দাদরোগ বা রিং ওয়ার্ম বা ডার্মাটোফাইটোসিস রোগের কারণ, লক্ষণ ও প্রতিকার । Ring worm । Dermatophytosis । ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

দাদ একটি ছোঁয়াচে বা সংক্রামক চর্মরোগ। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে টিনিয়া বলে। Trichophyton ছত্রাকের কারণে হয় বলে রোগটিকে Trichophytina বা Trichophytosis বলা হয়। ছত্রাকের আক্রমণে ত্বকের কেরাটিন প্রোটিন ধ্বংস হয়ে লাল বৃত্তাকার দাদ রোগ সৃষ্টি করে। তাই এরা কেরাটিনোফিলিক ছত্রাক নামে পরিচিত। দাদ রোগের সংক্রমণকে ডারমাটোফাইটোসিস বলে। যেসব ছত্রাক দাদ রোগ সৃষ্টি করে তাদেরকে ডারমাটোফাইটস্ বলে। ত্বকে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ বৃত্তাকার এই উপসর্গের জন্য রিং ওয়ার্ম (ring worm) নামকরণ করা হয়েছে।ড.সিদ্দিকপাবলিকেশন্স

রোগ সংক্রমণ বা বিস্তার
দাদ হলো ছোয়াচে রোগ। অতি সহজেই একদেহ থেকে অন্য দেহে বিস্তার লাভ করে। অপরিষ্কার-অপরিচ্ছন্ন শরীর, ঘামে ভেজা শরীর, দীর্ঘ সময় ভেজা শরীর, ত্বকে ক্ষতস্থান থাকলে সহজে রোগাক্রান্ত হয়। দাদ রোগে ছোট ছেলে-মেয়েরা বেশি আক্রান্ত হয়। এতিমখানা, হেফজখানা, হাসপাতাল অথবা অল্প জায়গায় অধিক সংখ্যক ছেলে বা মেয়ে বসবাস করলে সেখানে রোগটি দ্রæত বিস্তার লাভ করে। রোগীর গামছা, লুঙ্গি, প্যান্ট, শার্ট, চিরুনী, তোয়ালে, চাদর, বিছানা, থালা-বাসন প্রভৃতি দ্বারা রোগ ছড়িয়ে পড়ে। পোষা প্রাণী দ্বারা রোগ ছড়ায়। উঞ্চু ও ভেজা স্থানে জীবাণুর সংক্রমণ বেশি হয়। জীবাণুর সুপ্তিকাল ৩-৫ দিন। রোগ সংক্রমণের ৩-৫ দিন পর লক্ষণ প্রকাশ পায়। দেহের যেকোন স্থানে দাদরোগ হতে পারে। মুখমন্ডল ও হাতে রোগ লক্ষণ অধিক দেখা যায়। মাথার খুলিতে মারাত্বক হয়। উরু ও নখও আক্রান্ত হয়। উঞ্চ আর্দ্র পরিবেশে রোগটি দ্রæত বিস্তার লাভ করে।

দাদ রোগের কারণ
Trichophyton rubrum, Trichophyton tonsurans, Trichophyton interdigitale, Trichophyton mentagrophytes, Microsporum canis I Epidermophyton floccosum নামক ছত্রাকের কারণে মানুষের দাদ বা রিং ওয়ার্ম রোগ হয়।

বিভিন্ন ধরনের দাঁদ রোগ
১। মাথার ত্বকে দাদ (Tinea Capitis)ঃ মাথার ত্বকে যে দাদ হয় তাকে টিনিয়া ক্যাপিটিস বলে। এ সংক্রমণ অল্প বয়সী ছেলে-মেয়েদের বেশি ঘটে। আক্রান্ত স্থানের চুল পড়ে যায় এবং প্রদাহ সৃষ্টি হয়।
২। এথলেটস ফুট (Athlets Foot)ঃ হাত ও পায়ের ত্বকে যে দাদ হয় তাকে এথলেটস ফুট বলে। হাতের তালুর ভাঁজে, আঙ্গুলের পাশে এবং পায়ের মাঝে রোগের সংক্রমণ বেশি হয়। ত্বক শুষ্ক হয়, লালচে ও খসখসে হয় এবং খোসপাঁচড়ার মতো চুলকায়। মাঝে মাঝে ত্বকে ফুসকুড়ি দেখা যায়।ড.সিদ্দিকপাবলিকেশন্স
৩। শরীরে দাদ (Tinea Corporis)ঃ শরীরের ত্বকে যে দাদ হয় তাকে টিনিয়া কর্পোরিস বলে। হাত, পা, পেট ও পিঠে লালচে রিং বা গোলাকার দাগ দেখা যায়। রিং এর কিনারা আঁইশের মতো এবং মাঝের অংশ পরিষ্কার।
৪। কুঁচকির দাদ (Tinea Cruris)ঃ কুঁচকির ত্বকে যে দাদ হয় তাকে টিনিয়া ক্রুরিস বলে। একে Jock Itchও বলা হয়। যেসব পুরুষ বেশি ঘামে তাদের এ চর্মরোগ বেশি হয়। কুঁচকি চুলকায় এবং লাল ফুসকুড়ি দেখা যায়।

দাঁদ রোগের লক্ষণ সমুহ
১। হাতে, পায়ে, মাথায়, পিঠে, পেটে, কোমরে ও নখে রোগ সংক্রমণ ঘটে।
২। চুলকানির স্থানটি লাল বর্ণের গোলাকার চাকতির মতো দেখায়।
৩। ধীরে ধীরে গোলাকার চাকতির আকার বৃদ্ধি পায়, মাঝখানের ত্বক স্বাভাবিক থাকে এবং চুলকানি বৃদ্ধি পায়।
৪। আক্রান্ত স্থানের প্রান্তসীমা উঁচু-নিচু এবং অমসৃণ হয়। তীব্র সংক্রমণে স্থানটি লাল হয়ে যায়।
৫। হাতে লাল দাগ বা ফুসকুড়ি দেখা যায়। তালুর ভাঁজে এবং আঙ্গুলের পাশে দাগ হয়।
৬। নখে দাগ দেখা যায়, বিবর্ণ হয়ে যায়, বিকৃত হয়ে যায় এবং নখ শুকিয়ে খন্ড খন্ড হয়ে ভেঙ্গে যায়।
৭। পায়ের পাতায় দাগ দেখা যায়।
৮। চামড়ায় দানার মতো ফুসফুঁড়ি দেখা যায়। আক্রান্ত স্থানে বাদামী বর্ণের আঁইশ দেখা যায়।
৯। আক্রান্ত স্থানে বৃত্তাকার রিং সৃষ্টি হয়।
১০। মাঝে মাঝে লাল ক্ষত সৃষ্টি হয়। ক্ষতের সুনির্দিষ্ট সীমানা থাকে। ক্ষতে ছোট ছোট শল্ক প্রলেপ থাকে।
১১ আক্রান্ত স্থানের চারপাশের চামড়া ফুলে ওঠে, চুলকানি হয় এবং আঠালো রস বা কষাণী ঝরে।
১২। ত্বকের স্বাভাবিক রং নষ্ট হয়ে যায় এবং চামড়া ফেঁটে যায়।
১৩। মাথার খুলিতে দাগ দেখা যায় এবং মাথার চুল পড়ে যায়।
১৪। কুঁকচিতে দাগ দেখা যায়। কুঁচকিতে চুলকায়।
১৫। ত্বকের কেরাটিন প্রোটিন নষ্ট করে দেয়। এক্ষেত্রে কেরাটিনেজ এনজাইম সহায়তা করে।

দাদ রোগের প্রতিকার
১। চামড়া পরিষ্কার ও শুষ্ক রাখা।
২। ঢোলা ঢেলা আরামদায়ক কাপড় পড়া।
৩। আবদ্ধ ঘরে খালি পায়ে না হাটা।ড.সিদ্দিকপাবলিকেশন্স
৪। মাথায় রোগ হলে ন্যাড়া করে সেলিসাইলিক এসিড মলম ব্যবহার করা ।
৫। রাতে ব্যবহৃত কাপড় ও বিছানা পরিষ্কার করা।ড.সিদ্দিকপাবলিকেশন্স
৬। রোগাক্রান্ত ব্যক্তির পোষাক, তোয়ালে, রুমাল, চিরুনী প্রভৃতি ব্যবহার না করা। ড.সিদ্দিকপাবলিকেশন্স
৭। রোগীর বিছানাপত্র ও কাপড় সিদ্ধ করতে হবে।
৮। রোগীর থালা-বাসন আলাদা রাখা।
৯। ছত্রাকনাশক ক্রিম বা পাউডার ব্যবহার করা।
১০। ছত্রাকনাশক সাবান ব্যবহার করা। ড.সিদ্দিকপাবলিকেশন্স
১১। রোগাক্রান্ত প্রাণী স্পর্শ না করা।ড.সিদ্দিকপাবলিকেশন্স
১২। এন্টিফাংগাল ক্রিম বা ড্রাইপাওডার ব্যবহার করা।
১৩। আক্রান্ত স্থানে আয়োডিন, বেনজোয়িক এসিড ও বেস্টমেন্ট ব্যবহার করতে হবে। ড.সিদ্দিকপাবলিকেশন্স
১৪। আক্রান্ত স্থান চুলকিয়ে দাদ মর্দন (Cassia alata) পাতার রস লাগালে ২/৩ দিনে ভাল হয় ড.সিদ্দিকপাবলিকেশন্স
১৫। নখে দাদ হলে মরা অংশ তুলে তাতে ক্রমাগত টিনচার আয়োডিন প্রয়োগ করতে হবে। ড.সিদ্দিকপাবলিকেশন্স
১৬। রোগের প্রকোপ বেশি হলে Griseofulvin 500 mg অথবা Terbinafine 50 mg ওষুধ নিয়মিত খেলে দাদ রোগ ভাল হয়।
১৭। দাদ রোগে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী মাইকোনাজল, কেটোকোনাজল, ইকোনাজল যুক্ত ক্রিম বা লোশন ব্যবহার করতে হবে। ড.সিদ্দিকপাবলিকেশন্স
১৮। সুতার মোজা এবং অন্তর্বাস ব্যবহার করতে হবে। ড.সিদ্দিকপাবলিকেশন্স
১৯। গোসলের পর শরীর ভালভাবে মুছতে হবে।

দাদ রোগের চিকিৎসা
সাধারণত ৩-৪ সপ্তাহের মধ্যে দাদ রোগ আরোগ্য হয়ে যায়। এ রোগে অ্যান্টিফাংগাল ক্রিম টারবিনাফাইন (Terbinafine) অথবা মিকোনাজল (Miconazole) ব্যবহার করা হয়। মলম জাতীয় ওষুধে রোগ নিরাময় না হলে গ্রিসিওফুলভিন (Griseofulvin) অথবা ইনট্রাকোনাজল (Intraconazole) ট্যাবলেট খেতে হবে। মাথায় দাদ হলে মাথা ন্যাড়া করে সেলিসাইলিক এসিডযুক্ত মলম ব্যবহার করতে হবে। নখে দাদ হলে নখের মরা অংশ তুলে ক্রমাগত টিনচার আয়োডিন প্রয়োগ করতে হবে। আক্রান্ত স্থান ভালভাবে চুলকিয়ে দাদ মর্দন (Cassia alata) পাতার রস লাগালে ২/৩ দিনে রোগ ভাল হয়।ড.সিদ্দিকপাবলিকেশন্স

দাদ রোগের জটিলতা
চুলকানো স্থানে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ হতে পারে। এতে আক্রান্ত স্থান ফুলে যায়, পুঁজ সৃষ্টি হয় বা পুঁজ বের হয়। রোগীর জ্বর হতে পারে। অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করার প্রয়োজন হতে পারে।

দাদ রোগ হওয়ার ঝুকি কাদের বেশি
যারা অ্যান্টিবায়োটিক কোর্স সম্পন্ন করেছে, স্টেরয়েড গ্রহণ করেছে, ডায়াবেটিস রোগ আছে, অতিরিক্ত ওজন, পূর্বে ছত্রাক সংক্রমণ হয়েছে, ক্যান্সার ও এইডস রোগী।ড.সিদ্দিকপাবলিকেশন্স

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Dr. Abu Bakkar Siddiq