পেঁপের কান্ড, পাতা ও ফলে রিং স্পট রোগ হয়। বাংলাদেশ, ভারত, তাইওয়ান, চীন, থাইল্যান্ড, ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ, দক্ষিণ আমেরিকা, ফ্লোরিডা, হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জ, টেক্সাস ও ফিলিপাইনে এ রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি। ১৯৪৯ সালে উদ্ভিদ রোগতত্ত¡বিদ জেনসন এ রোগের নামকরণ করেন রিং স্পট।
পেঁপের রিং স্পট রোগের কারণ
Papaya Ring Spot Virus- Type P (PRSV-P) নামক ভাইরাসের কারণে পেঁপের রিং স্পট রোগ হয়। ইহা একটি RNA ভাইরাস। এই ভাইরাসটি রড বা দন্ড আকৃতির, আবরণীবিহীন, লম্বা ৭৬০-৮০০ ন্যানোমিটার এবং প্রস্থ ১২ ন্যানোমিটার। এই ভাইরাস কুমড়া জাতীয় উদ্ভিদে মোজাইক রোগ সৃষ্টি করে।
পেঁপের রিং স্পট রোগের সংক্রমণ
সাদা মাছি (Myzus persicae) ও জাব পোকা (Aphis gossypii) দ্বারা পেঁপের রিং স্পট রোগের ভাইরাস সংক্রমিত হয়। জাব পোকা কোন রোগাক্রান্ত উদ্ভিদ থেকে খাদ্য গ্রহণ করলে ১৫ সেকেন্ডের মধ্যে ভাইরাস পোকার দেহে লেগে যায়। এই পোকা সুস্থ উদ্ভিদের সংস্পর্শে আসলে উহা সংক্রমিত হয়। গাছের অবস্থান ঘন হলে খুব দ্রæত রোগ ছড়িয়ে পড়ে।
পেঁপের রিং স্পট রোগের লক্ষণ
১। কান্ডে রোগের লক্ষণ
(i) ৩০-৪০ সপ্তাহের মধ্যে এই রোগের লক্ষণ প্রকাশিত হয়
(ii) রোগাক্রান্ত গাছ খর্বাকার হয়।
(iii) কান্ডে গাঢ় সবুজ বর্ণের আকাঁবাকাঁ দাগ দেখা যায়।
(iv) অল্প বয়স্ক গাছ রোগাক্রান্ত হলে বৃদ্ধি রোহিত হয়।
(v) রোগের প্রকোপ বেশি হলে গাছে ফাটল দেখা যায়।
(vi) রোগের চরম পর্যায়ে গাছ পচে মারা যায়।
২। পাতায় রোগের লক্ষণ
(i) অপেক্ষাকৃত কম বয়সের পাতায় রোগ লক্ষণ প্রথম প্রকাশ পায়।
(ii) পাতায় ক্লোরোসিস হয়। পাতা হলুদ বর্ণের হয়।
(iii) পাতার আকৃতি কুঞ্চিত হয়ে ছোট ও বিকৃত আকার ধারণ করে।
(iv) রোগাক্রান্ত পাতায় সবুজ-হলুদ নক্সা দেখা যায়।
(v) পত্রবৃন্তের গোড়ায় পানিতে ভেজা গোলাকার দাগ দেখা যায়।
(vi) পাতায় রিং স্পট ও ডিস্টারসন রিং স্পট (মোজাইক) দেখা যায়।
(vii) রোগাক্রান্ত পাতার আয়তন হ্রাস পায়।
(viii) আক্রমণ প্রকট হলে গাছের মাথায় বিকৃত আকৃতির ক্ষুদ্রাকার কিছু পাতা লক্ষ্য করা যায়। কখনো কখনো পাতার কেবল শিরাগুলো থাকে।
৩। ফলে রোগের লক্ষণ
(i) ফলে গাঢ় সবুজ বর্ণের চক্রাকার দাগ বা রিং দেখা যায়।
(ii) ফলের উপর পানি ভেজা গোলাকার দাগ পড়ে এবং দাগের মধ্যবর্তী স্থান শক্ত হয়ে যায়।
(iii) রোগাক্রান্ত ফল-এ ফোলা ফোলা অংশ দেখা যায়।
(iv) ফল পরিপক্ক হলে বা হলুদ হলে দাগ গুলো অস্পষ্ট হতে থাকে।
(v) পেঁপের মিষ্টিত্ব ও পেপেইন হ্রাস পায়।
(vi) রোগাক্রান্ত ফল ছোট হয় এবং ঝরে পড়ে।
(vii) ছোট গাছ রোগাক্রান্ত হলে কখনো ফল ধরে না।
(viii) গাছে ফল ধরে না এবং ফলন ৯০% হ্রাস পায়।
পেঁপের রিং স্পট রোগ প্রতিকার/নিয়ন্ত্রণ
১। রোগাক্রান্ত গাছ তুলে মাটি চাপা দিতে হবে অথবা পুড়িয়ে ফেলতে হবে।
২। রোগাক্রান্ত জমিতে কীটনাশক ব্যবহার করতে হবে।
৩। Aphids পতঙ্গ প্রতিরোধের জন্য জাল দিয়ে সম্পূর্ণ জমি ঢেকে দিতে হবে।
৪। এফিড নিধনের জন্য পেস্টিসাইড রগর, রক্সিন, পারফেকথিয়ন ৪০ ইসি, মেটাসিস্টক্স ২৫ ইসি প্রভৃতি স্প্রে করতে হবে।
৫। চারা রোপনের প্রথম থেকেই নিয়মিত পেস্টিসাইড স্প্রে করলে এফিড পতঙ্গ দ্বারা রোগ ছড়ায় না।
৬। রোগাক্রান্ত গাছের প্রæনিং বন্ধ রাখতে হবে। কারণ কাটা অংশ থেকে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়তে পারে।
৭। জাব পোকার পপুলেশন নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
৮। পেঁপে বাগানের চারিদিকে এবং গাছের সারির মাঝখানে অন্য প্রজাতির গাছ লাগাতে হবে। এতে রোগাক্রমণ কম হবে।
পেঁপের রিং স্পট রোগ প্রতিরোধ
১। সুস্থ, সবল ও রোগ মুক্ত জাতকে বীজ হিসেবে ব্যবহার করতে হবে।
২। phids পতঙ্গ প্রতিরোধের জন্য জাল ব্যবহার করতে হবে।
৩। রোগাক্রান্ত এলাকায় পেঁপে চাষ বন্ধ রাখতে হবে।
৪। Cross protection প্রক্রিয়ায় ভাইরাসের দুর্বল প্রকরণ পেঁপে গাছে প্রবেশ করিয়ে রোগ প্রতিরোধী করে তুলতে হবে।
৫। ট্রান্সজেনিক পেঁপের জাত চাষ করতে হবে। টান্সজেনিক পেঁপে হলো রেইনবো, সানআপ প্রভৃতি।
৬। রোগাক্রান্ত বাগানের আশেপাশে অথবা বাগানের ভিতরে নতুন চারা রোপন করা যাবে না।
৭। মিশ্র চাষ পদ্ধতি প্রবর্তন করতে হবে।
৮। কোয়ারেন্টাইন পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে।