লিপিডের গুরুত্ব ।। কাজ ।। Function of Lipid

১। কোষঝিল্লি গঠনঃ ফসফোলিপিড মাইটোকন্ড্রিয়া, ক্লোরোপ্লাস্ট, টনোপ্লাস্ট, এন্ডোপ্লাজমিক জালিকা, নিউক্লিয়াস প্রভৃতির ঝিল্লি গঠন করে।
২। সঞ্চিত খাদ্যঃ ট্রাইগিøসারাইড জীবদেহে সঞ্চিত খাদ্য হিসেবে জমা থাকে। ইহা উচ্চমাত্রায় ক্যালরি সরবরাহ করে। উদ্ভিদের বীজ ও বীজপত্রে লিপিড সঞ্চিত থাকে। ১ গ্রাম ফ্যাটি এসিডে ১.৩ কিলোক্যালোরী শক্তি থাকে।
৩। প্রস্বেদন রোধঃ উদ্ভিদের পাতা ও কান্ডে মোম জাতীয় পদার্থের আবরণী সৃষ্টি হয়। এই আবরণী প্রস্বেদন রোধ করে।
৪। তাপ নিরোধক হিসেবেঃ প্রাণীদেহে ত্বকের নিচে চর্বি সঞ্চিত হয়ে স্তর গঠন করে। ইহা তাপ নিরোধক হিসেবে কাজ করে। মরুজ প্রাণীদের চর্বি স্তর বেশি পুরু এবং তাপ নিরোধক।
৫। অঙ্কুরোদগমঃ উদ্ভিদদেহে সঞ্চিত লিপিড অঙ্কুরোদগমের সময় শক্তি ও পুষ্টি সরবরাহ করে।
৬। সালোকসংশ্লেষণঃ গ্লাইকোলিপিড ক্লোরোপ্লাস্টে থাকে এবং সালোকসংশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিটা-ক্যারোটিন পাতায় আলোক শক্তি শোষণ করে।
৭। শক্তি উৎপাদনঃ লিপোপ্রোটিন জীবদেহে শক্তি উৎপন্ন করে। শর্করার চেয়ে লিপিড বেশি শক্তি ধারণ করে।
৮। সুগন্ধি সৃষ্টিঃ টারপিনস্ জাতীয় লিপিড উদ্ভিদে সুগন্ধি সৃষ্টি করে।
৯। ইলেকট্রন প্রবাহতন্ত্রঃ ফসফোলিপিড মাইটোকন্ড্রিয়ার ইলেকট্রন প্রবাহতন্ত্রকে সহায়তা করে।
১০। এক্টিভেটরঃ লিপিড এনজাইমের এক্টিভেটর হিসেবে কাজ করে। তেল, ঘি, মাখন প্রভৃতিতে লিপিড থাকে।
১১। মানবদেহেঃ বিটা-ক্যারোটিন থেকে ভিটামিন-এ তৈরী হয়। ভিটামিন-এ থেকে রডোপসিন তৈরী হয়। রডোপসিন দৃষ্টিশক্তি দান করে। রক্তে অতিরিক্ত ট্রাইগিøসারাইড থাকলে অ্যাথারোস্কে¬রোসিস রোগ হয়।
১২। বার্তা বাহক হিসেবেঃ লিপিড জীবদেহে বার্তাবাহক হিসেবে কাজ করে। স্টেরয়েড ও ইকোসানয়েড জাতীয় লিপিড সংকেত প্রদান করে।
১৩। সাবান তৈরীঃ স্যাপোনিফিকেশনের মাধ্যমে ফ্যাট বা চর্বি থেকে সাবান তৈরী করা হয়।
১৪। আঘাত থেকে রক্ষাঃ চর্বি দেহের বৃক্ক, জননাঙ্গ, চক্ষুগোলক প্রভৃতিকে আবৃত করে রাখে এবং আঘাত থেকে রক্ষা করে।
১৫। ভিটামিন শোষণঃ ভিটামিন অন্ত্র থেকে লিপিডের সহায়তায় পরিবাহিত হয়ে চর্বি কলায় সঞ্চিত হয়। চর্বিতে দ্রবণীয় ভিটামিন- A, D, E ও K জীবদেহে বিভিন্ন ধরনের কাজ করে।

লিপিড প্রোফাইল ।। Lipid Profile

লিপিড প্রোফাইল পরীক্ষা দ্বারা রক্তে কোলেস্টেরল ও চর্বির মাত্রা নির্ণয় করা হয়। এই পরীক্ষায় টোটাল কোলেস্টেরল (TC), লো-ডেনসিটি লিপোপ্রোটিন (LDL), হাই-ডেনসিটি লিপোপ্রোটিন (HDL) ও ট্রাইগিøসারাইড (TG) এর মাত্রা দেখা হয়।

অনাত্যাবশ্যক ফ্যাটি এসিড

যে সব ফ্যাটি এসিড দেহের জন্য প্রয়োজন এবং দেহে তৈরী হয় তাকে অনাত্যাবশ্যক ফ্যাটি এসিড বলে। অ্যারাকিডিক এসিড, স্টিয়ারিক এসিড, পামিটিক এসিড প্রভৃতি অনাত্যাবশ্যক ফ্যাটি এসিড থাকে।

অত্যাবশ্যক ফ্যাটি এসিড

যে সব অসম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিড দেহের জন্য অতি প্রয়োজন কিন্তু দেহে তৈরী হয় না, খাদ্যের সাথে গ্রহণ করতে হয় তাকে অত্যাবশ্যক ফ্যাটি এসিড বলে। ইহা দুই ধরনের। লিনোলিক এসিড বা ওমেগা-৩ ও লিনোলেনিক এসিড বা ওমেগা-৬। এই এসিড হৃৎকোষের জীবন-মরণ, অনাক্রম্যতন্ত্রের কার্যাবলী এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে। সামুদ্রিক মাছের তৈল, ফ্লাক্স সিড তৈল, হেম সিড তৈল, ওয়ালনাট এবং শাকসবজিতে প্রচুর পরিমাণে অত্যাবশ্যক ফ্যাটি এসিড থাকে।

ট্রান্স ফ্যাটি এসিড

ফ্যাটি এসিডের দুইটি কার্বনের ডবল বন্ডের হাইড্রোজেন উল্টো দিকে থাকলে তাকে ট্রান্স ফ্যাটি এসিড বলে। ইহা দেহের জন্য ক্ষতিকর।

সিস ফ্যাটি এসিড

ফ্যাটি এসিডের দুইটি কার্বনের ডবল বন্ডের হাইড্রোজেন একই দিকে থাকলে তাকে সিস ফ্যাটি এসিড বলে। ইহা দেহের জন্য উপকারী (অলিভ অয়েল)।

ওমেগা-3 এবং ওমেগা-6

ফ্যাটি এসিডের শেষ CH3 এর পর ৩নং কার্বনে ডবল বন্ধনী থাকলে তাকে ওমেগা-3 এবং ৬নং কার্বনে ডবল বন্ধনী থাকলে তাকে ওমেগা-6 বলে। ওমেগা-৩ এবং ওমেগা-৬ হলো অত্যাবশ্যকীয় ফ্যাটি এসিড। ইহা দেহে উৎপন্ন হয় না। খাদ্যের সাথে গ্রহণ করতে হয়। মস্তিষ্ক এবং চোখের গঠনে ইহা অধিক প্রয়োজন।

অসম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিড ।। Unsaturated

যে সব ফ্যাটি এসিডের হাইড্রোকার্বন শৃঙ্খলে একটি দ্বি-বন্ধন বা ত্রি-বন্ধন (C=C) থাকে তাকে অসম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিড বলে। মানুষ এবং স্তন্যপায়ীরা ফ্যাটি এসিডের ৯ম কার্বনের পর কোন ডবল বন্ড তৈরী করতে পারে না। তাই আমাদের খাদ্যে সামান্য অসম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিড যোগ করতে হয়। এ জন্যই linoleic এবং linolenic এসিড দুইটিকে আবশ্যকীয় ফ্যাটি এসিড বলা হয়। উদ্ভিদজাত অসম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিড মানব স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। তাই দেহে পুষ্টির অভাব পূরণ হয়। যেমন- অলিক এসিড, লিনোলিক এসিড, লিনোলেনিক এসিড ইত্যাদি।
অসম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিডের বৈশিষ্ট্য
(i) অসম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিডের কার্বন পরমাণু দ্বিযোজী বন্ধনী দ্বারা যুক্ত থাকে।
(ii) এর গলনাঙ্ক অপেক্ষাকৃত কম।
(iii) এটি অপরিহার্য ফ্যাটি এসিড।
(iv) উদ্ভিদ স্নেহ পদার্থে এর পরিমাণ বেশি।
(v) ইহা সাধারণ তাপমাত্রায় (২০০ সে) তরল অবস্থায় থাকে।

সম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিড ।। Saturated

যে সব ফ্যাটি এসিডের হাইড্রোকার্বন শৃঙ্খল একক বন্ধনী (C-C) যুক্ত হয় তাকে সম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিড বলে। এর আণবিক সংকেত CH3(CH2)nCOOH (n=18)। ইহা ধমনীর প্রাচীরে জমা হয়ে রক্ত চলাচল বন্ধ করে দেয়। ফলে হৃৎরোগ হয়। যেমন- লরিক এসিড, পামিটিক এসিড, স্টিয়ারিক এসিড, লিনোসেরিক এসিড ইত্যাদি।
সম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিডের বৈশিষ্ট্য
(i) সম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিডের কার্বন পরমাণু একযোজী বন্ধনী দ্বারা যুক্ত থাকে।
(ii) এর গলনাঙ্ক অপেক্ষাকৃত বেশি।
(iii) এটি অপরিহার্য ফ্যাটি এসিড না।
(iv) প্রাণিজ স্নেহ পদার্থে এর পরিমাণ বেশি।
(v) ইহা সাধারণ তাপমাত্রায় (২০০ সে) কঠিন অবস্থায় থাকে।

ট্রাইগ্লিসারাইড বা ফ্যাটি এসিড ।। Triglyceride ।। Fatty acids

ডিহাইড্রেশন বিক্রিয়ায় এক অণু গ্লিসারল ও তিন অণু ফ্যাটি এসিড মিলিত হয়ে যে সরল লিপিড গঠন করে তাকে ট্রাইগ্লিসারাইড বলে। ট্রাইগ্লিসারাইড হলো একটি অ্যালকোহল। এতে ৩টি কার্বন ও ৩টি হাইড্রোক্সি গ্রুপ থাকে। ফ্যাটি এসিড হলো হাইড্রোকার্বন চেইন এবং এতে কার্বোক্সিল গ্রুপ থাকে। কার্বোক্সিল গ্রুপের ডিহাইড্রেশন বিক্রিয়ার মাধ্যমে OH সাইড গ্রুপের সংযোগকে এস্টার লিংকেজ বলে। ট্রাইগ্লিসারাইড দুই ধরনের। সম্পৃক্ত বা স্যাচুরেটেড এবং অসম্পৃক্ত বা আনস্যাচুরেটেড।