মাইটোসিস কোষ বিভাজন ।। মেটাফেজ ।। Metaphage

গ্রীক শব্দ meta অর্থ মধ্যবর্তী এবং phage অর্থ দশা নিয়ে Metaphage শব্দটি গঠিত। মাইটোসিস কোষ বিভাজনের মধ্যবর্তী দশাকে মেটাফেজ বলে।

মেটাফেজ হলো একটি স্বল্প স্থায়ী পর্যায়। কনডেনসেশন প্রক্রিয়ায় ক্রোমোজোমগুলো সবচেয়ে বেশি সংকুচিত, মোটা ও খাটো হয়। এ পর্যায়ে ক্রোমোসোমের কয়েলিং-কে সুপার কয়েলিং বলা হয়। ক্রোমোসোম গুলো বিষুবীয় অঞ্চলে অবস্থান করে। বিষুবীয় অঞ্চলে ক্রোমোসোম গুলোর অবস্থান একটি প্লেটের মতো দেখায়। একে বিষুবীয় প্লেট বা মেটাফেজ প্লেট বলে। মেটাফেজ প্লেটে ছোট ক্রোমোসোমগুলো ভিতরের দিকে এবং বড় ক্রোমোসোমগুলো বাইরের দিকে সজ্জিত থাকে। ক্রোমোসোম গুলোর বিষুবীয় অঞ্চলে বিন্যস্ত হওয়ার প্রক্রিয়াকে মেটাকাইনেসিস বলে। মেটাফেজ পর্যায়ের শেষের দিকে প্রতিটি ক্রোমোসোমের সেন্ট্রোমিয়ার বিভক্ত হয়ে দুটি করে অপত্য সেন্ট্রোমিয়ার সৃষ্টি করে।

মাইটোসিস কোষ বিভাজন ।। প্রোমেটাফেজ ।। Prometaphage

গ্রীক শব্দ pro অর্থ আদি, meta অর্থ মধ্যবর্তী এবং phage অর্থ দশা নিয়ে Prometaphage শব্দটি গঠিত। প্রোফেজ  ও মেটাফেজের মধ্যবর্তী পর্যায়কে প্রোমেটাফেজ বলে।

প্রোমেটাফেজ পর্যায়ে নিউক্লিয়ার মেমব্রেন ও নিউক্লিওলাস সম্পূর্ণরুপে বিলুপ্ত হয়ে যায়। ক্রোমোসোমগুলো আরও সংকুচিত, মোটা ও খাটো হতে থাকে। প্রাণীকোষে সেন্ট্রিওল থেকে এবং উদ্ভিদকোষে মাইক্রোটিউবিউলস্ থেকে স্পিন্ডল যন্ত্র সৃষ্টি হয়। স্পিন্ডলযন্ত্র গুলো প্রোটিন নির্মিত এবং দুই মেরু বিশিষ্ট। স্পিন্ডল যন্ত্রের মধ্যবর্তী স্থানকে ইকুয়েটর/বিষুবীয়/নিরপেক্ষ/মধ্যবর্তী অঞ্চল বলে। উভয় মেরুকে মেরু অঞ্চল বলে। স্পিন্ডল যন্ত্র গুলো দুই ধরনের। স্পিন্ডল তন্তু এবং আকর্ষণ তন্তু। যে স্পিন্ডল যন্ত্র গুলো এক মেরু থেকে অপর মেরু পর্যন্ত বিস্তৃত থাকে তাকে স্পিন্ডল ফাইবার বা তন্তু বলে। যে স্পিন্ডল যন্ত্র গুলোর সাথে ক্রোমোসোম যুক্ত থাকে তাকে আকর্ষণ তন্তু বা ক্রোমোজোমাল তন্তু বা ট্র্যাকশন ফাইবার বলে। সেন্ট্রোমিয়ারের কাইনেটোকোরের মটর প্রোটিনের সাথে আকর্ষণ তন্তু যুক্ত হয়। ক্রোমোসোম আকর্ষণতন্তুর সাথে যুক্ত হয়ে ক্রোমোসোমীয় নৃত্য প্রদর্শন করে। প্রাণী কোষে স্পিন্ডল যন্ত্রের দুমেরুতে সেন্ট্রিওল থেকে অ্যাস্টার তন্তু সৃষ্টি হয়।

মাইটোসিস কোষ বিভাজন ।। প্রোফেজ ।। Prophage

মাইটোসিস কোষ বিভাজন প্রক্রিয়া (Process of mitosis cell division)

মাইটোসিস কোষ বিভাজন দুটি পর্যায়ে সম্পন্ন হয়। ক্যারিওকাইনেসিস ও সাইটোকাইনেসিস

 

ক্যারিওকাইনেসিস (Karyokinesis)

যে প্রক্রিয়ায় কোষের নিউক্লিয়াস বা ক্যারিওন-এর বিভাজন ঘটে তাকে ক্যারিওকাইনেসিস বলে। মাইটোসিস কোষ বিভাজন বলতে ক্যারিওকাইনেসিসকেই বুঝানো হয়ে থাকে। ১৮৭৯ সালে স্ট্রাসবুর্গার (Strasburger) এবং শ্লেইডেন (Schleicher) নিউক্লিয়াসের বিভাজন আবিষ্কার করেন এবং নাম দেন ক্যারিওকাইনেসিস। ক্যারিওকাইনেসিসকে পাঁচটি পর্যায়ে ভাগ করা হয়েছে। এগুলো হলো-

প্রোফেজ (Prophage)ঃ গ্রীক শব্দ pro অর্থ আদি এবং phage অর্থ দশা নিয়ে Prophage শব্দটি গঠিত।

প্রোফেজ হলো মাইটোসিস কোষ বিভাজনের প্রথম এবং সর্বাপেক্ষা দীর্ঘস্থায়ী পর্যায়। এ পর্যায়ে কোষের নিউক্লিয়াস আকারে বড় হতে থাকে। ক্রোমোসোম গুলোর মধ্যে পানি বিয়োজন বা পানি ত্যাগ (dehydration) আরম্ভ হয়। ক্রোমোসোম গুলোর রং বা রঞ্জক ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। CDK যৌগ প্রোটিনের ফসফোরাইলেশন ঘটায় বলে ক্রোমোসোম ধীরে ধীরে সংকুচিত হতে থাকে। ফলে ক্রোমোসোম গুলো ক্রমাগত  খাটো, মোটা ও দৃষ্টি গোচর হয়। এ পর্যায়ের শেষের দিকে প্রতিটি ক্রোমোসোম সেন্ট্রোমিয়ার ব্যতীত লম্বালম্বি ভাবে বিভক্ত হয়ে দুইটি করে ক্রোমাটিড সৃষ্টি করে। স্পাইরালাইজেশন প্রক্রিয়ায় ক্রোমোসোমের ক্রোমাটিড দুটি স্প্রিং এর মতো প্যাঁচিয়ে মোটা ও খাটো হয়। প্রোটিনের ফসফোরাইলেশনের কারণে নিউক্লিয়ার মেমব্রেন বা এনভেলপ এবং নিউক্লিওলাস বিলুপ্ত হতে থাকে। এ পর্যায়ে স্পিন্ডলযন্ত্র সৃষ্টির সূচনা ঘটে।

মাইটোসিসকে সমীকরণিক বিভাজন বলা হয় কেন

মাইটোসিস ঘটে জীবের দেহকোষে। দেহকোষে ডিপ্লয়েড সংখ্যক ক্রোমোসোম থাকে। এই প্রক্রিয়ায় একটি কোষ থেকে দুইটি কোষ সৃষ্টি হয়। মাইটোসিস প্রক্রিয়ায় কোষের নিউক্লিয়াস এবং ক্রোমোসোম উভয়ই একবার বিভাজিত হয়। সৃষ্ট অপত্য কোষ মাতৃকোষের অনুরুপ হয়। অপত্য কোষের ক্রোমোসোম সংখ্যা মাতৃকোষের ক্রোমোসোম সংখ্যার সমান হয়। তাই মাইটোসিসকে সমীকরণিক বিভাজন বলা হয়।

মাইটোসিস কোষ বিভাজনের কারণ ।। Causes of Mitosis cell division

১। দেহের কোন স্থানে ক্ষত সৃষ্টি হলে তা পূরণের জন্য মাইটোসিস কোষ বিভাজন ঘটে।

২। কোষে নিউক্লিয়াসের চেয়ে সাইটোপ্লাজমের পরিমাণ বেশি হলে মাইটোসিস কোষ বিভাজন ঘটে।

৩। কোষে DNA এর পরিমাণ বেশি হলে মাইটোসিস কোষ বিভাজন ঘটে।

৪। কোষে প্রোটিন সংশ্লেষণ ঘটলে মাইটোসিস কোষ বিভাজন ত্বরান্বিত হয়।

৫। কোষে DNA-এর চেয়ে RNA-এর পরিমাণ বেশি হলে মাইটোসিস কোষ বিভাজন ঘটে।

৬। সাইটোকাইনিন, স্টেরয়েড, লিম্ফোকাইন, EGF, PDGF প্রভৃতির কারণে কোষ বিভাজন ঘটে।

৭। কোষের সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য মাইটোসিস কোষ বিভাজন ঘটে।

৮। কোষের আয়তন বৃদ্ধির জন্য মাইটোসিস কোষ বিভাজন ঘটে।

৯। কোষে বিভিন্ন ধরনের বিপাক ক্রিয়া ঘটে। বিপাক ক্রিয়া সম্পাদনের জন্য কোষ বিভাজন আবশ্যক।

১০। কোষ বিভাজনের মাধ্যমে নিউক্লিও-সাইটোপ্লাজমিক অনুপাত বজায় থাকে।

মাইটোসিস কোথায় ঘটে

১। সকল ভ্রƒণকোষ মাইটোসিস প্রক্রিয়ায় বিভাজিত হয়ে বহুকোষী জীবে পরিনত হয়।

২। জীবদেহের বিভিন্ন অঙ্গের বিকাশ ও বৃদ্ধি মাইটোসিস প্রক্রিয়ায় ঘটে।

৩। বহুকোষী জীবের সকল অঙ্গের বিভাজন মাইটোসিসের মাধ্যমে ঘটে।

৪। বর্ধনশীল উদ্ভিদের কান্ডের অগ্রভাগে, মূলের অগ্রভাগে, ভ্রুণমূলে, পুষ্পমুকুলে, অগ্রমুকুলে, বর্ধনশীল পাতায়, ক্যাম্বিয়াম প্রভৃতি অঞ্চলে মাইটোসিস ঘটে।

৫। জননাঙ্গের গঠন ও বৃদ্ধিতে মাইটোসিস ঘটে।

মাইটোসিস কোষ বিভাজনের বৈশিষ্ট্য ।। Characteristics of Mitosis cell division

১। মাইটোসিস কোষ বিভাজন ঘটে জীবের দেহ কোষে।

২। ইহা হ্যাপ্লয়েড, ডিপ্লয়েড ও পলিপ্লয়েড কোষে ঘটে।

৩। এ প্রক্রিয়ায় প্রতিটি মাতৃকোষ হতে দুটি করে অপত্য কোষ সৃষ্টি হয়।

৪। এ প্রক্রিয়ায় কোষের নিউক্লিয়াস ও ক্রোমোসোম একবার বিভাজিত হয়।

৫। সৃষ্ট অপত্য কোষের ক্রোমোসোম সংখ্যা মাতৃকোষের ক্রোমোসোম সংখ্যার সমান হয়।

৬। জীবদেহের ক্ষতস্থান পুরণ ও প্রয়োজনীয় কোষ পুনরুৎপাদন মাইটোসিস কোষ বিভাজনের মাধ্যমে হয়।

৭। এককোষী ও বহুকোষী সকল জীবে মাইটোসিস কোষ বিভাজন ঘটে।

৮। এই প্রক্রিয়ায় প্রথমে নিউক্লিয়াস এবং পরে সাইটোপ্লাজমের বিভাজন ঘটে।

৯। জীবদেহের বিভিন্ন অঙ্গের বিকাশ ও বৃদ্ধি মাইটোসিস প্রক্রিয়ায় ঘটে।

১০। জননাঙ্গের গঠন ও বৃদ্ধিতে মাইটোসিস ঘটে।

১১। সাইটোকাইনিন, স্টেরয়েড, লিম্ফোকাইন, EGF, PDGF প্রভৃতির কারণে মাইটোসিস ঘটে।

১২। মাইটোসিস প্রক্রিয়ায় কোষের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়।

১৩। মাইটোসিস কোষের আয়তন বৃদ্ধি ঘটায়।

মাইটোসিস কোষ বিভাজন আবিষ্কার ও নামকরণ

১৯৭৩ সালে বিজ্ঞানী স্ট্রাসবুর্গার (Strasburger) সর্বপ্রথম একটি নিউক্লিয়াস থেকে অপত্য নিউক্লিয়াস সৃষ্টির ঘটনা পর্যবেক্ষণ করেন। ১৮৭৩ সালে পোল্যান্ডের বিজ্ঞানী ওয়াকলাও মাইজেল (Waclaw Mayzel) ব্যাঙ, খরগোশ ও বিড়ালের কর্ণিয়ার কোষ বিভাজন লক্ষ্য করেন এবং ১৮৭৫ সালে তা বর্ণনা করেন। ১৮৫৫ সালে বিজ্ঞানী রুডলফ ভিরচাও (Rudolf Virchow)  সর্বপ্রথম ব্যাখ্যা করেন যে, পূর্ববর্তী কোষ থেকে বিভাজনের মাধ্যমে নতুন কোষ সৃষ্টি হয়। ১৮৭৯ সালে বিজ্ঞানী স্লাইডার মাইটোসিস প্রক্রিয়ার পূর্ণ বিবরণ দেন। ১৮৮২ সালে বিজ্ঞানী ওয়াল্টার ফ্লেমিং (Walter Fleming) এর নামকরণ করেন মাইটোসিস। ১৯৬০ সালে ককরাম এবং ম্যাক-ক্লাউলেই (Cockraum & Mac-Caulay) মাইটোসিস কোষ বিভাজনের রাসায়নিক প্রকৃতি ব্যাখ্যা করেন। বিজ্ঞানী হুইটম্যান (Walter Whitman) সাইটোপ্লাজমের বিভাজনকে সাইটোকাইনেসিস নামে অ্যাখ্যায়িত করেন।

মাইটোসিস  বা সমীকরণিক কোষ বিভাজন ।। Mitosis cell division

গ্রীক শব্দ  Mitos অর্থ মোচড়ানো সূতা থেকে Mitosis শব্দটি এসেছে। যে প্রক্রিয়ায় প্রকৃত কোষের নিউক্লিয়াস ও সাইটোপ্লাজম বিভাজিত হয়ে দুইটি অপত্য কোষ সৃষ্টি করে এবং সৃষ্ট অপত্য কোষের ক্রোমোসোম সংখ্যা মাতৃকোষের ক্রোমোসোম সংখ্যার সমান হয় তাকে মাইটোসিস বলে। এ প্রক্রিয়ায় সৃষ্ট অপত্য কোষের ক্রোমোসোম সংখ্যা ও গুণাগুণ মাতৃকোষের অনুরুপ হয় বলে একে সমীকরণিক বা ইক্যুয়েশনাল বিভাজন বলা হয়।

অ্যামাইটোসিস ।। প্রত্যক্ষ কোষ বিভাজন ।। Amitosis

গ্রিক শব্দ a অর্থ না, mito অর্থ সূতা এবং osis অর্থ দশা নিয়ে Amitosis শব্দটি গঠিত। যে প্রক্রিয়ায় একটি কোষ কোন জটিল মাধ্যম ছাড়াই সরাসরি দুইটি অপত্য কোষ সৃষ্টি করে তাকে অ্যামাইটোসিস বলে। ১৮৮২ সালে ওয়াল্টার ফ্লেমিং (Walter Flemming) অ্যামাইটোসিস শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন। ১৯৫৫ সালে বিজ্ঞানী রিমাক (Remak) সর্বপ্রথম মুরগির ভ্রুণের লোহিত রক্তকণিকায় অ্যামাইটোসিস কোষ বিভাজন প্রত্যক্ষ করেন। ব্যাকটেরিয়া, ঈস্ট, অ্যামিবা, নস্টক, মেরুদন্ডী প্রাণীর তরুণাস্থি, ভ্রুণঝিল্লি, বীজের এন্ডোস্পার্ম প্রভৃতি কোষে অ্যামাইটোসিস ঘটে।

 

অ্যামাইটোসিস কোষ বিভাজন প্রক্রিয়া (Amitosis Process)ঃ অ্যামাইটোসিসের শুরুতে কোষ খাদ্য গ্রহণ করে আকারে বড় হয়। এর নিউক্লিয়াসও বড় হয়। নিউক্লিয়াসটি বৃদ্ধি পেয়ে ডাম্বেলের মতো আকার ধারণ করে। কোষের সাইটোপ্লাজম ভিতরের দিকে ভাঁজ হয়ে যায়। এরপর নিউক্লিয়াসটি দুটি খন্ডে পরিনত হয়। সাইটোপ্লাজমের ভাঁজ আরও ভিতরে প্রবেশ করে। পরে সাইটোপ্লাজম নিউক্লিয়াসসহ দুটি কোষে পরিনত হয়

 

অ্যামাইটোসিসের তাৎপর্য

১। অ্যামাইটোসিস হলো সরল কোষ বিভাজন প্রক্রিয়া।

২। এই প্রক্রিয়া থেকে জটিল ও উন্নত কোষ বিভাজনের উৎপত্তি হয়েছে।

৩। ইহা দ্রুত কোষের সংখ্যা বৃদ্ধি করে।

৪। নিম্নশ্রেণীর জীব এই পদ্ধতিতে সংখ্যা বৃদ্ধি করে।