১। চিকিৎসা ক্ষেত্রে ভূমিকা
(i) অ্যান্টিবায়োটিক তৈরীঃ ব্যাকটেরিয়া থেকে সাবটিলিন (Bacillus subtilisi), পলিমিক্সিন (Bacillus polymyxa), স্ট্রেপটোমাইসিন (Actinomycetes), টেরামাইসিন, কলিসিন বা কলিব্যাকটেরিন (E. coli) প্রভৃতি জীবন রক্ষাকারী অ্যান্টিবায়োটিক তৈরী করা হয়¬।
(ii) প্রতিষেধক টিকা তৈরীঃ ব্যাকটেরিয়া থেকে কলেরা, টাইফয়েড, যক্ষ্মা, ধনুষ্টংকার, হুপিংকাশি, ডিপথেরিয়া প্রভৃতি রোগের প্রতিষেধক টিকা তৈরী করা হয়¬। DPT রোগের প্রতিষেধক টিকা ব্যাকটেরিয়া থেকে তৈরী করা হয়¬। Corynebacterium dipthae (D), Bordetalla pertussis (P) এবং Clostridium tetani (T) থেকে DPT নামকরণ করা হয়েছে।
(iii) স্টেরয়েড তৈরীঃ জৈব প্রযুক্তির মাধ্যমে ব্যাকটেরিয়া থেকে স্টেরয়েড উৎপাদন করা হয়। স্টেরয়েড চিকিৎসা ক্ষেত্রে ব্যবহার হয়। যেমন- টেস্টোস্টেরন, পেডনিসোন, ইস্ট্রাডিওল, ইস্ট্রোন প্রভৃতি।
(iv) হরমোন তৈরীঃ জৈব প্রযুক্তির মাধ্যমে ব্যাকটেরিয়া থেকে মূল্যবান হরমোন তৈরী করা হয়। এ সব হরমোন ওষুধ হিসেবে ব্যবহার হয়। যেমন- ইনসুলিন, এরিথ্রোপোইটিন, ইন্টারফেরন, টিপিএ প্রভৃতি।
২। কৃষিক্ষেত্রে ভূমিকা
(i) মাটির উর্বরতা বৃদ্ধিঃ ব্যাকটেরিয়া উদ্ভিদ ও প্রাণীর মৃতদেহকে পচিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়। ফলে মাটির জৈব উপাদান বেড়ে যায় এবং উর্বরতা বৃদ্ধি পায়।
(ii) নাইট্রোজেন সংবন্ধনঃ Azotobacter, Pseudomonas, Clostridium প্রভৃতি ব্যাকটেরিয়া বায়ু থেকে নাইট্রোজেন ধরে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়। Rhizobium শিম জাতীয় উদ্ভিদের মূলে বায়ু থেকে নাইট্রোজেন সংবন্ধন করে। বর্তমানে Rhizobium-কে জীবাণু সার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। মসুর ডালের মূলে Rhizobium এর তিনটি প্রজাতি নডিউল সৃষ্টি করে। এগুলো হলো- Rhizobium bangladashense, Rhizobium bine এবং Rhizobium lentis। বাংলাদেশী বিজ্ঞানী ড. হারুন অর রশিদ এই তিনটি প্রজাতি আবিষ্কার করেছেন।
(iii) নাইট্রিফিকেশনঃ নাইট্রিফিকেশন প্রক্রিয়ায় নাইট্রিফাইং ব্যাকটেরিয়ার প্রভাবে অ্যামোনিয়া থেকে নাইট্রাইট উৎপন্ন হয়। পরে নাইট্রাইট থেকে নাইট্রেট উৎপন্ন হয়। নাইট্রেট মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করে।
(iv) পতঙ্গ নাশক হিসেবেঃ কোন কোন ব্যাকটেরিয়া জমিতে পতঙ্গ নাশক হিসেবে ব্যবহার হয়। যেমন- Bacillus thuringiensis।
(v) ফলন বৃদ্ধিতেঃ কিছু ব্যাকটেরিয়া জমিতে প্রয়োগ করে ধানের ফলন ৩১.৮% এবং গমের ফলন ২০.৮% বৃদ্ধি করা সম্ভব হয়েছে।
(vi) ফসলের উন্নত জাত সৃষ্টিঃ ব্যাকটেরিয়ার সাহায্যে জিনের স্থানান্তর ঘটিয়ে ট্রান্সজেনিক ফসল সৃষ্টি করা হয়েছে। এসব ট্রান্সজেনিক ফসল উন্নত মানের।
(vii) জৈব সার উৎপাদনঃ বর্তমানে ব্যাকটেরিয়ার সাহায্যে গোবর ও ময়লা আবর্জনা পচিয়ে জৈব সার তৈরী করা হচ্ছে। জমিতে রাসায়নিক সারের পরিবর্তে জৈব সার ব্যবহার হচ্ছে।
(viii) পশুখাদ্য বা সিলেজ তৈরীঃ ধানের খড়, ঘাস এবং লিগিউম জাতীয় উদ্ভিদের কান্ড কেটে টুকরা টুকরা করা হয়। টুকরা গুলো চিটাগুড়ের সাথে মিশিয়ে আবদ্ধ পাত্রে রাখা হয়। গাঁজন প্রক্রিয়ায় Lactobacillus ব্যাকটেরিয়া এগুলোকে উন্নতমানের গো-খাদ্যে পরিনত করে। এই গো-খাদ্যকে সিলেজ বলে।
(ix) পাট শিল্পেঃ Clostridium butricum জাতীয় ব্যাকটেরিয়ার সাহায্যে পাট পচিয়ে আঁশ পৃথক করা হয়।
(x) সেলুলোজ পরিপাকঃ গবাদিপশুর পাকস্থলীতে Ruminococcus albus ও Ruminococcus flavefaciens ব্যাকটেরিয়া বাস করে। এ সব ব্যাকটেরিয়া সেলুলেজ এনজাইম উৎপন্ন করে। সেলুলেজ এনজাইম কাঁচা ঘাস ও উদ্ভিদ হজমে সাহায্য করে।
৩। শিল্পক্ষেত্রে ভূমিকা
(i) ভিটামিন তৈরীঃ মানুষের পরিপাকতন্ত্রে বসবাসকারী E. coli ব্যাকটেরিয়া ভিটামিন- B, ভিটামিন- K2, থায়ামিন, রিবোফ্ল্যাভিন, ফলিক এসিড, বায়োটিন প্রভৃতি সংশ্লেষণ করে। বর্তমানে গাঁজন প্রক্রিয়ায় ভিটামিন তৈরীতে কয়েক প্রজাতির ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার হচ্ছে।
(ii) দুগ্ধ শিল্পেঃ Lactobacillus ও Streptococcus ব্যাকটেরিয়ার সাহায্যে দুধ থেকে ছানা, পনির, মাখন, ঘি, ঘোল প্রভৃতি তৈরী করা হয়।
(iii) চামড়া শিল্পেঃ টেনিন প্রক্রিয়ায় চামড়া থেকে লোম ছাড়ানো হয়। এরপর ব্যাকটেরিয়ার প্রোটিয়েজ এনজাইম ব্যবহার করে কাঁচা চামড়া পাঁকানো ও নমনীয় করা হয়।
(iv) প্রক্রিয়াজাতকরণেঃ চা, কফি, তামাক প্রভৃতি প্রক্রিয়াজাতকরণে ব্যাকটেরিয়া নিঃসৃত এনজাইম দরকার হয়। এর ফলে স্বাদ ও গন্ধের উৎপত্তি ঘটে। এ ক্ষেত্রে Bacillus megaterium ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার হয়।
(v) জৈব গ্যাস তৈরীঃ বর্তমানে ব্যাকটেরিয়ার সাহায্যে গোবর ও ময়লা আবর্জনা পচিয়ে মিথেন, বিউটেন প্রভৃতি জৈব গ্যাস তৈরী করা হচ্ছে। Bacillus, E. coli, Clostridium, Methanococcus প্রভৃতি ব্যাকটেরিয়া বায়োগ্যাস উৎপন্ন করে।
(vi ) লবণ তৈরীঃ টেস্টিং লবণ তৈরীতে ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার হয়।
(vii) রসায়ন শিল্পেঃ ভিনেগার (Acetobacter xylinum), ল্যাকটিক এসিড (Bacillus lacticacidi), অ্যাসিটোন (Clostridium acetobutylicum), অ্যালকোহল, এনজাইম, ভিটামিন প্রভৃতি রাসায়নিক পদার্থ তৈরী করতে ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার হয়।
(viii) এনজাইম তৈরীঃ Bacillus subtilis, Clostridium histolyticum, Trichoderma konigi প্রভৃতি প্রজাতির ব্যাকটেরিয়া থেকে এনজাইম উৎপাদন করা হয়।
(ix) অ্যালকোহল ও এসিড উৎপাদনঃ Clostridium ও Bacillus ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার করে স্টার্চ থেকে বিভিন্ন এসিড ও অ্যালকোহল উৎপন্ন করা হয়।
৪। মানব জীবনে ভূমিকা
(i) খাদ্য পরিপাকঃ E. coli ও Bacillus মানুষের খাদ্য পরিপাকে সাহায্য করে।
(ii) সেলুলোজ হজমঃ গবাদি পশুর অন্ত্রে এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া থাকে। উহা সেলুলোজ হজমকারী এনজাইম সেলুলেজ উৎপন্ন করে। সেলুলেজ খড়, ঘাস, পাতা, কোষপ্রাচীর প্রভৃতি হজমে সাহায্য করে।
(iii) ভিটামিন তৈরীঃ মানুষের অন্ত্রে E. coli এবং অন্যান্য ব্যাকটেরিয়া ভিটামিন B1, B2, K, বায়োটিন প্রভৃতি উৎপাদন ও সরবরাহ করে।
(iv) ইনসুলিন তৈরীঃ ইনসুলিন হরমোন তৈরীতে E. coli ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার হয়। ইহা ডায়াবেটিস রোগ নিয়ন্ত্রণ করে।
(v) জিন প্রকৌশলঃ জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং-এ Agrobacterium tumefaciens এবং E. coli ব্যাকটেরিয়ার গুরুত্ব অপরিসীম।
(vi) দুগ্ধজাত খাদ্য তৈরীঃ দুধ থেকে দই, পনীর, মাখন প্রভৃতি তৈরী করা হয়। এ সব খাদ্য তৈরীতে Streptococcus lactis, Lactobacillus প্রভৃতি ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার হয়।
(vii) প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়াঃ মানুষের পরিপাকতন্ত্রে প্রায় ৫০০ প্রজাতির ব্যাকটেরিয়া মিথোজীবী হিসেবে বাস করে। এ সব ব্যাকটেরিয়াকে প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়া বলে। প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়া মানুষের খাদ্য পরিপাকে সাহায্য করে। তাই এদেরকে মানুষের বন্ধু ও সাহায্যকারী ব্যাকটেরিয়া হিসেবে গণ্য করা হয়।
৫। পরিবেশ উন্নয়নে ভূমিকা
(i) পরিবেশ দূষণ প্রতিরোধঃ ব্যাকটেরিয়া পরিবেশের জৈব বর্জ্যকে ভেঙ্গে সরল উপাদানে পরিনত করে। জটিল উপাদানকে জারিত করে পুনঃব্যবহার উপযোগী করে তুলে। এ কারণে ব্যাকটেরিয়াকে প্রাকৃতিক ঝাড়–দার বলা হয়। Pseudomonas, Nocardia, Mycobacterium প্রভৃতি ব্যাকটেরিয়া পেট্রোলিয়াম বর্জ্যকে অক্সিজেনের উপস্থিতিতে সরল উপাদানে পরিনত করে।
(ii) পয়ঃপ্রণালীর সুষ্ঠ ব্যবস্থাঃ ব্যাকটেরিয়া জৈব বর্জ্যকে দ্রæত তরলে রুপান্তরিত করে পয়ঃপ্রণালীকে সুষ্ঠ রাখে। Zooglea ramigera ব্যাকটেরিয়া জৈব বর্জ্য রুপান্তরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
(iii) তেল নিস্কাশনঃ সমুদ্রের পানিতে ভাসমান তেল অপসারণে তেল খাদক ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার হয়। Pseudomonas aeruginosa হলো তেল খাদক ব্যাকটেরিয়া।
(iv) জৈবিক নিয়ন্ত্রণেঃ ক্ষতিকর কীটপতঙ্গের শূককীট দমনে ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার হয়।
৬। মাটির উর্বরতা বৃদ্ধিতে ব্যাকটেরিয়ার ভূমিকা
(i) ব্যাকটেরিয়া উদ্ভিদ ও প্রাণীর মৃতদেহকে পচিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়। ফলে মাটির জৈব উপাদান বেড়ে যায় এবং উর্বরতা বৃদ্ধি পায়।
(ii) Azotobacter, Pseudomonas, Clostridium প্রভৃতি ব্যাকটেরিয়া বায়ু থেকে নাইট্রোজেন ধরে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়। Rhizobium ব্যাকটেরিয়া শিম জাতীয় উদ্ভিদের মূলে বায়ু থেকে নাইট্রোজেন সংবন্ধন করে। বর্তমানে Rhizobium কে জীবাণুসার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। মসুর ডালের মূলে Rhizobium এর তিনটি প্রজাতি নডিউল সৃষ্টি করে। এগুলো হলো- Rhizobium bangladashense, Rhizobium bine এবং Rhizobium lentis। বাংলাদেশী বিজ্ঞানী ড. হারুন অর রশিদ এই তিনটি প্রজাতি আবিষ্কার করেছেন।
(iii) নাইট্রিফিকেশন প্রক্রিয়ায় নাইট্রিফাইং ব্যাকটেরিয়ার প্রভাবে অ্যামোনিয়া থেকে নাইট্রাইট উৎপন্ন হয়। পরে নাইট্রাইট থেকে নাইট্রেট উৎপন্ন হয়। নাইট্রেট মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করে।
(iv) ব্যাকটেরিয়া পরিবেশের জৈব বর্জ্যকে ভেঙ্গে সরল উপাদানে পরিনত করে। জটিল উপাদানকে জারিত করে পুনঃব্যবহার উপযোগী করে তোলে। এ কারণে ব্যাকটেরিয়াকে প্রাকৃতিক ঝাড়–দার বলা হয়। Pseudomonas, Nocardia, Mycobacterium প্রভৃতি ব্যাকটেরিয়া পেট্রোলিয়াম বর্জ্যকে অক্সিজেনের উপস্থিতিতে সরল উপাদানে পরিনত করে।
(v) বর্তমানে ব্যাকটেরিয়ার সাহায্যে গোবর ও ময়লা আবর্জনা পচিয়ে জৈব সার তৈরী করা হচ্ছে।
(vi) জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং-এ Agrobacterium tumefaciens ও E. coli ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার করে রোগ প্রতিরোধী উচ্চ ফলনশীল ফসল উদ্ভাবন করা হয়েছে। এসব ফসলে কীটনাশক, ছত্রাকনাশক ও রাসায়নিক সার প্রয়োগ করতে হয় না। ফলে জমির উর্বরতা নষ্ট হয় না।