১। টিকা (Vaccine)ঃ জিন প্রকৌশল প্রযুক্তি প্রয়োগ করে বিভিন্ন ধরনের রোগের টিকা বা ভেক্সিন তৈরী করা হয়। এসব টিকা হাম, পোলিও, বসন্ত, যক্ষ্মা, জলাতঙ্ক, কলেরা, মাম্পস, হেপাটাইটিস-বি প্রভৃতি সংক্রামক রোগের চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয়। বর্তমানে করোনাসহ বিভিন্ন রোগের কার্যকরী ভ্যাক্সিন তৈরীর চেষ্টা চলছে। নতুন নতুন ভ্যাক্সিন আবিষ্কার করে মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
২। বংশগত রোগ নিরাময় (Control of birth diseases)ঃ বংশগত রোগ নিরাময় করা দুষ্কর। রিকম্বিন্যান্ট DNA প্রযুক্তির মাধ্যমে ট্রান্সজেনিক ছাগলের দুধ থেকে অ্যান্টিথ্রম্বিন-III এবং ট্রান্সজেনিক খরগোসের দুধ থেকে III C12 esterase inhibitor ওষুধ তৈরী করা হয়েছে। অ্যান্টিথ্রম্বিন-III ওষুধ মানুষের অ্যান্টিথ্রম্বিন ডিফিসিয়েন্সী রোগের চিকিৎসায় এবং III C12 esterase inhibitor ওষুধ মানুষের অ্যানজিওডেমা এর চিকিৎসায় ব্যবহার হচ্ছে। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে আরো ওষুধ আবিষ্কারের মাধ্যমে বংশগত রোগ নির্মূলের চেষ্টা চলছে। মানুষের প্রতিটি কোষে ২৫০০০ পর্যন্ত (আরও বহু জিন অজানা রয়েছে) কর্মক্ষম জিন আছে। কোন একটি জিনে ডিস্অর্ডার হলে রোগ সৃষ্টি হতে পারে। মানুষের দেহে প্রায় ৩৫০০টি জেনেটিক ডিস্অর্ডার জানা গেছে। রিকম্বিন্যান্ট DNA প্রযুক্তির মাধ্যমে এই রোগ নিরাময় করা যাবে।
৩। ইনসুলিন উৎপাদন (Insulin production)ঃ ইনসুলিন হলো একপ্রকার হরমোন। রিকম্বিন্যান্ট DNA প্রযুক্তিতে বাণিজ্যিক ভাবে ইনসুলিন উৎপাদন করা হয়। ইহা রক্তের গ্লুকোজ গ্রহণ মাত্রা ত্বরান্বিত করে মানুষের ডায়াবেটিস রোগ নিয়ন্ত্রণ করে। তাই ডায়াবেটিস রোগীরা ইনসুলিন গ্রহণ করে।
৪। ইন্টারফেরন উৎপাদন (Interferon production)ঃ ইন্টারফেরন হলো উচ্চ আণবিক ওজন বিশিষ্ট প্রোটিন। ইহা ক্যান্সার কোষের বৃদ্ধিরোধ করে এবং ভাইরাসকে নিষ্ক্রিয় করে। জিন প্রকৌশলের মাধ্যমে E. coli ও ঈস্ট হতে ইন্টারফেরন উৎপাদন করা হয়। ইহা হেপাটাইটিস-বি, হার্পিস, প্যাপিলোমা, জলাতঙ্ক প্রভৃতি রোগের চিকিৎসায় ব্যবহার হয়। ১৯৫৭ সালে অ্যালেক ইস্যাক ও জ্যাঁ লিনডেনম্যান ইন্টারফেরন আবিষ্কার করেন।
৫। বৃদ্ধি বা গ্রোথ হরমোন উৎপাদন (growth homone production)ঃ মানুষের বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণকারী সোমাটোট্রফিন হরমোন রিকম্বিন্যান্ট DNA প্রযুক্তির মাধ্যমে বাণিজ্যিক ভাবে উৎপাদন করা হয়। এটি বামনত্ব রোগের চিকিৎসায় ব্যবহার হয়। প্রতি সপ্তাহে ৬-১০ মিলি গ্রাম গ্রোথ হরমোন প্রয়োগে প্রথম বছরেই ৬ সেন্টিমিটারের বেশি লম্বা হয়।
