রিকম্বিন্যান্ট DNA ।। পতঙ্গরোধী উদ্ভিদ সৃষ্টিতে রিকম্বিন্যান্ট DNA এর ভূমিকা

(i) Bacillus ব্যাকটেরিয়া থেকে একটি জিন নিয়ে আমেরিকান তুলা গাছে প্রবেশ করিয়ে ট্রান্সজেনিক তুলা গাছ তৈরী করা হয়েছে। এই ট্রান্সজেনিক তুলা গাছে এক প্রকার বিষাক্ত প্রোটিন উৎপন্ন হয়। এ কারণে পোকার আক্রমণ ঘটে না। ফলে তুলার উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। সেই সঙ্গে উৎপাদন ব্যয় কমেছে এবং পরিবেশ দুষণ রোধ হয়েছে।
(ii) বর্তমানে আলু, আপেল, তুলা, গম প্রভৃতি পতঙ্গরোধী উদ্ভিদ উদ্ভাবন করা হয়েছে। এসব উদ্ভিদে Bt toxin জিন এবং CpTi জিন স্থাপন করা হয়েছে। পোকা এসব উদ্ভিদের পাতা ভক্ষণ করলে ২৪ ঘন্টার মধ্যে মারা যায়।
(iii) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি শুঁয়াপোকা নিরোধক তুলার বীজ উৎপন্ন করেছে। এর ফলে তুলা চাষে কীটজনিত অসুবিধা দূর হয়েছে।
(iv) Bacillus thuringiensis ব্যাকটেরিয়া থেকে ক্রাই (cry) জিন পৃথক করে উদ্ভিদে প্রবেশ করিয়ে পতঙ্গ প্রতিরোধী উদ্ভিদ সৃষ্টি করা হয়েছে। Bt বেগুন, Bt তুলা, Bt রাইস, Bt কর্ণ, Bt আলু, Bt আপেল প্রভৃতি ট্রান্সজেনিক উদ্ভিদ পতঙ্গ প্রতিরোধী।
(v) ইউরোপিয়ান কর্নবোরা মথের লার্ভার আক্রমণে ভূট্রার ব্যাপক ক্ষতি হয় এবং ফলন ৪০% কমে যায়। ব্যাকটেরিয়া থেকে বিষাক্ত প্রোটিন উৎপাদনকারী জিন ভূট্রা গাছে প্রবেশ করিয়ে ট্রান্সজেনিক ভূট্রা সৃষ্টি করা হয়েছে। এই ভূট্রা কর্নবোরা দ্বারা আক্রান্ত হয় না। এখন ভূট্রা চাষে কীটনাশক প্রয়োগ করতে হয় না। এতে ভূট্রার ফলন বৃদ্ধি পেয়েছে, উৎপাদন খরচ কমেছে এবং পরিবেশ দূষণ রোধ হয়েছে।
(vi) Bacillus thuringiensis ব্যাকটেরিয়া থেকে বিষাক্ত পদার্থ উৎপন্নকারী জিন নিয়ে Rhyzobium-এ প্রবেশ করানো হয়েছে। Rhyzobium শিম জাতীয় উদ্ভিদের মূলে নডিউল বা অর্বুদ সৃষ্টি করে। নডিউল বা অর্বুদ যুক্ত শিম উদ্ভিদ উইভিল জাতীয় ক্ষতিকারক পতঙ্গের আক্রমণ রোধ করতে পারে।
(vii) Bacillus thuringiensis ব্যাকটেরিয়া থেকে জিন নিয়ে তুলা গাছে প্রবেশ করিয়ে Bt toxin জিন সৃষ্টি করা হয়েছে। Bt toxin জিন বিশিষ্ট তুলা গাছ ভক্ষণ করে লেপিডোপটেরা, বিটল, মাছি, মশা প্রভৃতি পতঙ্গ মারা গিয়েছে।
(viii) স্টেরাইল ইনসেক্ট টেকনিক (SIT) একটি আধুনিক পদ্ধতি। এটি একটি পরিবেশ বান্ধব ক্ষতিকর পতঙ্গ নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে ক্ষতিকর পতঙ্গের পুরুষগুলোকে বন্ধ্যা করে দেওয়া হয়। ফলে নতুন প্রজন্ম বিকশিত হয় না। ব্রাজিল, জাপান, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র প্রভৃতি দেশে এই প্রযুক্তি ব্যবহার হচ্ছে।

রিকম্বিন্যান্ট DNA ।। উচ্চ ফলনশীল জাত সৃষ্টিতে রিকম্বিন্যান্ট DNA এর ভূমিকা

বন্য প্রজাতি থেকে কাক্সিক্ষত জিন নিয়ে ফসলী উদ্ভিদে প্রবেশ করিয়ে উচ্চ ফলনশীল জাত সৃষ্টি করা হয়েছে। ড্যাফোডিল উদ্ভিদ থেকে বিটা ক্যারোটিন ও আয়রন উৎপন্নকারী জিন নিয়ে ধান, গম, ভূট্রা, সয়াবিন, আলু, টমেটো, পেঁপে, রাই, সূর্যমুখী, নাসপাতি, আঙ্গুর প্রভৃতি উদ্ভিদে প্রবেশ করিয়ে উচ্চ ফলনশীল জাত সৃষ্টি করা হয়েছে।

ট্রান্সফর্মেশন ।। ভেক্টর ট্রান্সফর্মেশন প্রক্রিয়া ।। Vector process

(i) রিকম্বিন্যান্ট DNA-কে পোষক Agrobacterium tumefaciens কোষে প্রবেশ করানো হয়। পরে জিনসহ উদ্ভিদ কোষে প্রবেশ করানো হয়।

(ii) কাংক্ষিত জিনসহ TMV-এর RNA-কে তামাক গাছে প্রবেশ করানো হয়।

ট্রান্সফর্মেশন ।। রাসায়নিক ট্রান্সফর্মেশন প্রক্রিয়া ।। Chemical process

(i) ক্যালসিয়াম ক্লোরাইড (Calcium chloride) ঃ প্রথমে কোষকে ঠান্ডা CaCl2 দ্রবণে ইনকিউবেট করা হয় এবং হিট-শক দিয়ে পোষক কোষে রিকম্বিন্যান্ট DNA প্রবেশ করানো হয়

(ii) লাইপোসোম (Liposome)ঃ প্রথমে কৃত্রিম ভেসিকলের সাথে রিকম্বিন্যান্ট DNA-কে সম্পৃক্ত করা হয়। পরে কোষঝিল্লির সাথে ভেসিকলকে সংযুক্ত করা হয়। এরপর রিকম্বিন্যান্ট DNA-কে পোষক কোষে প্রবেশ করানো হয়।

লাইপোসোম কী ।। Liposome কী

প্রথমে কৃত্রিম ভেসিকলের সাথে রিকম্বিন্যান্ট DNA-কে সম্পৃক্ত করা হয়। পরে কোষঝিল্লির সাথে ভেসিকলকে সংযুক্ত করা হয়। এরপর রিকম্বিন্যান্ট DNA-কে পোষক কোষে প্রবেশ করানো হয়

ট্রান্সফরমেশন ।। ভৌত ট্রান্সফরমেশন প্রক্রিয়া ।। Transformation

(i) ইলেকট্রোপোরেশন (Electroporation)ঃ ইলেকট্রিক ক্ষেত্র দ্বারা পোষকের কোষঝিল্লিতে ছিদ্র তৈরী করা হয়। এই ছিদ্রের মধ্য দিয়ে রিকম্বিন্যান্ট DNA-কে পোষক কোষে প্রবেশ করানো হয়।

(ii) মাইক্রো-ইনজেকশন (Micro-injection)ঃ একটি মাইক্রোপিপেট দিয়ে পোষক কোষকে ধরে রাখা হয় এবং অপর একটি অতিসুক্ষ্ম সুঁই দিয়ে রিকম্বিন্যান্ট DNA-কে পোষক কোষে প্রবেশ করানো হয়।

(iii) বায়োলিস্টিকস্ (Biolistics)ঃ কোন ধাতব পিন্ডের (স্বর্ণের) উপরিতলে রিকম্বিন্যান্ট DNA-কে বসিয়ে সেই পিন্ডকে গানশট (Gunshot) করে উদ্ভিদ কোষে প্রবেশ করানো হয়।

বায়োলিস্টিকস্ কী ।। Biolistics কী

কোন ধাতব পিন্ডের (স্বর্ণের) উপরিতলে রিকম্বিন্যান্ট DNA-কে বসিয়ে সেই পিন্ডকে গানশট (Gunshot) করে উদ্ভিদ কোষে প্রবেশ করানো হয়।

মাইক্রো-ইনজেকশন কী ।। Micro-injection কী

একটি মাইক্রোপিপেট দিয়ে পোষক কোষকে ধরে রাখা হয় এবং অপর একটি অতিসুক্ষ্ম সুঁই দিয়ে রিকম্বিন্যান্ট DNA-কে পোষক কোষে প্রবেশ করানো হয়।

ইলেকট্রোপোরেশন কী ।। Electroporation কী

ইলেকট্রিক ক্ষেত্র দ্বারা পোষকের কোষঝিল্লিতে ছিদ্র তৈরী করা হয়। এই ছিদ্রের মধ্য দিয়ে রিকম্বিন্যান্ট DNA-কে পোষক কোষে প্রবেশ করানো হয়।

রিকম্বিন্যান্ট DNA প্রযুক্তি ।। রিকম্বিন্যান্ট DNA প্রযুক্তির ধাপসমুহ বর্ণনা

১। কাঙিক্ষত DNA নির্বাচন ও পৃথকীকরণ (Terget DNA selection)ঃ প্রথমে কাঙিক্ষত DNA নির্বাচন করা হয়। কাক্সিক্ষত DNA নির্বাচনের সময় লক্ষ্য রাখতে হবে উহা যেন সুস্থ, সবল, রোগমুক্ত ও উন্নত জাতের হয়। নির্বাচিত কোষকে প্রথমে সামান্য লাইসিস করা হয়। লাইসোজাইম (ব্যাকটেরিয়া কোষ), কাইটিনেজ (ছত্রাক কোষ), সেলুলেজ (উদ্ভিদ কোষ) প্রভৃতি এনজাইম ব্যবহার করে কোষের আবরণী নষ্ট করা হয়। এরপর লাইসিস করা কোষকে সেন্টিফিউজ টেস্টটিউবে ঢুকানো হয়। সেন্টিফিউজ টেস্ট টিউবে পরিমাণ মত সিজিয়াম ক্লোরাইড দ্রবণ প্রবেশ করানো হয়। অতঃপর দ্রবণটিকে সেন্টিফিউজ করা হয়। ফলে টেস্ট টিউবের গায়ে DNA এর একটি ব্যান্ড তৈরী হয়। DNA এর সাথে অন্যান্য উপাদান মিশে হোমোজিনেট তৈরী হয়। প্রোটিয়েজ (প্রোটিন), রাইবোনিউক্লিয়েজ (RNA), অ্যামাইলেজ (শর্করা), লাইপেজ (ফ্যাট) প্রভৃতি এনজাইম ব্যবহার করে হোমোজিনেট থেকে DNA–কে পৃথক করা হয়। পরে বিশুদ্ধ DNA–কে ঠান্ডা ইথানল দ্রবণে ডুবিয়ে সুতার মতো অধঃক্ষিপ্ত করা হয়। অধঃক্ষিপ্ত DNA থেকে কাক্সিক্ষত  DNA নির্বাচন করা হয়।

২। বাহক নির্বাচন (Host selection)ঃ কাক্সিক্ষত DNA এর প্রয়োজনীয় অংশ বহন করার জন্য বাহক নির্বাচন করা হয়। এ ক্ষেত্রে Agrobacterium tumefaciens নামক ব্যাকটেরিয়া উত্তম বাহক হিসেবে কাজ করে। এই ব্যাকটেরিয়ার সাইটোপ্লাজমে অবস্থিত প্লাজমিড DNA এর সাথে কাক্সিক্ষত DNA এর প্রয়োজনীয় অংশ সংযুক্ত করে দেয়া হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কসমিড, ফাজমিড, কৃত্রিম ক্রোমোজোম প্রভৃতি বাহক ব্যবহার হয়।

৩। কাংক্ষিত DNA কে নির্দিষ্ট স্থানে ছেদনঃ রেস্ট্রিকশন এনজাইম প্রয়োগ করে কাংক্ষিত DNA হতে অনেকগুলো অংশ কেটে নেয়া হয়। একই এনজাইম ব্যবহার করে বাহক প্লাজমিড DNA হতেও অনুরুপ অংশ কেটে ফেলা হয়। এই প্রক্রিয়াকে Restriction digestion বলা হয়। রেস্ট্রিকশন এনজাইম দ্বিসূত্রী DNA কে খন্ডিত করে একসূত্রী প্রান্ত সৃষ্টি করে। একে আঠালো প্রান্ত বা Sticky end বলা হয়।

৪। কাংক্ষিত DNA অণুকে বাহক প্লাজমিড DNA অণুতে স্থাপনঃ জেল ইলেকট্রোফোরেসিস পদ্ধতিতে DNA খন্ডগুলো থেকে কাক্সিক্ষত খন্ড পৃথক করা হয়। পরে সাউদার্ন ব্লটিং পদ্ধতিতে কাংক্ষিত DNA খন্ডটি নাইলন পর্দায় তোলা হয়। এরপর তেজস্ক্রিয় প্রোব প্রয়োগ করে প্রয়োজনীয় জিন শনাক্ত করা হয়। শনাক্তকৃত DNA–কে লাইগেজ এনজাইম দিয়ে প্লাজমিড DNA এর সাথে সংযুক্ত করা হয়। কাংক্ষিত DNA–কে বাহক প্লাজমিড DNA এর সাথে সংযুক্তকরণের ফলে রিকম্বিন্যান্ট DNA তৈরী হয়ে যায়।

৫। রিকম্বিন্যান্ট DNA–কে পোষক দেহে প্রবেশ করানোঃ রিকম্বিন্যান্ট DNA–কে বহন করার জন্য পোষক নির্বাচন করা হয়। এ ক্ষেত্রে E. coli ব্যাকটেরিয়া পোষক হিসেবে কাজ করে। পোষক কোষে রিকম্বিন্যান্ট DNA প্রবেশ করিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু স্বাভাবিক অবস্থায় ব্যাকটেরিয়া অন্য প্লাজমিড গ্রহণ করে না। ব্যাকটেরিয়া যে কালচার মিডিয়ামে জন্মে সেই আবাদ মাধ্যমে তাপ প্রয়োগ ও ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ করে উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করলে ব্যাকটেরিয়া অন্য প্লাজমিড গ্রহণ করে। ব্যাকটেরিয়ার কোষে রিকম্বিন্যান্ট DNA প্রবেশ করানোর প্রক্রিয়াকে ট্রান্সফরমেশন বলে। এছাড়া কনজুগেশন, মাইক্রোইনজেকশন, লাইপোজোম, ইলেক্ট্রোপোরেশন প্রভৃতি মাধ্যমে পোষক কোষে রিকম্বিন্যান্ট DNA প্রবেশ করানো হয়।

৬। রিকম্বিন্যান্ট DNA–এর বহিঃপ্রকাশ মুল্যায়ন ঃ রিকম্বিন্যান্ট DNA তৈরীর কাজটি সঠিক ভাবে হয়েছে কিনা তা পরীক্ষা করে দেখা হয়। এই পরীক্ষাটি জেনেটিক প্রোব পদ্ধতিতে করা হয়। এ প্রক্রিয়ায় প্লাজমিড DNA-এর Selectable marker ব্যবহার করা হয়। রিকম্বিন্যান্ট DNA–তে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জিন প্রবেশ করে দেয়া হয়। এরপর পোষক ব্যাকটেরিয়াকে কালচার মিডিয়ামে আবাদ করা হয়। যে সব ব্যাকটেরিয়ায় অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জিন প্রবেশ করানো হয়েছিল সেগুলো কালচার মিডিয়ামে জন্মে এবং কলোনী গঠন করে। এ থেকে বুঝা যায়, রিকম্বিন্যান্ট উঘঅ তৈরীর কাজটি সঠিক হয়েছে।

৭। রিকম্বিন্যান্ট DNA কে উদ্ভিদ দেহে প্রবেশ করানোঃ প্রস্তুতকৃত রিকম্বিন্যান্ট DNA–কে টিস্যু কালচার প্রক্রিয়ায় কাক্সিক্ষত উদ্ভিদ দেহে প্রবেশ করানো হয়। পরে ঐ কোষ থেকে নতুন উদ্ভিদ পাওয়া যায়। এরুপ উদ্ভিদকে ট্রান্সজেনিক উদ্ভিদ বলে।