মানুষের লোহিত রক্তকণিকায় ম্যালেরিয়া পরজীবীর অযৌন জননকে এরিথ্রোসাইটিক সাইজোগনি বলে। স্পোরোজয়েট দশার পর থেকে মানুষের রক্তে আত্মপ্রকাশ করতে ম্যালেরিয়া পরজীবীর ৭-৮ দিন সময় লাগে। এ সময়কে প্রি-পেটেন্ট কাল বলে। অনেক সময় স্পোরোজয়েট যকৃত কোষে প্রবেশের পর কয়েক মাস বা বছর সুপ্তাবস্থায় থাকে। স্পোরোজয়েটের এরুপ সুপ্তাবস্থাকে হিপনোজয়েট বলে। এরিথ্রোসাইটিক সাইজোগনির ধাপগুলো নিম্নরুপ-
১। ট্রফোজয়েটঃ মেরোজয়েট গুলো লোহিত রক্তকণিকায় প্রবেশ করে এবং খাদ্য গ্রহণ করে স্ফীত, বড় ও গোলাকার হয়। এ দশাকে ট্রফোজয়েট বলে। ট্রফোজয়েটের ব্যাস ২.৫-৩.০ µm। এটি একটি ক্ষণস্থায়ী দশা।
২। সিগনেট রিংঃ ট্রফোজয়েটের ভিতরে একটি গহŸর সৃষ্টি হয়। এর সাইটোপ্লাজম পরিধির দিকে সরে যায় এবং নিউক্লিয়াস একপাশে অবস্থান করে। এ অবস্থায় জীবাণুটিকে পাথর বসানো আংটির মতো মনে হয়। একে সিগনেট রিং বলে।
৩। অ্যামিবয়েড ট্রফোজয়েটঃ ৮ ঘন্টার মধ্যে সিগনেট রিং এর গহ্বরটি অদৃশ্য হয়ে যায়। পরজীবীটি অনিয়ত আকার ধারণ করে, অ্যামিবার মতো ক্ষণপদ সৃষ্টি করে এবং চলনক্ষম হয়। এ দশাকে অ্যামিবয়েড ট্রফোজয়েট বলে। অ্যামিবয়েড ট্রফোজয়েট হিমোগ্লোবিনের প্রোটিন উপাদানকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে। হিমোগ্লোবিনের হিমাটিন বিষাক্ত হিমোজয়েন-এ পরিনত হয়। এ সময় লোহিত রক্তকণিকাটি আকারে বড় হয় এবং এর সাইটোপ্লাজমে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দানা দেখা যায়। এ দানা গুলোকে সাফনার্স কণা (Schiffner’s dots) বলে। রক্তকণিকায় সাফনার্স দানার উপস্থিতি দেখে ম্যালেরিয়া রোগ শনাক্ত করা হয়। আবিষ্কারক উইলহেলম সাফনার্স (Wilhelm Schiffner, 1904) এর নামানুসারে সাফনার্স দানা (Schiffner’s dots) নামকরণ করা হয়েছে।
৪। সাইজন্টঃ অ্যামিবয়েড ট্রফোজয়েটের ক্ষণপদ বিলিন হয়ে যায় এবং পরজীবীটি গোলাকার বা লম্বাকার হয়। এর নিউক্লিয়াসটি বিভাজিত হয়ে ১২-২৪টি অপত্য নিউক্লিয়াস সৃষ্টি করে। এই বহু নিউক্লিয়াস যুক্ত অবস্থাকে সাইজন্ট বলে। ৩৬-৪০ ঘন্টা পর এটি লোহিত রক্তকণিকার সবটুকু স্থান দখল করে নেয়। এ সময় পরজীবীর সাইটোপ্লাজমে হিমোজয়েন নামক বর্জ্য পদার্থ জমা হয়।
৫। মেরোজয়েটঃ ৪৫ ঘন্টা পর সাইজন্টের সাইটোপ্লাজমে ১২-১৮টি ক্ষুদ্র অংশ দেখা যায়। প্রতিটি অংশে একটি করে নিউক্লিয়াস প্রবেশ করে। এ গুলো পাপড়ির মতো দুটি স্তরে সাজানো থাকে। এই অবস্থাকে রোজেট বলে। নিউক্লিয়াসসহ প্রতিটি অংশ এক একটি মেরোজয়েটে পরিনত হয়। মেরোজয়েট গুলো নতুন লোহিত রক্তকণিকাকে আক্রমণ করে। এ সময রক্তে প্রচুর পরিমাণে পাইরোজেন নামক রাসায়নিক পদার্থ জমা হয় এবং এর প্রভাবেই দেহে জ্বর আসে।
৬। গ্যামিটোসাইটঃ কিছু মেরোজয়েট যকৃত কোষ থেকে বের হওয়ার পর গ্যামিটোসাইটে পরিনত হয়। গ্যামিটোসাইট গুলো দুই ধরনের। মাইক্রোগ্যামিটোসাইট এবং ম্যাক্রোগ্যামিটোসাইট।
(i) মাইক্রোগ্যামিটোসাইটঃ মাইক্রোগ্যামিটোসাইট আকারে ছোট। এর ব্যাস ৯-১০ µm এবং সাইটোপ্লাজম হালকা নীল বর্ণের। এর কেন্দ্রস্থলে বৃহদাকার গোলাপী বর্ণের নিউক্লিয়াস অবস্থিত। এর নিউক্লিয়াস ছোট, ঘন এবং প্রান্তভাগে অবস্থিত।
(ii) ম্যাক্রোগ্যামিটোসাইটঃ ম্যাক্রোগ্যামিটোসাইট আকারে বড়। এর ব্যাস ১০-১২ µm এবং সাইটোপ্লাজম ঘন নীল বর্ণের।
পরিনত গ্যামিটোসাইট সৃষ্টি হতে ৯৬ ঘন্টা সময় লাগে। এ চক্রটি সম্পন্ন হতে ৪৮-৭২ ঘন্টা সময় লাগে।