জায়ান্ট বা দৈত্যাকার ক্রোমোজোম (Giant chromosome)
যে সব ক্রোমোজোমের আকার সাধারণ ক্রোমোজোম অপেক্ষায় অনেক বড় তাকে জায়ান্ট বা দৈত্যাকার ক্রোমোজোম বলে। জীবদেহে দুই ধরণের জায়ান্ট ক্রোমোজোম পাওয়া যায়।
১। ল্যাম্প ব্রাশ ক্রোমোজোমঃ যে ক্রোমোজোম দেখতে বাতির চিমনির ব্রাশ বা ল্যাম্প ব্রাশের মতো তাকে ল্যাম্প ব্রাশ ক্রোমোজোম বলে। এই ক্রোমোজোমের অক্ষকে কেন্দ্র করে কতগুলো জোড়া লুপ থাকে এবং দেখতে অনেকটা বাতির চিমনির ব্রাশ বা ল্যাম্প ব্রাশের মতো দেখায়। ক্রোমোজোমের অক্ষটি ক্রোমোমিয়ার ও ইন্টার-ক্রোমোমিয়ার দ্বারা এবং লুপ ট্রান্সক্রাইবিং DNA দ্বারা গঠিত। এর দৈর্ঘ্য ১৫০০-২০০০ মাইক্রোমিটার। ইহা mRNA ও ডিমের কুসুম সৃষ্টির জন্য দরকার হয়। ইহা উভচর ও পতঙ্গে (জননকোষ) অবস্থান করে।
২। পলিটেন ক্রোমোজোমঃ ফলের মাছি Drosophila এর লালাগ্রন্থিতে ২০০০ মাইক্রোমিটার দৈর্ঘ্য বিশিষ্ট বৃহদাকার ক্রোমোজোম থাকে। একে পলিটেন বা স্যালিভারি গ্ল্যান্ড ক্রোমোজোম বলে। এই ক্রোমোজোমে ৫টি লম্বা এবং ১টি খাটো বাহু থাকে। প্রতিটি বাহুতে কালো ও সাদা ব্যান্ড থাকে। কালো বাহু হলো ইউক্রোমাটিন অঞ্চল। এর কিছু অংশ ফুলে গিয়ে বৃহৎ গঠন সৃষ্টি করে। একে ক্রোমোজোমাল পাফ বা ব্যালবিয়ানি রিং (Balbiani ring) বলে। ক্রোমোজোমাল পাফ/ব্যালবিয়ানি রিং mRNA সংশ্লেষ করে।
ক্রোমোজোমের রাসায়নিক গঠন । ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স
ক্রোমোজোমের রাসায়নিক গঠন
ক্রোমোজোম প্রধানত দুইটি রাসায়নিক উপাদান দ্বারা গঠিত।
১। নিউক্লিক এসিড
২। প্রোটিন
১। নিউক্লিক এসিডঃ ক্রোমোজোমে ৪৫ ভাগ নিউক্লিক এসিড থাকে। নিউক্লিক এসিড দুই ধরণের। DNA ও RNA। DNA ও RNA উভয়ই তিনটি রাসায়নিক পদার্থ দ্বারা গঠিত। নাইট্রোজেন ক্ষারক, পেন্টোজ শ্যুগার এবং ফসফোরিক এসিড। নাইট্রোজেন ক্ষারক দুই ধরনের। পিউরিন এবং পাইরিমিডিন। পিউরিন হলো অ্যাডেনিন ও গুয়ানিন এবং পাইরিমিডিন হলো থাইমিন, সাইটোসিন ও ইউরাসিল।
২। প্রোটিনঃ প্রোটিন ক্রোমোজোমের মূল কাঠামো গঠন করে। ক্রোমোজোমে প্রোটিন থাকে ৫৫%। ক্রোমোজোমে দুই ধরনের প্রোটিন থাকে। যথা-
(i) অম্লীয় প্রোটিনঃ উচ্চ আণবিক গুরুত্বসম্পন্ন প্রোটিন হলো অম্লধর্মী প্রোটিন। ক্রোমোজোমে DNA পলিমারেজ ও RNA পলিমারেজ প্রোটিন থাকে
(ii) ক্ষারীয় প্রোটিনঃ নিম্ন আণবিক গুরুত্বসম্পন্ন প্রোটিন ক্ষারধর্মী প্রোটিন। ক্রোমোজোমে প্রোটামিন অথবা হিস্টোন প্রোটিন থাকে। প্রোটামিন শুক্রাণুর ক্রোমোজোমে থাকে।
ক্রোমোজোমের ভৌত গঠন । Structure of chromosome । ড. সিদ্দিক পাবলিক্রেশন্স
ক্রোমোজোমের ভৌত গঠন (Physical Structure of Chromosome)
একটি আদর্শ ক্রোমোজোমে যে সব অংশ দেখা যায় তা নিম্নরুপ
১। পেলিকল ক্রোমোজোম যে আবরণী দ্বারা আবৃত থাকে তাকে পেলিকল। আধুনিক গবেষণায় পেলিকলের কোন অস্তিস্ক পাওয়া যায় নাই।
২। মাতৃকাঃ পেলিকলের ভিতরে যে তরল পদার্থ থাকে তাকে মাতৃকা বলে। কিন্তু আজ পর্যন্ত মাতৃকার অস্তিস্ক পাওয়া যায় নাই।
৩। ক্রোমাটিনঃ প্রতিটি ক্রোমোজোম লম্বালম্বি ভাবে বিভক্ত হয়ে দুইটি সুতার মতো গঠন সৃষ্টি করে। এদেরকে ক্রোমাটিন বলে। ইহা প্রাথমিক ভাবে ১১ nm পুরু এবং পর্যায়ক্রমে ৩০ nm, ৩০০ nm এবং ৭০০ nm পুরু হয়ে থাকে। Heit (১৯২৮) ক্রোমাটিন তন্তুকে দু’টি ভাগে ভাগ করেন। যথা- হেটারোক্রোমাটিন এবং ইউক্রোমাটিন।
৪। ক্রোমোনেমাঃ প্রতিটি ক্রোমাটিড লম্বালম্বি ভাবে বিভক্ত হয়ে দুইটি করে সূত্রাকার গঠন সৃষ্টি করে। একে ক্রোমোনেমা বলে। বিজ্ঞানী Vejdovsky (১৯২১) এদের ক্রোমোনেমা নামে আভিহিত করেন। প্রতিটি ক্রোমোনেমা ২৬টি অথবা ৩২টি অনুসূত্র দ্বারা গঠিত। তবে ১৯৬৫ সালে বিজ্ঞানী ডু’প্র প্রমাণ করেন, ক্রোমোনেমায় কোন অনুসূত্র থাকে না।
৫। সেন্ট্রোমিয়ারঃ ক্রোমোজোমে যে গোলাকার, বর্ণহীন ও সংকুচিত স্থান থাকে তাকে সেন্ট্রোমিয়ার বলে। প্রতিটি সেন্ট্রোমিয়ারে একটি ছোট গাঠনিক অবকাঠামো থাকে যাকে কাইনেটোফোর বলে। প্রতিটি ক্রোমোজোমে একটি মাত্র সেন্ট্রোমিয়ার থাকে। তবে কোন কোন ক্রোমোজোমে দুই বা ততোধিক সেন্ট্রোমিয়ার থাকতে পারে।
৬। সেকেন্ডারী কুঞ্চনঃ ক্রোমোজোমে সেন্ট্রোমিয়ার ছাড়া আরও এক বা একাধিক সংকুচিত স্থান থাকে। একে সেকেন্ডারী কুঞ্চন বলে। SAT (Sine Acid Thymonucleic) নামক সেকেন্ডারী কুঞ্চন নিউক্লিওলাস গঠন করে।
৭। ক্রোমোমিয়ারঃ ক্রোমোজোমে যে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গুটিকা দেখা যায় তাকে ক্রোমোমিয়ার বলে।
৮। বাহুঃ সেন্ট্রোমিয়ারের উভয় পাশের অংশকে বাহু বলে। ক্রোমোজোমের বাহু দু’টি সমান অথবা অসমান হতে পারে।
৯। সেটেলাইটঃ ক্রোমোজোমের সেকেন্ডারী কুঞ্চন সংলগ্ন ক্ষুদ্র অংশটিকে সেটেলাইট বলে। এ ধরনের ক্রোমোজোমকে স্যাট ক্রোমোজোম বলে। যেমন- ছোলার ১ নং ক্রোমোজোমে স্যাটেলাইট থাকে।
১০। টেলোমিয়ারঃ বিজ্ঞানী এইচ. জে. মুলার ক্রোমোজোমের প্রান্তদেশে একটি বিন্দুর অবস্থান কল্পনা করেন। একে টেলোমিয়ার বলে। টেলোমিয়ারের কারনে ক্রোমোজোমের বাহু দু’টি কখনো একত্রে হতে পারে না।
ক্রোমোজোমের রঞ্জক ভিত্তিক প্রকারভেদ ও কী কী । ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স
রঞ্জক ধারণের উপর ভিত্তি করে ক্রোমাটিন পদার্থকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে।
১। ইউক্রোমাটিনঃ ক্রোমোজোমকে ক্ষারীয় রঞ্জক দ্বারা রঞ্জিত করলে যে অংশ হালকা বর্ণ ধারণ করে তাকে ইউক্রোমাটিন বলে। এ অঞ্চলে অধিক পরিমাণে DNA থাকে এবং বংশগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ইহা mRNA সংশ্লেষণ করে।
২। হেটারোক্রোমাটিনঃ ক্রোমোজোমকে ক্ষারীয় রঞ্জক দ্বারা রঞ্জিত করলে যে অংশ গাঢ় বর্ণ ধারণ করে তাকে হেটারোক্রোমাটিন বলে। এ অঞ্চলে স্বল্ব পরিমাণে DNA থাকে এবং বংশগতিতে তেমন ভূমিকা পালন করে না। ইহা mRNA সংশ্লেষণ করে না
ক্রোমোজোমের সেন্ট্রোমিয়ারের সংখ্যা ভিত্তিক প্রকারভেদও কীকী । ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স
সেন্ট্রোমিয়ারের সংখ্যা অনুযায়ী ক্রোমোজোম তিন ধরনের।
১। অ্যাসেন্ট্রিক ক্রোমোজোমঃ যে ক্রোমোজোমে সেন্ট্রোমিয়ার থাকে না তাকে অ্যাসেন্ট্রিক ক্রোমোজোম বলে। ইহা ক্রোমোজোমের ভঙ্গুর অংশ।
২। মনোসেন্ট্রিক ক্রোমোজোমঃ যে ক্রোমোজোমে একটি মাত্র সেন্ট্রোমিয়ার থাকে তাকে মনোসেন্ট্রিক ক্রোমোজোম বলে। অধিকাংশ প্রজাতির ক্রোমোজোম মনোসেন্ট্রিক।
৩। ডাইসেন্ট্রিক ক্রোমোজোমঃ যে ক্রোমোজোমে দুইটি সেন্ট্রোমিয়ার থাকে তাকে ডাইসেন্ট্রিক ক্রোমোজোম বলে। যেমন–গম
৪। পলিসেন্ট্রিক ক্রোমোজোমঃ যে ক্রোমোজোমে দুই এর অধিক সেন্ট্রোমিয়ার থাকে তাকে পলিসেন্ট্রিক ক্রোমোজোম বলে। যেমন–কলা গাছ।
৫। ডিফিউজ ক্রোমোজোমলঃ ক্রোমোজোমে সেন্ট্রোমিয়ার বিচ্ছিন্ন ভাবে থাকলে তাকে ডিফিউজ ক্রোমোজোম বলে। যেমন–কলা গাছ।
ক্রোমোজোমের সেন্ট্রোমিয়ারের অবস্থান ভিত্তি প্রকারভেদ ও কী কী । ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স
সেন্ট্রোমিয়ারের অবস্থানের উপর ভিত্তি করে ক্রোমোজোমকে চার ভাগে ভাগ করা হয়েছে।
১। মেটাসেন্ট্রিক ক্রোমোজোমঃ যে ক্রোমোজোমের সেন্ট্রোমিয়ার মাঝখানে থাকে তাকে মেটাসেন্ট্রিক ক্রোমোজোম বলে। কোষ বিভাজনের অ্যানাফেজ দশায় মেটাসেন্ট্রিক ক্রোমোজোম গুলো দেখতে ইংরেজি V অক্ষরের মতো দেখায়।
২। সাব মেটাসেন্ট্রিক ক্রোমোজোমঃ যে ক্রোমোজোমের সেন্ট্রোমিয়ার মাঝখানে না থেকে সামান্য দূরে থাকে তাকে সাব মেটাসেন্ট্রিক ক্রোমোজোম বলে। কোষ বিভাজনের অ্যানাফেজ দশায় সাব মেটাসেন্ট্রিক ক্রোমোজোম গুলো দেখতে ইংরেজি L অক্ষরের মতো দেখায়।
৩। অ্যাক্রোসেন্ট্রিক ক্রোমোজোমঃ যে ক্রোমোজোমের সেন্ট্রোমিয়ার একেবারে প্রান্তের কাছাকাছি থাকে তাকে অ্যাক্রোসেন্ট্রিক ক্রোমোজোম বলে। কোষ বিভাজনের অ্যানাফেজ দশায় অ্যাক্রোসেন্ট্রিক ক্রোমোজোম গুলো দেখতে ইংরেজি J অক্ষরের মতো দেখায়।
৪। টেলোসেন্ট্রিক ক্রোমোজোমঃ যে ক্রোমোজোমের সেন্ট্রোমিয়ার একেবারে প্রান্তভাগে থাকে তাকে টেলোসেন্ট্রিক ক্রোমোজোম বলে। কোষ বিভাজনের অ্যানাফেজ দশায় টেলোসেন্ট্রিক ক্রোমোজোম গুলো দেখতে ইংরেজি I অক্ষরের মতো দেখায়।
ক্রোমোজোমের প্রকারভেদ ও কী কী । ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স
ক্রোমোজোমের প্রকারভেদ
বৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করে ক্রোমোজোমকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। যথা-
১। অটোজোমঃ যে সব ক্রোমোজোম জীবের দেহ কোষে থাকে তাদেরকে অটোজোম বলে। অটোজোমের সংখ্যা ২২ জোড়া বা ৪৪টি।
২। সেক্স ক্রোমোজোমঃ যে সব ক্রোমোজোম জীবের লিঙ্গ নির্ধারণ করে তাদেরকে সেক্স ক্রোমোজোম বলে। সেক্স ক্রোমোজোমের সংখ্যা এক জোড়া বা ২টি।
সেন্ট্রোমিয়ারের অবস্থানের উপর ভিত্তি করে ক্রোমোজোমকে চার ভাগে ভাগ করা হয়েছে।
১। মেটাসেন্ট্রিক ক্রোমোজোমঃ যে ক্রোমোজোমের সেন্ট্রোমিয়ার মাঝখানে থাকে তাকে মেটাসেন্ট্রিক ক্রোমোজোম বলে। কোষ বিভাজনের অ্যানাফেজ দশায় মেটাসেন্ট্রিক ক্রোমোজোম গুলো দেখতে ইংরেজি V অক্ষরের মতো দেখায়।
২। সাব মেটাসেন্ট্রিক ক্রোমোজোমঃ যে ক্রোমোজোমের সেন্ট্রোমিয়ার মাঝখানে না থেকে সামান্য দূরে থাকে তাকে সাব মেটাসেন্ট্রিক ক্রোমোজোম বলে। কোষ বিভাজনের অ্যানাফেজ দশায় সাব মেটাসেন্ট্রিক ক্রোমোজোম গুলো দেখতে ইংরেজি L অক্ষরের মতো দেখায়।
৩। অ্যাক্রোসেন্ট্রিক ক্রোমোজোমঃ যে ক্রোমোজোমের সেন্ট্রোমিয়ার একেবারে প্রান্তের কাছাকাছি থাকে তাকে অ্যাক্রোসেন্ট্রিক ক্রোমোজোম বলে। কোষ বিভাজনের অ্যানাফেজ দশায় অ্যাক্রোসেন্ট্রিক ক্রোমোজোম গুলো দেখতে ইংরেজি J অক্ষরের মতো দেখায়।
৪। টেলোসেন্ট্রিক ক্রোমোজোমঃ যে ক্রোমোজোমের সেন্ট্রোমিয়ার একেবারে প্রান্তভাগে থাকে তাকে টেলোসেন্ট্রিক ক্রোমোজোম বলে। কোষ বিভাজনের অ্যানাফেজ দশায় টেলোসেন্ট্রিক ক্রোমোজোম গুলো দেখতে ইংরেজি I অক্ষরের মতো দেখায়।
সেন্ট্রোমিয়ারের সংখ্যা অনুযায়ী ক্রোমোজোম তিন ধরনের।
১। অ্যাসেন্ট্রিক ক্রোমোজোমঃ যে ক্রোমোজোমে সেন্ট্রোমিয়ার থাকে না তাকে অ্যাসেন্ট্রিক ক্রোমোজোম বলে। ইহা ক্রোমোজোমের ভঙ্গুর অংশ।
২। মনোসেন্ট্রিক ক্রোমোজোমঃ যে ক্রোমোজোমে একটি মাত্র সেন্ট্রোমিয়ার থাকে তাকে মনোসেন্ট্রিক ক্রোমোজোম বলে। অধিকাংশ প্রজাতির ক্রোমোজোম মনোসেন্ট্রিক।
৩। ডাইসেন্ট্রিক ক্রোমোজোমঃ যে ক্রোমোজোমে দুইটি সেন্ট্রোমিয়ার থাকে তাকে ডাইসেন্ট্রিক ক্রোমোজোম বলে। যেমন-গম
৪। পলিসেন্ট্রিক ক্রোমোজোমঃ যে ক্রোমোজোমে দুই এর অধিক সেন্ট্রোমিয়ার থাকে তাকে পলিসেন্ট্রিক ক্রোমোজোম বলে। যেমন-কলা গাছ।
৫। ডিফিউজ ক্রোমোজোমলঃ ক্রোমোজোমে সেন্ট্রোমিয়ার বিচ্ছিন্ন ভাবে থাকলে তাকে ডিফিউজ ক্রোমোজোম বলে। যেমন-কলা গাছ।
রঞ্জক ধারনের উপর ভিত্তি করে ক্রোমাটিন পদার্থকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে।
১। ইউক্রোমাটিনঃ ক্রোমোজোমকে ক্ষারীয় রঞ্জক দ্বারা রঞ্জিত করলে যে অংশ হালকা বর্ণ ধারণ করে তাকে ইউক্রোমাটিন বলে। এ অঞ্চলে অধিক পরিমাণে DNA থাকে এবং বংশগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ইহা mRNA সংশ্লেষণ করে।
২। হেটারোক্রোমাটিনঃ ক্রোমোজোমকে ক্ষারীয় রঞ্জক দ্বারা রঞ্জিত করলে যে অংশ গাঢ় বর্ণ ধারণ করে তাকে হেটারোক্রোমাটিন বলে। এ অঞ্চলে স্বল্ব পরিমাণে DNA থাকে এবং বংশগতিতে তেমন ভূমিকা পালন করে না। ইহা mRNA সংশ্লেষণ করে না
ক্রোমোজোম কী ? ক্রোমোজোমের সংখ্যা ও আবিষ্কার
ক্রোমোজোম (Chromosome)
গ্রিক শব্দ chroma অর্থ রং এবং soma অর্থ দেহ নিয়ে chromosome শব্দটি গঠিত। এর অর্থ হলো রঞ্জিত দেহ বা রং ধারণকারী দেহ। প্রকৃত কোষের নিউক্লিয়াসে অবস্থিত নিউক্লিওপ্রোটিন দ্বারা গঠিত অনুলিপন ক্ষমতাসম্পন্ন সরু সুতার মতো ক্ষুদ্রাঙ্গ যা বংশগত বৈশিষ্ট্যাবলী বহন করে এবং প্রকরণ ও মিউটেশন ঘটাতে সক্ষম তাকে ক্রোমোজোম বলে।
আবিষ্কার ঃ ১৮৪২ সালে Karl Nagli সর্বপ্রথম উদ্ভিদ কোষের নিউক্লিয়াসে ক্রোমোজোম প্রত্যক্ষ করেন। ১৮৭৫ সালে বিজ্ঞানী স্ট্রাসবুর্গার সর্বপ্রথম ক্রোমোজোম আবিষ্কার করেন। ১৮৮৮ সালে বিজ্ঞানী ওয়ালটার ফ্লেমিং নিউক্লিয়াসের সূতার মতো গঠনকে নামকরণ করেন। ১৮৮৮ সালে বিজ্ঞানী ওয়ালডেয়ার ক্রোমোজোমের নামকরণ করেন। ১৯০২ সালে Sutton ও Boveri ক্রোমোজোমকে বংশগতির ধারক ও বাহক হিসেবে বর্ণনা করেন।
ক্রোমোজোম সংখ্যা
১৯২১ সালে বিজ্ঞানী Theophilus Painter সর্বপ্রথম মানুষের ক্রোমোজোম সংখ্যা প্রকাশ করেন। জীবজগতে ১০% এর কম ক্রোমোজোম সংখ্যা গণনা করা হয়েছে। প্রজাতির বৈশিষ্ট্য ভেদে ক্রেমোজোম 2n সংখ্যা ২-১৬০০ হতে পারে। উদ্ভিদ দেহে সবচেয়ে কম ক্রোমোজোম Haplopappus gracilis, 2n = 4 এবং সবচেয়ে বেশি Poa littarosa 2n = 506-530। প্রাণী দেহে সবচেয়ে কম ক্রোমোজোম Ascaris megalocephalus sub. sp. univalens 2n = 2 এবং সবচেয়ে বেশি Aulacantha (Olacantha sp.) 2n = 1600। উচ্চতর জীবের প্রতিটি দেহকোষে ক্রোমোজোম সংখ্যা ২-৮০। মানুষের দেহে ক্রোমোজোম সংখ্যা ২৩ জোড়া বা ৪৬টি। এর মধ্যে ২টি সেক্স ক্রোমোজোম এবং ৪৪টি অটোজোম।
কোষের বর্জ্য পদার্থ কী কী । Excretory or waste products । ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স
কোষের বর্জ্য পদার্থ (Excretory or waste products)
প্রোটোপ্লাজমের বিপাক ক্রিয়ায় উৎপন্ন উপজাত পদার্থকে বর্জ্য পদার্থ বলে। ইহা কোষে জমা থাকে।
১। রেজিনঃ পাইন, অরোক্যারিয়া প্রভৃতি উদ্ভিদের রজন নালীতে যে আঠা জাতীয় পদার্থ থাকে তাকে রজন বা রেজিন বলে। সেতার ও বেহালার তার মসৃন করার জন্য রজন ব্যবহার হয়।
২। ট্যানিনঃ তেঁতুল ও গাব উদ্ভিদের ফলত্বক ও বীজত্বকে ট্যানিন থাকে। চামড়া পাকানো, রং ও কালি তৈরী করতে ট্যানিন ব্যবহার হয়।
৩। গামঃ জিগা, সজিনা, বাবলা প্রভৃতি উদ্ভিদে গঁদ বা গাম থাকে। ইহা আঠা হিসেবে ব্যবহার হয়।
৪। জৈব এসিডঃ টমেটোতে ম্যালিক এসিড, লেবুতে সাইট্রিক এসিড, আমরুলে অক্সালিক এসিড, তেঁতুলে টারটারিক এসিড থাকে।
৫। ল্যাটেক্সঃ বট, ডুমুর, অশথ, আকন্দ, করবী প্রভৃতি উদ্ভিদের কান্ড, পাতা, ফুল ও ফলে তরুক্ষীর বা ল্যাটেক্স থাকে।
৬। টারপিনয়েডঃ তুলসী পাতা, পুদিনা পাতা, পাইনাস কোষ প্রভৃতিতে টারপিনয়েড থাকে।
৭। অ্যালকালয়েডঃ তামাকে নিকোটিন, ধুতুরায় ডাটুরিন, কফিতে ক্যাফেইন, আফিমে ওপিয়াম, সর্পগন্ধায় সার্পেন্টাইন, সিঙ্কোনায় কুইনাইন প্রভৃতি উপক্ষার বা অ্যালকালয়েড থাকে।
৮। উদ্বায়ী তেলঃ লেবু, তুলসী, কামিনী, রক্তদ্রোণ, শ্বেতদ্রোণ, ইউক্যালিপটাস প্রভৃতি উদ্ভিদের ফুল, ফল ও পাতায় উদ্বায়ী তেল থাকে।
৯। খনিজ ক্রিস্টালঃ খনিজ কেলাস দুই ধরণের। সিস্টোলিথ এবং র্যাফাইড। আঙ্গুরের থোকার মতো ক্যালসিয়াম কার্বনেটকে সিস্টোলিথ এবং সূঁচের মতো ক্যালসিয়াম অক্সালেটকে র্যাফাইড বলে। বট, ডুমুর, রাবার প্রভৃতি উদ্ভিদের পাতায় সিস্টোলিথ এবং মানকচু, ওলকচু, মুখীকচু প্রভৃতি উদ্ভিদের কান্ড ও পাতায় র্যাফাইড থাকে।
কোষের সঞ্চিত পদার্থ কী কী । Reserve materials । ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স
কোষের সঞ্চিত পদার্থ (Reserve materials)
যে সব পদার্থ কোষে সঞ্চিত খাদ্য হিসেবে জমা থাকে তাকে সঞ্চিত পদার্থ বলে। কোষের প্রধান সঞ্চিত পদার্থ হলো–
১। প্রোটিনঃ মসুর, খেসারী, মটর, ছোলা, অড়হড়, মুগ, মাসকলাই প্রভৃতি দানায় প্রোটিন থাকে। এসব প্রোটিন দানাকে অ্যালিউরন দানা বলে।
২। লিপিডঃ নারকেল, বাদাম, সরিষা, রেপসিড প্রভৃতিতে লিপিড থাকে।
৩। শর্করাঃ গম, ভূট্রা, আলু, চাল, কাউন প্রভৃতিতে শর্করা থাকে।
৪। গ্লাইকোজেনঃ যকৃত ও পেশিকোষে প্রাণীজ শে^তসার হিসেবে সঞ্চিত থাকে। ব্যাকটেরিয়া, নীলাভ– সবুজ শৈবাল এবং ছত্রাকে গ্লাইকোজেন সঞ্চিত থাকে।
৫। ইনিউলিনঃ ইনিউলিন একধরণের শর্করা বা পলিস্যাকারাইড। ইহা Compoitae গোত্রের কতিপয় উদ্ভিদ বিশেষ করে সূর্যমুখী, ডালিয়া প্রভৃতি উদ্ভিদের কোষে সঞ্চিত থাকে।
৬। জাইমোজেন দানাঃ বিভিন্ন ধরণের এনজাইম একত্রিত হয়ে জাইমোজেন দানা গঠন করে। ইহা উদ্ভিদ কোষের সাইটোপ্লাজমে সঞ্চিত থাকে।