আলুর লেট ব্লাইট রোগের কারণ, লক্ষণ ও প্রতিকার । Late blight। ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

আলুর লেট ব্লাইট রোগের কারণঃ Phytophthora infestans ছত্রাকের কারণে আলুর লেট ব্লাইট রোগ হয়। (তবে Alternaria solani ছত্রাকের কারণে আলুর আর্লি ব্লাইট রোগ হয়)
লেট ব্লাইট রোগের বিস্তার
রোগাক্রান্ত আলু থেকে রোগের প্রাথমিক সংক্রমণ ঘটে। রোগাক্রান্ত আলু থেকে চারা গাছে সুপ্ত মাইসেলিয়াম উজ্জীবিত হয়ে উঠে। ছত্রাকের মাইসেলিয়াম থেকে কনিডিওফোর উৎপন্ন হয়। কনিডিওফোরে কনিডিয়া সৃষ্টি হয়। কনিডিয়া পানি ও বাতাসের সাহায্যে বিস্তার লাভ করে এবং নতুন উদ্ভিদকে আক্রমণ করে।
এশিয়া, উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ, ক্যারাবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ, ওশেনিয়া, অস্ট্রেলিয়া, ফিজি, নিউক্যালিডোনিয়া, নিউজিল্যান্ড ও পাপুয়া নিউগিনিতে এ রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। শীতকালে তাপমাত্রা খুব নিম্ন হলে বাংলাদেশে এ রোগের সম্ভাবনা থাকে।

Phytophthora infestans ছত্রাকের বৈশিষ্ট্য
১। ছত্রাকের মাইসেলিয়াম বর্ণহীন সাদা তুলার মতো।
২ ছত্রাকের মাইসেলিয়াম অধিক শাখান্বিত এবং সিনোসাইটিক।
৩। এরা মৃতজীবী বা পরজীবী হিসেবে বাস করে।
৪। পোষকদেহের আন্তঃকোষীয় ফাঁকে অবস্থান করে এবং হস্টোরিয়া দ্বারা খাদ্য শোষণ করে।
৫। স্পোরাঞ্জিওফোরের শাখায় লেবু আকৃতির স্পোরাঞ্জিয়াম উৎপন্ন হয়।
৬। স্পোরাঞ্জিয়ামে দ্বি-ফ্ল্যাজেলাযুক্ত স্পোর উৎপন্ন হয়।
৭। কনিডিওফোরের প্রতিটি শাখার শীর্ষে একটি করে কনিডিয়াম উৎপন্ন হয়।
৮। কনিডিয়াগুলো ডিম্বাকার, পুরু প্রাচীরবিশিষ্ট, দানাদার প্রোটোপ্লাজম এবং একাধিক নিউক্লিয়াসযুক্ত।
৯। ইহা ডিপ্লয়েড প্রকৃতির ছত্রাক। এর কোষে ১১-১৩টি ক্রোমোসোম থাকে। এতে ২৪০ মিলিয়ন ক্ষারকযুগল এবং ১৮০০০ জিন রয়েছে।

আলুর লেট ব্লাইট রোগের লক্ষণ
১। পাতায় রোগের লক্ষণ
(i) পাতার আগা ও কিনারায় সবুজ-ধুসর বর্ণের দাগ দেখা যায়। দাগগুলো গোলাকার বা অসম আকৃতির।
(ii) দাগ গুলো বড় হয়, হালকা বাদামী বর্ণের হয় এবং শেষে লালচে কালো বা কালো বাদামী বর্ণ ধারণ করে।
(iii) পাতায় কালচে ভেজা দাগসহ পচন সৃষ্টি হয়।
(iv) আক্রান্ত স্থানে মখমলের মতো আস্তরণ সৃষ্টি হয়।
(v) পাতার নি¤œতলে সূত্রাকার মাইসেলিয়াম ও কনিডিওফোর দেখা যায়।
(vi) দাগ গুলো পাতার বোটা বা পত্রবৃন্তে বিস্তার লাভ করে।
(vii) রোগাক্রান্ত পাতা ঝলসে যাওয়ার মতো শুকিয়ে যায়।
(viii) টিউবারে শুষ্ক পচন (Dry rot) ধরে।
২। কান্ডে রোগের লক্ষণ
(i) মেঘলা ও আর্দ্র আবহাওয়ায় দাগ পাতা থেকে কান্ডে বিস্তার লাভ করে এবং গাছ ঢলে পড়ে।
(ii) ১২-২৫০ সে তাপমাত্রায় দাগ গাছের সমস্ত দেহে ছড়িয়ে পড়ে।
(iii) আক্রমণ তীব্র হলে আক্রান্ত গাছ হতে পচা ডিমের ন্যায় দুর্গন্ধ বের হয়।
(iv) রোগাক্রান্ত গাছ মরে কালো হয়ে যায়।
৩। আলুতে রোগের লক্ষণ
(i) রোগাক্রান্ত আলু বা টিউবারে লালচে-বাদামী ছোপ দেখা যায়।
(ii) রোগাক্রান্ত আলুর খোসায় লালচে বাদামী কালো দাগ দেখা যায়।
(iii) টিউবারে আর্দ্র পচন ধরে।
(iv) টিউবারে শুষ্ক পচন (Dry rot) ধরে।
(v) আলু বা টিউবারের ফলন কমে যায়।
আলুর লেট ব্লাইট রোগের প্রতিকার
১। রোগ প্রতিরোধী জাতকে বীজ হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। কুফরি সিন্দুরি, কুফরি চন্দ্রমুখী, কুফরি চমৎকার, RKM, অ্যাবানাকি, বেলচিপ, ব্যাক কিং, সুপেরিয়র প্রভৃতি রোগ প্রতিরোধী আলুর জাত ব্যবহার করতে হবে।
২। রোগ মুক্ত এলাকা থেকে আলু বীজ সংগ্রহ করতে হবে।
৩। বীজ আলু প্রখর রোদে শুকাতে হবে।
৪। উঁচু স্থানে আলুর চাষ করতে হবে।
৫। আলু গাছের গোঁড়ার মাটি উঁচু করে দিতে হবে।
৬। জমির মাটি বেশী ভেজা না থাকা।
৭। জমির আবর্জনা পুড়িয়ে ফেলতে হবে।
৮। ১% বোর্দোমিশ্রণ বা কপার-লাইম দ্বারা জমির মাটি ভালভাবে শোধন করতে হবে।
৯। খোলামেলা জমিতে আলু চাষ করতে হবে এবং আলু গাছের সারির মাঝখানে ফাঁক রাখতে হবে।
১০। গাছ ৬-১০ সেমি হলে একবার, এরপর ১৫ দিন পর পর ডায়াথন এম-৪৫ ছিটাতে হবে।
১১। Bordeaux mixture, Mancozeb 0.2% ও Copper oxychloride দ্বারা রোগ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
১২। সাইনক্স বা অ্যামোনিয়াম থায়োসায়ানেট ছিটিয়ে রোগাক্রান্ত পাতা ঝরিয়ে ফেলতে হবে।
১৩। শুকনো আবহাওয়ায় আলু সংগ্রহ করতে হবে।
১৪। আলু হিমাগারে সংরক্ষণ করতে হবে। হিমাগারে ৫০ সে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
১৫। জমিতে সেচ ও নাইট্রোজেন সারের ব্যবহার পরিহার করতে হবে।
১৬। শস্য আবর্তন পদ্ধতি প্রবর্তন করতে হবে।
১৭। কোয়ারেন্টাইন পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *