ব্যাকটেরিয়ার জনন পদ্ধতি ।। Reproduction of Bacteria

ব্যাকটেরিয়ার অঙ্গজ জনন

১। দ্বি-বিভাজন (Binary fission)

(i) দ্বি-বিভাজনের শুরুতে ব্যাকটেরিয়া খাদ্য গ্রহণ করে আকারে বড় হয়। এর নিউক্লিয়াসটিও বড় হয়।

(ii) ব্যাকটেরিয়ার DNA কোষের মাঝখানে অবস্থান করে এবং কোষঝিল্লির সাথে যুক্ত হয়।

(iii) কোষঝিল্লির সাথে যুক্ত থাকা অবস্থায় DNA-এর রেপ্লিকেশন ঘটে।

(iv) কোষটি লম্বায় বৃদ্ধি পায়। কোষপ্রাচীর এবং কোষঝিল্লির বৃদ্ধি কোষের দুই প্রান্তের মাঝখানে ঘটে।

(v) কোষপ্রাচীর এবং কোষঝিল্লি লম্বায় বৃদ্ধির কারণে DNA রেপ্লিকা দুটি দুই দিকে পৃথক হয়ে যায়।

(vi) কোষের সাইটোপ্লাজম ভিতরের দিকে ভাঁজ হয়ে যায়। এরপর নিউক্লিয়াসটি দুটি খন্ডে পরিনত হয়। সাইটোপ্লাজমের ভাঁজ আরও ভিতরে প্রবেশ করে। পরে সাইটোপ্লাজম নিউক্লিয়াসসহ দুটি কোষে পরিনত হয়।

(vii) টার্গার প্রেসারের কারণে নতুন সৃষ্ট অপত্য কোষ দুটি পরস্পর থেকে পৃথক হয়ে যায়।

(viii) অপত্য কোষ দুটি বৃদ্ধি পেয়ে মাতৃকোষের সমান হয়। পুনরায় দ্বি-বিভাজনে অংশ গ্রহণ করে। এ প্রক্রিয়ায় সময় লাগে ২০-৩০ মিনিট।

২। মুকুলোদগমঃ ব্যাকটেরিয়ায় ছোট ছোট মুকুল সৃষ্টি হয়। প্রথমে একপাশে একটি ছোট কুঁড়ি বের হয়। এরপর একদিকে কুড়িটি ধীরে ধীরে বড় হয় এবং অপরদিকে মূল ব্যাকটেরিয়ার নিউক্লিওয়েড বস্তু দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। নিউক্লিওয়েড বস্তুর একটি খন্ড মুকুলে প্রবেশ করে। মুকুল বৃদ্ধি পেয়ে বড় হয় এবং বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। যেমন- Ancalomicrobium adetum.

৩। খন্ডায়নঃ বিভিন্ন কারণে ব্যাকটেরিয়া এক বা একাধিক খন্ডে পরিনত হয়। প্রতিটি খন্ড পূর্ণাঙ্গ ব্যাকটেরিয়ায় পরিনত হয়।

৪। শাখা উৎপাদনঃ ব্যাকটেরিয়া থেকে এক বা একাধিক শাখা সৃষ্টি হয়। শাখাগুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীনভাবে বাস করে।

 

ব্যাকটেরিয়ার অযৌন জনন

১। কনিডিয়াঃ সূত্রাকার ব্যাকটেরিয়া থেকে কনিডিওফোর সৃষ্টি হয়। কনিডিওফোরে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কনিডিয়া উৎপন্ন হয়।  কনিডিয়াগুলো শিকলের ন্যায় অবস্থান করে। পরিনত কনিডিয়া বিচ্ছিন্ন হয় এবং অনুকূল পরিবেশে অঙ্কুরিত হয়ে নতুন ব্যাকটেরিয়া সৃষ্টি করে। যেমন- Streptomyces

২। গনিডিয়াঃ প্রতিকূল পরিবেশে সূত্রাকার ব্যাকটেরিয়ার প্রোটোপ্লাস্ট বিভক্ত হয়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশ সৃষ্টি করে। প্রতিটি অংশের চারিদেকে সাইটোপ্লাজম জমা হয়ে গনিডিয়া গঠন করে। পরিনত গনিডিয়া থেকে নতুন ব্যাকটেরিয়া সৃষ্টি হয়। যেমন- Leucothris

৩। জুস্পোরঃ প্রতিকূল পরিবেশে ব্যাকটেরিয়া জুস্পোর সৃষ্টি করে। জুস্পোর থেকে নতুন ব্যাকটেরিয়া উৎপন্ন হয়। যেমন- Azotobactor, Rhizobium.

৪। এন্ডোস্পোরঃ প্রতিকুল পরিবেশে খাদ্যের অভাবে ব্যাকটেরিয়ার প্রোটোপ্লাস্ট সঙ্কুচিত হয়ে গোলাকার বা ডিম্বাকার ধারণ করে। এরপর পুরু আবরণী দ্বারা আবৃত হয়ে এন্ডোস্পোরে পরিনত হয়। একে রেস্টিং স্পোর বলা হয়। অনুকূল পরিবেশে রেস্টিং স্পোর থেকে নতুন ব্যাকটেরিয়ার জন্ম হয়। যেমন- Bacillus subtilis, Clostridium tetan, Escherichia coli .

