১। মানুষের খাদ্য হিসেবে (Human food)
(i) খাদ্য বিশারদগণ ১০০টি শৈবাল প্রজাতিকে মানুষের খাদ্য হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এসব শৈবালে প্রোটিন থাকে বলে পুষ্টিকর খাদ্য হিসেবে তালিকা করা হয়েছে।
(ii) প্রাচীনকাল থেকে Chlorella, Laminaria, Ulva, Chondrus, Gracilaria প্রভৃতি শৈবাল মানুষের খাদ্য হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে।
(iii) বাদামী শৈবাল থেকে প্রস্তুত অ্যারামি ও ক্যুমবো জাপানীদের সর্বাধিক জনপ্রিয় খাদ্য।
(iv) Porphyra শৈবাল থেকে জাপানে নরি, কোরিয়ায় জিম এবং যুক্তরাজ্যে ল্যাভার তৈরী করা হয়।
(v) Chlorella একটি ভিটামিন সমৃদ্ধ শৈবাল।
(vi) Spirulina-কে ভবিষত্যের সেরা খাদ্য হিসেবে মন্তব্য করা হয়।
২। উৎপাদক হিসেবে (Producer)ঃ শৈবাল জলাশয়ে খাদ্য শৃঙ্খলে উৎপাদক হিসেবে কাজ করে। এরা সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় শর্করা জাতীয় খাদ্য তৈরী করে।
৩। পশুখাদ্য হিসেবে (Animal food)ঃ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে শৈবাল পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহার হয়। যেমন- Alaria, Laminaria, Rhodymenia, Ascophyllum, Sargassum, Fucus প্রভৃতি।
৪। পোল্ট্রিখাদ্য হিসেবে (Poultry food)ঃ শৈবাল শুকিয়ে বা পুড়িয়ে কেল্প তৈরী করা হয়। কেল্প পোল্ট্রিখাদ্য হিসেবে ব্যবহার হয়। যেমন- Laminaria, Mucus, Sargassum প্রভৃতি।
৫। অক্সিজেন উৎপাদন (Oxygen production)ঃ শৈবাল সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় অক্সিজেন উৎপন্ন করে। পৃথিবীর ৬০% অক্সিজেন শৈবাল উৎপন্ন করে।
৬। পরিবেশ দুষণ রোধ (Pollution control)ঃ শৈবাল অক্সিজেন উৎপন্ন করে এবং কার্বন ডাই অক্সাইড গ্রহণ করে। ফলে বায়ুমন্ডলের বিশুদ্ধতা রক্ষা পায়। নালা-নর্দমার আবর্জনা শোধনে শৈবাল ব্যবহার হয়। পানি শোধনে Nitzschia (ডায়াটম) শৈবাল ব্যবহার হয়। বায়ু শোধন এবং নর্দমার বর্জ্য অপসারণে Chlorella শৈবাল ব্যবহার হয়। ফলে পরিবেশ দুষণ রোধ হয়।
৭। সামুদ্রিক মাছের অবস্থান নির্ণয় (Marine fish position)ঃ সমুদ্রের যে অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে শৈবাল জন্মে সে অঞ্চলে প্রচুর মাছ থাকে। স্যাটেলাইটের মাধ্যমে মাছের অবস্থান নির্ণয় করা হয়। ফলে অল্প সময়ে প্রচুর পরিমাণ মাছ ধরা যায়।
৮। বায়োফুয়েল তৈরী (Biofuel production)ঃ শৈবাল থেকে Biofuel বাv Biodiesel তৈরী করা হয়। তাই শৈবালকে Second generation biofuels নামে অভিহিত করা হয়। Biofuel তৈরীতে Botryococcus braunii শৈবাল ব্যবহৃত হচ্ছে। Chlorella ও Scenedesmus শৈবাল হতে বায়োফুয়েল তৈরীর চেষ্টা চলছে। সম্প্রতি গবেষকগণ মাইক্রোঅ্যালগাল বায়োম্যাস থেকে তৃতীয় প্রজন্মের জৈব জ¦ালানি (Third generation biofuels) উৎপাদনের চেষ্টা করছে। কিছু মাইক্রো-অ্যালগাল প্রজাতি Kirchneriella lunaris, Ankistrodesmus fusiformis, Ankistrodesmus falcatus, Chlamydocapsa bacillus, Chlorella, Scenedesmus প্রভৃতি থেকে বায়োডিজেল উৎপাদনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
৯। জৈব সার হিসেবে (Bio-fertilizer)ঃ সামুদ্রিক শৈবাল পটাশ সারের উৎস হিসেবে ব্যবহার হয়। যেমন- Spirulina, Scytonema, Oscillatoria, Anabaena, Nostoc প্রভৃতি।
১০। গোয়েন্দা সাবমেরিনের অবস্থান নির্ণয় (Submarine position)ঃ নীলাভ সবুজ শৈবালে phycobilin protein নামক রঞ্জক কণিকা থাকে। এই রঞ্জক কণিকা (C-phycoerythrin, C-phycocyanin) গোয়েন্দা সাবমেরিন থেকে বিকরিত রশ্মি শোষণ করে। শোষিত রশ্মির পরিমাণ হতে গোয়েন্দা সাবমেরিনের অবস্থান জানা যায়।
১১। ডায়াটমীয় মাটি (Diatomite)ঃ ডায়াটম জাতীয় (Navicula) শৈবালের মৃতদেহ জলাশয়ের তলদেশে জমা হয়ে ডায়াটমীয় মাটি বা ডায়াটোমাইট গঠন করে। মাটির স্তরে জমাকৃত ডায়াটম শৈবালের খোলস কার্বন ডেটিং করে মাটির বয়স নির্ণয় করা হয়। পানির ফিল্টার, বয়লার, বøাষ্ট চুল্লী, ধাতব পালিশ, দাঁতের মাজন প্রভৃতি তৈরীতে ডায়াটোমাইট ব্যবহার হয়। ডিনামাইট তৈরীতে ডায়াটমীয় মাটি ব্যবহার হতো।
১২। ওষুধ তৈরীতে (Madicine)ঃ Gelidium, Gracilaria, Pterocladia প্রভৃতি হতে অ্যাগার অ্যাগার, Sargassum ও Laminaria থেকে গলগন্ড রোগের ওষুধ এবং Chlorella থেকে Chloreline অ্যান্টিবায়োটিক তৈরী করা হয়। Callophyllis variegate ও Agardhiella tenera নামক লাল শৈবাল থেকে গ্যালাক্টেন তৈরী করা হয়। গ্যালাক্টেন HIV প্রতিরোধে ব্যবহার হয়। অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন বিটা ক্যারোটিনযুক্ত শৈবাল থেকে মুখের ক্যান্সারের ওষুধ তৈরী করা হয়।
১৩। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি (Diseases control)ঃ লোহিত শৈবাল শ্বেত রক্তকণিকা সৃষ্টি করে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।
১৪। মহাকাশ গবেষণায় (Aerospace research)ঃ মহাকাশ গবেষণায় নভোযানের দুষিত বাতাসকে বিশুদ্ধ করার জন্য Chlorella ব্যবহার হয়। Chlorella নভোযানে অক্সিজেনের চাহিদা পূরণ করে।
১৫। শিল্পক্ষেত্রে গুরুত্ব (Importance of Industry)
(i) সামুদ্রিক শৈবালের কেল্প হতে ফিটকিরি, কাঁচ, সোডা, পটাশ, অ্যালজিনিক এসিড ও সাবান তৈরী করা হয়।
(ii) বাদামী শৈবালের অলজিন এবং লোহিত শৈবালের জিলাটিন হতে আইসক্রিম, জেরি, রং, বার্নিস, শ্যাম্পু ও প্রসাধনী তৈরী করা হয়।
(iii) শৈবালের অ্যাগার-অ্যাগার থেকে সাবান, কাগজ, ফটোগ্রাফি, রেয়ন প্রভৃতি তৈরী করা হয়।
(iv) শৈবালে প্রাকৃতিক উপায়ে স্টার্চ ও পলিহাইড্রোক্সি-অ্যালকানোয়েটস জাতীয় পলিমার সৃষ্টি হয়। এ সব পলিমার থেকে বায়োপ্লাস্টিক তৈরী করা হয়।
(v) শৈবালের (ঈযড়হফৎঁং পৎরংঢ়ঁং) কারাজিন খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে, রেয়ন, ওষুধ শিল্পে, চামড়া শিল্পে, টুথপেস্ট ও রং তৈরীতে ব্যবহার হয়।
(vi) শৈবালের (ঋঁৎপবষষধৎরধ) ফুরসেলারান জ্যাম-জেলি তৈরী, মাছ-মাংস সংরক্ষণ এবং টুথপেস্ট ও ওষুধ শিল্পে ব্যবহার হয়।
(vii) শৈবালের (এষবড়ঢ়বষঃরং ভঁৎপধঃধ) ফিউনোরি কাগজ, বস্তু শিল্পে এবং আঠা তৈরীতে ব্যবহার হয়।
(viii) Laminaria শৈবাল থেকে আয়োডিন ও পটাশ উৎপন্ন করা হয়।
১৬। অ্যাগার-অ্যাগার (Agar agar)ঃ সামুদ্রিক লোহিত শৈবাল (Gelidium, Gracilaria, Gigartina) থেকে অ্যাগার-অ্যাগার তৈরী করা হয়। ইহা কয়েক প্রকার খাদ্য তৈরীতে ব্যবহার হয়।
১৭। পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাসঃ সামুদ্রিক শৈবাল থেকে পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস পাওয়া যায়।
১৮। মাছ চাষেঃ বিভিন্ন ধরনের শৈবাল মাছের খাদ্য হিসেবে ব্যবহার হয়। তাই মাছ চাষে পুকুর বা জলাশয়ে শৈবাল ব্যবহার হয়। তেলাপিয়া মাছ চাষে কয়েক প্রকার শৈবাল খাদ্যরুপে ব্যবহার হয়।
১৯। নাইট্রোজেন সংবন্ধনঃ Nostoc, Anabaena, Aulosira প্রভৃতি শৈবালে হেটারোসিস্ট থাকে। হেটারোসিস্ট নাইট্রোজেন সংবন্ধন করে। এসব শৈবাল নাইট্রোজেনকে গ্রহণ যোগ্য অ্যামোনিয়াতে রুপান্তরিত করে।
২০। ন্যানো ফিল্টার তৈরীঃ ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় এবং সুইডেনের উপশালা বিশ^বিদ্যালয়ের একদল গবেষক Pithophora শৈবাল থেকে ন্যানো ফিল্টার তৈরী করেছেন। ন্যানো ফিল্টার হলো সেলুলোজ ফিল্টার। ইহা সাদা কাগজের মতো এবং ছাঁকনিগুলোর ছিদ্র ১৭ ন্যানোমিটার। পানিবাহিত জীবাণু ৩০-১০০ ন্যানোমিটার হয়। তাই সকল ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া ছাঁকনিতে আটকা পড়ে। পানি থেকে বিষাক্ত আর্সেনিক, আয়ন, লবণ প্রভৃতি পৃথক করা সম্ভব।
২১। আবাদ মাধ্যম তৈরী (ঈঁষঃঁৎব সবফরঁস) ঃ গবেষণাগারে ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকের আবাদ মাধ্যম তৈরীতে শৈবাল ব্যাপক ভাবে ব্যবহার হচ্ছে।
২২। মশা নিয়ন্ত্রণ (Mosquito control)ঃ জলাশয়ে Chara, Nitella প্রভৃতি শৈবালের উপস্থিতিতে মশার লার্ভা মারা যায়। জলাশয়ে এ সব শৈবাল চাষ করে মশা নিয়ন্ত্রণ করা যায়।