মায়োসিস-১ চারটি দশায় বিভক্ত। প্রোফেজ-১, মেটাফেজ-১, অ্যানাফেজ-১ এবং টেলোফেজ-১।
১। প্রোফেজ-১ (Prophase-1)ঃ প্রোফেজ-১ পাঁচটি উপদশায় বিভক্ত। লেপ্টোটিন, জাইগোটিন, প্যাকাইটিন, ডিপ্লোটিন এবং ডায়াকাইনেসিস।
(i) লেপ্টোটিন বা লেপ্টোনেমা (Leptotene)ঃ Leptos অর্থ চিকন এবং tene অর্থ সুতা। এ পর্যায়ে কোষের নিউক্লিয়াস আকারে বড় হতে থাকে। ক্রোমোসোম গুলো সরু সুতার মতো দেখায়। ক্রোমোসোম গুলোর মধ্যে জল বিয়োজন (dehydration) শুরু হয়। এতে ক্রোমোসোমের রং বা রঞ্জক ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। ক্রোমোসোমে ক্রোমোমিয়ার নামক দানাদার গুঁটি দেখা যায়। DNA তার প্রতিরুপ সৃষ্টি করে দ্বিগুণ হয়। এ পর্যায়ের শেষের দিকে ক্রোমোসোম গুলো সংকুচিত, খাটো, মোটা ও দৃষ্টি গোচর হয়। নিউক্লিয়ার মেমব্রেন ও নিউক্লিওলাস সুস্পষ্ট থাকে। প্রাণীকোষে অ্যাস্টার রশ্মির দিকে ক্রোমোসোমের প্রান্ত এবং নিউক্লিয়ারপর্দা যুক্ত হয়ে অ্যাটাচমেন্ট প্লেট গঠন করে। অ্যাটাচমেন্ট প্লেট অনেকটা ফুলের তোড়ার মতো দেখায়। বিজ্ঞানী ডার্লিংটন ক্রোমোসোমের এই অবস্থাকে বোকে স্টেজ বা ফুলের তোড়া বলে অভিহিত করেছেন। উদ্ভিদকোষে ক্রোমোসোম ফুলের তোড়ার মতো গঠন সৃষ্টি করলে তাকে সাইনেজেসিস বলে।
(ii) জাইগোটিন বা জাইগোনেমা (Zygotene)ঃ Zygos অর্থ জোড়া এবং tene অর্থ সুতা। এ পর্যায়ে হোমোলোগাস ক্রোমোসোম গুলো জোড়ায় জোড়ায় অবস্থান করে। হোমোলোগাস ক্রোমোসোম গুলোর মধ্যে আকর্ষণ শুরু হয়। ক্রোমোসোম গুলো পরস্পরের কাছাকাছি আসে এবং জোড়া বাঁধে (একটি পিতা থেকে অন্যটি মাতা হতে আসে)। ক্রোমোসোম গুলোর জোড়া বাঁধার প্রক্রিয়াকে সিন্যাপসিস এবং এক এক জোড়া ক্রোমোসোমকে বাইভেলেন্ট বলে। বাইভেলেন্টের ক্রোমোসোম দুটি সাইন্যাপটোনিমাল কমপ্লেক্স দ্বারা যুক্ত থাকে। জোড়া বাঁধার প্রক্রিয়া এক প্রান্ত থেকে শুরু হয়ে অন্য প্রান্তে শেষ হতে পারে, অথবা সেন্ট্রোমিয়ারের মধ্যে আরম্ভ হয়ে ধীরে ধীরে দুদিকে বিস্তার লাভ করতে পারে, অথবা স্থানে স্থানে আরম্ভ হতে পারে। প্রতিটি কোষে যত সংখ্যক ক্রোমোসোম থাকে তার অর্ধেক সংখ্যক বাইভেলেন্ট গঠিত হয়। এ পর্যায়ে ক্রোমোসোম গুলো আরও সংকুচিত, মোটা ও খাটো হয়। নিউক্লিয়ার মেমব্রেন ও নিউক্লিওলাস সুস্পষ্ট থাকে।
[একই গঠন বিশিষ্ট ক্রোমোসোমকে হোমোলোগাস ক্রোমোসোম বলে। হোমোলোগাস ক্রোমোসোমের একটি পিতা থেকে এবং অপরটি মাতা থেকে আসে]
