যে সব লিপিড ফ্যাটি এসিড, গিøসারল ও প্রোটিন দ্বারা গঠিত তাদেরকে লিপোপ্রোটিন বলে। মাইটোকন্ড্রিয়া ও ক্লোরোপ্লাস্টের আবরণীতে এই লিপিড থাকে। ইহা মাইটোকন্ড্রিয়ার ইলেকট্রন ট্রান্সপোর্ট সিস্টেমের সাথে জড়িত এবং শক্তি উৎপন্ন করে। রক্তরসে, ডিমের কুসুমে এবং দুধে লিপোপ্রোটিন থাকে। উদাহরণ- কিউটিন, সুবেরিন ইত্যাদি।
লিপোপ্রোটিন ৫ ধরনের হয়। এগুলো হলো-
(i) কাইলোমাইক্রনঃ কাইলোমাইক্রন হলো ফ্যাট ও প্রোটিন দ্বারা গঠিন পোলাইপোপ্রটি কণিকা। ইহা কোলেস্টেরলের বাহক হিসেবে কাজ করে।
(ii) VLDL : Very Low Density Lipoprotein কে VLDL বলা হয়। ইহা অতি নি¤œ ঘনত্বের লিপোপ্রোটিন।
(iii) IDL : Intermediate Density Lipoprotein কে সংক্ষেপে IDL বলা হয়। ইহা মধ্যম ঘনত্বের লিপোপ্রোটিন।
(iv) LDL : Low Density Lipoprotein কে সংক্ষেপে LDL বলা হয়। ইহা নি¤œ ঘনত্বের লিপোপ্রোটিন। রক্তে কোলেস্টেরলের স্বাভাবিক মাত্রা ০.১৫-১.২০%। রক্তে LDL এর মাত্রা বেশি থাকা ক্ষতিকর (<100 mg/dl)। প্রতি অণু LDL প্রায় ১৫০০ কোলেস্টেরল এস্টার বহন করে। রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি হলে রক্তনালীর ভিতরের গাত্রে জমা হয়ে রক্ত প্রবাহ পথ সরু করে দেয়। এতে শরীরে রক্তচাপ বেড়ে যায় এবং রক্ত প্রবাহ কমে যায়। ফলে হৃৎযন্ত্রে রক্ত চলাচল কমে যায় এবং হৃৎরোগ হয়। এর মাত্রা বেশি হলে ব্যক্তি অচেতন হয়ে পড়ে। বুকে ব্যথা হয়। হার্ট অ্যাটাক হতে পারে। হার্ট ফেইলর দেখা যায়। করোনারী থ্রম্বোসিস হতে পারে। সাধারণত পুরুষদের LDL বেশি থাকে এবং মহিলাদের কম থাকে। LDL কে খারাপ বা মন্দ কোলেস্টেরল (Bad cholesterol) বলা হয়।
(v) HDL : High Density Lipoprotein কে সংক্ষেপে HDL বলা হয়। ইহা উচ্চ ঘনত্বের লিপোপ্রোটিন। মানুষের রক্তে HDL এর মাত্রা বেশি থাকা ভাল (40<mg/dl)। এরা মুক্ত ফ্যাটকে হৃৎপিন্ড থেকে শরীরের প্রান্তীয় অংশে ছড়িয়ে দেয়। এতে রক্ত চাপ কমে যায় এবং রক্ত চলাচল স্বাভাবিক থাকে। ফলে হৃৎরোগ হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে। সাধারণত মহিলাদের HDL বেশি থাকে এবং পুরুষদের কম থাকে। HDL কে ভাল কোলেস্টেরল (Good cholesterol) বলা হয়।
Category: Biology Second Paper
ফসফোলিপিড (Phospholipid)
যে সব লিপিড ফ্যাটি এসিড, গিøসারল ও ফসফেট দ্বারা গঠিত তাদেরকে ফসফোলিপিড বলে। এর গাঠনিক উপাদান হলো ফসফোটাইডিক এসিড। ফসফোলিপিডের ফসফেট গ্রুপটি কোলিন দ্বারা এস্টারীভূত হলে লেসিথিন এবং সেরিন হাইড্রোক্সিল দ্বারা এস্টারীভূত হলে সেফালিন উৎপন্ন হয়। লেসিথিন হলো প্রথম শনাক্তকারী ফসফোলিপিড। ফসফোলিপিড হলো-লেসিথিন, সেফালিন, প্লাজমালোজেন, কোলিন, সিরিন, কার্ডিওলিপিন, স্ফিংগোমায়োলিন ইত্যাদি।
ফসফোলিপিড তিন ধরনের। এগুলো হলো-
(i) ফসফোগিøসারাইডঃ যে ফসফোলিপিড গিøসারল, ফ্যাটি এসিড ও ফসফোরিক এসিড দ্বারা গঠিত তাকে ফসফোগিøসারাইড বলে। ইহা কোষ পর্দায় উপস্থিত থাকে। যেমন- লেসিথিন।
(ii) ফসফোইনোসিটাইডঃ যে ফসফোলিপিড গিøসারল, ফ্যাটি এসিড, ফসফোরিক এসিড ও ইনোসিটল দ্বারা গঠিত তাকে ফসফোইনোসিটাইড বলে। ইহা মস্তিষ্কে উপস্থিত থাকে। ইহা সয়াবিনে পাওয়া যায়।
(iii) ফসফোস্ফিঙ্গোসাইডঃ যে ফসফোলিপিড ফ্যাটি এসিড, ফসফোরিক এসিড ও স্ফিঙ্গোসিন দ্বারা গঠিত তাকে ফসফোস্ফিঙ্গোসাইড বলে। ইহা প্রাণীর স্নায়ু কলায় থাকে।
ফসফোলিপিডের কাজ
(i) ফসফোলিপিড কোষের মাইটোকন্ড্রিয়া, ক্লোরোপ্লাস্ট, টনোপ্লাস্ট, এন্ডোপ্লাজমিক জালিকা, নিউক্লিয়াস প্রভৃতির ঝিল্লি গঠন করে।
(ii) ইহা কোষের ভেদ্যতা ও পরিবহন প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে।
(iii) কয়েকটি এনজাইমের প্রোসথেটিক গ্রুপ হিসেবে কাজ করে।
(iv) ইহা প্রাণীদেহে রক্ত তঞ্চন বা জমাট বাঁধতে সাহায্য করে।
(v) ইহা কোষের আয়ন হিসেবে কাজ করে। গ্লুকোজ, পানি ও চার্জযুক্ত আয়নের ব্যাপন রোধ করে।
(vi) ইহা জারণের হার বৃদ্ধি করে।
(vii) ইহা অ্যাসিটাইলকোলিন নিউরোট্রান্সমিশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
(viii) ইহা উদ্ভিদ কোষে জেসমোনিক এসিড উৎপাদনে সাহায্য করে। জেসমোনিক এসিড রোগ প্রতিরোধে অংশ গ্রহণ করে।
(ix) ইহা কোষের অভ্যন্তরীণ স্থিতিবস্থা বজায় রাখে।
গ্লাইকোলিপিড (Glycolipid)
যে সব লিপিড ফ্যাটি এসিড, গিøসারল ও কার্বোহাইড্রেট (গ্লুকোজ) দ্বারা গঠিত তাদেরকে গ্লাইকোলিপিড বলে। ইহা গ্লাইকোক্যালিক্স হিসেবে পরিচিত। যেমন-সেরিব্রোন, নারভন ইত্যাদি।
বিভিন্ন ধরনের গ্লাইকোলিপিড হলো-
(i) সেরিব্রোসাইডঃ যে গ্লাইকোলিপিড গিøসারল, ফ্যাটি এসিড ও গ্লুকোজ বা গ্যালাক্টোজ দ্বারা গঠিত তাকে সেরিব্রোসাইড বলে। ইহা প্রাণীর মস্তিষ্কে থাকে।
(ii) সালফাটিডঃ যে গ্লাইকোলিপিড গিøসারল, ফ্যাটি এসিড ও সালফেট দ্বারা গঠিত তাকে সালফাইড বলে। ইহা বৃক্ক, যকৃত, লালাগ্রন্থি, শুক্রাশয়, ক্লোরোপ্লাস্ট প্রভৃতিতে থাকে।
(iii) গ্যাংলিওসাইডঃ যে গ্লাইকোলিপিড গিøসারল, ফ্যাটি এসিড ও অলিগোস্যাকারাইড দ্বারা গঠিত তাকে গ্যাংলিওসাইড বলে। ইহা প্রাণীর মস্তিস্ক, স্নায়ুকোষ, প্লিহা ও লোহিত রক্তকণিকায় থাকে।
গ্লাইকোলিপিডের কাজ
(i) গ্লাইকোলিপিড কোষের আন্তঃক্রিয়ায় শনাক্তকরণ হিসেবে ব্যবহার হয়।
(ii) ইহা ভাইরাস শনাক্তকরণের মাধ্যমে দেহের অনাক্রম্য সাড়া প্রদানে ভূমিকা রাখে।
(iii) ইহা ক্লোরোপ্লাস্টের মেমব্রেন গঠন করে।
(iv) সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় অংশ গ্রহণ করে।
(v) লিপিডের সাথে গ্যালাক্টোজ যুক্ত হয়ে গ্যালাক্টোলিপিড গঠন করে।
(vi) গ্লাইকোলিপিড মানুষের রক্তের গ্রুপ সৃষ্টি করে।
(vii) তুলা ও সূর্যমুখীর বীজে এই লিপিড পাওয়া যায়।
(viii) ইহা নিউরনের মায়োলিন সিথ গঠন করে।
মোমের কাজ/গুরুত্ব
(i) মোম উদ্ভিদের কান্ড, পাতা, ফল ও ফুলের উপর পানি প্রতিরোধক স্তর হিসেবে কাজ করে।
(ii) মোম উদ্ভিদ অঙ্গের প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে।
(iii) মোম থেকে মোমবাতি তৈরী হয়।
(iv) ইহা প্রসাধনী শিল্পে ব্যবহার হয়।
(v) মোম আবৃত পালক ও লোম পানি প্রতিরোধী হয়।
(vi) পাতা ও কচি কান্ডে মোমের আবরণী প্রস্বেদন হ্রাস করে।
(vii) কোষপ্রাচীরে কিউটিন ও সুবেরিনের আবরণী তৈরী হয়। কিউটিন ও সুবেরিন হলো মোম জাতীয় পদার্থ।
(viii) ইহা ফল সংরক্ষণে ব্যবহার হয়।
মোমের বৈশিষ্ট্য
(i) মোম বর্ণহীন ও গন্ধহীন।
(ii) মোম পানিতে অদ্রবণীয়, কিন্তু জৈব দ্রাবকে দ্রবণীয়।
(iii) ইহা রাসায়নিক ভাবে নিষ্ক্রিয়।
(iv) সাধারণ তাপমাত্রায় মোম কঠিন অবস্থায় থাকে।
(v) এতে সম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিড থাকে।
(vi) ইহা পানি বিকর্ষী।
(vii) এর গলনাঙ্ক চর্বির চেয়ে বেশি।
মোম (Wax) কী?
উচ্চ আণবিক ওজন বিশিষ্ট ফ্যাটি এসিড ও মনোহাইড্রিক অ্যালকোহলের এস্টারকে মোম বলে। ফ্যাটি এসিডের কার্বন সংখ্যা ১৪-৩৬ এবং অ্যালকোহলের কার্বন সংখ্যা ১৬-৩৬। মোম পানিতে অদ্রবণীয়, কিন্তু জৈব দ্রাবকে দ্রবণীয়। ইহা রাসায়নিক ভাবে নিষ্ক্রিয়। সাধারণ তাপমাত্রায় কঠিন অবস্থায় থাকে। উদ্ভিদের কান্ড, পাতা, ফুল ও ফলের ত্বকে মোম থাকে। ব্রাজিলিয়ান পাম গাছ থেকে কারনোবা মোম উৎপন্ন হয়। বিভিন্ন ধরনের মোম হলো- ল্যানোলিন, মৌচাকের মোম, পালকের মোম, লোমের মোম, বিওয়াক্স, কারনোবা, সিবাম, সেরুমেন, সুবেরিন ইত্যাদি।
তেল ও চর্বির কাজ/গুরুত্ব
(i) তেল ও চর্বি শক্তির ঘনীভূত উৎস। শর্করা সরবরাহের ঘাটতিতে এরা শক্তির উৎস হিসেবে কাজ করে।
(ii) অ্যাডিপোজ কলায় বিদ্যমান চর্বিকোষ তাপের অপচয় রোধ করে এবং দেহের স্বাভাবিক তাপমাত্রা বজায় রাখে।
(iii) ভিটামিন A, D, E ও K চর্বিতে দ্রবণীয় ভিটামিন। তেল জাতীয় খাবার গ্রহণ করে এ সব ভিটামিনের চাহিদা পূরণ হয়।
(iv) তেল ও চর্বি দেহে ফ্যাটি এসিডের প্রধান উৎস। ইহা বিপাক ক্রিয়া ও গাঠনিক কাজ করে।
(v) উদ্ভিদের ফল ও বীজে সঞ্চিত চর্বি খাদ্য হিসেবে জমা থাকে।
(vi) বীজে সঞ্চিত তেল ও চর্বি শর্করায় রুপান্তরিত হয়ে বর্ধিঞ্চু ভ্রæণের পুষ্টি যোগায়।
(vii) চর্বি দেহে LDL-এর মাত্রা বৃদ্ধি করে হৃদরোগের ঝুকি বাড়ায়।
(viii) তেল দেহে LDL-এর মাত্রা কমিয়ে হৃদরোগের ঝুকি কমায়
সরল লিপিড (Simple Lipid)
যে সব লিপিডকে ভাঙ্গলে বা বিশ্লেষণ করলে ফ্যাটি এসিড ও গিøসারল ছাড়া অন্য কোন উপাদান পাওয়া যায় না তাদেরকে সরল লিপিড বলে। ইহা দুই প্রকার। এগুলো হলো-
১। ট্রাইগিøসারাইড বা স্নেহ দ্রব্যঃ ফ্যাটি এসিড ও গিøসারলের এস্টারকে স্নেহ দ্রব্য বলে। ইহা তিন অণু ফ্যাটি এসিড ও এক অণু গিøসারল দ্বারা গঠিত। তাই একে ট্রাইগিøসারাইড বলা হয়। অতিরিক্ত ট্রাইগিøসারাইড অ্যাথারোস্কে¬রোসিস রোগ সৃষ্টি করে যা হৃদরোগ ও স্ট্রোকের কারণ। ট্রাইগিøসারাইড দুই ভাগে বিভক্ত।
(i) তেলঃ যে সব ট্রাইগিøসারাইড অসম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিড দ্বারা গঠিত এবং সাধারণ তাপমাত্রায় (২০০ সে.) তরল অবস্থায় থাকে তাকে তেল বলে। এদের গলনাঙ্ক খুব কম, ৫০ সে. এর কাছাকাছি। উদ্ভিজ্জ চর্বি ও পাম অয়েল এর গলনাঙ্ক বেশি। নারিকেল তেল কম তাপমাত্রায় জমাট বাঁধে।
(ii) চর্বিঃ যে সব ট্রাইগিøসারাইড সম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিড দ্বারা গঠিত এবং সাধারণ তাপমাত্রায় (২০০ সে.) কঠিন অবস্থায় থাকে তাকে চর্বি বলে। এদের গলনাঙ্ক বেশি, ৭০০ সে. এর কাছাকাছি। যেমন- মাছের তেল, বাটার, ঘি, নারিকেল তেল, প্রাণীজ চর্বি, অলিভ অয়েল, পাম অয়েল ও চকোলেট।
কাজঃ উদ্ভিদের ফল ও বীজে তেল ও চর্বি সঞ্চিত খাদ্য হিসেবে জমা থাকে। অঙ্কুরোদগমের সময় তেল ও চর্বি কার্বোহাইড্রেটে রুপান্তরিত হয় এবং বর্ধিঞ্চু ভ্রƒণের খাদ্য যোগায়।
লিপিডের শ্রেণীবিভাগ (Classification of Lipid)
NaOH/KOH এর সাথে বিক্রিয়ার ভিত্তিতে লিপিড দুই ধরনের।
১। সাবানায়নঃ এই লিপিডে একটি কার্যকরী এস্টার গ্রুপ থাকে এবং ইহা ক্ষারীয় মাধ্যমে আর্দ্র বিশ্লেষিত হয়। যেমন-ট্রাইগিøসারাইড, ফসফোলিপিড, গ্লাইকোলিপিড, স্ফিংগোলিপিড, মোম ইত্যাদি।
২। অ-সাবানায়নঃ এই লিপিডে কার্যকরী এস্টার গ্রুপ থাকে না এবং ইহা ক্ষারীয় মাধ্যমে আর্দ্র বিশ্লেষিত হয় না। যেমন- টারপিন, প্রোস্টোগ্লান্ডেন স্টেরয়েড ইত্যাদি।
আণবিক গঠনের উপর ভিত্তি করে লিপিডকে পাঁচ ভাগে ভাগ করা হয়েছে।
১। নিউট্রাল লিপিড, ২। ফসফোলিপিড, ৩। গ্লাইকোলিপিড, ৪। টারপিনয়েডস্ ও ৫। মোম
লিপিডের রাসায়নিক পরীক্ষা
১। লিবারম্যান বারচারড পরীক্ষাঃ লিপিডকে ক্লোরোফর্মে দ্রবীভূত করে কয়েক ফোটা অ্যাসিটিক অ্যানহাইড্রাইড ও গাঢ় H2SO4 যোগ করলে প্রথমে লাল, পরে নীল এবং সবশেষে নীলাভ-সবুজ বর্ণ ধারণ করে।
২। সাকোস্কি পরীক্ষাঃ লিপিডকে ক্লোরোফর্মে দ্রবীভূত করে সমপরিমাণ গাঢ় H2SO4 যোগ করলে প্রথমে নীলাভ-লাল এবং পরে কালচে লাল বর্ণ ধারণ করে।