মাইটোসিস ঘটে জীবের দেহকোষে। দেহকোষে ডিপ্লয়েড সংখ্যক ক্রোমোসোম থাকে। এই প্রক্রিয়ায় একটি কোষ থেকে দুইটি কোষ সৃষ্টি হয়। মাইটোসিস প্রক্রিয়ায় কোষের নিউক্লিয়াস এবং ক্রোমোসোম উভয়ই একবার বিভাজিত হয়। সৃষ্ট অপত্য কোষ মাতৃকোষের অনুরুপ হয়। অপত্য কোষের ক্রোমোসোম সংখ্যা মাতৃকোষের ক্রোমোসোম সংখ্যার সমান হয়। তাই মাইটোসিসকে সমীকরণিক বিভাজন বলা হয়।
Category: Biology Second Paper Lecture Sheet
মাইটোসিস কোষ বিভাজনের কারণ ।। Causes of Mitosis cell division
১। দেহের কোন স্থানে ক্ষত সৃষ্টি হলে তা পূরণের জন্য মাইটোসিস কোষ বিভাজন ঘটে।
২। কোষে নিউক্লিয়াসের চেয়ে সাইটোপ্লাজমের পরিমাণ বেশি হলে মাইটোসিস কোষ বিভাজন ঘটে।
৩। কোষে DNA এর পরিমাণ বেশি হলে মাইটোসিস কোষ বিভাজন ঘটে।
৪। কোষে প্রোটিন সংশ্লেষণ ঘটলে মাইটোসিস কোষ বিভাজন ত্বরান্বিত হয়।
৫। কোষে DNA-এর চেয়ে RNA-এর পরিমাণ বেশি হলে মাইটোসিস কোষ বিভাজন ঘটে।
৬। সাইটোকাইনিন, স্টেরয়েড, লিম্ফোকাইন, EGF, PDGF প্রভৃতির কারণে কোষ বিভাজন ঘটে।
৭। কোষের সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য মাইটোসিস কোষ বিভাজন ঘটে।
৮। কোষের আয়তন বৃদ্ধির জন্য মাইটোসিস কোষ বিভাজন ঘটে।
৯। কোষে বিভিন্ন ধরনের বিপাক ক্রিয়া ঘটে। বিপাক ক্রিয়া সম্পাদনের জন্য কোষ বিভাজন আবশ্যক।
১০। কোষ বিভাজনের মাধ্যমে নিউক্লিও-সাইটোপ্লাজমিক অনুপাত বজায় থাকে।
মাইটোসিস কোথায় ঘটে
১। সকল ভ্রƒণকোষ মাইটোসিস প্রক্রিয়ায় বিভাজিত হয়ে বহুকোষী জীবে পরিনত হয়।
২। জীবদেহের বিভিন্ন অঙ্গের বিকাশ ও বৃদ্ধি মাইটোসিস প্রক্রিয়ায় ঘটে।
৩। বহুকোষী জীবের সকল অঙ্গের বিভাজন মাইটোসিসের মাধ্যমে ঘটে।
৪। বর্ধনশীল উদ্ভিদের কান্ডের অগ্রভাগে, মূলের অগ্রভাগে, ভ্রুণমূলে, পুষ্পমুকুলে, অগ্রমুকুলে, বর্ধনশীল পাতায়, ক্যাম্বিয়াম প্রভৃতি অঞ্চলে মাইটোসিস ঘটে।
৫। জননাঙ্গের গঠন ও বৃদ্ধিতে মাইটোসিস ঘটে।
মাইটোসিস কোষ বিভাজনের বৈশিষ্ট্য ।। Characteristics of Mitosis cell division
১। মাইটোসিস কোষ বিভাজন ঘটে জীবের দেহ কোষে।
২। ইহা হ্যাপ্লয়েড, ডিপ্লয়েড ও পলিপ্লয়েড কোষে ঘটে।
৩। এ প্রক্রিয়ায় প্রতিটি মাতৃকোষ হতে দুটি করে অপত্য কোষ সৃষ্টি হয়।
৪। এ প্রক্রিয়ায় কোষের নিউক্লিয়াস ও ক্রোমোসোম একবার বিভাজিত হয়।
৫। সৃষ্ট অপত্য কোষের ক্রোমোসোম সংখ্যা মাতৃকোষের ক্রোমোসোম সংখ্যার সমান হয়।
৬। জীবদেহের ক্ষতস্থান পুরণ ও প্রয়োজনীয় কোষ পুনরুৎপাদন মাইটোসিস কোষ বিভাজনের মাধ্যমে হয়।
৭। এককোষী ও বহুকোষী সকল জীবে মাইটোসিস কোষ বিভাজন ঘটে।
৮। এই প্রক্রিয়ায় প্রথমে নিউক্লিয়াস এবং পরে সাইটোপ্লাজমের বিভাজন ঘটে।
৯। জীবদেহের বিভিন্ন অঙ্গের বিকাশ ও বৃদ্ধি মাইটোসিস প্রক্রিয়ায় ঘটে।
১০। জননাঙ্গের গঠন ও বৃদ্ধিতে মাইটোসিস ঘটে।
১১। সাইটোকাইনিন, স্টেরয়েড, লিম্ফোকাইন, EGF, PDGF প্রভৃতির কারণে মাইটোসিস ঘটে।
১২। মাইটোসিস প্রক্রিয়ায় কোষের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়।
১৩। মাইটোসিস কোষের আয়তন বৃদ্ধি ঘটায়।
মাইটোসিস কোষ বিভাজন আবিষ্কার ও নামকরণ
১৯৭৩ সালে বিজ্ঞানী স্ট্রাসবুর্গার (Strasburger) সর্বপ্রথম একটি নিউক্লিয়াস থেকে অপত্য নিউক্লিয়াস সৃষ্টির ঘটনা পর্যবেক্ষণ করেন। ১৮৭৩ সালে পোল্যান্ডের বিজ্ঞানী ওয়াকলাও মাইজেল (Waclaw Mayzel) ব্যাঙ, খরগোশ ও বিড়ালের কর্ণিয়ার কোষ বিভাজন লক্ষ্য করেন এবং ১৮৭৫ সালে তা বর্ণনা করেন। ১৮৫৫ সালে বিজ্ঞানী রুডলফ ভিরচাও (Rudolf Virchow) সর্বপ্রথম ব্যাখ্যা করেন যে, পূর্ববর্তী কোষ থেকে বিভাজনের মাধ্যমে নতুন কোষ সৃষ্টি হয়। ১৮৭৯ সালে বিজ্ঞানী স্লাইডার মাইটোসিস প্রক্রিয়ার পূর্ণ বিবরণ দেন। ১৮৮২ সালে বিজ্ঞানী ওয়াল্টার ফ্লেমিং (Walter Fleming) এর নামকরণ করেন মাইটোসিস। ১৯৬০ সালে ককরাম এবং ম্যাক-ক্লাউলেই (Cockraum & Mac-Caulay) মাইটোসিস কোষ বিভাজনের রাসায়নিক প্রকৃতি ব্যাখ্যা করেন। বিজ্ঞানী হুইটম্যান (Walter Whitman) সাইটোপ্লাজমের বিভাজনকে সাইটোকাইনেসিস নামে অ্যাখ্যায়িত করেন।
মাইটোসিস বা সমীকরণিক কোষ বিভাজন ।। Mitosis cell division
গ্রীক শব্দ Mitos অর্থ মোচড়ানো সূতা থেকে Mitosis শব্দটি এসেছে। যে প্রক্রিয়ায় প্রকৃত কোষের নিউক্লিয়াস ও সাইটোপ্লাজম বিভাজিত হয়ে দুইটি অপত্য কোষ সৃষ্টি করে এবং সৃষ্ট অপত্য কোষের ক্রোমোসোম সংখ্যা মাতৃকোষের ক্রোমোসোম সংখ্যার সমান হয় তাকে মাইটোসিস বলে। এ প্রক্রিয়ায় সৃষ্ট অপত্য কোষের ক্রোমোসোম সংখ্যা ও গুণাগুণ মাতৃকোষের অনুরুপ হয় বলে একে সমীকরণিক বা ইক্যুয়েশনাল বিভাজন বলা হয়।
অ্যামাইটোসিস ।। প্রত্যক্ষ কোষ বিভাজন ।। Amitosis
গ্রিক শব্দ a অর্থ না, mito অর্থ সূতা এবং osis অর্থ দশা নিয়ে Amitosis শব্দটি গঠিত। যে প্রক্রিয়ায় একটি কোষ কোন জটিল মাধ্যম ছাড়াই সরাসরি দুইটি অপত্য কোষ সৃষ্টি করে তাকে অ্যামাইটোসিস বলে। ১৮৮২ সালে ওয়াল্টার ফ্লেমিং (Walter Flemming) অ্যামাইটোসিস শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন। ১৯৫৫ সালে বিজ্ঞানী রিমাক (Remak) সর্বপ্রথম মুরগির ভ্রুণের লোহিত রক্তকণিকায় অ্যামাইটোসিস কোষ বিভাজন প্রত্যক্ষ করেন। ব্যাকটেরিয়া, ঈস্ট, অ্যামিবা, নস্টক, মেরুদন্ডী প্রাণীর তরুণাস্থি, ভ্রুণঝিল্লি, বীজের এন্ডোস্পার্ম প্রভৃতি কোষে অ্যামাইটোসিস ঘটে।
অ্যামাইটোসিস কোষ বিভাজন প্রক্রিয়া (Amitosis Process)ঃ অ্যামাইটোসিসের শুরুতে কোষ খাদ্য গ্রহণ করে আকারে বড় হয়। এর নিউক্লিয়াসও বড় হয়। নিউক্লিয়াসটি বৃদ্ধি পেয়ে ডাম্বেলের মতো আকার ধারণ করে। কোষের সাইটোপ্লাজম ভিতরের দিকে ভাঁজ হয়ে যায়। এরপর নিউক্লিয়াসটি দুটি খন্ডে পরিনত হয়। সাইটোপ্লাজমের ভাঁজ আরও ভিতরে প্রবেশ করে। পরে সাইটোপ্লাজম নিউক্লিয়াসসহ দুটি কোষে পরিনত হয়
অ্যামাইটোসিসের তাৎপর্য
১। অ্যামাইটোসিস হলো সরল কোষ বিভাজন প্রক্রিয়া।
২। এই প্রক্রিয়া থেকে জটিল ও উন্নত কোষ বিভাজনের উৎপত্তি হয়েছে।
৩। ইহা দ্রুত কোষের সংখ্যা বৃদ্ধি করে।
৪। নিম্নশ্রেণীর জীব এই পদ্ধতিতে সংখ্যা বৃদ্ধি করে।
কোষ বিভাজনের কারণ ।। Causes of cell division
১। মাইটোজেনঃ যে সব পদার্থ কোষ বিভাজনে উদ্দীপনা সৃষ্টি করে তাকে মাইটোজেন বলে। সাইটোকাইনিন উদ্ভিদ কোষ বিভাজনে উদ্দীপনা সৃষ্টি করে। স্টেরয়েড, লিম্ফোকাইন, EGF (Epidermal growth factor), PDGF (Platelet derived growth factor) প্রভৃতি প্রাণিকোষ বিভাজনে উদ্দীপনা সৃষ্টি করে। এসব রাসায়নিক উপাদানের কারণে কোষ বিভাজন ঘটে।
২। জিন নিয়ন্ত্রণঃ কোষ বিভাজন হলো একটি জিন নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া। নিউক্লিয়াসে DNA-এর পরিমাণ দ্বিগুণ হলেই কোষ বিভাজন শুরু হয়।
৩। কোষের সংখ্যা বৃদ্ধিঃ কোষের সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য কোষ বিভাজিত হয়। কোষ বিভাজিত না হলে কোষের সংখ্যা বৃদ্ধি পায় না।
৪। কোষের আয়তন বৃদ্ধিঃ কোষের আয়তন বৃদ্ধির জন্য কোষ বিভাজন ঘটে। কোষ বার বার বিভাজিত হয়ে কোষের আয়তন বৃদ্ধি করে।
৫। কোষের বিপাকঃ কোষে বিভিন্ন ধরনের বিপাক ক্রিয়া ঘটে। বিপাক ক্রিয়া সম্পাদনের জন্য কোষ বিভাজন আবশ্যক।
৬। নিউক্লিও-সাইটোপ্লাজমিক অনুপাতঃ কোষ বিভাজনের মাধ্যমে নিউক্লিও-সাইটোপ্লাজমিক অনুপাত বজায় থাকে।
কোষচক্র নিয়ন্ত্রণে চেক পয়েন্ট ।। নির্ধারক বিন্দুর ভূমিকা
কোষচক্রের যে নির্দিষ্ট স্থানে কোষের বিভাজন বন্ধ হয়ে যায় তাকে চেক পয়েন্ট বা নির্ধারক বিন্দু বলে। কোষচক্রের চেক পয়েন্ট গুলো হলো-
১। G1/S চেক পয়েন্টঃ কোষ বিভাজনের উপযুক্ত না হলে এবং কোষের DNA ক্ষতিগ্রস্ত হলে G1/S চেক পয়েন্টে কোষচক্র বন্ধ হয়ে যায়। কোষটি G1 দশা থেকে S দশায় প্রবেশ করতে পারে না। এখানে কোষের আকৃতি, কোষের হরমোন এবং DNA ক্ষতিগ্রস্ত কিনা তা চেক করা হয়।
২। G2/M চেক পয়েন্টঃ কোষের ক্ষতিগ্রস্ত DNA মেরামত না হলে এবং DNA-এর ডুপ্লিকেশন সম্পন্ন না হলে G2/M চেক পয়েন্টে কোষচক্র বন্ধ হয়ে যায়। কোষটি G2 দশা থেকে M দশায় প্রবেশ করতে পারে না। এখানে কোষ ও নিউক্লিয়াসের আয়তন এবং DNA ক্ষতিগ্রস্ত কিনা তা চেক করা হয়।
৩। M চেক পয়েন্টঃ কোষের স্পিন্ডল তন্তুর গঠন সম্পূর্ণ না হলে এবং কাইনেটোকোরের সাথে বেম তন্তু (Beam fiber) সঠিকভাবে যুক্ত না হলে M চেক পয়েন্টে কোষচক্র বন্ধ হয়ে যায়। ফলে মাইটোসিস প্রক্রিয়া ঘটে না।
কোষচক্র নিয়ন্ত্রণ ।। Regulation of cell cycle
১। সাইক্লিন-Cdk যৌগঃ কোষের ভিতরে সাইক্লিন- cdk যৌগ কোষচক্রের বিভিন্ন দশার পরিবর্তন নিয়ন্ত্রণ করে।
২। সাইক্লিন- Cdk-MPFঃ যে কোষ বিভাজিত হবে তার সাইক্লিন- cdk যৌগের সাথে MPF যুক্ত হয়ে কোষচক্র শুরুর নির্দেশ প্রদান করে।
৩। P53 প্রোটিনঃ কোন কারণে DNA ক্ষতিগ্রস্ত হলে P53 প্রোটিন কোষচক্র বন্ধ করে দেয়। DNA ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে P53 প্রোটিন অ্যাপোপটোসিস ক্রিয়ায় কোষের মৃত্যু ঘটায়।
৪। P27 প্রোটিনঃ P27 প্রোটিন সাইক্লিন- cdk যৌগের সাথে যুক্ত হয়ে কোষকে সংশ্লেষ দশায় প্রবেশে বাধা দেয়। কোষে উচ্চ মাত্রায় P27 প্রোটিন মহিলাদের স্তন ক্যান্সার সৃষ্টি করে।
৫। সাইক্লিনঃ কোষচক্রের নিয়ন্ত্রক হলো সাইক্লিন প্রোটিন। Timothy Hunt (1982) সাইক্লিন প্রোটিন আবিষ্কার করেন। এজন্য Timothy Hunt, Lee Hartwell ও Paul Nurse-কে ২০০১ সালে নোবেল পুরষ্কার দেয়া হয়। মানুষের কোষে চার প্রকার সাইক্লিন থাকে।
(i) সাইক্লিন- Dঃ সাইক্লিন-D কোষকে G1 থেকে S পর্যায়ে এবং S পর্যায় থেকে G2 পর্যায়ে নিয়ে যায়।
(ii) সাইক্লিন- Eঃ সাইক্লিন-E কোষকে S পর্যায়ে DNA রেপ্লিকেশনের জন্য প্রস্তুত করে।
(iii) সাইক্লিন-Aঃ সাইক্লিন-A কোষের S পর্যায়ে DNA রেপ্লিকেশন সক্রিয় ও ত্বরান্বিত করে।
(iv) সাইক্লিন-Bঃ সাইক্লিন-B মাইটোসিস প্রক্রিয়ার জন্য স্পিন্ডলতন্তু তৈরী এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজ করে।