োজেনেসিস বলে। ১৯৫৮ সালে আমেরিকার উদ্ভিদ বিজ্ঞানী এফ. সি স্টিওয়ার্ড ও তাঁর সহযোগীরা সোমাটিক এমব্রায়োজেনেসিস পদ্ধতি আবিষ্কার করেন এবং এ পদ্ধতিতে গাজরের চারা উৎপাদন করেন।
৫। উদ্ভিদ প্রজননে ভূমিকা (Roles of reprodustion)
(i) টিস্যু কালচার প্রক্রিয়ায় উদ্ভিদের মূল, কান্ড, পাতা, ফুল, ফল, পরাগরেণু প্রভৃতি অঙ্গ থেকে নতুন চারা উৎপন্ন করা হয়।
(ii) এই প্রক্রিয়ায় উদ্ভিদের দেহ কোষ থেকে মাতৃগুণ সম্পন্ন ফুল ও ফলের চারা সৃষ্টি করে সংখ্যা বৃদ্ধি করা হচ্ছে।
(iii) যে সব উদ্ভিদ বীজ উৎপাদন করে না তাদের অঙ্গ থেকে চারা উৎপাদন করে বংশবৃদ্ধি করা হয়।
(iv) যে সব উদ্ভিদ বিলুপ্তপ্রায় তাদের যে কোন অঙ্গ থেকে নতুন চারা সৃষ্টি করে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করা হচ্ছে।
৬। উন্নত জাত উদ্ভাবনে ভূমিকা (Roles of development varieties)
(i) টিস্যু কালচার প্রযুক্তির মাধ্যমে সোমাক্লোনাল ভ্যারিয়েশন সৃষ্টি করে উৎকৃষ্ট ও ভালো জাতের ক্লোন বাছাই করে অতি অল্প সময়ে অসংখ্য নতুন জাতের উদ্ভিদ সৃষ্টি করা হয়। সোমাক্লোনাল ভ্যারিয়েশনের মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধী জাত, পেস্টিসাইড প্রতিরোধী উদ্ভিদ, খরা প্রতিরোধী উদ্ভিদ প্রভৃতি সৃষ্টি করা হয়েছে। সোমাক্লোনাল ভ্যারিয়েশনের মাধ্যমে উৎপন্ন উন্নত জাতের গম হলো AdhI।
(ii) টিস্যু কালচার প্রযুক্তির মাধ্যমে হাইব্রিডাইজেশন প্রক্রিয়ায় ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের দু’টি উদ্ভিদের প্রোটোপ্লাস্টের মিলন ঘটিয়ে নতুন সংকর উদ্ভিদ বা সাইব্রিড সৃষ্টি করা হয়েছে। সাইব্রিডে উন্নত বৈশিষ্ট্যের ভিন্নধর্মী মাইটোকন্ড্রিয়া ও ক্লোরোপ্লাস্টের সংমিশ্রণ ঘটে। আলু, টমেটো, পিটুনিয়া, লেবু, তামাক প্রভৃতি উদ্ভিদে সাইব্রিড সৃষ্টি করা হয়েছে। আলু ও টমেটো উদ্ভিদের প্রোটোপ্লাস্টের মিলনে পোমাটো সাইব্রিড উদ্ভিদ সৃষ্টি করা হয়েছে। এরা উন্নত বৈশিষ্ট্যের জাত।
৭। কৃষি অর্থনীতিতে ভূমিকা (Roleof economics)
(i) টিস্যু কালচার প্রক্রিয়ায় উদ্ভিদের মূল, কান্ড, পাতা, ফুল, ফল, পরাগরেণু প্রভৃতি অঙ্গ থেকে নতুন চারা উৎপাদন করা হয়। ফসলী উদ্ভিদের যে কোন অংশ থেকে নতুন চারা উৎপাদন করে কৃষি উন্নয়ন ঘটানো হয়। এতে খাদ্য চাহিদা পূরণ হয়।
(ii) টিস্যু কালচার প্রক্রিয়ায় ফল জাতীয় উদ্ভিদের চারা উৎপাদন করা হয়। এসব চারা রোপন করে ফলের উৎপাদন বাড়ানো হয়। ফল খাদ্য হিসেবে ব্যবহার হয়। অতিরিক্ত ফল বিক্রয় করা হয়।
(iii) টিস্যু কালচার প্রক্রিয়ায় ফল জাতীয় উদ্ভিদের চারা উৎপাদন করে বিক্রয় করা হয়। ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়।
৮। জীববৈচিত্র্য সৃষ্টিতে ভূমিকা (Roles of biodiversity)
(i) টিস্যু কালচার প্রযুক্তির মাধ্যমে সোমোক্লোনাল ভ্যারিয়েশন সৃষ্টি করে উৎকৃষ্ট ও ভালো জাতের ক্লোন বাছাই করে অতি অল্প সময়ে অসংখ্য নতুন জাতের উদ্ভিদ সৃষ্টি করা হয়। সেমিক্লোনাল ভ্যারিয়েশনের মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধী জাত, পেস্টিসাইড প্রতিরোধী উদ্ভিদ, খরা প্রতিরোধী উদ্ভিদ প্রভৃতি সৃষ্টি করা হয়েছে। সেমিক্লোনাল ভ্যারিয়েশনের মাধ্যমে উৎপন্ন উন্নত জাতের গম হলো AdhI।
(ii) টিস্যু কালচার প্রযুক্তির মাধ্যমে সাইব্রিডাইজেশন প্রক্রিয়ায় ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের দু’টি উদ্ভিদের প্রোটোপ্লাস্টের মিলন ঘটিয়ে নতুন সংকর উদ্ভিদ বা সাইব্রিড সৃষ্টি করা হয়েছে। সাইব্রিডে উন্নত বৈশিষ্ট্যের ভিন্নধর্মী মাইটোকন্ড্রিয়া ও ক্লোরোপ্লাস্টের সংমিশ্রণ ঘটে। আলু, টমেটো, পিটুনিয়া, লেবু, তামাক প্রভৃতি উদ্ভিদে সাইব্রিড সৃষ্টি করা হয়েছে। আলু ও টমেটো উদ্ভিদের প্রোটোপ্লাস্টের মিলনে পোমাটো সাইব্রিড উদ্ভিদ সৃষ্টি করা হয়েছে।
৯। চিকিৎসাক্ষেত্রে ভূমিকা (Roles of medical)
(i) টিস্যু কালচার প্রযুক্তির মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের ঔষধী উদ্ভিদের চারা উৎপাদন করা হচ্ছে। এসব চারা পূর্ণাঙ্গ হলে ঔষধ তৈরীর কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
(ii) টিস্যু কালচার প্রযুক্তির মাধ্যমে ঔষধীগুণ সম্পন্ন সবজির উৎপাদন বাড়ানো হচ্ছে। এসব সবজি ওষুধের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে।
(iii) টিস্যু কালচার প্রযুক্তিতে সেমিক্লোনাল ভ্যারিয়েশনের মাধ্যমে পতঙ্গরোধী উদ্ভিদ, আগাছানাশকরোধী উদ্ভিদ, রোগ প্রতিরোধী জাত, পেস্টিসাইড প্রতিরোধী উদ্ভিদ প্রভৃতি সৃষ্টি করা হয়েছে। এসব উদ্ভিদ চাষে কীটনাশক প্রয়োগ করা হয় না। ফলে পরিবেশ দূষণ মুক্ত হয়। এতে প্রাণীদেহে রোগ সৃষ্টির সম্ভাবনা কম থাকে।