৫। মাইক্রোসিস্টঃ মিক্সোব্যাকটেরিয়ার কতকগুলো কোষ একত্রিত হয়ে সোয়ার্ম গঠন করে। সোয়ার্ম এর প্রতিটি কোষ মাইক্রোসিস্টে পরিনত হয়। মাইক্রোসিস্ট থেকে নতুন ব্যাকটেরিয়ার জন্ম হয়। যেমন- Myxococcus fulvus, Chondromyces crocatus.

 

ব্যাকটেরিয়ার যৌন জনন

ব্যাকটেরিয়াতে প্রকৃত যৌন জনন ঘটে না। এর যৌন জনন জেনেটিক রিকম্বিনেশন নামে পরিচিত। যে প্রক্রিয়ায় কোন কোষের জেনেটিক পদার্থ বা DNA অন্য কোন কোষে স্থানান্তরিত হয়ে নতুন বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন নতুন কোষ সৃষ্টি করে তাকে জেনেটিক রিকম্বিনেশন বলে। ১৯৪৬ সালে বিজ্ঞানী লিন্ডারবার্গ (Lenderberg) এবং ট্যাটাম (Tatum) ব্যাকটেরিয়ার যৌন জনন আবিষ্কার করেন। ওলম্যান রিঙ্ক (Wollman Rink) এবং জ্যাকব (Jacob) ব্যাকটেরিয়ার যৌন জনন বর্ননা করেন। ব্যাকটেরিয়ার জেনেটিক রিকম্বিনেশন তিনটি উপায়ে হয়ে থাকে।

১। কনজুগেশনঃ যে প্রক্রিয়ায় দু’টি কোষের মধ্যে কনজুগেশন নালী সৃষ্টির মাধ্যমে এককোষ থেকে নিউক্লিয়ার পদার্থ (DNA) অন্য কোষে স্থানান্তরিত হয় তাকে কনজুগেশন বলে। বিপরীত যৌনতা (+,Ñ) সম্পন্ন দুটি ব্যাকটেরিয়া কোষ পরস্পরের কাছাকাছি আসে এবং ঘনিষ্ট ভাবে পাশাপাশি অবস্থান করে। এদের একটিকে দাতা (Doner) এবং অপরটিকে গ্রহীতা (Recipient) বলে। মুখোমুখী অবস্থিত দুটি কোষের প্রাচীর স্ফীত হয়ে সংশ্লে¬ষ নালী সৃষ্টি করে। নালিকা দুটি বৃদ্ধি পেয়ে পরস্পরকে স্পর্শ করে। পরে স্পর্শ স্থানের প্রাচীর বিগলিত হয়ে একটি কনজুগেশন নালিকা গঠন করে। পাইলাসের (fertility pilus) মধ্য দিয়ে দাতা কোষ হতে নিউক্লিয়ার বস্তু (DNA) গ্রহীতা কোষে প্রবেশ করে। দাতা কোষ থেকে গ্রহীতা কোষে নিউক্লিয়ার বস্তুর সম্পুর্ণ অংশ প্রবেশ করার আগেই কোষ দুটি পরস্পর থেকে পৃথক হয়ে যায়। ফলে দাতা কোষ থেকে গ্রহীতা কোষে নিউক্লিয়ার বস্তুর অংশ বিশেষ প্রবেশ করে। দাতা কোষটি নিউক্লিয়ার বস্তু হারিয়ে নষ্ট হয়ে যায়। পরে দাতা ও গ্রহীতার নিউক্লিয়ার বস্তু মিলিত হয়ে জাইগোট সৃষ্টি করে। একে মেরোজাইগোট বলে। পরবর্তীতে মেরোজাইগোট দ্বি-বিভাজন প্রক্রিয়ায় সংখ্যা বৃদ্ধি করতে থাকে। উৎপন্ন প্রতিটি নতুন কোষে দাতা ও গ্রহীতার গুণাবলী বিদ্যমান থাকে। ১৯৪৬ সালে বিজ্ঞানী লিন্ডারবার্গ (Lenderberg) এবং ট্যাটাম (Tatum) ব্যাকটেরিয়ার কনজুগেশন প্রক্রিয়াটি আবিষ্কার করেন।

২। ট্রান্সফরমেশনঃ যে প্রক্রিয়ায় একটি কোষের DNA অন্য কোষে প্রবেশ করে বংশগতীয় পুনর্বিন্যাস ঘটায় তাকে ট্রান্সফরমেশন বলে। ট্রান্সফরমেশন প্রক্রিয়ায় দাতা কোষ হতে শুধু মাত্র DNA গ্রহীতা কোষে প্রবেশ করে। পরে দাতা ও গ্রহীতার DNA  মিলিত হয়ে জেনেটিক রিকম্বিনেশন ঘটায়।

৩। ট্রান্সডাকশনঃ যে প্রক্রিয়ায় ভাইরাসের মাধ্যমে একটি ব্যাকটেরিয়া থেকে জেনেটিক পদার্থ (DNA) অন্য একটি ব্যাকটেরিয়াতে স্থানান্তরিত হয়ে নতুন বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন নতুন ব্যাকটেরিয়া সৃষ্টি করে তাকে ট্রান্সডাকশন বলে। ১৯৫২ সালে বিজ্ঞানী জিনডার (Zinder) এবং লিন্ডারবার্গ (Lenderberg) ব্যাকটেরিয়ার ট্রান্সডাকশন আবিষ্কার করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *