মাইটোসিস কোষ বিভাজন দুটি পর্যায়ে সম্পন্ন হয়। ক্যারিওকাইনেসিস ও সাইটোকাইনেসিস
ক্যারিওকাইনেসিস (Karyokinesis)
যে প্রক্রিয়ায় কোষের নিউক্লিয়াস বা ক্যারিওন-এর বিভাজন ঘটে তাকে ক্যারিওকাইনেসিস বলে। মাইটোসিস কোষ বিভাজন বলতে ক্যারিওকাইনেসিসকেই বুঝানো হয়ে থাকে। ১৮৭৯ সালে স্ট্রাসবুর্গার (Strasburger) এবং শ্লেইডেন (Schleicher) নিউক্লিয়াসের বিভাজন আবিষ্কার করেন এবং নাম দেন ক্যারিওকাইনেসিস। ক্যারিওকাইনেসিসকে পাঁচটি পর্যায়ে ভাগ করা হয়েছে। এগুলো হলো-
১। প্রোফেজ (Prophage)ঃ গ্রীক শব্দ pro অর্থ আদি এবং phage অর্থ দশা নিয়ে Prophage শব্দটি গঠিত।ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স
প্রোফেজ হলো মাইটোসিস কোষ বিভাজনের প্রথম এবং সর্বাপেক্ষা দীর্ঘস্থায়ী পর্যায়। এ পর্যায়ে কোষের নিউক্লিয়াস আকারে বড় হতে থাকে। ক্রোমোসোম গুলোর মধ্যে পানি বিয়োজন বা পানি ত্যাগ (dehydration) আরম্ভ হয়। ক্রোমোসোম গুলোর রং বা রঞ্জক ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। CDK যৌগ প্রোটিনের ফসফোরাইলেশন ঘটায় বলে ক্রোমোসোম ধীরে ধীরে সংকুচিত হতে থাকে। ফলে ক্রোমোসোম গুলো ক্রমাগত খাটো, মোটা ও দৃষ্টি গোচর হয়। এ পর্যায়ের শেষের দিকে প্রতিটি ক্রোমোসোম সেন্ট্রোমিয়ার ব্যতীত লম্বালম্বি ভাবে বিভক্ত হয়ে দুইটি করে ক্রোমাটিড সৃষ্টি করে। স্পাইরালাইজেশন প্রক্রিয়ায় ক্রোমোসোমের ক্রোমাটিড দুটি স্প্রিং এর মতো প্যাঁচিয়ে মোটা ও খাটো হয়। প্রোটিনের ফসফোরাইলেশনের কারণে নিউক্লিয়ার মেমব্রেন বা এনভেলপ এবং নিউক্লিওলাস বিলুপ্ত হতে থাকে। এ পর্যায়ে স্পিন্ডলযন্ত্র সৃষ্টির সূচনা ঘটে।
২। প্রোমেটাফেজঃ গ্রীক শব্দ pro অর্থ আদি, meta অর্থ মধ্যবর্তী এবং phage অর্থ দশা নিয়ে Prometaphage শব্দটি গঠিত। প্রোফেজ ও মেটাফেজের মধ্যবর্তী পর্যায়কে প্রোমেটাফেজ বলে।ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স
প্রোমেটাফেজ পর্যায়ে নিউক্লিয়ার মেমব্রেন ও নিউক্লিওলাস সম্পূর্ণরুপে বিলুপ্ত হয়ে যায়। ক্রোমোসোমগুলো আরও সংকুচিত, মোটা ও খাটো হতে থাকে। প্রাণীকোষে সেন্ট্রিওল থেকে এবং উদ্ভিদকোষে মাইক্রোটিউবিউলস্ থেকে স্পিন্ডল যন্ত্র সৃষ্টি হয়। স্পিন্ডলযন্ত্র গুলো প্রোটিন নির্মিত এবং দুই মেরু বিশিষ্ট। স্পিন্ডল যন্ত্রের মধ্যবর্তী স্থানকে ইকুয়েটর/বিষুবীয়/নিরপেক্ষ/মধ্যবর্তী অঞ্চল বলে। উভয় মেরুকে মেরু অঞ্চল বলে। স্পিন্ডল যন্ত্র গুলো দুই ধরনের। স্পিন্ডল তন্তু এবং আকর্ষণ তন্তু। যে স্পিন্ডল যন্ত্র গুলো এক মেরু থেকে অপর মেরু পর্যন্ত বিস্তৃত থাকে তাকে স্পিন্ডল ফাইবার বা তন্তু বলে। যে স্পিন্ডল যন্ত্র গুলোর সাথে ক্রোমোসোম যুক্ত থাকে তাকে আকর্ষণ তন্তু বা ক্রোমোজোমাল তন্তু বা ট্র্যাকশন ফাইবার বলে। সেন্ট্রোমিয়ারের কাইনেটোকোরের মটর প্রোটিনের সাথে আকর্ষণ তন্তু যুক্ত হয়। ক্রোমোসোম আকর্ষণতন্তুর সাথে যুক্ত হয়ে ক্রোমোসোমীয় নৃত্য প্রদর্শন করে। প্রাণী কোষে স্পিন্ডল যন্ত্রের দুমেরুতে সেন্ট্রিওল থেকে অ্যাস্টার তন্তু সৃষ্টি হয়।ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স
৩। মেটাফেজ (Metaphage)ঃ গ্রীক শব্দ meta অর্থ মধ্যবর্তী এবং phage অর্থ দশা নিয়ে Metaphage শব্দটি গঠিত। মাইটোসিস কোষ বিভাজনের মধ্যবর্তী দশাকে মেটাফেজ বলে।
মেটাফেজ হলো একটি স্বল্প স্থায়ী পর্যায়। কনডেনসেশন প্রক্রিয়ায় ক্রোমোজোমগুলো সবচেয়ে বেশি সংকুচিত, মোটা ও খাটো হয়। এ পর্যায়ে ক্রোমোসোমের কয়েলিং-কে সুপার কয়েলিং বলা হয়। ক্রোমোসোম গুলো বিষুবীয় অঞ্চলে অবস্থান করে। বিষুবীয় অঞ্চলে ক্রোমোসোম গুলোর অবস্থান একটি প্লেটের মতো দেখায়। একে বিষুবীয় প্লেট বা মেটাফেজ প্লেট বলে। মেটাফেজ প্লেটে ছোট ক্রোমোসোমগুলো ভিতরের দিকে এবং বড় ক্রোমোসোমগুলো বাইরের দিকে সজ্জিত থাকে। ক্রোমোসোম গুলোর বিষুবীয় অঞ্চলে বিন্যস্ত হওয়ার প্রক্রিয়াকে মেটাকাইনেসিস বলে। মেটাফেজ পর্যায়ের শেষের দিকে প্রতিটি ক্রোমোসোমের সেন্ট্রোমিয়ার বিভক্ত হয়ে দুটি করে অপত্য সেন্ট্রোমিয়ার সৃষ্টি করে।ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স
৪। অ্যানাফেজ (Anaphage)ঃ গ্রীক শব্দ ana অর্থ গতি এবং phage অর্থ দশা নিয়ে Anaphage শব্দটি গঠিত। অ্যানাফেজ হলো সর্বাপেক্ষা স্বল্পস্থায়ী পর্যায়। এ দশায় ক্রোমোসোম গুলো স্ব স্ব মেরুমুখী গমন করে বলে একে গতির পর্যায় বলা হয়।
অ্যানাফেজ পর্যায়ে কোষে অপত্য ক্রোমোসোম সংখ্যা মাতৃকোষের দ্বিগুণ হয়। একই ক্রোমোসোম থেকে সৃষ্ট সমধর্মী অপত্য ক্রোমোসোম গুলো পরস্পরকে বিকর্ষণ করে। আর্কষণ তন্তুর সঙ্কোচন এবং কান্ড দেহের প্রসারণের ফলেই ক্রোমোসোম গুলো গতি প্রাপ্ত হয়। ক্রোমোসোম গুলো বিপরীত মেরুর দিকে ধাবিত হয়। অপত্য ক্রোমোসোম গুলোর মধ্যে অর্ধেক সংখ্যক এক মেরুর দিকে এবং বাকি অর্ধেক সংখ্যক অন্য মেরুর দিকে ধাবিত হয়। মেরু চলনের সময় সেন্ট্রোমিয়ার অগ্রগামী এবং বাহুদ্বয় অনুগামী হয়। ক্রোমোসোমের এরুপ মেরু চলনকে ক্রোমোসোমীয় চলন বা অ্যানাফেজীয় চলন বলে। প্রাণিকোষে মাকুতন্তুগুলো মিলিত হয়ে ইন্টারজোনাল ফাইবার বা স্টেমবডি গঠন করে। স্টেমবডি ক্রোমোসোমগুলোকে মেরুর দিকে চলনে সাহায্য করে। ক্রোমোসোমগুলো মেরু অঞ্চলে ইংরেজি V, L, J বা I অক্ষরের মতো আকার ধারণ করে। অপত্য ক্রোমোসোম গুলো মেরুর কাছাকাছি পৌঁছালে অ্যানাফেজ বা গতির দশার পরিসমাপ্ত ঘটে।
৫। টেলোফেজ (Telophage)ঃ গ্রীক শব্দ telo অর্থ শেষ এবং phage অর্থ দশা নিয়ে Telophage শব্দটি গঠিত। মাইটোসিস কোষ বিভাজনের শেষ দশা হলো টেলোফেজ। একে অন্তঃপর্যায়ও বলা হয়।ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স
টেলোফেজ দশায় প্রোফেজ দশার বিপরীত অবস্থা ঘটে। ক্রোমোসোম গুলো বিপরীত দুই মেরুতে স্থির ভাবে অবস্থান করে। ক্রোমোসোম গুলোর মধ্যে পানি যোজন বা পানি শোষণ (hydration) শুরু হয়। ফলে ক্রোমোসোমের রং বা রঞ্জক ধারণ ক্ষমতা কমে যায়। ডি-কনডেনসেশন প্রক্রিয়ায় ক্রোমোসোম গুলোর কুন্ডলী বা প্যাঁচ খুলে যায়, সরু ও লম্বা হয় এবং নিউক্লিওজালিকা গঠন করে। স্পিন্ডলযন্ত্র গুলোর কাঠামো ভেঙ্গে যায় এবং ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যায়। নিউক্লিয়ার মেমব্রেন ও নিউক্লিওলাস-এর পুনঃআবির্ভাব ঘটে। প্রতিটি অপত্য নিউক্লিয়াসের ক্রোমোসোম সংখ্যা মাতৃ নিউক্লিয়াসের ক্রোমোসোম সংখ্যার সমান থাকে। টেলোফেজ পর্যায়ের শেষের দিকে বিষুবীয় অঞ্চল বরাবর উদ্ভিদ কোষে কোষপ্লেট এবং প্রাণীকোষে কোষঝিল্লিতে খাঁজ সৃষ্টি হয়।
সাইটোকাইনেসিস (Cytokinesis)
যে প্রক্রিয়ায় কোষের সাইটোপ্লাজমের বিভাজন ঘটে তাকে সাইটোকাইনেসিস বলে। টেলোফেজ পর্যায়ের শেষের দিকে সাইটোকাইনেসিস ঘটে। উদ্ভিদকোষ এবং প্রাণীকোষে সাইটোকাইনেসিসে ভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়।ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স
১। উদ্ভিদকোষে সাইটোকাইনেসিসঃ টেলোফেজ পর্যায়ের শেষের দিকে কোষের স্পিন্ডল যন্ত্রের বিষুবীয় অঞ্চল ধীরে ধীরে প্রশস্ত হয়ে কোষ প্রাচীরকে স্পর্শ করে। এরপর স্পিন্ডল যন্ত্র গুলো অদৃশ্য হয়ে যায়। কোষের বিষুবীয় অঞ্চলে লাইসোসোমের মতো ফ্র্যাগমোজম জমা হয়। পরে ফ্র্যাগমোজম গুলো মিলিত হয়ে প্লাজমালেমা বা কোষঝিল্লি গঠন করে। প্লাজমালেমার উপরে বিভিন্ন ধরনের পদার্থ জমা হয়ে কোষ প্লেটে পরিনত হয়। কোষ প্লেটের উপর সেলুলোজ, হেমিসেলুলোজ, পেকটিন এবং অন্যান্য দ্রব্য জমা হয়ে কোষপ্রাচীর গঠন করে। কোষপ্রাচীর গঠিত হলে সাইটোপ্লাজম দুভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। ফলে দুইটি নতুন কোষ সৃষ্টি হয়।ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স
২। প্রাণীকোষে সাইটোকাইনেসিসঃ টেলোফেজ পর্যায়ের শেষের দিকে বিষুবীয় তল বরাবর কোষঝিল্লি উভয়দিক থেকে ভিতরে প্রবেশ করে এবং একটি ক্লিভেজ খাঁজ সৃষ্টি করে। অ্যাকটিন প্রোটিন ও মায়োসিন প্রোটিন কোষঝিল্লির খাঁজ সৃষ্টিতে সাহায্য করে। কোষের সাইটোপ্লাজম পরিধি থেকে আড়াআড়ি মধ্যরেখা বরাবর সংকুচিত হতে শুরু করে। এই সঙ্কোচন ক্রমশ প্রসারিত হয়ে সাইটোপ্লাজম দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। ফলে দুইটি নতুন কোষ সৃষ্টি হয়।ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স
মুক্ত নিউক্লিয়ার বিভাজন (Free nuclear division-FND)
সাইটোকাইনেসিস না ঘটলে ক্যারিওকাইনেসিসের মাধ্যমে একই কোষে বহু নিউক্লিয়াস সৃষ্টি হয়। একে Free nuclear division বা মুক্ত প্রাণকেন্দ্রীয় বিভাজন বলে। ডাবের পানি (তরল এন্ডোস্পার্ম) মুক্ত নিউক্লিয়াস বিভাজনের ফসল। শৈবাল ও ছত্রাকের বহুনিউক্লিয়াসযুক্ত কোষকে সিনোসাইটিক, স্লাইম মোল্ডের বহুনিউক্লিয়াসযুক্ত কোষকে প্লাজমোডিয়াম এবং প্রাণীর বহুনিউক্লিয়াসযুক্ত কোষকে সিনসাইটিয়াম বলে।
অনিয়ন্ত্রিত মাইটোসিস বা ক্যান্সার
কোষের বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন ধরনের ফ্যাক্টরের কারণে অনিয়ন্ত্রিত মাইটোসিস কোষ বিভাজন ঘটে। অনিয়ন্ত্রিত মাইটোসিস ঘটলে দেহে টিউমার ও ক্যান্সার সৃষ্টি হয়। টিউমার সৃষ্টির প্রক্রিয়াকে অঙ্কোজেনেসিস বলে। অনিয়ন্ত্রিত মাইটোসিস বা ক্যান্সার সৃষ্টির কারণ উল্লেখ করা হলো।
১। কোষচক্র নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাঃ কোষচক্রের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় ক্রটি বা বিচ্যুতি ঘটলে কোষের অনিয়ন্ত্রিত সংখ্যা বৃদ্ধি ঘটে এবং টিউমার বা ক্যান্সার সৃষ্টি হয়।
(i) কোষে সাইক্লিন-CDK যৌগের নিয়ন্ত্রণ বিনষ্ট হলে অনিয়ন্ত্রিত মাইটোসিস হয় এবং ক্যান্সার সৃষ্টি হয়।
(ii) কোষের DNA ক্ষতিগ্রস্ত হলে p53 প্রোটিন কোষ চক্র বন্ধ করে দেয়। কোন কারণে p53 প্রোটিন defective হলে কোষচক্র নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। ফলে ক্যান্সার সৃষ্টি হয়। মানুষের অধিক হারে ক্যান্সার সৃষ্টির সম্ভবত এটি একটি কারণ।ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স
(iii) কোষ বিভাজনের জন্য কিছু গ্রোথ ফ্যাক্টর কাজ করে। ক্যান্সার কোষ নিজেই গ্রোথ ফ্যাক্টর তৈরী করে। এ কারণে কোষ বিভাজন দ্রæত হয় এবং ক্যান্সার সৃষ্টি হয়।
(iv) কোষচক্র নিয়ন্ত্রণকারী দুই ধরনের প্রোটিন হলো কাইনেজ প্রোটিন ও সাইক্লিন প্রোটিন। কাইনেজ প্রোটিন ও সাইক্লিন প্রোটিন কোষচক্র নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে ক্যান্সার সৃষ্টি হয়।
২। প্রোটো-অনকোজিনঃ যে সব জিন দেহে পজিটিভ কোষচক্র নিয়ন্ত্রক সৃষ্টি করে তাদেরকে প্রোটো-অনকোজিন বলে। প্রোটো-অনকোজিন মিউটেশনের কারণে অনকোজিনে (Oncogene) পরিনত হয়। Oncogene এর কারণে কোষচক্র নষ্ট হয়ে যায় এবং ক্যান্সার সৃষ্টি হয়। CDK একটি প্রোটো-অনকোজিন।ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স
৩। প্যাপিলোমা ভাইরাসঃ বিভিন্ন প্রকার প্যাপিলোমা ভাইরাস ক্যান্সার রোগ সৃষ্টিতে সহায়তা করে। প্যাপিলোমা ভাইরাসে B6 ও B7 জিন থাকে। এই জিন কোষ বিভাজন নিয়ন্ত্রক প্রোটিন দু’টিকে স্থানচ্যুত করে। এতে স্বাভাবিক কোষ বিভাজন ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। ফলে টিউমার সৃষ্টি হয় যা পরে ক্যান্সার হতে পারে।
৪। টিউমার সাপ্রেসর জিনঃ টিউমার সাপ্রেসর জিন হলো নেগেটিভ কোষচক্র নিয়ন্ত্রক সৃষ্টিকারী জিন। ইহা কোষের অনিয়ন্ত্রিত সংখ্যা বৃদ্ধি রোধ করে। দেহে টিউমার ও ক্যান্সার সৃষ্টি বন্ধ করে।ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স
৫। কারসিনোজেনিক এজেন্টঃ যে সব উপাদান বা এজেন্ট দেহে ক্যান্সার সৃষ্টি করে তাদেরকে কারসিনোজেনিক এজেন্ট বলে। অতিবেগুনি আলোকরশ্মি, সিগারেটের টার, এক্স-রে প্রভৃতি কারসিনোজেনিক এজেন্ট। এসব পদার্থ জিনের মিউটেশন বা পরিবর্তন ঘটায়। মিউটাজেনিক জিন ক্যান্সার সৃষ্টি করে।
৬। মেটাস্ট্যাসিসঃ দেহের বিভিন্ন অংশে ক্যান্সার সৃষ্টিকারী কোষ ছড়িয়ে পড়াকে মেটাস্ট্যাসিস বলে। ক্যান্সার সৃষ্টিকারী ম্যালিগন্যান্ট টিউমার কোষ রক্ত ও লসিকা দ্বারা দেহের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে এবং নতুন ভাবে টিউমার সৃষ্টি করে। Metastasis এর কারণে ক্যান্সার সৃষ্টি ত্বরান্বিত হয়।ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স
৭। কোষের মৃত্যুঃ কোষের মৃত্যু দুটি উপায়ে ঘটে। নেক্রোসিস ও অ্যাপোপটোসিস। পুষ্টি উপাদানের অভাব অথবা বিষাক্ত পদার্থের কারণে কোষের মৃত্যু হলে তাকে নেক্রোসিস বলে। অ্যাপোপটোসিস প্রক্রিয়ায় দেহের অপ্রয়োজনীয় কোষ বা অঙ্গের মৃত্যু ঘটে। মানুষের আঙ্গুলের মাঝখানের টিস্যুর বিলুপ্তি বা মৃত্যু হলো অ্যাপোপটোসিস। অ্যাপোপটোসিসের কারণে লোহিত রক্তকণিকা, শে^ত রক্তকণিকা ও অণুচক্রিকা নির্দিষ্ট সময় পর মারা যায়।ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স
৮। ক্যান্সারঃ Cancer শব্দের অর্থ হলো crab বা কাঁকড়া। ক্যান্সার কোষ চারিদিকে ছড়িয়ে পড়লে কাঁকড়ার সাঁড়াসি পায়ের মতো দেখায়। ক্যান্সার কোষে সাইক্লিন- cdk এর নিয়ন্ত্রণ বিনষ্ট হয়ে যায়। ক্যান্সার কোষ তাদের গ্রোথ ফ্যাক্টর নিজেরাই তৈরী করে অথবা কোষ বিভাজনের জন্য গ্রোথ ফ্যাক্টর দরকার হয় না। তাই ক্যান্সার সৃষ্টির সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
৯। মাইটোটিক ইনডেক্সঃ কোন টিস্যুতে বিদ্যমান মোট কোষের সংখ্যা এবং মাইটোসিস বিভাজনরত কোষের সংখ্যার অনুপাতকে মাইটোটিক ইনডেক্স (MI) বলে। ক্যান্সার সৃষ্টিকারী কোষের মাইটোটিক ইনডেক্স স্বাভাবিক কোষের চেয়ে অনেক বেশি থাকে।
কোষের মৃত্যু (Death of Cell)
বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ কারণে কোষের জীবন অবসান হওয়াকে মৃত্যু বলে। প্রতিদিন মানবদেহে লক্ষ লক্ষ কোষের মৃত্যু ঘটে। কোষের মৃত্যু দু’টি উপায়ে ঘটে। নেক্রোসিস ও অ্যাপোপটোসিস।
১। নেক্রোসিস (Necrosis)ঃ পুষ্টি উপাদানের অভাব অথবা বিষাক্ত পদার্থের কারণে কোষের মৃত্যু হলে তাকে নেক্রোসিস বলে। মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট ও ম্যাক্রোনিউট্রিয়েন্ট এর এক বা একাধিক উপাদানের অভাবে কোষ মারা যেতে পারে। বিভিন্ন উপায়ে দেহে বিষাক্ত পদার্থ প্রবেশ করে, রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে বিষাক্ত পদার্থ উৎপন্ন হয় এবং অতিরিক্ত ওষুধ বিষাক্ত পদার্থ হিসেবে জমা থাকে। এসব বিষাক্ত পদার্থ কোষের মৃত্যুর কারণ হতে পারে।ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স
২। অ্যাপোপটোসিস (Apoptosis)ঃ অ্যাপোপটোসিস হলো জেনেটিক্যাল নিয়ন্ত্রণঘটিত মৃত্যু। এ প্রক্রিয়ায় দেহের অপ্রয়োজনীয় কোষ বা অঙ্গের মৃত্যু ঘটে। মানুষের আঙ্গুলের মাঝখানের টিস্যুর বিলুপ্তি বা মৃত্যু হলো অ্যাপোপটোসিস। অ্যাপোপটোসিসের কারণে লোহিত রক্তকণিকা, শে^ত রক্তকণিকা ও অণুচক্রিকা নির্দিষ্ট সময় পর মারা যায়। এসব কোষ দীর্ঘদিন বেঁচে থাকলে ক্যান্সার হতে পারে। মানবদেহে অ্যাপোপটোসিসের ভূমিকা হলো-
(i) ভ্রুণীয় বিকাশের সময় হাতের আঙ্গুলের পৃথকীকরণ অ্যাপোপটোসিসের মাধ্যমে হয়।
(ii) অ্যাপোপটোসিসের কারণে দেহের পৃষ্ঠীয় নিউরাল নালি বন্ধ হয়।
(iii) অ্যাপোপটোসিসের মাধ্যমে লুপ্তপ্রায় অঙ্গের অবশিষ্টাংশ (প্রো-নেফ্রন) দেহ থেকে অপসারিত হয়।
(iv) ভ্রুণের লিঙ্গ নির্ধারণের সময় অ্যাপোপটোসিসের মাধ্যমে উলফিয়ান নালি (wolffian ducts) অপসারিত হয়।
(v) ভ্রুণীয় বিকাশের সময় নাভিরজ্জু ও থলীর মাঝখানের অবশিষ্ট টিস্যু অ্যাপোপটোসিসের মাধ্যমে অপসারিত হয়।ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স
মাইটোসিস কোষ বিভাজনের গুরুত্ব
১। দেহ গঠন ও দৈহিক বৃদ্ধিঃ মাইটোসিস কোষ বিভাজনের মাধ্যমে জীবদেহে কোষের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। এতে জীবের দেহ গঠিত হয় এবং দৈহিক বৃদ্ধি ঘটে।
২। বংশ বৃদ্ধিঃ স্পার্মাটোসিস ও উওজেনেসিস প্রক্রিয়ায় মাইটোসিসের মাধ্যমে জনন কোষের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। নি¤œ শ্রেণীর উদ্ভিদ মাইটোসিস বিভাজন দ্বারা বংশবৃদ্ধি করে। Chlamydomonas ও Chlorella এর বংশবৃদ্ধি ঘটে মাইটোসিসের মাধ্যমে।
৩। ক্রোমোসোমের সমতা বা নিত্যতাঃ মাইটোসিস কোষ বিভাজন না ঘটলে জীবের দেহকোষে ক্রোমোসোম সংখ্যা সমান হবে না। এতে জীবের দেহে মাতৃ গুণাগুণ অক্ষুন্ন থাকবে না।
৪। নিউক্লিয়াস ও সাইটোপ্লাজমের ভারসাম্য রক্ষাঃ মাইটোসিস প্রক্রিয়ায় জীবদেহের সাইটোপ্লাজম ও নিউক্লিয়াসের বিভাজন একবার হয়। ফলে সমতা বজায় থাকে। তাই নিউক্লিয়াস ও সাইটোপ্লাজমের ভারসাম্য রক্ষা পায় (NP index = Nucleoplasmic index)।
৫। অঙ্গজ জননঃ মাইটোসিস বিভাজনের মাধ্যমে কাটিং, লেয়ারিং, গ্রাফটিং প্রভৃতি অঙ্গজ জননে মূল উৎপন্ন হয়।ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স
৬। ক্ষতস্থান পূরণঃ জীবদেহের কোথায়ও ক্ষত সৃষ্টি হলে মাইটোসিসের মাধ্যমে তা পুরণ হয়। কিন্তু মাইটোসিস না ঘটলে উহা কখনো পুরণ হবে না।
৭। পুনরুৎপাদনঃ জীবদেহে বিদ্যমান কোন কোন কোষের আয়ুকাল সীমিত। এ সব কোষ নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর মাইটোসিস প্রক্রিয়ায় বার বার উৎপন্ন হয়।
৮। নির্দিষ্ট আকার-আয়তনঃ মাইটোসিস কোষ বিভাজন দ্বারা জীবদেহের আকার ও আয়তন সুনির্দিষ্ট হয়।ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স
৯। জননাঙ্গ সৃষ্টি ও জনন কোষের সংখ্যা বৃদ্ধিঃ মাইটোসিস কোষ বিভাজনের মাধ্যমে বহুকোষী জীবের জননাঙ্গ সৃষ্টি হয়। জনন কোষের সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য এই প্রক্রিয়া আবশ্যক।ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স
১০। গুণগত বৈশিষ্ট্যের স্থিতিশীলতা রক্ষাঃ মাইটোসিস কোষ বিভাজনের মাধ্যমে সৃষ্ট অপত্য কোষের গুণাগুণ মাতৃকোষের অনুরুপ হয়। অর্থাৎ গুণাগুণের কোন পরিবর্তন ঘটে না। তাই জীবজগতে গুণগত বৈশিষ্ট্য স্থিতিশীল থাকে।
১১। ক্যান্সার সৃষ্টিঃ অনিয়ন্ত্রিত মাইটোসিস কোষ বিভাজনকে নিউপ্লাসিয়া (neoplasia) বলে। নিউপ্লাসিয়ায় সৃষ্ট কোষ একটি স্থানে সীমাবদ্ধ থাকলে তাকে বিনাইন নিউপ্লাসিয়া বলে। সৃষ্ট কোষগুলো দেহের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়লে তাকে ম্যালিগন্যান্ট নিউপ্লাসিয়া বলে। নিউপ্লাসিয়ার কারণে ক্যান্সার ও টিউমার সৃষ্টি হয়।
১২। ক্রমাগত ক্ষয় পূরণঃ যে সব কোষের আয়ুষ্কাল নির্দিষ্ট সেগুলো নষ্ট হয়ে গেলে মাইটোসিসের মাধ্যমে ক্ষয় পূরণ হয়। মাইটোসিসের মাধ্যমে পুরনো ও ক্ষতিগ্রস্ত কোষের প্রতিস্থাপন ঘটে।
১৩। জিনগত সাম্যতা রক্ষাঃ মাইটোসিস কোষ বিভাজনে কোষের গুণাগুণ অক্ষুন্ন থাকে এবং জিনগত কোন পরিবর্তন ঘটে না। ফলে কোষের জেনেটিক সাম্যতা বা স্থিরতা বজায় থাকে।ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স
১৪। সুশৃঙ্খল বৃদ্ধিঃ মাইটোসিস কোষ বিভাজনের মাধ্যমে দেহের সুশৃঙ্খল বৃদ্ধি ঘটে। এতে অপত্য কোষের ক্রোমোসোম সংখ্যা ও গুণাগুণ একই রকম থাকে বলে জীবদেহের বৃদ্ধি সুশৃঙ্খল ভাবে হয়ে থাকে।
১৫। লোহিত রক্তকণিকা উৎপাদনঃ লোহিত রক্তকণিকার আয়ুকাল ১২০ দিন। মাইটোসিস প্রক্রিয়ায় অস্থিমজ্জা ও যকৃত থেকে লোহিত রক্তকণিকা উৎপন্ন হয়।
১৬। রাসায়নিক ভারসাম্যঃ মাইটোসিস প্রক্রিয়ায় সৃষ্ট অপত্য কোষের ক্রোমোসোম সংখ্যা সমান থাকে বলে নিউক্লিক এসিড, প্রোটিন ও অন্যান্য রাসায়নিক পদার্থের ভারসাম্য বজায় থাকে।ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স
১৭। অনিয়ন্ত্রিত মাইটোসিসঃ অনিয়ন্ত্রিত মাইটোসিস জীবদেহে টিউমার ও ক্যান্সার সৃষ্টি করে।
নতুন বংশধর সৃষ্টিতে মাইটোসিসের ভূমিকা
১। স্পার্মাটোসিস ও উওজেনেসিস প্রক্রিয়ায় মাইটোসিসের মাধ্যমে জনন কোষের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়।ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স
২। নিম্নশ্রেণীর উদ্ভিদ মাইটোসিস কোষ বিভাজন দ্বারা বংশবৃদ্ধি করে। Chlamydomonas ও Chlorella এর বংশবৃদ্ধি ঘটে মাইটোসিসের মাধ্যমে।
৩। মাইটোসিস বিভাজনের মাধ্যমে কাটিং, লেয়ারিং, গ্রাফটিং প্রভৃতি অঙ্গজ জননে মূল উৎপন্ন হয়।ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স
৪। মাইটোসিস কোষ বিভাজনে মাধ্যমে বহুকোষী জীবের জননাঙ্গ সৃষ্টি হয়। জনন কোষের সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য এই প্রক্রিয়া আবশ্যক।
জীবদেহের বৃদ্ধিতে মাইটোসিসের ভূমিকা
১। সকল ভ্রƒণকোষ মাইটোসিস প্রক্রিয়ায় বিভাজিত হয়ে বহুকোষী উদ্ভিদ বা প্রাণীতে পরিনত হয়। মাইটোসিস ব্যতীত ভ্রæণ হতে পরিনত জীব সৃষ্টি হয় না।ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স
২। জীবদেহের বিভিন্ন অঙ্গের বিকাশ ও বৃদ্ধি মাইটোসিস প্রক্রিয়ায় ঘটে।
৩। বহুকোষী জীবের সকল অঙ্গের বিভাজন মাইটোসিসের মাধ্যমে ঘটে।
৪। মাইটোসিস প্রক্রিয়ায় উদ্ভিদের মূল, কান্ড ও পাতা বৃদ্ধি লাভ করে।
৫। মাইটোসিস বিভাজনের মাধ্যমে কাটিং, লেয়ারিং, গ্রাফটিং প্রভৃতি অঙ্গজ জননে মূল উৎপন্ন হয়।
মাইটোটিক ইনডেক্স (Mitotic Index)
কোন টিস্যুর মোট কোষের সংখ্যা এবং মাইটোসিস বিভাজনের কোষের সংখ্যার অনুপাতকে মাইটোটিক ইনডেক্স বা MI বলে।
মাইটোটিক ইনডেক্স এর গুরুত্ব বা ভূমিকাঃ মাইটোটিক ইনডেক্স চিকিৎসা ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। চিকিৎসার জন্য চিকিৎসককে মাইটোটিক ইনডেক্স জানা অতি প্রয়োজন। MI থেকে জানা যায় টিউমার বা ক্যান্সার কত তাড়াতাড়ি বৃদ্ধি পাচ্ছে। উচ্চ MI থেকে বুঝা যায় টিউমার বা ক্যান্সার দ্রæত বৃদ্ধি পাচ্ছে। MI জানার পর রোগীর চিকিৎসার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স