১। প্রোটিন বিপাক
(i) প্লাজমা প্রোটিন তৈরীঃ যকৃত কোষ অ্যামাইনো এসিড হতে অ্যালবুমিন, গ্লোবিউলিন, ফাইব্রিনোজেন, প্রোথ্রম্বিন, ট্রান্সফেরিন, সেরোপ্লাজমিন, ফটোপ্রোটিন প্রভৃতি প্লাজমা প্রোটিন তৈরী করে।
(ii) হরমোন সংশ্লেষঃ যকৃত অ্যানজিওটেনসিনোজেন হরমোন সংশ্লেষ করে। এই হরমোন রক্তচাপ বৃদ্ধি করে।
(iii) ডি-অ্যামিনেশনঃ যকৃত অতিরিক্ত ও অব্যবহৃত অ্যামাইনো এসিডকে ডি-অ্যামিনেশন প্রক্রিয়ায় ভেঙ্গে কিটো এসিড ও অ্যামিন মূলকে পরিনত করে।
২। কার্বোহাইড্রেট বিপাক
(i) গ্লাইকোজেনেসিসঃ এ প্রক্রিয়ায় গ্লুকোজ থেকে গ্লাইকোজেন উৎপন্ন হয় তাকে গ্লাইকোজেনেসিস বলে। যকৃত রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। গ্যালাক্টোজ, ফ্রুক্টোজসহ হেক্সোজ শর্করাগুলো গ্লাইকোজেন হিসেবে জমা থাকে।
(ii) গ্লাইকোজেনোলাইসিসঃ এ প্রক্রিয়ায় যকৃতে সঞ্চিত গ্লাইকোজেন ভেঙ্গে গ্লুকোজ উৎপন্ন হয়। এই প্রক্রিয়াটি এপিনেফ্রিন ও গ্লুকাগন হরমোন দ্বারা প্রভাবিত হয়।
(iii) গ্লাইকোনিউজেনেসিসঃ যে জৈব রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় অশর্করা জাতীয় উপাদান থেকে গ্লুকোজ উৎপন্ন হয় তাকে গ্লাইকোনিউজেনেসিস বলে। দেহে গ্লুকোজের মাত্রা অত্যধিক কমে গেলে অ্যামাইনো এসিড, ল্যাকটিক এসিড, পাইরুভিক এসিড, গিøসারল প্রভৃতি অশর্করা জাতীয় উপাদান থেকে গ্লুকোজ উৎপন্ন হয়।
(iv) লাইপোজেনেসিসঃ এ প্রক্রিয়ায় যকৃত অতিরিক্ত গ্লুকোজকে ট্রাইগিøসারাইডে রুপান্তরিত করে। উৎপন্ন ট্রাইগিøসারাইড কোষে চর্বি হিসেবে জমা থাকে। হৃৎরোগ ও স্ট্রোকের অন্যতম কারণ হলো ট্রাইগিøসারাইড।
৩। লিপিড বিপাক
(i) যকৃতে ফ্যাটি এসিড ভেঙ্গে ATP উৎপন্ন হয়। ATP পেশির প্রসারণ ও শিথিলে ব্যবহার হয়।
(ii) যকৃত লিপোপ্রোটিন সংশ্লেষণ করে। লিপোপ্রোটিন কোষের ফ্যাটি এসিড, কোলেস্টেরল ও ট্রাইগিøসারাইডের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে।
(iii) যকৃত কোলেস্টেরল সঞ্চয় করে। কোলেস্টেরল দ্বারা সোডিয়াম গ্লাইকোকোলেট ও সোডিয়াম টাউরোকোলেট নামক পিত্তলবণ তৈরী হয়।
(iv) যকৃতে ফ্যাটি এসিড ও গিøসারলের জারণের মাধ্যমে কিটোন উৎপন্ন হয়।
(v) সোডিয়াম গ্লাইকোকোলেট ও সোডিয়াম টাইরোকোলেট দ্বারা স্নেহ জাতীয় খাদ্য ভেঙ্গে সাবানের ফেনার মতো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দানায় পরিনত হয়। এই প্রক্রিয়াকে ইমালসিফিকেশন বলে।
(vi) যকৃত রসের প্রভাবে ফসফোলিপিড, গ্লাইকোলিপিড, লিপোপ্রোটিন, কোলেস্টেরল প্রভৃতি বিশ্লেষিত হয়। শর্করার অভাবে সঞ্চিত ফ্যাট হতে গ্লুকোজ উৎপন্ন হয়।
৪। নিউক্লিক এসিড বিপাকঃ যকৃত কোষের সাহায্যে পিউরিন ও পাইরিমিডিনের নিউক্লিওটাইড গুলো বিশ্লেষিত হয়। পিউরিন ভেঙ্গে ইউরিক এসিড এবং পাইরিমিডিন ভেঙ্গে ইউরিয়া উৎপন্ন হয়।
৫। হরমোন ভাঙ্গনঃ যকৃতের রস সকল প্রকার হরমোনের ভাঙ্গন প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। ইস্ট্রোজেন, কর্টিকাল, টেস্টোস্টেরণ প্রভৃতি হরমোন সালফিউরিক এসিডের সাথে নির্গত হয়। টেস্টোস্টেরণ ও অ্যান্ড্রোস্টেরণ হরমোন দ্রুত এবং ইনসুলিন, গ্লুকাগন, ইস্টোজেন, প্রোজেস্টেরন, অ্যাডেনাল, থাইরক্সিন প্রভৃতি হরমোন ধীরে ধীরে ধ্বংস হয়।
৬। দেহের সুরক্ষাঃ যকৃতের কাফ্ফার কোষ ফ্যাগোসাইটোসিস প্রক্রিয়ায় ব্যাকটেরিয়া ও অন্যান্য জীবাণু ভক্ষণ করে দেহকে সুরক্ষা করে।
৭। লোহিত রক্ত কণিকা উৎপাদনঃ শিশুদের যকৃত কোষ লোহিত রক্ত কণিকা উৎপন্ন করে। আবার, ইহা মৃত প্রায় লোহিত রক্তকণিকাকে অপসারিত করে।
৮। বিলিরুবিন সৃষ্টিঃ রক্তের হিমোগ্লোবিনকে ভেঙ্গে হিম ও গ্লোবিন উৎপন্ন করে। হিম অংশ হতে সবুজ বর্ণের বিলিভার্ডিন উৎপন্ন হয়। পরে বিলিভার্ডিন হতে হলুদ বর্ণের বিলিরুবিন সৃষ্টি হয়। দেহে অতিরিক্ত বিলিরুবিন থাকলে জন্ডিস হয় এবং গায়ের রং হলুদ হয়ে যায়।
৯। নির্বিষকরণঃ দেহে বিদ্যমাণ ক্ষতিকর পদার্থকে যকৃত কোষ জারণ, বিজারণ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে ধ্বংস ও অপসারণ করে। দেহের অতিরিক্ত ওষুধ অপসারিত হয়।
১০। ইউরিয়া প্রস্তুতঃ যকৃত রসের প্রভাবে ডিঅ্যামাইনেশন প্রক্রিয়ায় অ্যামাইনো এসিড হতে ইউরিয়া উৎপন্ন হয়
১১। রক্তের প্রোটিন তৈরীঃ রক্তের অ্যালবুমিন, গ্লোবিউলিন প্রভৃতি প্রোটিন যকৃতে তৈরী হয়।
১২। রক্ত জমাট বাঁধাঃ যকৃত কোষের কার্যকারীতায় ফাইব্রিনোজেন ও প্রোথ্রম্বিন উৎপন্ন হয়। ফাইব্রিনোজেন ও প্রোথ্রম্বিন রক্ত জমাট বাঁধতে সাহায্য করে।
১৩। এনজাইম উৎপাদনঃ যকৃত ক্যাটালেজ এনজাইম উৎপন্ন করে। ক্যাটালেজ এনজাইম হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড ভেঙ্গে পনি ও অক্সিজেন উৎপন্ন করে। ইহা দেহের বিষাক্ত পদার্থ নষ্ট করে দেয়।
১৪। তাপশক্তি উৎপাদনঃ যকৃতে ট্রাইগিøসারাইড ও ফ্যাটি এসিড জারিত হয়ে তাপ শক্তি উৎপন্ন হয়।
১৫। রক্তের উপাদান সংশ্লেষণঃ যকৃত রক্তের তঞ্চন ফ্যাক্টর, ইমিইন ফ্যাক্টর এবং রক্তকণিকা সৃষ্টির কাঁচমাল উৎপন্ন করে।
১৬। কোলেস্টেরল উৎপাদনঃ ফ্যাটযুক্ত খাবার খেলে যকৃতে কোলেস্টেরল উৎপন্ন হয়। কোলেস্টেরল হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোক রোগ সৃষ্টি করে।
১৭। ট্রান্সঅ্যামিনেশনঃ ট্রান্সঅ্যামিনেশন প্রক্রিয়ায় অ্যামাইনো এসিডের নাইট্রোজেন যুক্ত অংশ শর্করাতে প্রতিস্থাপন করে নতুন অ্যামাইনো এসিড উৎপন্ন করে।
১৮। রক্ত ব্যাকটেরিয়া মুক্ত রাখাঃ কাফফার কোষ রক্তের ব্যাকটেরিয়াকে ধ্বংস করে। রক্ত ব্যাকটেরিয়া মুক্ত হয়।