কার্বোহাইড্রেট জাতক ।। উৎপাদিত শর্করা ।। ডেরিভেটিভ শ্বেতসার ।। Carbohydrate derivatives

কার্বোহাইড্রেট থেকে যে সব নতুন পদার্থ উৎপন্ন হয় তাদেরকে ডেরিভেটিভস্ বলে। কার্বোহাইড্রেট জাতক হলো চিনি জাতীয় উপাদান এবং অধিকাংশই প্রাকৃতিক। কয়েকটি কার্বোহাইড্রেট জাতক হলো-

১। স্যাকারিন বা সুইট-এন-লোঃ স্যাকারিন বা সুইট-এন-লো একটি আদিম কৃত্রিম মিষ্টান্ন। ইহা চিনির চেয়ে ৩০০ গুণ মিষ্টি।

২। গ্লুকোসামিনঃ গ্লুকোসামিন মানবদেহের সুপরিচিত অ্যামিনো শ্যুগার। ইহা গ্লাইকোস্যালেটিড লিপিড ও প্রোটিন উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়। ইহা পলিমার হয়ে কাইটিন গঠন করে। ছত্রাক ও সন্ধিযুক্ত প্রাণীতে কাইটিন থাকে।

৩। গ্যালাক্টোসামিনঃ গ্যালাক্টোসামিন কোষ থেকে কোষে আন্তঃক্রিয়ায় ভূমিকা রাখে। ইহা তরুণাস্থির প্রধান দ্রব্য।

৪। গ্যালাক্টোসামিন অ্যাডিনোসিনঃ গ্যালাক্টোসামিন অ্যাডিনোসিন DNA ও RNA-এর গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

৫। শ্যুগার অ্যালকোহলঃ শ্যুগার অ্যালকোহল মিষ্টি জাতীয় পদার্থ। ডায়াবেটিস রোগীরা চিনির পরিবর্তে এটি ব্যবহার করে।

৬। অ্যামিনো শ্যুগার হেপারিনঃ অ্যামিনো শ্যুগার হেপারিন একটি দানাদার পদার্থ। ইহা ধমনীর প্রাচীরের মাস্ট কোষে থাকে। ইহা রক্ত জমাট প্রতিরোধ করে। ড. আবু বকর সিদ্দিক

৭। সায়ালিক এসিডঃ সায়ালিক এসিড হলো শ্যুগার অ্যামিন। ইহা মানুষকে দৈহিক ও মানসিক ভাবে সুস্থ রাখে।

৮। কনড্রয়টিন সালফেটঃ কনড্রয়টিন সালফেট তরুণাস্থির একটি উপাদান। ইহা চাপ প্রতিরোধ করে।

৯। অ্যাসকরবিক এসিড বা ভিটামিন-সিঃ অ্যাসকরবিক এসিড বা ভিটামিন-সি স্কার্ভিরোগ প্রতিরোধ করে।

১০। সুক্রেলোজ বা স্পিøন্ডাঃ সুক্রেলোজ বা স্পিøন্ডা একটি কৃত্রিম মিষ্টান্ন। ইহা চিনির চেয়ে ৬০০ গুণ মিষ্টি।

কাইটিনের সংজ্ঞা, বৈশিষ্ট্য ও ব্যবহার ।। Chitin

কাইটিন হলো একটি পলিস্যাকারাইড। N-অ্যাসিটিল- D-গ্লুকোসামিন রেসিডিউর সরল রৈখিক হোমোপলিমারকে কাইটিন বলে। পৃথিবীতে প্রচুর পরিমাণে থাকা দ্রব্যের মধ্যে একটি হলো কাইটিন। ইহা বিশে^র দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ পলিমার। এর রাসায়নিক সংকেত (C8H13O5)n। অসংখ্য D অ্যামিনো মনোমার β-1, 4 গ্লাইকোসাইডিক বন্ধনী দ্বারা যুক্ত হয়ে কাইটিন গঠন করে।

 

কাইটিনের বৈশিষ্ট্য

(i) কাইটিন পানি, জৈব এসিড ও লঘু এসিডে অদ্রবণীয়।

(ii) ইহা গাঢ় ফরমিক এসিড ও মিথেন সালফোনিক এসিডে দ্রবণীয়।

(iii)  ইহা সেলুলোজের চেয়ে অধিক শক্ত ও স্থিতিশীল।

(iv) শক্তিশালি এসিডের প্রভাবে কাইটিনকে বিশ্লেষিত করলে অ্যাসিটিক এসিড ও উ-অ্যামিনো গ্লুকোজে পরিনত হয়।

(v) ইহা অনেকটা কেরাটিন প্রোটিনের মতো।

কাইটিনের উৎসঃ পতঙ্গ, কাঁকড়া, চিংড়ী, লোবস্টার, স্কুইড প্রতৃতি প্রাণীর বহিঃকঙ্কাল বা খোলস গঠন করে কাইটিন। ঈস্ট ও ছত্রাকের কোষপ্রাচীর কাইটিন নির্মিত। ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

কাইটিনের ব্যবহারঃ ভেষজ, শিল্পজ ও জৈবপ্রযুক্তিতে কাইটিনের ব্যবহার রয়েছে।

ইনুলিন ।। Inulin

ইনুলিন হলো একটি পলিস্যাকারাইড। ইহা কোষরসে দ্রবীভূত অবস্থায় থাকে। এতে ৩০-৩৫টি ফ্রুক্টোজ একক থাকে। Asteraceae গোত্রের ডালিয়া, চিকোরি, জেরুজালেম অ্যার্টিচোক প্রভৃতি উদ্ভিদে ইনুলিন থাকে। পিঁয়াজ ও রসুনে ইনুলিন পাওয়া যায়।

গ্লাইকোজেনের সংজ্ঞা, বৈশিষ্ট্য, গঠন ও ব্যবহার ।। Glycogen

গ্লাইকোজেন হলো একটি পুষ্টিজাত জটিল হোমোপলিস্যাকারাইড। প্রাণীদেহের প্রধান সঞ্চিত খাদ্য হলো গ্লাইকোজেন। মেরুদন্ডী প্রাণির যকৃত, পেশি, মস্তিষ্ক ও পাকস্থলীতে গ্লাইকোজেন সঞ্চিত থাকে। তবে যকৃতে সবচেয়ে বেশি থাকে। মানুষের যকৃতে প্রায় ১০০-১২০ গ্রাম গ্লাইকোজেন থাকে। সায়ানোব্যাকটেরিয়া বা নীলাভ সবুজ শৈবাল এবং কতিপয় ছত্রাকে (ঈষ্ট) সঞ্চিত খাদ্য হিসেবে গ্লাইকোজেন থাকে। গ্লাইকোজেনকে প্রাণীজ স্টার্চ বলা হয়। ফরাসি বিজ্ঞানী ক্লাউডি বারনার্ড (Claude Bernard, ১৮৫৭) গ্লাইকোজেন আবিষ্কার করেন।

 

গ্লাইকোজেনের বৈশিষ্ট্য /ধর্ম

(i) গ্লাইকোজেন হলো সাদা পাউডার জাতীয় জৈব রাসায়নিক পদার্থ।

(ii) ইহা পানিতে দ্রবণীয়। ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

(iii) ইহা ঠান্ডা পানিতে সাসপেনসন গঠন করে।

(iv) এর আণবিক ওজন ৫০ লক্ষ ডাল্টন।

(v) একে আর্দ্র বিশ্লেষণ করলে প্রথমে মল্টোজ এবং পরে α গ্লুকোজে পরিনত হয়।

(vi) ইহা আয়োডিন দ্রবণের সাথে বিক্রিয়া করে লালচে বেগুনী বর্ণ ধারণ করে।

(vii) তাপ দিলে এর লাল বর্ণ দূর হয়ে যায়।

(viii) ঠান্ডা অবস্থায় ইহা কালো বর্ণে ফিরে আসে।

(ix) আংশিক আর্দ্র-বিশ্লেষিত হয়ে মল্টোজ এবং পূর্ণ আর্দ্র-বিশ্লেষিত হয়ে α-D গ্লুকোজে পরিনত হয়।

(x) ইহা গ্লাইকোলাইসিস প্রক্রিয়ায় গ্লুকোজে পরিনত হয়। ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

(xi) ইহা রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা স্বাভাবিক রাখে।

 

গ্লাইকোজেনের রাসায়নিক গঠন

গ্লাইকোজেন হলো একটি জটিল পলিস্যাকারাইড। ইহা অসংখ্য α-গ্লুকোজ অণু দ্বারা গঠিত। গ্লাইকোজেনেসিস প্রক্রিয়ায় ৩০,০০০ অণু গ্লুকোজ মিলিত হয়ে গ্লাইকোজেন উৎপন্ন করে। গ্লুকোজ অণু গুলো α-1-4 গ্লাইকোসাইডিক বন্ধনী দ্বারা যুক্ত হয়ে গ্লাইকোজেন গঠন করে। α-1-6 লিংকেজের মাধ্যমে গ্লাইকোজেনের শাখা সৃষ্টি হয়। এর প্রতিটি শাখায় ১০-২০টি গ্লুকোজ অণু থাকে। এদের আণবিক ওজন 106-107 ডাল্টন। গ্লাইকোজেনকে হাইড্রোলাইসিস করলে গ্লুকোজে পরিনত হয়। গ্লাইকোজেন প্রয়োজনে গ্লুকোজে পরিনত হয়ে কার্বন ও শক্তি সরবরাহ করে। এ জন্য গ্লাইকোজেনকে প্রাণিজ স্টার্চ বলা হয়।

 

গ্লাইকোজেনের ব্যবহার

(i) সঞ্চিত খাদ্যঃ গ্লাইকোজেন প্রাণীদেহে সঞ্চিত খাদ্য হিসেবে জমা থাকে।

(ii) গ্লুকোজ উৎপাদনঃ গ্লাইকোজেনেসিস প্রক্রিয়ায় যকৃতের গ্লাইকোজেন হতে গ্লুকোজ উৎপন্ন হয়।

(iii) পেশি শক্তিঃ কঙ্কাল ও হৃৎপেশিতে সঞ্চিত গ্লাইকোজেন পেশির অতিরিক্ত শক্তি প্রদান করে।

(iv) রক্তের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণঃ  ইহা দেহে রক্তের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে। যকৃতের গ্লাইকোজেন ভেঙ্গে রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ বৃদ্ধি করে। ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

(v) সাসপেনশন তৈরীঃ ইহা পানিতে কলয়েড সাসপেনশন তৈরী করে।

(vi) সারফেকটেন্ট উৎপাদনঃ গর্ভধারণের ২৩ সপ্তাহ সময়ে ভ্রুণীয় শিশুর পালমোনারী কোষে গ্লাইকোজেন সঞ্চিত হতে থাকে। সঞ্চিত গ্লাইকোজেন ফুসফুসের সারফেকটেন্ট উৎপন্ন করে।

(vii) শক্তির আধারঃ প্রাণীর যকৃত কোষে গ্লাইকোজেন উৎপাদন ও সঞ্চয় ঘটে। ইহা প্রাণীদেহে গ্লুকোজ চক্রের গৌণ সঞ্চিত শক্তির আধার হিসেবে কাজ করে। ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

(viii) মস্তিষ্কে শক্তির সরবরাহঃ মস্তিষ্কের কোষে সামান্য পরিমাণ গ্লাইকোজেন সঞ্চিত থাকে। ইহা সচেতন মস্তিষ্কের কাজে শক্তি যোগায়।

স্টার্চের সংজ্ঞা, বৈশিষ্ট্য, গঠন ও ব্যবহার (Starch)

জার্মান শব্দ Starch অর্থ মজবুত বা শক্ত বা কঠিন বা  অনমনীয়। স্টার্চ হলো একটি জটিল হোমোপলিস্যাকারাইড। এর আণবিক সংকেত (C6H10O5)n। সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন শর্করা বা চিনি স্টার্চে রুপান্তরিত হয় এবং জমা থাকে। ধান, গম, আলু, ভুট্রা, কলা, বার্লি প্রভৃতি হলো স্টার্চের প্রধান উৎস। এ সব উপাদানে ৭০-৮০% স্টার্চ থাকে। গোল আলুর স্টার্চ কণা সবচেয়ে বড় এবং 100µm । চালের স্টার্চ কণা সবচেয়ে ছোট এবং 2µm। প্লিনি দ্যা এলডার (Pliny the Elder, 77-78 AD) বর্ণিত Natural History-তে উদ্ভিদ থেকে স্টার্চ আহরণের প্রথম তথ্য পাওয়া যায়। ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

 

স্টার্চের বৈশিষ্ট্য /ধর্ম

(i) স্টার্চ স্বাদহীন, গন্ধহীন ও বর্ণহীন পদার্থ।

(ii) ইহা সাদা অদানাদার পাউডার জাতীয় জৈব রাসায়নিক পদার্থ।

(iii) ইহা পানি, অ্যালকোহল ও ইথারে অদ্রবণীয়।

(iv) স্টার্চ আয়োডিন দ্রবণে নীল বর্ণ ধারণ করে।

(v) ইহা উচ্চ তাপমাত্রায় ভেঙ্গে বড় বড় ডেক্সটিন কণায় পরিনত হয়।

(vi) স্টার্চ ফেহলিং দ্রবণকে বিজারিত করতে পারে না।

(vii) স্টার্চের অ্যামাইলোজের সাথে আয়োডিন বিক্রিয়া করে কালো বা কালো-নীল বর্ণ ধারণ করে।

(viii) স্টার্চের অ্যামাইলোপেকটিনের সাথে আয়োডিন বিক্রিয়া করে লাল বা পার্পল বর্ণ ধারণ করে।

 

স্টার্চের রাসায়নিক গঠন

স্টার্চ হলো একটি জটিল পলিস্যাকারাইড। অ্যামাইলোজ ও অ্যামাইলোপেকটিন দ্বারা স্টার্চ গঠিত হয়। এতে  অ্যামাইলোজ ২২% এবং  অ্যামাইলোপেকটিন ৭৮% থাকে। অ্যামাইলোজ ২০০-১০০০ অণু এবং অ্যামাইলোপেকটিন ২০০০-২,০০,০০০ অণু গ্লুকোজ দ্বারা গঠিত। অসংখ্য গ্লুকোজ অণু  α-1-4 গ্লাইকোসাইডিক বন্ধনী দ্বারা যুক্ত হয়ে স্টার্চ গঠন করে। তবে গ্লুকোজ অণুগুলো α-1-6 বন্ধনে যুক্ত হতে পারে। স্টার্চকে হাইড্রোলাইসিস করলে গ্লুকোজে পরিনত হয়।

 

স্টার্চের ব্যবহার

(i) সঞ্চিত খাদ্যঃ স্টার্চ উদ্ভিদ দেহে সঞ্চিত খাদ্য হিসেবে জমা থাকে। উদ্ভিদের বীজ, ফল ও কন্দের স্টার্চ সঞ্চিত খাদ্য হিসেবে অবস্থান করে। ধান, গম, ভূট্রা, ক্যাসাবা, কর্ণ ও গোল আলুতে সঞ্চিত স্টার্চ মানুষের খাদ্য হিসেবে ব্যবহার হয়।

(ii) শক্তির উৎসঃ ইহা জীবদেহে শক্তির উৎস হিসেবে কাজ করে। স্টার্চ গ্লুকোজে পরিনত হয়ে জীবদেহে শক্তি ও কার্বন অণু সরবরাহ করে। ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

(iii) শ্বসনেঃ ইহা শ্বসনে তাপ ও শক্তি উৎপন্ন করে।

(iv) গবেষণায়ঃ স্টার্চ পরীক্ষাগারে গ্লুকোজ ও অ্যালকোহল তৈরীতে ব্যবহার হয়।

(v) কাগজ শিল্পেঃ কাগজ শিল্পের প্রধান উপাদান হলো স্টার্চ।

(vi) আঠা তৈরীঃ বিশুদ্ধ স্টার্চ গরম পানিতে মিশিয়ে আঠা তৈরী করা হয়। ইহা করোগেটেড বোর্ডের আঠা তৈরীতে ব্যবহার হয়।

(vii) টাইট্রেশনেঃ টাইট্রেশনের সময় স্টার্চ নির্দেশক হিসেবে ব্যবহার হয়।

(viii) কাপড়ে ব্যবহারঃ স্টার্চ থেকে ওয়ার্প সিজিং এজেন্ট উৎপন্ন হয়। ওয়ার্প সিজিং এজেন্ট কাপড় বুননের সময় সূতা ছিড়ে যাওয়ার হার কমায়। কাপড়ে মার (লন্ডি) দেওয়ার কাজে স্টার্চ ব্যবহার হয়। ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

(ix) তেল সন্ধানঃ তেল অনুসন্ধানে পিচ্ছিলকারী তরল ড্রিলিং ফ্লুইডের সান্দ্রতা বাড়ানোর জন্য স্টার্চ ব্যবহার হয়।

(x) প্রসাধনী তৈরীঃ ট্যালকম পাউডার এবং অন্যান্য প্রসাধনী তৈরীতে স্টার্চ ব্যবহার হয়।

(xi) খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণঃ খাদ্য প্রক্রিয়াজাত করার সময় খাদ্যের ঘনত্ব বৃদ্ধি করতে স্টার্চ ব্যবহার হয়।

(xii) পলিমার উৎপাদনঃ পরিবেশ বান্ধব বায়োপ্লাস্টিক এবং অন্যান্য সিনথেটিক পলিমার তৈরীতে স্টার্চ ব্যবহৃত হয়।

(xiii) জ্বালানী উৎপাদনঃ গাঁজন প্রক্রিয়ায় স্টার্চ থেকে জৈব জ্বালানী কর্ন ইথানল উৎপাদন করা হয়।

(xiv) বংশবৃদ্ধিঃ উদ্ভিদের ফল, বীজ, রাইজোম ও কন্দালে সঞ্চিত স্টার্চ পরবর্তী ঋতুতে বংশধর উৎপাদনে অংশ নেয়।

(xv) ওষুধ শিল্পেঃ ওষুধ শিল্পে স্টার্চ সক্রিয় উপাদানের বাহক, ট্যাবলেট ডিসইন্টিগ্রেন্ট এবং বাইন্ডার হিসেবে ব্যবহার হয়।

(xvi) ক্লথিং স্টার্চঃ বিশুদ্ধ স্টার্চ পানির সাথে মিশিয়ে তরল ক্লথিং স্টাচ তৈরী করা হয়। ইহা গার্মেন্টসে এবং লন্ড্রিতে ব্যবহার হয়।

মানুষ সেলুলোজ হজম করতে পারে না কেন

স্তন্যপায়ী প্রাণীর পরিপাকতন্ত্রে সেলুলোজ হজমকারী এনজাইম সেলুলেজ উৎপন্ন হয় না। তবে গরু, মহিষ, ছাগল, হরিণ, ভেড়া প্রভৃতির পরিপাকতন্ত্রে এক ধরনের মিথোজীবী ব্যাকটেরিয়া বাস করে। এ সব ব্যাকটেরিয়া সেলুলোজ হজমকারী এনজাইম সেলুলেজ উৎপন্ন করে। এই এনজাইম সেলুলোজের β, 1-4 গ্লাইকোসাইডিক বন্ধনী ভেঙ্গে সেলুলোজ হজমে সহায়তা করে। মানুষের পরিপাকতন্ত্রে এধরনের মিথোজীবী ব্যাকটেরিয়া থাকে না বলে মানুষ সেলুলোজ হজম করতে পারে না। কিন্তু মানুষের খাদ্য তালিকায় সেলুলোজ জাতীয় খাদ্য থাকা আবশ্যক। কারণ সেলুলোজ মল উৎপাদনের জন্য অত্যাবশ্যক। ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

 সেলুলোজের সংজ্ঞা, বৈশিষ্ট্য, গঠন ও ব্যেবহার ।। Cellulose

সেলুলোজ হলো একটি জটিল হোমোপলিস্যাকারাইড। স্বভোজী উদ্ভিদের কোষ প্রাচীর সেলুলোজ দ্বারা গঠিত। পৃথিবীর জৈব উপাদানের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরিমাণে বিরাজ করে সেলুলোজ। সেলুলোজকে হাইড্রোক্লোরিক এসিড বা সালফিউরিক এসিড বা সোডিয়াম হাইড্রোক্সাইড দ্বারা আর্দ্র বিশ্লেষণ করলে গ্লুকোজ পাওয়া যায়। সেলুলোজ অণুতে β-1-4 গ্লাইকোসাইডিক বন্ধনী থাকে। প্রাণী বা মানুষের এই β-1-4 গ্লাইকোসাইডিক বন্ধনী ভাঙ্গার মতো কোন এনজাইম থাকে না বলে সেলুলোজ হজম করতে পারে না। ফরাসি রসায়নবিদ অ্যানসেলমি পায়েন (Anselme Payen, 1838) সেলুলোজ আবিষ্কার করেন। কোবায়েসি এবং সোডা (Kobayashi & Shoda, 1992) সর্বপ্রথম কৃত্রিম সেলুলোজ তৈরী করেন। ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

 

সেলুলোজের পরিমাণ

তুলায় ৯৪%, লিনন বা তিসিতে ৯০%, তন্তুকোষে ৯০%, তৃণলতায় ৩০-৪০%, কাঠে ৬০%, শুষ্ক হেল্প তন্তেÍÍ ৪৫%, পাটকাঠিতে ৫৮% আখের ছোবড়ায় ৪০%, গমের খড়ে ৪২%  এবং জৈব মাটিতে ৪০-৭০% সেলুলোজ থাকে।

 

সেলুলোজের বৈশিষ্ট্য /ধর্ম

(i) সেলুলোজ হলো স্বাদহীন, গন্ধহীন ও বর্ণহীন পদার্থ।

(ii) রাসায়নিক ভাবে ইহা নিষ্ক্রিয়, তবে গাঢ় এসিড দ্বারা আর্দ্র বিশ্লেষণ করলে গ্লুকোজে পরিনত হয়।

(iii) ইহা পানি ও জৈব দ্রাবকে অদ্রবণীয়। ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

(iv) এর আণবিক ওজন ২ লক্ষ থেকে কয়েক লক্ষ ডাল্টন।

(v) ইহা মিষ্টি বিবর্জিত এবং বিজারণক্ষমতা বিহীন।

(vi) ইহা আয়োডিন দ্রবণে কোন বর্ণ ধারণ করে না।

(vii) এটি শক্ত ও ফাইবারের মতো।

(viii) এর কোন পুষ্টিগুণ নাই।

(ix) সেলুলোজে ৪৪.৪১% কার্বন, ৪৪.৪% অক্সিজেন এবং ৬.২% হাইড্রোজেন থাকে।

 

সেলুলোজের রাসায়নিক গঠন

সেলুলোজ হলো একটি জটিল পলিস্যাকারাইড। ইহা গ্লুকোজ অণু দ্বারা গঠিত। অসংখ্য গ্লুকোজ অণু β 1-4 গ্লাইকোসাইডিক বন্ধনী দ্বারা যুক্ত হয়ে সেলুলোজ গঠন করে। সেলুলোজকে H2SO4 বা HCl বা NaOH দ্বারা হাইড্রোলাইসিস করলে গ্লুকোজে পরিনত হয়।

 

সেলুলোজের ব্যবহার

(i) বস্ত্রশিল্পেঃ সেলুলোজ বস্ত্রশিল্পের কাঁচামাল তৈরীর প্রধান উপাদান হিসেবে ব্যবহার হয়। কাপড়ের কাঁচামাল রেয়ন তৈরী করা হয় সেলুলোজ থেকে।

(ii) বিস্ফোরক হিসেবেঃ ইহা নাইট্রেট বিস্ফোরক হিসেবে ব্যবহার হয়। নাইট্রোসেলুলোজ তৈরীর কাঁচামাল হিসেবে সেলুলোজ ব্যবহার হয়। ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

(iii) আসবাবপত্র তৈরীতেঃ কাঠ ও বাঁশের প্রধান উপাদান হলো সেলুলোজ। বাঁশ ও কাঠ দ্বারা বিভিন্ন ধরনের আসবাবপত্র তৈরী করা হয়।

(iv) কাগজ শিল্পেঃ ইহা ফিল্টার পেপার ও টিস্যু পেপার তৈরীতে ব্যবহৃত হয়। রিসাইক্লিং প্রক্রিয়ায় নিউজপ্রিন্ট কাগজ থেকে সেলুলোজ ইনসুলেটর তৈরী করা হয়। সেলুলোজ ইনসুলেটর হলো একটি পরিবেশ বান্ধব আবরক।

(v) হজমেঃ কাঠখেকো কীটপতঙ্গ কাঠ হজম করতে সেলুলোজ ব্যবহার করে।

(vi) আঠা তৈরীতেঃ মিথাইল সেলুলোজ আঠা তৈরীতে ইহা ব্যবহার হয়। বিশুদ্ধ সেলুলোজ পানির সাথে মিশিয়ে আঠা তৈরী করা হয়।

(vii) ফটোগ্রাফিক ফিল্ম তৈরীতেঃ ফটোগ্রাফিক, সেলোফেন এবং সেলুলয়েড তৈরীতে ইহা ব্যবহার হয়।

(viii) জৈব প্রযুক্তিতেঃ ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়া থেকে উৎপন্ন সেলুলোজ বায়োটেকনোলজিতে ব্যবহার হচ্ছে।

(ix) গাঠনিক উপাদান হিসাবেঃ সেলুলোজ উদ্ভিদের প্রধান গাঠনিক উপাদান হিসেবে কাজ করে। ইহা উদ্ভিদের পাতা, কান্ড ও শাখা-প্রশাখা গঠন করে। ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

(x) উদ্ভিদের কঙ্কালতন্ত্রঃ সেলুলোজ উদ্ভিদকে দৃঢ়তা ও সুরক্ষা প্রদান করে। তাই সেলুলোজকে উদ্ভিদের কঙ্কালতন্ত্র বলা হয়।

(xi) মল তৈরীঃ প্রাণীর খাদ্যের সাথে আগত সেলুলোজের অধিকাংশই মল হিসেবে নির্গত হয়। রাফেজ কোষ্ঠবদ্ধতা দূর করে। তাই প্রাণীর জীবন ধারণের জন্য সেলুলোজ অত্যাবশ্যক। ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

(xii) স্টেশনারি ফেজঃ থিন লেয়ার ক্রোমাটোগ্রাফিতে স্টেশনারি ফেজ হিসেবে সেলুলোজ ব্যবহার হয়।

ম্যালটোজ ।। Maltose

ম্যালটোজ একটি ডাইস্যাকারাইড। ইহা একটি রিডিউসিং শ্যুগার। এর আণবিক সংকেত C12H22O11।  ইহা স্বাদে মিষ্টি এবং এর মিষ্টতা চিনির ৩০-৬০%। চিনির আংশিক পাতনের ফলে ম্যালটোজ তৈরী হয়। স্টার্চ-এর আংশিক ভাঙ্গনের ফলে ম্যালটোজ তৈরী হয়। দুই অণু গ্লুকোজ α-1, 4 লিংকেজ দিয়ে সংযুক্ত হয়ে ম্যালটোজ গঠন করে। বিয়ার তৈরীতে বার্লির ম্যাল্টিং কাজে ম্যালটোজ ব্যবহার হয়।

 সেলোবায়োজ ।। Cellobiose

সেলোবায়োজ একটি ডাইস্যাকারাইড। ইহা একটি রিডিউসিং শ্যুগার। এর আণবিক সংকেত C12H22O11। সেলুলোজ বা লিগনিন-এর আংশিক ভাঙ্গনের ফলে সেলোবায়োজ তৈরী হয়। দুই অণু গ্লুকোজ β-1, 4 লিংকেজ দিয়ে সংযুক্ত হয়ে সেলোবায়োজ গঠন করে। ইমালসিন এনজাইম ও এসিডের প্রভাবে সেলোবায়োজ ভেঙ্গে গ্লুকোজে পরিনত হয়। ব্রোমিন পানি দিয়ে সেলোবায়োজকে জারিত করলে সেলোবায়োনিক এসিড উৎপন্ন হয়। ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

কাজঃ সেলোবায়োজ কোষ প্রাচীরের গাঠনিক উপাদান হিসেবে কাজ করে।

ল্যাক্টোজ ।। Lactose

ল্যাক্টোজ হলো একটি ডাইস্যাকারাইড। এর আণবিক সংকেত C12H22O11। দুধে ২-৪% ল্যাক্টোজ থাকে। এক অণু গ্লুকোজ ও এক অণু গ্যালাক্টোজ গ্লাইকোসাইডিক বন্ধনী দ্বারা যুক্ত হয়ে ল্যাক্টোজ গঠন করে। ল্যাকটেজ এনজাইম ল্যাক্টোজকে ভেঙ্গে গ্লুকোজ ও গ্যালাক্টোজে পরিনত করে। ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স