১। পেরিকার্ডিয়াম আবরণী
হৃৎপিন্ড দ্বিস্তরী পেরিকার্ডিয়াম আবরণী দ্বারা আবৃত থাকে। বাইরের অংশকে তন্তুময় আবরণী এবং ভিতরের অংশকে সেরাস আবরণী বলে। সেরাস আবরণীর দুইটি স্তর থাকে। প্যারাইটাল স্তর ও ভিসেরাল স্তর। বাইরের স্তরকে প্যারাইটাল স্তর এবং ভিতরের স্তরকে ভিসেরাল স্তর বলে। স্তর দুটির মাঝখানে পেরিকার্ডিয়াল ফ্লুইড থাকে। এই তরল পদার্থ হৃৎপিন্ডকে তাপ, চাপ ও ঘর্ষণজনিত আঘাত থেকে রক্ষা করে।
২। হৃৎপিন্ডের প্রাচীর
হৃৎপিন্ডের প্রাচীর হৃৎপেশী দ্বারা গঠিত। এর তিনটি স্তর থাকে। এ গুলো হলো–
(i) এপিকার্ডিয়ামঃ হৃৎপ্রাচীরের বাইরের স্তরকে এপিকার্ডিয়াম বলে। ইহা চর্বিযুক্ত।
(ii) মায়োকার্ডিয়ামঃ হৃৎপ্রাচীরের মধ্যবর্তী স্তরকে মায়োকার্ডিয়াম বলে। ইহা সংকোচন–প্রসারণক্ষম।
(iii) এন্ডোকার্ডিয়ামঃ হৃৎপ্রাচীরের ভিতরের স্তরকে এন্ডোকার্ডিয়াম বলে। ইহা কপাটিকা গুলোকে ঢেকে রাখে।
৩। হৃৎপিন্ডের প্রকোষ্ঠ
মানুষের হৃৎপিন্ড চারটি প্রকোষ্ঠ নিয়ে গঠিত। এ গুলো হলো–
(i) ডান অলিন্দ বা অ্যাট্রিয়ামঃ ডান অ্যাট্রিয়াম বড় এবং পাতলা আবরণী দ্বারা আবৃত থাকে। এর উপরের দিকে উর্ধ্ব মহাশিরা বা সুপিরিয়র ভেনাক্যাভা এবং নিচের দিকে নিম্ন মহাশিরা বা ইনফিরিয়র ভেনাক্যাভা থাকে। ইহা ট্রাইকাসপিড কপাটিকার মাধ্যমে CO2 যুক্ত রক্ত ডান নিলয়ে পৌছে দেয়।
(ii) বাম অলিন্দ বা অ্যাট্রিয়ামঃ বাম অলিন্দ সামান্য ছোট এবং পুরু প্রাচীর দ্বারা আবৃত থাকে। এর সাথে ফুসফুসীয় শিরা যুক্ত থাকে। ইহা বাইকাসপিড কপাটিকার মাধ্যমে O2 যুক্ত রক্ত বাম নিলয়ে পৌছে দেয়। অলিন্দ দুটির মাঝখানে আন্তঃঅলিন্দ পর্দা থাকে।
(iii) ডান নিলয় বা ভেন্ট্রিকলঃ ডান নিলয় সামান্য বড় এবং পুরু প্রাচীর দ্বারা আবৃত থাকে। এর একদিকে ট্রাইকাসপিড কপাটিকা এবং অপরদিকে সেমিলুনার কপাটিকা থাকে। ইহা সেমিলুনার কপাটিকার মাধ্যমে CO2 যুক্ত রক্ত পালমোনারী ধমনীতে পৌছে দেয়।
(iv) বাম নিলয় বা ভেন্ট্রিকলঃ বাম নিলয় সামান্য ছোট এবং পুরু প্রাচীর দ্বারা আবৃত থাকে। এর প্রাচীর ডান নিলয়ের প্রাচীর অপেক্ষা তিনগুণ পুরু। নিলয়ের প্রাচীর হতে মাংসল কলামনি কর্নি সৃষ্টি হয়। এর একদিকে বাইকাসপিড কপাটিকা এবং অপরদিকে সেমিলুনার কপাটিকা থাকে। ইহা সেমিলুনার কপাটিকার মাধ্যমে O2 যুক্ত রক্ত মহাধমনী বা অ্যাওর্টায় পৌছে দেয়। নিলয় দুটির মাঝখানে আন্তঃনিলয় পর্দা থাকে।
৪। হৃৎপিন্ডের কপাটিকা
(i) দ্বিপত্রী বা বাইকাসপিড কপাটিকাঃ বাম অলিন্দ ও নিলয়ের মাঝখানে বাইকাসপিড কপাটিকা অবস্থিত। একে মিট্রাল কপাটিকা বলা হয়। ইহা কর্ডা টেন্ডনি তন্তু দ্বারা কলামনি কর্নির সাথে যুক্ত থাকে। এর আয়তন ৪-৬ বর্গসেমি। ইহা O2 যুক্ত রক্তকে বাম অলিন্দ হতে বাম নিলয়ে আসতে দেয়।
(ii) ত্রিপত্রী বা ট্রাইকাসপিড কপাটিকাঃ ডান অলিন্দ ও নিলয়ের মাঝখানে ট্রাইকাসপিড কপাটিকা অবস্থিত। ইহা কর্ডা টেন্ডনি তন্তু দ্বারা কলামনি কর্নির সাথে যুক্ত থাকে। এর আয়তন ৭-৯ বর্গ সেমি। ইহা CO2 যুক্ত রক্তকে ডান অলিন্দ হতে ডান নিলয়ে আসতে দেয়।
(iii) পালমোনারী সেমিলুনার কপাটিকাঃ ডান নিলয় ও পালমোনারী ধমনীর মাঝখানে যে অর্ধচন্দ্রাকৃতির কপাটিকা থাকে তাকে পালমোনারী সেমিলুনার কপাটিকা বলে। ইহা ত্রি-পর্দা বিশিষ্ট। তবে দ্বি-পর্দা বিশিষ্ট (১-২) হতে পারে। এই কপাটিকার মাধ্যমে CO2 যুক্ত রক্ত ডান নিলয় থেকে পালমোনারী ধমনীতে প্রবেশ করে।
(iv) অ্যাওর্টিক সেমিলুনার কপাটিকাঃ বাম নিলয় ও অ্যাওর্টিক ধমনীর মাঝখানে যে অর্ধচন্দ্রাকৃতির কপাটিকা থাকে তাকে অ্যাওর্টিক সেমিলুনার কপাটিকা বলে। ইহা ত্রি-পর্দা বিশিষ্ট। এই কপাটিকার মাধ্যমে O2 যুক্ত রক্ত বাম নিলয় থেকে অ্যাওর্টিক ধমনীতে প্রবেশ করে।
(v) করোনারি বা থিবোসিয়ান কপাটিকাঃ করোনারী সাইনাস এবং ডান অলিন্দের মাঝখানে থিবেসিয়ান কপাটিকা থাকে। এটি ভ্রুণীয় সাইনো-অ্যাট্রিয়াল কপাটিকার ক্ষয়প্রাপ্ত অংশ। অনেকক্ষেত্রে ইহা অনুপস্থিত থাকে।
(vi) ইউস্টেশিয়ান কপাটিকাঃ ইহা নিম্ন মহাশিরা ও ডান অলিন্দের মাঝখানে অবস্থিত। এই কপাটিকার মধ্য দিয়ে CO2 যুক্ত রক্ত ডান অলিন্দে প্রবেশ করে। ইটালিয়ান চিকিৎসক Bartolomeo Eustachi এ কপাটিকা আবিষ্কার করেন।
৫। সংযোগকারী কলা (Junction tissue)
হৃৎপিন্ডের প্রাচীরের রুপান্তরিত পেশিকে মায়োজেনিক বা সংযোগী টিস্যু বলে। হৃৎপিন্ডের মায়োজেনিক টিস্যু হলো-
(i) সাইনো-অ্যাট্রিয়াম নোড (SAN) বা পেসমেকার ঃ উর্ধ্ব মহাশিরা বা সুপিরিয়র ভেনাক্যাভা ও ডান অলিন্দের মাঝখানে একগুচ্ছ বিশেষায়িত হৃৎপেশি থাকে। একে SAN বলে। এর দৈর্ঘ্য ১০-১৫ mm, প্রস্থ ৩ mm এবং পুরু ১ mm। SAN থেকে হৃৎপিন্ডের সংকোচন-প্রসারণের উদ্দীপনা বা অ্যাকশন পোটেনসিয়াল সৃষ্টি হয়। তাই SA নোডকে প্রাথমিক গতির উৎপাদক বলা হয়। উত্তেজনার ঢেউ সৃষ্টি এবং ঢেউ সৃষ্টির উদ্দীপক হিসেবে কাজ করে বলে SAN-কে পেসমেকার বলা হয়। ইহা প্রতি মিনিটে ১০০ বিট হৃদস্পন্দন ঘটায়। দেহ হতে হৃৎপিন্ড বিচ্ছিন্ন করা হলেও এর সঙ্কোচন চলতে থাকে। এর কার্যকারীতা কমে গেলে ক্লান্তি ও শ্বাসকষ্ট হয়। একে ইশকেমিয়া বলে। মার্টিন ফ্লাক (১৯০৭) এটি আবিষ্কার করেন।
(ii) অ্যাট্রিও ভেন্ট্রিকুলার নোড (AVN)ঃ হৃৎপিন্ডের ডান অলিন্দ-নিলয়ের মধ্যবর্তী পর্দায় AVN অবস্থিত। ইহা হৃৎপেশি দ্বারা গঠিত। একে সংরক্ষিত পেসমেকার বলা হয়। কারণ SAN যদি বৈদ্যুতিক সংকেত সৃষ্টিতে ব্যর্থ হয় তাহলে উহা সৃষ্টি করে। এটি SAN থেকে উদ্দীপনা গ্রহণ করে বান্ডল অব হিজ-এ সঞ্চারিত করে। SAN থেকে উদ্দীপনা AVN পৌছাতে ০.০৩ সেকেন্ড সময় লাগে। কিন্তু AVN-এ উদ্দীপনা আসতে ০.০৯ সেকেন্ড বিলম্ব হয়। একে AV Nodal Delay বলে। এরপর AVN ঠঘ থেকে ভেন্ট্রিকলের পেশিতে পৌছাতে আরও ০.০৪ সেকেন্ড সময় লাগে। অর্থাৎ AVN থেকে উদ্দীপনা ভেন্ট্রিকলের পেশিতে পৌছাতে মোট (০.০৩+০.০৯+০.০৪) ০.১৬ সেকেন্ড সময় লাগে।
(iii) বান্ডল অব হিজঃ AVN এর পিছনে বান্ডল অব হিজ অবস্থিত। ইহা বহুমাত্রিক ক্ষুদ্র ফসিকল দ্বারা গঠিত। এর দুইটি শাখার মধ্যে একটি বাম নিলয় এবং অপরটি ডান নিলয়ের প্রাচীর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। সুইস কার্ডিওলজিস্ট উইলহেলম হিজ (১৮৯৩) এটি আবিষ্কার করেন।
(vi) পারকিনজি তন্তুঃ বান্ডল অব হিজের শেষ প্রান্ত সুক্ষ্ম তন্তুতে পরিনত হয় এবং নিলয়ের প্রাচীরে জালক সৃষ্টি করে। একে পারকিনজি তন্তু বলে। ইহা বিশেষায়িত হৃৎপেশি দ্বারা গঠিত এবং দ্রুত ও কার্যকরভাবে হৃদক্রিয়া পরিবাহিত করে। এর গতি প্রতি মিনিটে ৪০-৬০ বার। ইহা নিলয়ের প্রাচীরের সংকোচন ঘটায়। জন ইভানজেলিস্ট পারকিনজি (১৮৩৯) এটি আবিষ্কার করেন।