কৃত্রিম প্রজনন ।। কৃত্রিম প্রজননের গুরুত্ব ।। Importance of artificial breeding

১। উচ্চ ফলনশীল জাত উদ্ভাবনঃ কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে বিভিন্ন ফসলের উচ্চ ফলনশীল জাত উদ্ভাবন করা হয়।

(i) উচ্চ ফলনশীল ধানঃ ফিলিপাইনে ইন্দোনেশিয়ার পেটা ধান (Peta) এবং তাইওয়ানের ডিজি উজেন (Dee-gee-woo-gen)  ধানের মধ্যে নিষেক ঘটিয়ে ইরি-৮ ধান উদ্ভাবন করা হয়েছে। ইরি-৮ ধানের ফলন একর প্রতি ৯০-১০০ মণ। ইরি-৫ ধানের ফলন একর প্রতি ৭০-৭৫ মণ। উচ্চ ফলনশীল ইরি ধান হলো ইরি-২০, ইরি-২৮, ইরি-২৯ ইত্যাদি।

ইন্দোনেশিয়ার পেটা ধান (Peta), ভারতের টিকেএম-৬ ধান (TKM-6) এবং তাইওয়ানের টাইচু-১ (Tichu-1) ধানের মধ্যে কৃত্রিম প্রজনন ঘটিয়ে ইরিশাইল ধান উদ্ভাবন করা হয়। এ ধানের ফলন একর প্রতি ৭০-৭৫ মণ। কৃষক পর্যায়ে ইরিশাইল ধান ব্যাপক ভাবে চাষ হচ্ছে।

বাংলাদেশ ধান গবেষণা কেন্দ্র BR-২০ এবং BR-৩ এর মধ্যে নিষেক ঘটিয়ে বিরিশাইল ধান উদ্ভাবন করেছে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা কেন্দ্র কর্তৃক উদ্ভাবিত চারটি উফশি জাতের ধান হলো চান্দিনা (BR-১), মালা (BR-২), শাহী বালাম (BR-১৫) এবং শ্রাবনী (BR-২৬)।

(ii) উচ্চ ফলনশীল গমঃ বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) সংকরায়নের মাধ্যমে ১৭টি উফশি জাতের গম উদ্ভাবন করেছে। উচ্চ ফলনশীল গমের জাত হলো- বলাকা, আকবর, কাঞ্চন, বরকত ও সওগাত। এছাড়া BR-২৭ ও BR-২৮ গম আরও উন্নত।

(iii) উচ্চ ফলনশীল ভূট্রাঃ ১৯০৮ সালে আমেরিকার বিজ্ঞানী সুল (G.H. Shull) ভূট্রার সংকর জাত উদ্ভাবন করেন। ভূট্রার উচ্চ ফলনশীল জাত হলো- বারি ভূট্রা-৬, বারি ভূট্রা-৭, বারি ভূট্রা-৮, বারি ভূট্রা-৯, বারি ভূট্রা-১০ এবং বারি ভূট্রা-১১।

(রা) ফলঃ কৃত্রিম সংকরায়নের মাধ্যমে সৃষ্ট ফল হলো- আম, লিচু, পেঁয়ারা, ড্রাগন, তরমুজ, আপেল, আঙ্গুর, বড়ই ইত্যাদি।

(া) অর্কিড ও ফুলঃ বর্তমানে বাংলাদেশ চাষকৃত অধিকাংশ ফুল কৃত্রিম সংকরায়নের মাধ্যমে সৃষ্টি করা হয়েছে। বিপ্লব সৃষ্টিকারী কয়েকটি ফুল হলো- গোলাপের হাইব্রিড-টি, ফ্লোরিবান্ডা, মেরিগোল্ড, গ্ল্যাডিওলাস, রজনীগন্ধা ইত্যাদি।

(ার) সবজিঃ কৃত্রিম সংকরায়নের মাধ্যমে সৃষ্ট সবজি হলো- মিষ্টি কুমড়া, লাউ, টমেটো, ঝিঙা, ফুলকপি, বাঁধাকপি, পুঁইশাক ইত্যাদি।

২। রোগ প্রতিরোধী জাত উদ্ভাবনঃ বুনো রোগ প্রতিরোধী ফসলের সাথে আবাদি রোগ কাতর ফসলের প্রজনন ঘটিয়ে রোগ প্রতিরোধী জাত উদ্ভাবন করা হয়। যেমন- মুক্তা (BR-11), গাজী (BR-14), মোহিনী (BR-15) প্রভৃতি ধানের রোগ প্রতিরোধী জাত।

৩। প্রতিকূল সহিঞ্চু জাত উদ্ভাবনঃ কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে উদ্ভিদের এমন জাত সৃষ্টি করা হয় যা প্রতিকূল পরিবেশে জন্মাতে পারে। এ সব জাত খরা, বন্যা, লবণাক্ততা, জলমগ্নতা প্রভৃতি সহ্য করতে পারে।

৪। বীজবিহীন ফল সৃষ্টিঃ কৃত্রিম প্রজনন ঘটিয়ে বীজবিহীন ফল উৎপন্ন করা হয়েছে। যেমন- কমলা।

৫। দৃষ্টিনন্দন অর্কিড উদ্ভাবনঃ বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের দৃষ্টিনন্দন অর্কিড সৃষ্টি করা হয়েছে।

৬। আবাদকাল সংক্ষিপ্তকরণঃ কৃত্রিম সংকরায়নের মাধ্যমে ফসলের আবাদকাল ২০-৩০ দিন পর্যন্ত কমানো সম্ভব হয়েছে। এতে প্রাকৃতিক দূর্যোগ শুরুর আগেই ফসল সংগ্রহ করা যায়।

৭। শস্যের গুণগত মান উন্নয়নঃ কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে শস্যের গুণগত মান উন্নয়ন ঘটানো যায়। এই প্রক্রিয়ায় শস্যের আকর্ষণীয় বর্ণ, দানার আকার, সুঘ্রাণ প্রভৃতির পরিবর্তন ঘটানো যায়। Bangladesh Institute of Nuclear Agriculture (BINA) রঞ্জন রশ্মি প্রয়োগ করে হাইপ্রো-ছোলা উদ্ভাবন করেছে। এই ছোলা অধিক প্রোটিন সমৃদ্ধ।

৮। হাইব্রিড ফল ও সবজি উৎপাদনঃ সংকরায়নের মাধ্যমে আম, তরমুজ, বরই প্রভৃতি ফল এবং লাউ, মিষ্টি কুমড়া, টমেটো, ঝিঙা, বাঁধাকপি ইত্যাদি উৎপাদন করা হয়েছে।

৯। অধিক অভিযোজন ক্ষমতাঃ কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে সৃষ্ট উদ্ভিদের অভিযোজন ক্ষমতা বেশি হয়। তাই পরিবেশীয় পীড়ন সহ্য করতে পারে। যে কোন পরিবেশে টিকে থাকতে পারে।

১০। একই সময়ে পরিপক্কতাঃ কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে একই সময়ে পরিপক্ক হয় এমন ফসল উদ্ভাবন করা হয়। এতে ফসল সংগ্রহে পরিশ্রম এবং অর্থ কম ব্যয় হয়।

১১। বীজ ঝরে পড়া স্বভাবের পরিবর্তনঃ অনেক ফসলের বীজ মাঠে ঝরে পড়ে। এতে ফসলের ফলন কমে যায় এবং কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে ফসলের বীজ ঝরে পড়া স্বভাবের পরিবর্তন ঘটানো হয়।

১২। উদ্ভিদের বিবর্তনঃ কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে উদ্ভিদে জিন মিউটেশন, ক্রোমোজোমীয় মিউটেশন, জেনেটিক রিকম্বিনেশন প্রভৃতি ঘটানো হয়। এতে নতুন প্রজাতি সৃষ্টি হয়। ফলে উদ্ভিদে বিবর্তন ঘটে। গম ও রাই এর সংকরায়নে ট্রিটিসেল উদ্ভাবন হয়েছে। ইহা অল্প শীত এবং প্রচন্ড শীতে ভাল ফলন দেয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Dr. Abu Bakkar Siddiq