কোষ বিভাজনের কারণ ।। Causes of cell division

১। মাইটোজেনঃ যে সব পদার্থ কোষ বিভাজনে উদ্দীপনা সৃষ্টি করে তাকে মাইটোজেন বলে। সাইটোকাইনিন উদ্ভিদ কোষ বিভাজনে উদ্দীপনা সৃষ্টি করে। স্টেরয়েড, লিম্ফোকাইন, EGF (Epidermal growth factor), PDGF (Platelet derived growth factor) প্রভৃতি প্রাণিকোষ বিভাজনে উদ্দীপনা সৃষ্টি করে। এসব রাসায়নিক উপাদানের কারণে কোষ বিভাজন ঘটে।

২। জিন নিয়ন্ত্রণঃ কোষ বিভাজন হলো একটি জিন নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া। নিউক্লিয়াসে DNA-এর পরিমাণ দ্বিগুণ হলেই কোষ বিভাজন শুরু হয়।

৩। কোষের সংখ্যা বৃদ্ধিঃ কোষের সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য কোষ বিভাজিত হয়। কোষ বিভাজিত না হলে কোষের সংখ্যা বৃদ্ধি পায় না।

৪। কোষের আয়তন বৃদ্ধিঃ কোষের আয়তন বৃদ্ধির জন্য কোষ বিভাজন ঘটে। কোষ বার বার বিভাজিত হয়ে কোষের আয়তন বৃদ্ধি করে।

৫। কোষের বিপাকঃ কোষে বিভিন্ন ধরনের বিপাক ক্রিয়া ঘটে। বিপাক ক্রিয়া সম্পাদনের জন্য কোষ বিভাজন আবশ্যক।

৬। নিউক্লিও-সাইটোপ্লাজমিক অনুপাতঃ কোষ বিভাজনের মাধ্যমে নিউক্লিও-সাইটোপ্লাজমিক অনুপাত বজায় থাকে।

কোষচক্র নিয়ন্ত্রণে চেক পয়েন্ট ।। নির্ধারক বিন্দুর ভূমিকা

কোষচক্রের যে নির্দিষ্ট স্থানে কোষের বিভাজন বন্ধ হয়ে যায় তাকে চেক পয়েন্ট বা নির্ধারক বিন্দু বলে। কোষচক্রের চেক পয়েন্ট গুলো হলো-

১। G1/S চেক পয়েন্টঃ কোষ বিভাজনের উপযুক্ত না হলে এবং কোষের DNA ক্ষতিগ্রস্ত হলে G1/S চেক পয়েন্টে কোষচক্র বন্ধ হয়ে যায়। কোষটি G1 দশা থেকে S দশায় প্রবেশ করতে পারে না। এখানে কোষের আকৃতি, কোষের হরমোন এবং DNA ক্ষতিগ্রস্ত কিনা তা চেক করা হয়।

২। G2/M চেক পয়েন্টঃ কোষের ক্ষতিগ্রস্ত DNA মেরামত না হলে এবং DNA-এর ডুপ্লিকেশন সম্পন্ন না হলে G2/M চেক পয়েন্টে কোষচক্র বন্ধ হয়ে যায়। কোষটি G2 দশা থেকে M দশায় প্রবেশ করতে পারে না। এখানে কোষ ও নিউক্লিয়াসের আয়তন এবং DNA ক্ষতিগ্রস্ত কিনা তা চেক করা হয়।

৩। M চেক পয়েন্টঃ কোষের স্পিন্ডল তন্তুর গঠন সম্পূর্ণ না হলে এবং কাইনেটোকোরের সাথে বেম তন্তু (Beam fiber) সঠিকভাবে যুক্ত না হলে M চেক পয়েন্টে কোষচক্র বন্ধ হয়ে যায়। ফলে মাইটোসিস প্রক্রিয়া ঘটে না।

কোষচক্র নিয়ন্ত্রণ ।। Regulation of cell cycle

১। সাইক্লিন-Cdk যৌগঃ কোষের ভিতরে সাইক্লিন- cdk যৌগ কোষচক্রের বিভিন্ন দশার পরিবর্তন নিয়ন্ত্রণ করে।

২। সাইক্লিন- Cdk-MPFঃ যে কোষ বিভাজিত হবে তার  সাইক্লিন- cdk যৌগের সাথে MPF যুক্ত হয়ে কোষচক্র শুরুর নির্দেশ প্রদান করে।

৩। P53 প্রোটিনঃ কোন কারণে DNA ক্ষতিগ্রস্ত হলে P53 প্রোটিন কোষচক্র বন্ধ করে দেয়। DNA ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে P53 প্রোটিন অ্যাপোপটোসিস ক্রিয়ায় কোষের মৃত্যু ঘটায়।

৪। P27 প্রোটিনঃ P27 প্রোটিন সাইক্লিন- cdk যৌগের সাথে যুক্ত হয়ে কোষকে সংশ্লেষ দশায় প্রবেশে বাধা দেয়। কোষে উচ্চ মাত্রায় P27 প্রোটিন মহিলাদের স্তন ক্যান্সার সৃষ্টি করে।

৫। সাইক্লিনঃ কোষচক্রের নিয়ন্ত্রক হলো সাইক্লিন প্রোটিন। Timothy Hunt (1982) সাইক্লিন প্রোটিন আবিষ্কার করেন। এজন্য Timothy Hunt, Lee Hartwell ও Paul Nurse-কে ২০০১ সালে নোবেল পুরষ্কার দেয়া হয়। মানুষের কোষে চার প্রকার সাইক্লিন থাকে।

(i) সাইক্লিন- Dঃ সাইক্লিন-D কোষকে G1 থেকে S পর্যায়ে এবং S পর্যায় থেকে G2 পর্যায়ে নিয়ে যায়।

(ii) সাইক্লিন- Eঃ সাইক্লিন-E কোষকে S পর্যায়ে DNA রেপ্লিকেশনের জন্য প্রস্তুত করে।

(iii) সাইক্লিন-Aঃ সাইক্লিন-A কোষের S পর্যায়ে DNA রেপ্লিকেশন সক্রিয় ও ত্বরান্বিত করে।

(iv) সাইক্লিন-Bঃ সাইক্লিন-B মাইটোসিস প্রক্রিয়ার জন্য স্পিন্ডলতন্তু তৈরী এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজ করে।

ইন্টারফেজ দশার গুরুত্ব ।। Importance of Interphase

(i) কোষটি পরবর্তী বিভাজনে অংশ গ্রহণ করবে কিনা তা এ পর্যায়ে নির্ধারিত হয়।

(ii) কোষ বিভাজনের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি (ATP) তৈরী হয়।

(iii) DNA অনুলিপন ঘটে।

(iv) RNA সংশ্লেষণ এবং হিস্টোন প্রোটিনের পরিমাণ বৃদ্ধি ঘটে।

(v) এ পর্যায়ে মাইক্রোটিউবিউলস্ তৈরী হয় যা সেন্ট্রোসোম গঠন করে।

(vi) এ দশায় প্রাণীকোষে সেন্ট্রিওল সৃষ্টি হয়।

(vii) ইন্টারফেজ দশা না থাকলে কোষ বিভাজন ঘটবে না। জীবের দেহ গঠিত হবে না। ফলে নতুন জীব সৃষ্টি হবে না।

কোষ বিভাজন ।। বিরাম-২ ।। G2 Phase

সংশ্লেষ দশার পরবর্তী দশাকে বিরাম-২ বলে।  বিরাম-২ এর বৈশিষ্ট্য হলো-

(i) এই উপদশায় কোষের বিপাক ক্রিয়া বৃদ্ধি পায়।

(ii) হিস্টোন প্রোটিন, নন-হিস্টোন প্রোটিন, tRNA, mRNA, rRNA প্রভৃতি সংশ্লেষণ হয়।

(iii) বিভিন্ন উপাদান প্রস্তুত হয় বলে নিউক্লিয়াসের আয়তন বেড়ে যায়।

(iv) এ পর্যায়ে ক্ষতিগ্রস্থ DNA অণুর মেরামত হয়।

(v) একটি সেন্ট্রোসোম থেকে দুটি সেন্ট্রোসোম সৃষ্টি হয়। সেন্ট্রোসোম মাইক্রোটিউবিউল গঠন করে। মাইক্রোটিউবিউল স্পিন্ডল তন্তু তৈরী করে।

(vi) ম্যাচুরেশন প্রোমোটিং ফ্যাক্টর (MPF) এর সাহায্যে কোষ G2 phase থেকে মাইটোসিসে প্রবেশ করে।

(vii) নিউক্লিয়াস ও সাইটোপ্লাজমের আয়তন বৃদ্ধি পায়।

(viii) এই উপপর্যায়ে সময় লাগে ১০-২০%।

কোষ বিভাজন ।। সংশ্লেষ দশা ।। S phase

বিরাম-১ এর পরবর্তী দশাকে সংশ্লেষণ দশা বা S দশা বা Synthesis দশা বলে। একে DNA অনুলিপন বা রেপ্লিকেশন দশাও বলা হয়। সংশ্লেষ দশার বৈশিষ্ট্য হলো-

(i) এ উপপর্যায়ে হিস্টোন প্রোটিন ও DNA সংশ্লেষিত হয়।

(ii) DNA-এর পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে দ্বিগুণ হয়।

(iii) ক্রোমোসোমের দৈহিক বৃদ্ধি ঘটে এবং প্রতিটি ক্রোমোসোম বিভক্ত হয়ে দুইটি করে ক্রোমাটিড সৃষ্টি করে।

(iv) এ পর্যায়ে কাইনেটোকোরের উপএকক তৈরী হয়।

(v) প্রাণিকোষে সেন্ট্রোজোমের বিভাজন ঘটে।

(vi) এ পর্যায়ে নিষ্ক্রিয় প্রোটিন সংশ্লেষিত হয়।

(vii) এ উপপর্যায়ে সময় লাগে ৩০-৫০%। স্তন্যপায়ীদের এ দশায় সময় লাগে ৭ ঘন্টা।

কোষ বিভাজনের বিরাম-১ ।। G1 Phase

বিপাকীয় ভাবে সক্রিয় কোষের বৃদ্ধির দশাকে বিরাম-১ দশা বলে। এ দশাকে অ্যান্টিফেজ বলা হয়। যে কোষটি আর বিভাজিত হবে না তা এক সপ্তাহ বা এক বছর বা আমৃত্যু G1 উপপর্যায়ে আবদ্ধ থাকে। বিরাম-১ দশার বৈশিষ্ট্য হলো-

(i) এই দশায় কোষচক্র সূচনা হয়।

(ii) কোনো কোষ বিভাজনে অংশ গ্রহণ করবে কিনা তা এ পর্যায়ের উপর নির্ভর করে।

(iii) এই উপপর্যায়ে সাইক্লিন প্রোটিন, গ্লোবিউলার প্রোটিন, ফাইব্রাস প্রোটিন ও RNA উৎপন্ন হয়।

(iv) সাইক্লিন প্রোটিন CDK এর সাথে যুক্ত হয়ে প্রক্রিয়ার গতি ত্বরান্বিত ও নিয়ন্ত্রণ করে। CDK ফসফোরাইলেশন প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে।

(v) DNA ও প্রোটিন তৈরীর জন্য এনজাইম উৎপন্ন হয়।

(vi) কোষের সাইটোপ্লাজম ও নিউক্লিয়াসের আকৃতি বৃদ্ধি পায়।

(vii) বিভিন্ন নিউক্লিওটাইড ও অ্যামাইনো এসিডের সংশ্লেষণ ঘটে।

(viii) এ দশায় কোষীর অঙ্গাণুগুলো সংখ্যায় দ্বিগুণ হয়।

(ix) এ উপপর্যায়ে সময় লাগে ৩০-৪০%।

ইন্টারফেজ দশা ।। প্রস্তুতিমূলক পর্যায় ।। Interphase

কোষচক্র দুইটি পর্যায়ে সম্পন্ন হয়। ইন্টারফেজ দশা এবং  বিভাজন দশা।

ইন্টারফেজ দশা বা প্রস্তুতিমূলক পর্যায়

একটি কোষ পর পর দুই বার বিভাজিত হওয়ার মধ্যবর্তী সময়কে ইন্টারফেজ দশা বলে। এ অবস্থাটিকে বিশ্রাম দশা নামে আখ্যায়িত করা হয়। এ দশার নিউক্লিয়াসকে বলা হয় বিপাকীয় নিউক্লিয়াস। ইন্টারফেজ দশার বৈশিষ্ট্য হলো-

(i) ইন্টারফেজ দশায় বাহ্যিক উদ্দীপনা প্রদান করে ঈউক CDK (Cyclin Dependent Kinase) যৌগ।

(ii) ইন্টারফেজ দশায় অভ্যন্তরীণ উদ্দীপনা যোগায় বিভিন্ন ধরনের হরমোন ও গ্রোথ ফ্যাক্টর।

(iii) এ পর্যায়ে কোষে বিভিন্ন ধরনের বিপাকীয় কার্যকলাপ চলতে থাকে। নিউক্লিয়াসের আয়তন বৃদ্ধি পায় এবং বহু ক্রিয়া-বিক্রিয়া ঘটে বলে একে বিপাকীয় নিউক্লিয়াস বলা হয়।

(iv) এই পর্যায়ে DNA, RNA ও প্রোটিন সংশ্লেষণ ঘটে। তাই একে সংশ্লেষ পর্যায় বলা হয়।

(v) ক্রোমোসোমগুলো প্যাঁচানো অবস্থায় ক্রোমাটিনরুপে অবস্থান করে।

(vi) এ দশায় কোষে প্রয়োজনীয় শক্তি মজুদ থাকে।

(vii) এ দশায় কোষের আয়তন বৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি ঘটে।

(viii) কোষের DNA-এর ডুপ্লিকেশন ঘটে, অর্থাৎ মোনাড ডায়াডে পরিনত হয়।

(ix) প্রাণীকোষের সেন্ট্রোজোমের বিভাজন ঘটে।

(x) এ পর্যায়ে সময় লাগে ৯০-৯৫%।

কোষচক্রের সময়

কোষচক্র সম্পন্ন হতে ১০ মিনিট থেকে ২৪ ঘন্টা সময় লাগে। মানব দেহের কোষচক্র সম্পন্ন হয় ২০-২৪ ঘন্টায়। ঈস্ট কোষে সময় লাগে ৯০ মিনিট। ব্রড বিন (Broad bean) এর সময় লাগে ১৮-১৯ ঘন্টা।

কোষচক্রের বৈশিষ্ট্য ।। Characteristics of Cell cycle

১। কোষচক্র সম্পন্ন হতে একটি নির্দিষ্ট সময় লাগে। কোষচক্রের সময়কালকে জনুকাল বলে।

২। কোষচক্র একটি জেনেটিক প্রোগ্রাম দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।

৩। কোষচক্রের অভ্যন্তরীণ উদ্দীপনা প্রদান করে সাইক্লিন- cdk যৌগ।

৪। কোষচক্রের বাহ্যিক উদ্দীপনা প্রদান করে হরমোন ও গ্রোথ ফ্যাক্টর।

৫। দেহের কোন স্থানে কেটে গেলে অণুচক্রিকা গ্রোথ ফ্যাক্টর তৈরী করে। এই গ্রোথ ফ্যাক্টরের উদ্দীপনায় চারপাশের কোষ বিভাজিত হয়ে ক্ষতস্থান জোড়া লাগে।

৬। দেহের ইমিউন সিস্টেমের জন্য শে^ত রক্তকণিকা গ্রোথ ফ্যাক্টর তৈরী করে।

৭। বৃক্কে ইরিথ্রোপোইটিন উৎপন্ন হয়। ইরিথ্রোপোইটিন অস্থিমজ্জার লোহিত রক্তকণিকা উৎপাদনে সাহায্য করে।

৮। কোষের DNA ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে P53 প্রোটিন কোষচক্র বন্ধ করে দেয়।

৯। কোষের DNA ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে P53 প্রোটিন অ্যাপোপটোসিস প্রক্রিয়ায় কোষের মৃত্যু ঘটায়।

১০। অস্বাভাবিক বা অনিয়ন্ত্রিত কোষচক্র জীবদেহের বৃদ্ধি ও বিকাশ ব্যাহত করে। এমনকি ক্যান্সার সৃষ্টি করতে পারে।