লোহিত রক্তকণিকার বৈশিষ্ট্য, উৎপত্তি, পরিমাণ ও কাজ । RBC । ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

গ্রীক শব্দ Erythros অর্থ লাল এবং kytos অর্থ কোষ নিয়ে erythrocyte শব্দটি গঠিত। রক্তের লাল বর্ণের দ্বি-অবতল চাকতির মতো কণিকাকে লোহিত রক্তকণিকা বা হিমাটিড বা erythrocyte বা RBC বলে। মানবদেহে লোহিত রক্তকণিকা প্রতি ৬০ সেকেন্ডে একবার সমগ্র দেহ পরিভ্রমণ করে। দেহে ২০-৩০ ট্রিলিয়ন লোহিত রক্তকণিকা থাকে যা দেহের সকল কোষের ৭০%। রক্তে লোহিত রক্তকণিকার আয়তন পরিমাপের শতকরা হিসাবকে হেমাটোক্রিট (HCT) বলে। দেহে এর অভাব হলে রক্তাল্পতা এবং বেশি হলে পলিসাইথেমিয়া হয়। শিশুদের রক্তে লোহিত রক্তকণিকার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।

লোহিত রক্তকণিকার বৈশিষ্ট্য (RBC)

১। এতে হিমোগ্লোবিন থাকে বলে লাল বর্ণের হয়। ১০০ মিলি রক্তে ১৫-১৬ গ্রাম হিমোগ্লোবিন থাকে। প্রতিটি লোহিত রক্তকণিকায় ২৯ পিকোগ্রাম হিমোগ্লোবিন থাকে।

২। ইহা গোলাকার, দ্বি-অবতল ও চাকতির মতো।

৩। এর ব্যাস প্রায় ৭.৫ µm এবং পুরুত্ব ২.০-২.৫ µm।

৪। এর পরিধি মসৃণ ও পুরু এবং মধ্যাংশ পাতলা। কেন্দ্রের পুরুত্ব ১.০ µm।

৫। স্তন্যপায়ীর লোহিত রক্তকণিকায় নিউক্লিয়াস থাকে না (ব্যতিক্রম-উট)।

৬। এর গড় আয়ু ১২০ দিন বা ৪ মাস। এ সময়ে ইহা ১১০০ কিমি দূরত্ব অতিক্রম করে।

৭। এতে ৬০-৭০% পানি এবং ৩০-৪০% কঠিন পদার্থ থাকে (কঠিন পদার্থের মধ্যে ৯০% হলো হিমোগ্লোবিন)।

৮। ইহা বিলিরুবিন ও বিলিভার্ডিন তৈরীতে সাহায্য করে।

 

লোহিত রক্তকণিকার উৎপত্তি (RBC)

ভ্রুণাবস্থায় যকৃত, প্লীহা ও থাইমাস থেকে লোহিত রক্তকণিকা উৎপন্ন হয়। জন্মের পর ২০ বছর বয়স পর্যন্ত অস্থিমজ্জা (এরিথ্রোব্লাস্ট বা স্টোম কোষ ও হিমোসাইটোব্লাস্ট কোষ) থেকে উৎপন্ন হয়। অস্থিমজ্জায় উৎপন্ন হওয়ার সময় নিউক্লিয়াস থাকে বলে একে ইরাইথ্রোব্লাস্ট বলে। জীবনের বাকি সময় হিউমেরাস, ফিমার, স্টার্ণাম, কশেরুকা, পর্শুকা প্রভৃতির প্রান্ত হতে সৃষ্টি হয়। মানবদেহে প্রতি মাসে৪০০-৫০০ মিলি লোহিত রক্তকণিকা উৎপন্ন হয়। প্রতি সেকেন্ডে ১০ মিলিয়ন লোহিত রক্তকণিকা উৎপন্ন হয় এবং ১০ মিলিয়ন ধ্বংস হয়। ইহা যকৃত এবং প্লীহায় ধ্বংস হয়। বৃক্ক এরিথ্রোপয়েটিন হরমোন ক্ষরণ করে। এরিথ্রোপয়েটিন হরমোন লোহিত রক্তকণিকা উৎপাদন (কম বা বেশি) নিয়ন্ত্রণ করে। লোহিত রক্তকণিকা সৃষ্টির প্রক্রিয়াকে এরিথ্রোপয়েসিস (erythropoiesis) বলে।

 

লোহিত রক্তকণিকার পরিমাণ RBC

প্রতি ঘনমিলিলিটার রক্তে পুরুষের দেহে ৫০-৫৪ লক্ষ, স্ত্রীলোকের দেহে ৪৫-৪৮ লক্ষ, শিশুর দেহে ৬০-৭০ লক্ষ এবং ভ্রুণে ৮০-৯০ লক্ষ লোহিত রক্তকণিকা থাকে। ব্যায়াম ও গর্ভাবস্থায় এই কণিকা বেশি থাকে।

 

লোহিত রক্তকণিকার কাজ (Functions of RBC)

১। অক্সিজেন পরিবহনঃ লোহিত রক্তকণিকা অক্সিহিমোগ্লোবিন হিসেবে অক্সিজেন পরিবহন করে।

২। কার্বন ডাই অক্সাইডঃ লোহিত রক্তকণিকা কার্বামিনোহিমোগ্লোবিন হিসেবে কার্বন ডাই অক্সাইড পরিবহন করে।

৩। পিত্তরঞ্জক উৎপন্নঃ লোহিত রক্তকণিকা পরিবর্তিত হয়ে বিলিরুবিন বিলিভার্ডিন তৈরী করে।

৪। সান্দ্রতাঃ ইহা রক্তের ঘনত্ব সান্দ্রতা বজায় রাখে।

৫। ¤ø-ক্ষারের ভারসাম্য বজায়ঃ  লোহিত রক্তকণিকা দেহে অম্লক্ষারের ভারসাম্য বজায় রাখে।

৬। ব্লাড গ্রুপিংঃ এর প্লাজমা মেমব্রেণেন অ্যান্টিজেন প্রোটিন থাকে যা ব্লাড গ্রুপিং এর জন্য দায়ি।

৭। নাইট্রিক অক্সাইড উৎপন্নঃ লোহিত রক্তকণিকা নাইট্রিক অক্সাইড উৎপন্ন করে। নাইট্রিক অক্সাইড এন্ডোথেলিয়াল কোষে L-arginine এর মতো ব্যবহার হয়।

৮। রক্ত নালিকার সঙ্কোচনঃ লোহিত রক্তকণিকা হাইড্রোজেন সালফাইড উৎপন্ন করে। হাইড্রোজেন সালফাইড রক্ত নালির সঙ্কোচনের জন্য সংকেত প্রদান করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *