মানুষের শ্বসনতন্ত্র আলোচনা । Respiratory System আলোচনা । ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

যে তন্ত্রের মাধ্যমে শ্বসন ক্রিয়া সম্পন্ন হয় তাকে শ্বসনতন্ত্র বলে। শ্বসন কাজে অংশ গ্রহণকারী অঙ্গ গুলোকে একত্রে শ্বসনতন্ত্র বলে। মানব শ্বসনতন্ত্রের বিভিন্ন অংশ হলো

১। সম্মুখ নাসারন্ধ্রঃ নাকের সামনে অবস্থিত পাশাপাশি দুটি ছিদ্রকে সম্মুখ নাসারন্ধ্র বলে। ইহা শ্বাসনালির প্রথম অংশ। ন্যাসাল সেপ্টাম দ্বারা ইহা দুটি রন্ধ্রে বিভক্ত। সম্মুখ নাসারন্ধ্র সর্বদা উন্মুক্ত থাকে।

কাজঃ নাসারন্ধ্রের মধ্য দিয়ে বায়ু প্রবেশ করে এবং কার্বন ডাই অক্সাইড বাইরে বের হয়ে যায়।

২। ভেস্টিবিউলঃ নাসারন্ধ্রের পরে নাকের ভিতরের অংশকে ভেস্টিবিউল বলে। এর প্রাচীরে লোম থাকে। লোম গুলো ছাঁকুনী হিসেবে কাজ করে এবং বায়ু পরিষ্কার করে।

৩। নাসাগহ্বরঃ ভেস্টিবিউলের পরের অংশকে নাসাগহ্বর বলে। এর অন্তঃপ্রাচীরে সিলিয়াযুক্ত এপিথেলিয়াম, মিউকাস পর্দা, ঘ্রাণ সংবেদী কোষ, রক্তবাহিকা, স্নায়ুপ্রান্ত, তৈলগ্রন্থি এবং অসংখ্য লোম থাকে। অলফ্যাক্টরী কোষ ঘ্রাণ উদ্দীপনা গ্রহণে সাহায্য করে।

কাজঃ ইহা শুষ্ক বায়ুকে সিক্ত এবং গরম বায়ুকে ঠান্ডা করে। সিলিয়াযুক্ত কোষ এবং মিউকাস পর্দা ধুলাবালি জীবাণুকে আটকে দেয়। অলফ্যাক্টরী কোষ ঘ্রাণ উদ্দীপনা গ্রহণে সহায়তা করে।

৪। পশ্চাৎ নাসারন্ধ্র/কোয়ানীঃ নাসাগহŸরদ্বয় যে ছিদ্র দ্বারা নাসাগলবিলে উন্মুক্ত হয়েছে তাকে কোয়ানী বা পশ্চাৎ নাসারন্ধ্র বলে।

কাজঃ এই ছিদ্র পথে বাতাস নাসাগলবিলে প্রবেশ করে।

৫। নাসাগলবিলঃ পশ্চাৎ নাসারন্ধ্র থেকে স্বরযন্ত্র পর্যন্ত অংশকে নাসাগলবিল বলে। ইহা খাদ্যনালী শ্বাসনালীর একটি অভিন্ন অংশ।

৬। স্বরযন্ত্রঃ গলবিলের নিচে অবস্থিত তরুণাস্থি নির্মিত একটি ছোট অঙ্গ হলো স্বরযন্ত্র। তরুণাস্থি গুলোর মধ্যে থাইরয়েড তরুণাস্থিটি সবচেয়ে বড় এবং Adam’s apple নামে পরিচিত। এর উপরের দিকে এপিগøটিস নামে একটি ছোট ঢাকনা থাকে। স্বরযন্ত্রের ভিতরে মিউকাস আবরণী এবং ৬টি স্থিতিস্থাপক ভোকাল কর্ড থাকে। টানটান অবস্থায় ভোকাল কর্ড বায়ু দ্বারা কম্পিত হয় এবং শব্দ উৎপন্ন করে।

কাজঃ এপিগ্লটিস স্বরযন্ত্রে খাদ্য প্রবেশে বাঁধা দেয়। ভোকাল কর্ড স্বর বা শব্দ উৎপন্ন করে।

৭। শ্বাসনালী বা ট্রাকিয়াঃ ভোকাল কর্ড থেকে পঞ্চম বক্ষদেশীয় কশেরুকা পর্যন্ত অংশকে শ্বাসনালী বলে। ইহা একটি ফাঁপা নল। এর দৈর্ঘ্য ১২ সেমি এবং ব্যাস সেমি। ইহা C (অর্ধ বলয়) আকৃতির ১৬২০টি তরুণাস্থি বলয় দ্বারা গঠিত। বলয় গুলো তন্তুময় কলা দ্বারা যুক্ত থাকে বলে শ্বাসনালী চুপসে যায় না। শ্বাসনালীর অন্তঃপ্রাচীর সিলিয়াযুক্ত মিউকাস আবরণী দ্বারা এবং বহিঃপ্রাচীর যোজক কলার আবরণী দ্বারা আবৃত থাকে।

কাজঃ ট্রাকিয়ার মধ্য দিয়ে বায়ু চলাচল করে। মিউকাস আবরণীর সিলিয়া অবাঞ্চিত বস্তুর প্রবেশ রোধ করে।

৮। ব্রঙ্কিয়াল বা শ্বসন বৃক্ষঃ ট্রাকিয়ার শেষ প্রান্ত বিভক্ত হয়ে দুইটি শাখা সৃষ্টি করে। ডান বাম শাখা। শাখা দুটিকে ক্রোমনালী বা ব্রংকাস বলে। ডান শাখাটি ৩টি ভাগে বিভক্ত হয়ে ডান ফুসফুসে এবং বাম শাখাটি ২টি ভাগে বিভক্ত হয়ে বাম ফুসফুসে প্রবেশ করে। প্রতিটি শাখা পুনঃপুনঃ বিভক্ত হয়ে অসংখ্য ব্রংকিওল গঠন করে। প্রতিটি ব্রংকিওলে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অসংখ্য বায়ু প্রকোষ্ঠ থাকে। এদেরকে অ্যালভিলাই বলে। অ্যালভিওলাস হলো ফুসফুসে গঠনিক এবং কার্যিক একক। সমগ্র শ্বাসনালি দেখতে উল্টানো বৃক্ষের মতো বলে একে শ্বসন বৃক্ষ বলা হয়।

কাজঃ ব্রংকাসের ভিতর দিয়ে বায়ু ট্রাকিয়া হতে ফুসফুসে প্রবেশ করে এবং ফুসফুস হতে CO2 যুক্ত বায়ু ট্রাকিয়ার মধ্য দিয়ে বের হয়ে যায়।

৯। ফুসফুসঃ মানুষের বক্ষগহŸরে যে হালকা গোলাপী বর্ণের বৃহৎ স্পঞ্জের মতো নরম অঙ্গ থাকে তাকে ফুসফুস বলে। মানবদেহে দুইটি ফুসফুস থাকে। ডান বাম ফুসফুস। ডান ফুসফুস বড়, তিন খন্ড বা লোব বিশিষ্ট এবং ওজন ৬২৫ গ্রাম। বাম ফুসফুস ছোট, দুই খন্ড বা লোব বিশিষ্ট এবং ওজন ৫৬৫ গ্রাম। দুইটি ফুসফুসের একত্রে ওজন . পাউন্ড। ডান ফুসফুসে ১০টি এবং বাম ফুসফুসে ৮টি সেগমেন্ট বা খন্ডে বিভক্ত। প্রতিটি সেগমেন্ট বা খন্ড অসংখ্য লোবিওলে বিভক্ত। ফুসফুসের যে স্থান দিয়ে ব্রংকাস, রক্তনালি লসিকানালি প্রবেশ করে তাকে হাইলাম বলে। ব্রংকাস, রক্তনালি লসিকানালি যোজক কলা দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে ফুসফুসের মূল গঠন করে।

প্রতিটি ফুসফুস প্লিউরা নামক দ্বিস্তরী পাতলা আবরণী দ্বারা আবৃত থাকে। বাইরের স্তরটিকে প্যারাইটাল এবং ভিতরের স্তরটিকে ভিসেরাল স্তর বলে। স্তর দুটির মাঝখানে সেরাস ফ্লুইড নামক তরল পদার্থ থাকে। সেরাস ফ্লুইড ফুসফুসকে ঘর্ষণজনিত আঘাত থেকে রক্ষা করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *