ফরেনসিক জিনোম সিকোয়েন্সিং ।। DNA ফরেনসিক জিনোম সিকোয়েন্সিং

(i) পিতৃত্ব নির্ণয়ঃ জিনোম সিকোয়েন্সিং দ্বারা ভুমিষ্ঠ সন্তানের পিতা বা মাতা শনাক্ত করা হয়। সন্তান তার পিতা ও মাতার নিকট থেকে অর্ধেক করে ক্রোমোসোম লাভ করে। তাই সন্তানের DNA সিকোয়েন্স মাঝামাঝি বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে। এভাবে সন্তানের পিতৃত্ব নির্ণয় করা যায়।

(ii) অপরাধী শনাক্তকরণঃ জিনোম সিকোয়েন্সিং প্রয়োগের মাধ্যমে খুন বা ধর্ষণের সাথে জড়িত অপরাধীদের শনাক্ত করা যায়। ঘটনাস্থল থেকে  রক্তের ফোটা, চুল, দাঁত, নখ, সিমেন বা বীর্যরস, শরীরের খসে পড়া অংশ প্রভৃতি সংগ্রহ করা হয়। প্রাপ্ত নমুনার পরিমাণ খুব কম হলে PCR প্রক্রিয়ায় পরিমাণে বাড়িয়ে নেয়া হয়। এসব নমুনার জিনোম সিকোয়েন্সিং এর সাথে সন্দেহভাজন ব্যক্তির জিনোম সিকোয়েন্সিং মিলিয়ে দেখা হয়। এভাবে অপরাধী শনাক্ত করা যায়।

(iii) মৃতদেহ শনাক্তকরণঃ জিনোম সিকোয়েন্সিং করে বিকৃত মৃতদেহ শনাক্ত করা যায়।

(iv) ব্যক্তি শনাক্তকরণঃ জিনোম সিকোয়েন্স পরীক্ষা করে কোন ব্যক্তির দৈহিক গঠন, বৈশিষ্ট্য, বর্ণ প্রভৃতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

(v) শিশু সম্পর্কে ধারণাঃ শিশু ভুমিষ্ঠ হওয়ার আগেই ভ্রæণ থেকে নমুনা নিয়ে জিনোম সিকোয়েন্সিং করে শিশুটির ভবিষৎ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। শিশুটি লম্বা না খাটো, কালো না ফর্সা, দুর্বল না শক্তিশালী এবং আচার-আচরণ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

(vi) জীববৈচিত্র্য শনাক্তকরণঃ উদ্ভিদের জেনেটিক বৈচিত্র্য শনাক্ত করতে জিনোম সিকোয়েন্সিং প্রয়োগ করা হয়।

জিনোম সিকোয়েন্সিং ।। চিকিৎসক্ষেত্রে জিনোম সিকোয়েন্সিং

(i) অঙ্গ প্রতিস্থাপনঃ একজনের দেহ থেকে অন্যজনের দেহে হৃৎপিন্ড, ফুসফুস, কিডনী, চোখ প্রভৃতি প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে দাতা বা গ্রহীতার কোনো বিরুপ প্রভাব আছে কিনা জানা দরকার। DNA সিকোয়েন্সিং এর মাধ্যমে তা নির্ণয় করা হয়।

(ii) ঔষধের পাশর্^ প্রতিক্রিয়া রোধঃ ওষুধ মানব দেহে বিভিন্ন ধরনের পাশর্^ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। জিনোম সিকোয়েন্সিং এর মাধ্যমে ঔষধের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া রোধ করা যাবে।

(iii) ঔষধ তৈরীঃ এই পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট রোগের ঔষধ তৈরী করা যায়।

(iv) জিন থেরাপিঃ এই পদ্ধতির মাধ্যমে জিন থেরাপি দেওয়া যায়। জিন থেরাপি হলো আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি।

(v) ক্রটিপূর্ণ জিন শনাক্তঃ ক্রটিপূর্ণ জিন জীবের জন্য ক্ষতিকর। এই পদ্ধতিতে ক্রটিপূর্ণ জিন শনাক্ত করা হয়। এর পর ক্রটিপূর্ণ জিন অপসারণ করা হয়।

(vi) বংশগত রোগ নিরাময়ঃ জিনোম সিকোয়েন্সিং এর মাধ্যেমে হিমোফিলিয়া, মায়োটিক ডিস্ট্রফি, ফ্রাগাইল এক্স সিনড্রোম, নিউরোফাইব্রো ম্যাটোসিস-২ প্রভৃতি বংশগত রোগের কারণ জানা যায় এবং প্রতিরোধের ব্যবস্থা নেয়া যাবে।

(vii) অগ্রিম চিকিৎসাঃ এ প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন রোগের সমস্যা পূর্বেই জানা যাবে এবং রোগের অগ্রিম চিকিৎসা নেওয়া যাবে।

(viii) ক্যান্সার নিরাময়ঃ ক্যান্সার রোগের গবেষণা ও চিকিৎসায় জিনোম সিকোয়েন্সিং এর সফল প্রয়োগ রয়েছে। কোলন ক্যান্সার, স্তন্য ক্যান্সার, সোমাটিক ভেরিয়েশন ডিটেকশন, ট্রান্সক্রিপটোম সিকুয়েন্সিং, টিউমার ভাইরাস ডিটেকশন প্রভৃতি ক্যান্সার সংক্রান্ত গবেষণায় জিনোম সিকুয়েন্সিং প্রয়োগ করা হয়। বায়োইনফরমেটিক্সের মাধ্যমে ক্যান্সার গবেষণার বিভিন্ন বিষয় গবেষকদের মাঝে উপস্থাপন করা হচ্ছে।

(ix) রোগ শনাক্তকরণঃ কিছু রোগ শনাক্তকরণে জিনোম সিকোয়েন্সিং প্রয়োগ করা হয়। যেমন- ডাউন্স সিনড্রোম।

(x) স্বল্প সময়ে চিকিৎসাঃ জিনোম সিকোয়েন্সিং প্রয়োগ করে সঠিক রোগ নির্ণয় করা হচ্ছে। অল্প সময়ে ও কম খরচে সঠিক চিকিৎসার জন্য ব্যাপক গবেষণা চলছে।

(xi) রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নির্ণয়ঃ মানুষের সহজে রোগাক্রান্ত হওয়া এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম-বেশি হওয়ার কারণ নির্ণয় করা যাবে।

(xii) DNA অনুক্রমের পরিবর্তনঃ বিভিন্ন এক্স-রে সরাসরি প্রয়োগ করলে DNA অনুক্রমের কতটুকু পরিবর্তন করে তা জানা যায়।

(xiii) ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণঃ জিনোম সিকোয়েন্সিং প্রযুক্তি দ্বারা ডেঙ্গু রোগের বাহক Aedes মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়েছে। অক্সিটেক কোম্পানির গবেষকেরা জিন পরিবর্তন করে এক ধরনের মশার জাত সৃষ্টি করেছেন। এদের পুরুষ মশা বেঁচে থাকার মতো বংশধর সৃষ্টি করতে পারে না। ডিম থেকে লার্ভা বের হওয়ার পর পরই মারা যায়। এভাবে ব্রাজিলের কয়েকটি শহরে ৯০% মশা কমানো সম্ভব হয়েছে।

কোষে DNA-র অবস্থান

১। দেহ কোষেঃ মানুষের দেহকোষে ক্রোমোসোম থাকে। ক্রোমোসোমে DNA অবস্থান করে। মানুষের দেহকোষে ডিপ্লয়েড সংখ্যক ক্রোমোসোম থাকে।

২। জনন কোষেঃ মানুষের জননকোষে হ্যাপ্লয়েড ক্রোমোসোম থাকে। হ্যাপ্লয়েড ক্রোমোসোমে DNA থাকে। মানুষের জনন কোষের ক্রোমোসোমকে সেক্স ক্রোমোসোম বলে।

৩। রক্তেঃ রক্ত হলো তরল যোজক কলা। রক্ত পরীক্ষা করে DNA টেস্ট করা হয়।

৪। বীর্যেঃ প্রাণীদের বীর্যে DNA থাকে। বীর্য থেকে DNA শনাক্ত করা হয়।

৫। লালারসেঃ মানুষের লালারসে DNA থাকে। লালারস থেকে DNA শনাক্ত করা হয়।

৬। মুখের তরলেঃ মানুষের হাঁচি, কাঁশি ও থুথুতে DNA থাকে। এসব তরল থেকে DNA শনাক্ত করা হয়।