(iii) প্যাকাইটিন বা প্যাকাইনেমা (Pachytene)ঃ গ্রিক শব্দ Pachys অর্থ মোটা বা পুরু এবং tene অর্থ সুতা। প্যাকাইটিন হলো অপেক্ষাকৃত দীর্ঘস্থায়ী পর্যায়। এ পর্যায়ে ক্রোমোসোম গুলো আরও সংকুচিত, খাটো এবং মোটা হয়। বাইভেলেন্টের প্রতিটি ক্রোমোসোম সেন্ট্রোমিয়ার ব্যতীত লম্বালম্বি ভাবে বিভক্ত হয়ে দুটি করে ক্রোমাটিডে পরিনত হয়। ফলে প্রতিটি বাইভেলেন্টে চারটি করে ক্রোমাটিড সৃষ্টি হয়। এ অবস্থাকে টেট্রাড বলে। একই ক্রোমোসোমের ক্রোমাটিড দুটিকে সিস্টার ক্রোমাটিড এবং ভিন্ন ভিন্ন ক্রোমোসোমের ক্রোমাটিড দুটিকে নন-সিস্টার ক্রোমাটিড বলে। দুটি নন-সিস্টার ক্রোমাটিড পরস্পরের কাছাকাছি আসে এবং X আকৃতির গঠন সৃষ্টি করে। একে কায়াজমা (chiasma=cross) বা কাই স্ট্রাকচার বলে। বাইভেলেন্টের ক্রোমাটিড গুলোর দৈর্ঘ্য কম হলে কায়াজমা গঠিত নাও হতে পারে। আবার, ক্রোমাটিড গুলোর দৈর্ঘ্য বেশি হলে একাধিক স্থানে কায়াজমাটা সৃষ্টি হতে পারে। এন্ডোনিউক্লিয়েজ এনজাইমের সহায়তায় কায়াজমা অংশে নন-সিস্টার ক্রোমাটিড দুটি ভেঙ্গে যায় এবং অংশের বিনিময় ঘটায়। এরপর অংশ বিনিময় করা ক্রোমাটিড গুলো লাইগেজ এনজাইমের সহায়তায় জোড়া লাগে। এ ভাবে দুটি নন-সিস্টার ক্রোমাটিডের মধ্যে অংশের বিনিময়কে ক্রসিংওভার বা ক্রসওভার বলে। কায়াজমাটায় ক্রসিংওভারের কারণে ক্রোমোসোম গুলোর মধ্যে গুণগত পরিবর্তন সাধিত হয়। এ পর্যায়ে নিউক্লিয়ার মেমব্রেন ও নিউক্লিওলাস অবিকৃত থাকে।
(iv) ডিপ্লোটিন বা ডিপ্লোনেমা (Diplotene)ঃ Diplos অর্থ দ্বি বা দুই এবং tene অর্থ সুতা। এ পর্যায়ে ক্রোমোসোম গুলো ক্রমাগত সঙ্কোচনের মাধ্যমে আরও খাটো ও মোটা হয়। বাইভেলেন্টের হোমোলোগাস ক্রোমোসোম গুলোর মধ্যে আর্কষণ ক্ষমতা হ্রাস পায় এবং এর পরিবর্তে বিকর্ষণ শুরু হয়। সাধারণত সেন্ট্রোমিয়ারের মধ্যেই প্রথম এবং ব্যাপক ভাবে বিকর্ষণ পরিলক্ষিত হয়। বিকর্ষণের ফলে ক্রোমোসোম গুলো একে অপর হতে দূরে সরে যেতে থাকে। তবে হোমোলোগাস ক্রোমোসোম গুলো সম্পুর্ণ আলাদা হতে পারে না। ক্রোমোসোমের দূরে সরে যাওয়াকে ডিসজাংশন বলে। দুটি কায়াজমাটার উপস্থিতিতে বাইভেলেন্টে একটি লুপ বা ফাঁস সৃষ্টি হয়। কায়াজমাটা গুলো ধীরে ধীরে প্রান্তের দিকে সরে যেতে থাকে। কায়াজমাটার প্রান্তের দিকে সরে যাওয়াকে প্রান্তীয়করণ বা টারমিনালাইজেশন (Terminalization) বলে। এ সময় দুই বা ততোধিক বাহু ৯০ ডিগ্রী কোণ করে আবর্তিত হয়। তবে একটি কায়াজমা থাকলে বাহু গুলো ১৮০ ডিগ্রী কোণে আবর্তিত হতে পারে। এ পর্যায়ের শেষের দিকে কায়াজমাটার সংখ্যা কমে যায়। নিউক্লিয়ার মেমব্রেন অক্ষত থাকলেও নিউক্লিওলাসের বিলুপ্তি সুচনা হয়।
মানুষের ডিম্বাণুকোষের উওসাইটগুলো ভ্রুণীয় অবস্থায় ডিপ্লোটিন দশায় থেমে থাকে। এ অবস্থাকে ডিকটায়োটেন দশা বলে। লুটিনাইজিং হরমোনের প্রভাবে ডিকটায়োটেন দশার সমাপ্তি ঘটে।
(v) ডায়াকাইনেসিস (Diakinesis)ঃ Dia অর্থ বিপরীত দিকে এবং kinesis অর্থ সন্নিবেশ। এ পর্যায়ে ক্রোমোসোম গুলো আরও খাটো ও মোটা হয়। কায়াজমাটা গুলোর সর্বাধিক প্রান্তীয়করণ ঘটে। বাইভেলেন্টের প্রতিটি ক্রোমোসোমের উপর ধাত্র (ম্যাটিক্স) জমা হওয়ার কারণে ক্রোমাটিড গুলোকে আলাদা আলাদা ভাবে চিহ্নিত করা যায় না। বাইভেলেন্ট গুলো নিউক্লিয়াসের কেন্দ্র স্থল হতে পরিধির দিকে সরে আসে। এ সময় ক্রসিংওভারের মাধ্যমে বিনিময়কৃত অংশ দৃশ্যমান হয়। এ পর্যায়ের শেষের দিকে নিউক্লিওলাস অদৃশ্য হয়ে যায় এবং নিউক্লিয়ার পর্দাও অপসারিত হয়।
প্রোফেজ-১ হলো মিয়োসিস কোষ বিভাজনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ। এ পর্যায়ে জিনের নতুন বিন্যাস ঘটে। ফলে নতুন বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন নতুন প্রজাতি সৃষ্টি হয়।
২। মেটাফেজ–১ (Metaphase-1)ঃ মেটাফেজ–১ এ ক্রোমোসোম গুলো আরও মোটা ও খাটো হতে থাকে। বাইভেলেন্টের প্রতিটি সেন্ট্রোমিয়ার বিষুবীয় রেখা হতে সমদূরে মেরুর দিকে অবস্থান করে। সেন্ট্রোমিয়ার ট্র্যাকশন ফাইবারের সাথে যুক্ত থাকে। ক্রোমোসোমের মধ্যে লুপ সৃষ্টি হয়। এ পর্যায়ের শেষের দিকে ট্র্যাকশন ফাইবারের টানে বাইভেলেন্টের ক্রোমোসোম দু’টি পৃথক হতে থাকে।
৩। অ্যানাফেজ–১ (Anaphase-1)ঃ অ্যানাফেজ–১ এ হোমোলোগাস ক্রোমোসোম পৃথক হয়ে যায়। ক্রোমোসোম গুলো বিপরীত মেরুর দিকে ধাবিত হয়। ক্রোমোসোম সূত্রের সঙ্কোচন এবং কান্ডদেহের প্রসারণের কারণে ক্রোমোসোমের মেরু চলন ঘটে। একে অ্যানাফেজিক চলন বলে। মেরু চলনের সময় সেন্ট্রোমিয়ার অগ্রগামী এবং বাহুদ্বয় অনুগামী হয়। মেরু অঞ্চলে পৌছালে ক্রোমোসোম গুলো ইংরেজি V, L, J বা I অক্ষরের মতো দেখায়। বাইভেলেন্টের অবিভক্ত পূর্ণাঙ্গ ক্রোমোসোম মেরুতে পৌছায় বলে ক্রোমোসোম সংখ্যা মাতৃকোষের ক্রোমোসোম সংখ্যার অর্ধেক হয়ে যায়।
৪। টেলোফেজ–১ (Telophase-1)ঃ টেলোফেজ–১ হলো মিয়োসিস–১ এর শেষ পর্যায়। ক্রোমোসোম গুলো বিপরীত দুই মেরুতে স্থির ভাবে অবস্থান করে। ক্রোমোসোমের পানি যোজন বা পানি শোষণ (hydration) শুরু হয়। ক্রোমোসোমের রং বা রঞ্জক ধারণ ক্ষমতা কমে যায়। ক্রোমোসোম গুলোর কুন্ডলী বা প্যাঁচ খুলে যায় এবং লম্বা, সরু ও অস্পষ্ট হয়। নিউক্লিয়ার মেমব্রেন ও নিউক্লিওলাস এর আবির্ভাব ঘটে। ফলে দুই প্রান্তে দুইটি নিউক্লিয়াস সৃষ্টি হয়। অনেক প্রজাতিতে টেলোফেজ–১ পর্যায়ে সাইটোকাইনেসিস ঘটে। অর্থাৎ কোষের বিষুবীয় অঞ্চলে কোষপ্লেট সৃষ্টি হয়ে দুটি অপত্য কোষে পরিনত হয়। অপত্য কোষে হ সংখ্যক ক্রোমোসোম থাকে। অনেক প্রজাতিতে টেলোফেজ–১ ঘটে না।