সাইনুসাইটিসের কারণ, লক্ষণ, সমস্যা ও প্রতিকার । Sinusitis। ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকের আক্রমণে অথবা এলার্জিজনিত কারণে সাইনাসের মিউকাস পর্দায় যে প্রদাহ সৃষ্টি হয় তাকে সাইনুসাইটিস বলে। চিকিৎসা বিজ্ঞানে উর্ধ্ব শ্বাসনালি অর্থাৎ নাক, কান ও গলার সাইনাসের সংক্রমণকে সাইনুসাইটিস বলা হয়। পেরিফারেল নার্ভ স্টিমুলেশন (PNS) X-ray দ্বারা সাইনুসাইটিস নির্ণয় করা হয়।
মুখমন্ডলে চার জোড়া বায়ুপূর্ণ নাসিকা গহ্বর বা সাইনাস আছে। এগুলো হলো-
১। ম্যাক্সিলারী সাইনাসঃ ম্যাক্সিলারী অঞ্চলে গালে একজোড়া ম্যাক্সিলারী সাইনাস অবস্থিত। এর প্রদাহের কারণে গালে, দাঁতে ও মাথায় ব্যথা হয়।
২। এথময়েড সাইনাসঃ দুই চোখের মাঝখানে একজোড়া এথময়েড সাইনাস অবস্থিত। এর প্রদাহে চোখের সামনে, পিছনে এবং মাথায় ব্যথা হয়।
৩। স্ফেনয়েড সাইনাসঃ দুই চোখের পিছনে একজোড়া স্ফেনয়েড সাইনাস অবস্থিত। এর প্রদাহে চোখের পিছনে এবং মাথার চ‚ড়ায় ব্যথা হয়।
৪। ফ্রন্টাল সাইনাসঃ চোখের উপরে একজোড়া ফ্রন্টাল সাইনাস অবস্থিত। এর প্রদাহে চোখের উপরে এবং মাথার চ‚ড়ায় ব্যথা হয়।
সাইনুসাইটিসের প্রকারভেদ (Classification of Sinusitis)
স্থায়িত্বের ভিত্তিতে সাইনুসাইটিসকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। যথা-
১। অ্যাকিউট সাইনুসাইটিসঃ রোগের প্রদাহের স্থায়িত্ব ৪-৮ সপ্তাহ হলে তাকে অ্যাকিউট সাইনুসাইটিস বলে।
২। ক্রনিক সাইনুসাইটিসঃ রোগের প্রদাহের স্থায়িত্ব ৩ মাসের অধিককাল হলে তাকে ক্রনিক সাইনুসাইটিস বলে।

সাইনুসাইটিসের কারণ (Causes of Sinusitis)
১। প্রায় সকল সাইনুসাইটিসের কারণ হলো ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক।
২। ছত্রাকের আক্রমণে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেলে সাইনুসাইটিস হয়।
৩। এলার্জির কারণে এই রোগ হতে পারে।
৪। নাসা নালি সরু বা বন্ধ হয়ে গেলে এবং নাকের ভিতরে পলিপ বা মাংসপিন্ড হলে।
৫। দাঁতে ইনফেকশন হলে অথবা দাঁত উঠানোর কারণে সাইনাসে ইনফেকশন হলে।
৬। ময়লা পানিতে ঝাপ দিলে যদি ময়লা পানি নাকের সাইনাসে প্রবেশ করে।
৭। নাকের হাড় বাঁকা থাকলে বা ফেটে গেলে।
৮। নাকের পিছনের টনসিল বড় হলে এই রোগ হয়।
৯। সিস্টিক ফাইব্রোসিস জিনের কারণে এই রোগ হয়ে থাকে।
১০। ইউস্টেশিয়ান নালি অস্বাভাবিক হয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হলে ক্রনিক সাইনুসাইটিস হয়ে থাকে।
১১। অপুষ্টি, ঠান্ডা, পরিবেশ দুষণ ও স্যাঁতসেঁতে পরিবেশের কারণে সাইনুসাইটিস হয়।

সাইনুসাইটিসের লক্ষণ (Symptoms of Sinusitis)
১। নাকে সর্দি হয়, নাক দিয়ে ক্রমাগত পানি ঝরে, সাত দিন পরেও নাক দিয়ে পানি ঝরতে থাকে।
২। মাথা ব্যথা, কপালে ব্যথা এবং চোখের চারপাশে চাপা ব্যথা হয়।
৩। শ্বাস নিতে কষ্ট হয়।
৪। মাথা নড়াচড়া করলে, হাঁটলে বা মাথা নিচু করলে ব্যথার তীব্রতা বাড়ে।
৫। জ্বর জ্বর ভাব থাকে, কোন কিছুতে ভাল লাগে না, সামান্য পরিশ্রমে ক্লান্তি ও অবসন্ন বোধ হয়।
৬। এক্স-রে করলে নাকের সাইনাস ঘোলাটে দেখায়।
৭। নাক বন্ধ থাকে, ঘ্রাণ অনুভ‚তি থাকে না, দুর্গন্ধযুক্ত নিঃশ্বাস বের হয় এবং নাকের ভিতরে পুঁজ জমে।
৮। নাক দিয়ে হলদে বা সবুজ বর্ণের তরল বের হয় এবং তরলের সাথে পুঁজ বা রক্ত থাকে।
৯। কাশি হয় এবং রাতে কাশির তীব্রতা বাড়ে।
১০। কন্ঠস্বর বা গলা ভেঙ্গে যায়।

সাইনুসাইটিসের জটিলতা (Complecations of Sinusitis)
১। মুখ ব্যথা, চোখ ব্যথা, মাথা ব্যথা ও মাথা ঘোরা হয়।
২। নাক বন্ধ হয়ে যায় এবং শ্বাস-প্রশ্বাসে কষ্ট হয়।
৩। চোখ ও মস্তিষ্কের সাইনাসে ইনফেকশন হলে চোখ ও মস্তিষ্কে মারাত্বক জটিলতা হতে পারে।
৪। চোখে সংক্রমণ হলে চোখ নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
৫। মস্তিষ্কের সংক্রমণে মেনিনজাইটিস এবং মস্তিষ্কে ক্ষত (ব্রেইন অ্যাবসেস) হতে পারে।
৬। দৃষ্টি সমস্যা এবং খিচুনী হতে পারে।
৭। হাঁপানি হয় এবং রাতে কাশি হয়।
৮। দাঁত ব্যথা হয় এবং মুখে দুর্গন্ধ হয়।

সাইনুসাইটিসের প্রতিকার (Prevention of Sinusitis)
১। প্রতিদিন ৮-১০ গ্লাস বিশুদ্ধ পানি পান করতে হবে। এতে নাক দিয়ে আগত গাঢ় তরল পাতলা হয়।
২। রোগাক্রান্ত স্থানে বার বার ভেজা গরম কাপড়ের সেক দিলে উপশম হয়।
৩। প্রতিদিন ২-৪ বার অল্প গরম জলীয়বাষ্প অথবা মেনথলযুক্ত বাষ্প নাক দিয়ে গ্রহণ করলে স্বস্তিবোধ হয়।
৪। নাকে লবণাক্ত পানি ছিটকে দিয়ে মিউকাস ও ব্যাকটেরিয়া ধুতে হবে।
৫। প্রাথমিক পর্যায়ে অ্যান্টিবায়োটিক, অ্যান্টিহিস্টামিন, নাকের ড্রপ ও ব্যথানাশক ওষুধ ব্যবহার করা যেতে পারে।
৬। যত দ্রুত সম্ভব একজন নাক, কান ও গলা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।
৭। ওষুধে রোগ নিরাময় না হলে স্যালাইন পানি দিয়ে সাইনাস ওয়াশ অথবা অপারেশন করতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *