যে প্রক্রিয়ায় কোষের নিউক্লিয়াস বা ক্যারিওন-এর বিভাজন ঘটে তাকে ক্যারিওকাইনেসিস বলে। মাইটোসিস কোষ বিভাজন বলতে ক্যারিওকাইনেসিসকেই বুঝানো হয়ে থাকে। ১৮৭৯ সালে স্ট্রাসবুর্গার (Strasburger) এবং শ্লেইডেন (Schleicher) নিউক্লিয়াসের বিভাজন আবিষ্কার করেন এবং নাম দেন ক্যারিওকাইনেসিস। ক্যারিওকাইনেসিসকে পাঁচটি পর্যায়ে ভাগ করা হয়েছে। এগুলো হলো-
১। প্রোফেজ (Prophage)ঃ গ্রীক শব্দ pro অর্থ আদি এবং phage অর্থ দশা নিয়ে Prophage শব্দটি গঠিত।
প্রোফেজ হলো মাইটোসিস কোষ বিভাজনের প্রথম এবং সর্বাপেক্ষা দীর্ঘস্থায়ী পর্যায়। এ পর্যায়ে কোষের নিউক্লিয়াস আকারে বড় হতে থাকে। ক্রোমোসোম গুলোর মধ্যে পানি বিয়োজন বা পানি ত্যাগ (dehydration) আরম্ভ হয়। ক্রোমোসোম গুলোর রং বা রঞ্জক ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। CDK যৌগ প্রোটিনের ফসফোরাইলেশন ঘটায় বলে ক্রোমোসোম ধীরে ধীরে সংকুচিত হতে থাকে। ফলে ক্রোমোসোম গুলো ক্রমাগত খাটো, মোটা ও দৃষ্টি গোচর হয়। এ পর্যায়ের শেষের দিকে প্রতিটি ক্রোমোসোম সেন্ট্রোমিয়ার ব্যতীত লম্বালম্বি ভাবে বিভক্ত হয়ে দুইটি করে ক্রোমাটিড সৃষ্টি করে। স্পাইরালাইজেশন প্রক্রিয়ায় ক্রোমোসোমের ক্রোমাটিড দুটি স্প্রিং এর মতো প্যাঁচিয়ে মোটা ও খাটো হয়। প্রোটিনের ফসফোরাইলেশনের কারণে নিউক্লিয়ার মেমব্রেন বা এনভেলপ এবং নিউক্লিওলাস বিলুপ্ত হতে থাকে। এ পর্যায়ে স্পিন্ডলযন্ত্র সৃষ্টির সূচনা ঘটে।
২। প্রোমেটাফেজঃ গ্রীক শব্দ pro অর্থ আদি, meta অর্থ মধ্যবর্তী এবং phage অর্থ দশা নিয়ে Prometaphage শব্দটি গঠিত। প্রোফেজ ও মেটাফেজের মধ্যবর্তী পর্যায়কে প্রোমেটাফেজ বলে।
প্রোমেটাফেজ পর্যায়ে নিউক্লিয়ার মেমব্রেন ও নিউক্লিওলাস সম্পূর্ণরুপে বিলুপ্ত হয়ে যায়। ক্রোমোসোমগুলো আরও সংকুচিত, মোটা ও খাটো হতে থাকে। প্রাণীকোষে সেন্ট্রিওল থেকে এবং উদ্ভিদকোষে মাইক্রোটিউবিউলস্ থেকে স্পিন্ডল যন্ত্র সৃষ্টি হয়। স্পিন্ডলযন্ত্র গুলো প্রোটিন নির্মিত এবং দুই মেরু বিশিষ্ট। স্পিন্ডল যন্ত্রের মধ্যবর্তী স্থানকে ইকুয়েটর/বিষুবীয়/নিরপেক্ষ/মধ্যবর্তী অঞ্চল বলে। উভয় মেরুকে মেরু অঞ্চল বলে। স্পিন্ডল যন্ত্র গুলো দুই ধরনের। স্পিন্ডল তন্তু এবং আকর্ষণ তন্তু। যে স্পিন্ডল যন্ত্র গুলো এক মেরু থেকে অপর মেরু পর্যন্ত বিস্তৃত থাকে তাকে স্পিন্ডল ফাইবার বা তন্তু বলে। যে স্পিন্ডল যন্ত্র গুলোর সাথে ক্রোমোসোম যুক্ত থাকে তাকে আকর্ষণ তন্তু বা ক্রোমোজোমাল তন্তু বা ট্র্যাকশন ফাইবার বলে। সেন্ট্রোমিয়ারের কাইনেটোকোরের মটর প্রোটিনের সাথে আকর্ষণ তন্তু যুক্ত হয়। ক্রোমোসোম আকর্ষণতন্তুর সাথে যুক্ত হয়ে ক্রোমোসোমীয় নৃত্য প্রদর্শন করে। প্রাণী কোষে স্পিন্ডল যন্ত্রের দুমেরুতে সেন্ট্রিওল থেকে অ্যাস্টার তন্তু সৃষ্টি হয়।
৩। মেটাফেজ (Metaphage)ঃ গ্রীক শব্দ meta অর্থ মধ্যবর্তী এবং phage অর্থ দশা নিয়ে Metaphage শব্দটি গঠিত। মাইটোসিস কোষ বিভাজনের মধ্যবর্তী দশাকে মেটাফেজ বলে।
মেটাফেজ হলো একটি স্বল্প স্থায়ী পর্যায়। কনডেনসেশন প্রক্রিয়ায় ক্রোমোজোমগুলো সবচেয়ে বেশি সংকুচিত, মোটা ও খাটো হয়। এ পর্যায়ে ক্রোমোসোমের কয়েলিং-কে সুপার কয়েলিং বলা হয়। ক্রোমোসোম গুলো বিষুবীয় অঞ্চলে অবস্থান করে। বিষুবীয় অঞ্চলে ক্রোমোসোম গুলোর অবস্থান একটি প্লেটের মতো দেখায়। একে বিষুবীয় প্লেট বা মেটাফেজ প্লেট বলে। মেটাফেজ প্লেটে ছোট ক্রোমোসোমগুলো ভিতরের দিকে এবং বড় ক্রোমোসোমগুলো বাইরের দিকে সজ্জিত থাকে। ক্রোমোসোম গুলোর বিষুবীয় অঞ্চলে বিন্যস্ত হওয়ার প্রক্রিয়াকে মেটাকাইনেসিস বলে। মেটাফেজ পর্যায়ের শেষের দিকে প্রতিটি ক্রোমোসোমের সেন্ট্রোমিয়ার বিভক্ত হয়ে দুটি করে অপত্য সেন্ট্রোমিয়ার সৃষ্টি করে।
৪। অ্যানাফেজ (Anaphage)ঃ গ্রীক শব্দ ana অর্থ গতি এবং phage অর্থ দশা নিয়ে Anaphage শব্দটি গঠিত। অ্যানাফেজ হলো সর্বাপেক্ষা স্বল্পস্থায়ী পর্যায়। এ দশায় ক্রোমোসোম গুলো স্ব স্ব মেরুমুখী গমন করে বলে একে গতির পর্যায় বলা হয়।
অ্যানাফেজ পর্যায়ে কোষে অপত্য ক্রোমোসোম সংখ্যা মাতৃকোষের দ্বিগুণ হয়। একই ক্রোমোসোম থেকে সৃষ্ট সমধর্মী অপত্য ক্রোমোসোম গুলো পরস্পরকে বিকর্ষণ করে। আর্কষণ তন্তুর সঙ্কোচন এবং কান্ড দেহের প্রসারণের ফলেই ক্রোমোসোম গুলো গতি প্রাপ্ত হয়। ক্রোমোসোম গুলো বিপরীত মেরুর দিকে ধাবিত হয়। অপত্য ক্রোমোসোম গুলোর মধ্যে অর্ধেক সংখ্যক এক মেরুর দিকে এবং বাকি অর্ধেক সংখ্যক অন্য মেরুর দিকে ধাবিত হয়। মেরু চলনের সময় সেন্ট্রোমিয়ার অগ্রগামী এবং বাহুদ্বয় অনুগামী হয়। ক্রোমোসোমের এরুপ মেরু চলনকে ক্রোমোসোমীয় চলন বা অ্যানাফেজীয় চলন বলে। প্রাণিকোষে মাকুতন্তুগুলো মিলিত হয়ে ইন্টারজোনাল ফাইবার বা স্টেমবডি গঠন করে। স্টেমবডি ক্রোমোসোমগুলোকে মেরুর দিকে চলনে সাহায্য করে। ক্রোমোসোমগুলো মেরু অঞ্চলে ইংরেজি V, L, J বা I অক্ষরের মতো আকার ধারণ করে। অপত্য ক্রোমোসোম গুলো মেরুর কাছাকাছি পৌঁছালে অ্যানাফেজ বা গতির দশার পরিসমাপ্ত ঘটে।
৫। টেলোফেজ (Telophage)ঃ গ্রীক শব্দ telo অর্থ শেষ এবং phage অর্থ দশা নিয়ে Telophage শব্দটি গঠিত। মাইটোসিস কোষ বিভাজনের শেষ দশা হলো টেলোফেজ। একে অন্তঃপর্যায়ও বলা হয়।
টেলোফেজ দশায় প্রোফেজ দশার বিপরীত অবস্থা ঘটে। ক্রোমোসোম গুলো বিপরীত দুই মেরুতে স্থির ভাবে অবস্থান করে। ক্রোমোসোম গুলোর মধ্যে পানি যোজন বা পানি শোষণ (hydration) শুরু হয়। ফলে ক্রোমোসোমের রং বা রঞ্জক ধারণ ক্ষমতা কমে যায়। ডি-কনডেনসেশন প্রক্রিয়ায় ক্রোমোসোম গুলোর কুন্ডলী বা প্যাঁচ খুলে যায়, সরু ও লম্বা হয় এবং নিউক্লিওজালিকা গঠন করে। স্পিন্ডলযন্ত্র গুলোর কাঠামো ভেঙ্গে যায় এবং ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যায়। নিউক্লিয়ার মেমব্রেন ও নিউক্লিওলাস-এর পুনঃআবির্ভাব ঘটে। প্রতিটি অপত্য নিউক্লিয়াসের ক্রোমোসোম সংখ্যা মাতৃ নিউক্লিয়াসের ক্রোমোসোম সংখ্যার সমান থাকে। টেলোফেজ পর্যায়ের শেষের দিকে বিষুবীয় অঞ্চল বরাবর উদ্ভিদ কোষে কোষপ্লেট এবং প্রাণীকোষে কোষঝিল্লিতে খাঁজ সৃষ্টি হয়।