৭। হাড়েঃ হাড় হলো কঠিন যোজক কলা। এই যোজক কলায় DNA থাকে।

৮। চুলেঃ চুল থেকে DNA শনাক্ত করা হয়।

৯। নখেঃ হাত ও পায়ের নখ থেকে DNA শনাক্ত করা হয়।

জিনোম সিকুয়েন্সিং ।। জিনোম সিকুয়েন্সিং পদ্ধতি

জিনোম সিকোয়েন্সিং এর দুইটি পদ্ধতি হলো– Chemical degradation method এবং Chain termination method। ১৯৭৬ সালে A. Maxam I W. Gilbert  Chemical degradation method এবং ১৯৭৭ সালে F. Sanger I A.R. Coulsor Chain termination method আবিষ্কার করেন। জিনোম সিকোয়েন্সিং প্রক্রিয়া বর্ণনা করা হলো–

১। DNA অণুকে রিএজেন্ট সমৃদ্ধ করে ৪টি টেস্টটিউবে ভাগ করে নেওয়া হয়।

২। জেল ইলেক্টোফোরেসিস পদ্ধতিতে চারটি বিক্রিয়ায় প্রতিটিকে পৃথক করা হয়।

৩। রেডিওঅ্যাক্টিভ ব্যান্ড এর স্থান ও পরিমাণ (size) থেকে জিনোম সিকুয়েন্সিং নির্ণয় করা হয়।

৪। কম্পিউটারের সাহায্যে X-ray স্ক্যানার ব্যবহার করে ইলেক্টোফোরেসিস এর রেজাল্ট বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যা করা হয়।

জিনোম সিকোয়েন্সিং ।। জিনোম সিকোয়েন্সিং আবিষ্কার

জার্মান উদ্ভিদ বিজ্ঞানী হ্যান্স উনঙ্কলার (Hans Winkler, ১৯২০) সর্বপ্রথম জিনোম শব্দটি ব্যবহার করেন। ১৯৭৬ সালে সর্বপ্রথম MS-2 ভাইরাসের পূর্ণাঙ্গ জিনোম সিকোয়েন্সিং করা হয়। ১৯৭৭ সালে ফ্রেডরিক স্যাঙ্গার (Dr. F. Sanger) DNA-এর সিকুয়েন্সিং পদ্ধতির সূচনা ঘটান এবং প্রথম জীব হিসেবে ব্যাকটেরিওফায-এর জিনোম সিকোয়েন্স নির্ণয় করেন। ২০২০ সালে জিনোম সম্পাদনা পদ্ধতি আবিষ্কারের জন্য ফরাসি বিজ্ঞানী ইমানুয়েল কার্পেন্টার এবং মার্কিন বিজ্ঞানী জেনিফার এ. ডৌডানাকে রসায়নে নোবেল পুরষ্কার প্রদান করা হয়। তাদের প্রযুক্তির নাম হলো ক্রিসপার ক্যাস নাইল জেনেটিক সিজার্স।

DNA অণুর নিউক্লিওটাইডের নির্দিষ্ট অণুক্রমকে সিকোয়েন্স বলে। যে প্রক্রিয়ায় DNA-এর নিউক্লিওটাইড বা সিকোয়েন্স নির্ণয় করা হয় তাকে জিনোম সিকোয়েন্সিং বলা হয়। বাংলাদেশী বিজ্ঞানী ড. মাকসুদুল আলম এবং তাঁর সহযোগীরা তোষা পাটের জিনোম সিকুয়েন্সিং বা জীবনরহস্য উৎঘাটন করেছেন। পাটের বেস পেয়ার ১২ কোটি। Paris japonica-এর জিনোম উদ্ভিদজগতে দীর্ঘতম। এতে ১৫০ বিলিয়ন বেস পেয়ার থাকে। এর একটি কোষের জেনেটিক তথ্যের দৈর্ঘ্য ৩২৮ ফুট। অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ নুরুল ইসলাম এবং তাঁর সহযোগী দল RNAi পদ্ধতি ব্যবহার করে মুগ ডালের হলুদ মোজাইক ভাইরাসের জিনোম সিকুয়েন্সিং সম্পন্ন করেছেন। জিনোম সিকুয়েন্সিং এর প্রবর্তক হলো ড. সানজার (Dr. F. Sanger).

জিনোম সিকোয়েন্সিং ।। জিনোম সিকোয়েন্সিং কী ।। Genome sequencing কী

ক্রোমোসোমের একটি সেটকে জিনোম বলে। মানুষের দেহকোষে এক জোড়া জিনোম আছে। সহজভাবে, জীবকোষে অবস্থিত জিনের সমষ্টিকে জিনোম বলে। জিনোমকে কোষের মাস্টার ব্লু-প্রিন্ট বলা হয়। মানব জিনোমের সকল জিনে প্রায় তিন মিলিয়ন ক্ষারক জোড় থাকে।

ত্বকীয় ফিঙ্গার প্রিন্টিং অপেক্ষা DNA ফিঙ্গার প্রিন্টিং উন্নত

ত্বকীয় ফিঙ্গার প্রিন্টিং বা ডারমাটোগিøফিক্স পদ্ধতিতে ব্যক্তি এবং অপরাধী শনাক্ত করা যায়। প্লাস্টিক সার্জারির মাধ্যমে ত্বকের ফিঙ্গার প্রিন্টিং পরিবর্তন করা যায়। তাই এই পদ্ধতি ক্রটিপূর্ণ। কিন্তু DNA ফিঙ্গার প্রিন্টিং কোনো ভাবেই পরিবর্তন করা যায় না। ব্যক্তির দেহের যে কোন অংশের কোষ, কলা বা অঙ্গের DNA ফিঙ্গার প্রিন্টিং সর্বদা একই রকম হয়। তাই অপরাধী শনাক্তকরণে DNA ফিঙ্গার প্রিন্টিং সর্বশ্রেষ্ঠ।

ফিঙ্গার প্রিন্ট ।। DNA ফিঙ্গার প্রিন্ট এর গুরুত্ব

১। DNA ফিঙ্গার প্রিন্টিং এর মাধ্যমে যে কোন অপরাধী সুনিশ্চিত ভাবে চিহ্নিত করা যায়।

২। DNA ফিঙ্গার প্রিন্টিং খুনি, ধর্ষক, ডাকাত প্রভৃতি শনাক্তকরণে খুবই কর্যকরী।

৩। DNA ফিঙ্গার প্রিন্টিং দ্বারা শিশুর পিতৃত্ব নির্ণয় করা হয়।

৪। DNA ফিঙ্গার প্রিন্টের মাধ্যমে নিকট আত্মীয়দের মধ্যে সম্পর্ক নির্ণয় করা হয়।

৫। এই পদ্ধতির সাহায্যে জেনেটিক ডাটাব্যাংক ও জমি রেজিস্ট্রি করা হয়।

ফিঙ্গার প্রিন্ট ।। DNA ফিঙ্গার প্রিন্ট পদ্ধতি

জেল ইলেকট্রোফোরোসিস প্রক্রিয়ায় কোন জীবের DNA-এর ফটোগ্রাফিক বিন্যাস বা ছাপ তৈরী করাকে DNA finger print বা DNA profile বলে। DNA সংগ্রহ করে রেস্ট্রিকশন এনজাইম দ্বারা কয়েকটি খন্ড কেটে নেওয়া হয়। জেল ইলেকট্রোফোরোসিস প্রক্রিয়ায় জেল স্তরের উপর দিয়ে খন্ডগুলো চালনা করা হয়। উঘঅ খন্ডগুলো ক্রমান্বয়ে ছোট হয় এবং সারিবদ্ধ ব্যান্ড হিসেবে জমা হয়। ব্যান্ডগুলো থেকে ফটোগ্রাফিক বিন্যাস বা ছাপ পাওয়া যায়। একে DNA finger print বলে।

ফিঙ্গার প্রিন্টিং ।। DNA ফিঙ্গার প্রিন্টিং এর নমুনা সংগ্রহ

রক্তকণিকা (WBC), বীর্য, অস্থিমজ্জা, চুলের গোড়া, ত্বক, নখ, থুথু, লালারস, দেহের কোন অংশ প্রভৃতি নমুনা হিসেবে সংগ্রহ করা হয়। এসব কোষ DNA ফিঙ্গার প্রিন্টিং এর উৎস হিসেবে কাজ করে। DNA ফিঙ্গার প্রিন্টিং এর ১ মাইক্রোগ্রাম কলা প্রয়োজন হয়।