জীববৈচিত্র্যতা ।। জীববৈচিত্র্যের প্রকারভেদ ও গুরুত্ব ।। Biodiversity ।। ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

গ্রিক শব্দ Bios অর্থ জীব বা জীবন এবং diversity অর্থ বৈচিত্র্যতা বা ভিন্নতা নিয়ে Biodiversity শব্দটি গঠিত। জীবের জীবন বৈচিত্র্যময়তাকেই জীববৈচিত্র্যতা বলে। কোন নির্দিষ্ট সময়ে কোন নির্দিষ্ট পরিবেশে বসবাসকারী সকল জীবের মধ্যে যে পার্থক্য বা বিভিন্নতা দেখা যায় তাকে জীববৈচিত্র্য বা বায়োডাইভারসিটি বলে। সর্বপ্রথম ১৯৮৬ সালে বিজ্ঞানী Walter G. Rosen জীববৈচিত্র্য বা Biodiversity শব্দটি ব্যবহার করেন। জীববৈচিত্র্যতা তিন প্রকার।

 

১। জিনগত বৈচিত্র্য (Genetics diversity) ঃ একই প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন উদ্ভিদ বা প্রাণীর মধ্যে যে জিনগত পার্থক্য বা বিভিন্নতা দেখা যায় তাকে জিনগত জীববৈচিত্র্য বা জেনেটিক ডাইভারসিটি বলে। একে অন্তঃপ্রজাতিক (intraspesific) বৈচিত্র্যও বলা হয়। এসব প্রজাতির সদস্যদের মধ্যে অন্তঃজনন (inbreeding) ঘটে। যে প্রজাতির জিনগত বৈচিত্র্য বেশি তার অভিযোজন ক্ষমতাও বেশি। জিন রোগের প্রতি সংবেদনশীল হলে তা বংশ পরস্পরায় সঞ্চারিত হয়। মানুষ একই প্রজাতির (Homo sapien) হওয়া সত্তে¡ও জিনগত কারণে আকার, আকৃতি, গায়ের রং, চুলের বর্ণ প্রভৃতিতে অনেক পার্থক্য দেখা যায়। প্রজাতিতে জিনের অ্যালিল ভিন্নতার কারণে জিনগত বৈচিত্র্য সৃষ্টি হয়। মিউটেশনের কারণে জিনের নতুন অ্যালিল সৃষ্টি হতে পারে।

 

জিনগত বৈচিত্র্যের গুরুত্ব (Importance of genetics diversity)

(i) কোনো প্রজাতিতে অধিক পরিমান জিনগত বৈচিত্র্য থাকলে অধিক প্রকরণ সৃষ্টি হয়। ফলে জীবে পরিবর্তনশীল পরিবেশে টিকে থাকতে সহায়তা করে।

(ii) জিনগত বৈচিত্র্য জীবদেহে নানা ধরনের শারীরিক বৈশিষ্ট্য আনয়ন করে। তাই প্রকৃতিতে টিকে থাকা এবং অভিযোজন ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।

(iii) জিনগত বৈচিত্র্য বংশগতিয় অনাকাক্সিক্ষত বৈশিষ্ট্যের পুনঃআবির্ভাব হ্রাস করে।

(iv) কম জিনগত বৈচিত্র্য বিশিষ্ট জীব সর্বদা হুমকিতে থাকে।

(v) জিনগত বৈচিত্র্য পরজীবী, বালাই ও রোগ প্রতিরোধে সহায়তা করে।

(vi) জিনগত বৈচিত্র্য প্রজাতিকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করে। কারণ এতে বেঁেচ থাকার বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান।

 

২। প্রজাতিগত বৈচিত্র্য (Species diversity) দুই বা ততোধিক প্রজাতির উদ্ভিদ বা প্রাণীর মধ্যে যে পার্থক্য বা বিভিন্নতা দেখা যায় তাকে প্রজাতিগত বৈচিত্র্য যভ স্পেসিস ডাইভারসিটি বলে। একে আন্তঃপ্রজাতিক (interspesific) বৈচিত্র্যও বলা হয়। প্রজাতি বৈচিত্র্যের প্রধান উপাদান দুইটি। প্রজাতি সমৃদ্ধ (species richness) এবং প্রজাতি সমতা (species evenness) প্রজাতি বস্তুতন্ত্রে যে ভূমিকা রাখে তাকে পরিবেশগত কুলুঙ্গি (ecological niche) বলে। যে অঞ্চলে প্রজাতিগত বৈচিত্র্য বেশি সে অঞ্চলকে জীববৈচিত্র্যের হটস্পট হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যে অঞ্চলে পুষ্টি উপাদান আবহাওয়া অনুক সে অঞ্চলে প্রজাতি বৈচিত্র্য বেশি। যেমনগ্রীষ্মমন্ডলীয় অঞ্চল।

 

প্রজাতি বৈচিত্র্য পরিমাপ (Measurement of species diversity) প্রজাতি বৈচিত্র্য সূচক দ্বারা প্রাণীর প্রজাতি বৈচিত্র্য পরিমাপ করা হয়। প্রজাতি বৈচিত্র্য পরিমাপের সর্বাধিক ব্যবহৃত সূচক হলো সিম্পসন ডাইভাসিটি ইনডেক্স (Simpson’s Diversity Index) একে D = ∑(n/N)2 দ্বারা প্রকাশ করা হয়। n হলো কোনো নির্দিষ্ট প্রাণী প্রজাতির সংখ্যা, N হলো সকল প্রাণী প্রজাতির সমাহার এবং D  হলো প্রাণী বৈচিত্র্যের মান। D এর মান পর্যন্ত। কোনো স্থানে D এর মান যত বেশি হবে প্রাণী বৈচিত্র্য তত বেশি হবে। ১৯৯০ সালে বিজ্ঞানী নরম্যান মায়ার (Norman Myer, 1990) পৃথিবীর জীববৈচিত্র্য বিশিষ্ট এলাকাকে হট স্পট নামে অভিহিত করেন।

 

প্রজাতিগত বৈচিত্র্যের গুরুত্ব (Importance of species diversity)

(i) প্রজাতিগত বৈচিত্র্য বাস্তুতন্ত্রে শক্তি আহরণ সঞ্চয়, জৈববস্তু উৎপাদন বিয়োজন এবং পানি পুষ্টি উপাদানের আবর্তন ঘটায়।

(ii) প্রজাতিগত বৈচিত্র্য বাস্তুতন্ত্রের উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।

(iii) প্রজাতিগত বৈচিত্র্য ভূমিক্ষয়রোধ বালাই নিয়ন্ত্রণ করে।

(iv) প্রজাতিগত বৈচিত্র্য বায়ুমন্ডলে গ্যাসীয় পদার্থের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে।

 

৩। বাস্তুতান্ত্রিক বৈচিত্র্য (Ecosystem diversity) বিভিন্ন ধরনের জীবের মধ্যে যে পরিবেশ বা বাস্তুসংস্থানিক  পার্থক্য বা বিভিন্নতা দেখা যায় তাকে পরিবেশগত বৈচিত্র্য বা ইকোসিস্টেম ডাইভারসিটি বলে। প্রাকৃতিক পরিবেশের ভৌত, জৈব রাসায়নিক উপাদানের পরিবর্তন ঘটলে বাস্তুতাস্ত্রিক বৈচিত্র্যের উদ্ভব ঘটে। যেমনমরু বায়োম, বনভুমির বায়োম, তৃণভুমির বায়োম, তুন্দ্রা বায়োম প্রভৃতি।

 বাস্তুতান্ত্রিক বৈচিত্র্যের গুরুত্ব (Importance of species diversity)

(i) বাস্তুতান্ত্রিক বৈচিত্র্য বর্জ্য পদার্থের বিয়োজন ঘটায় এবং মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করে।

(ii) বাস্তুতান্ত্রিক বৈচিত্র্য উদ্ভিদের পরাগায়ন শিকারশিকারী নিয়ন্ত্রণ করে।

(iii) বাস্তুতান্ত্রিক বৈচিত্র্য উৎপাদনশীলতা এবং পীড়ন বা চাপ সহনশীলতা নিয়ন্ত্রণ করে।

(iv) বাস্তুতান্ত্রিক বৈচিত্র্য জীবজগতের প্রয়োজনীয় কাঁচামালের যোগান দেয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Dr. Abu Bakkar Siddiq