৬। ফুসফুসের এমফাইসেমা প্রতিরোধ (Emphysema prevent)ঃ এমফাইসেমা হলো ফুসফুসের একটি মরণব্যাধী। এই রোগ প্রতিরোধে AAT প্রোটিন ব্যবহার হয়। জিন প্রকৌশল প্রক্রিয়ায় AAT প্রোটিন বাণিজ্যিক ভাবে উৎপাদন হচ্ছে। তাই ফুসফুসের এমফাইসেমা রোগ প্রতিরোধ এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
৭। জিন থেরাপি (Gene therapy)ঃ জিনের ক্রটিজনিত রোগ নিরাময় সহজ ব্যাপার নয়। তবে জিন থেরাপি প্রক্রিয়ায় এই রোগ নিরাময় করা সম্ভব হয়েছে। জিন প্রকৌশল প্রক্রিয়ায় রুপান্তরিত ভাইরাসকে জিন থেরাপি প্রক্রিয়ায় ব্যবহার করা হয়।
৮। গর্ভের শিশু পরীক্ষা (Baby test)ঃ অ্যামনিওসিস জিন প্রযুক্তিতে মাতৃগর্ভের শিশুর রোগ বা অস্বাভাবিকতা নির্ণয় করা হয়।
৯। মলিকুলার ফার্মিং (Molecular farming)ঃ ট্রান্সজেনিক প্রাণিকে বায়োরিয়েক্টর হিসেবে ব্যবহার করে এদের দুধ, রক্ত ও মূত্র থেকে ওষুধ তৈরী করা হয়। একে মলিকুলার ফার্মিং বলে। এসব ওষুধ বহুবিধ রোগ নিরাময়ে ব্যবহার হয়। আমেরিকায় উদ্ভাবিত ট্রান্সজেনিক ছাগলের দুধ থেকে TPA পাওয়া যায়।
১০। বায়োফার্মিং (Biofarming)ঃ ফার্মাসিউটিক্যাল দ্রব্য বড় মাত্রায় উৎপাদন করলে তাকে বায়োফার্মিং বলে। বায়োফার্মিং প্রক্রিয়ায় ছাগলের মাধ্যমে অতি অল্প খরচে জীবন রক্ষাকারী Anticoagulant antithrombin উৎপাদন করা হচ্ছে। GMO ছাগলের দুধ থেকে শক্তিশালী Spider silk উৎপন্ন করা হচ্ছে। কুসুম ফুলের বীজের মাধ্যমে ইনসুলিন উৎপাদন করা হচ্ছে।
১১। এনজাইম উৎপাদন (Enzyme production)ঃ জিন প্রকৌশল প্রক্রিয়ায় জাইমেজ, প্রোটিয়েজ, লাইপেজ, ফাইসিন (কৃমিনাশক) প্রভৃতি এনজাইম বাণিজ্যিক ভাবে উৎপাদন করা হয়।
১২। পরিবেশ দুষণ মুক্ত রাখাঃ রিকম্বিন্যান্ট DNA প্রযুক্তির মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধী উদ্ভিদ সৃষ্টি করা হয়েছে। এসব উদ্ভিদে ছত্রাকনাশক ও কীটনাশক প্রয়োগ করতে হয় না। ফলে পরিবেশ দুষণ মুক্ত থাকে। এরুপ পরিবেশ স্বাস্থ্যের জন্য উপযুক্ত।
১৩। হিমোফিলিয়া (Hemophilia)ঃ হিমোফিলিয়া একটি জন্মগত রোগ। হিমোফিলিয়া রোগীর কোনো স্থানে কেটে গেলে রক্ত জমাট বাঁধতে পারে না। কিছু ফ্যাক্টর জিন এ কাজে বাঁধা সৃষ্টি করে। জিন প্রযুক্তিতে ব্যাকটেরিয়ার সাহায্যে ভেড়ার দুধ থেকে ফ্যাক্টরগুলো আলাদা করে ওষুধ তৈরী করা হয়। এই ওষুধ হিমোফিলিয়ার চিকিৎসায় ব্যবহার হয়।
১৪। বংশগত রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসাঃ পিতা-মাতার যে কোন একজন বংশগত রোগী হলে সন্তানেরা ৫০% সে রোগে আক্রান্ত হয়। বংশগত রোগ নিরাময় করা যায় না। বর্তমানে জিন প্রকৌশলের মাধ্যমে বংশগত রোগ নির্ণয় ও নিরাময় করা হচ্ছে।
১৫। হেপাটাইটিস-বি (Hepatitis-B)ঃ ভাইরাসের অ্যান্টিজেন উৎপাদনকারী জিন TMV-এর মাধ্যমে তামাক গাছে প্রবেশ করিয়ে হেপাটাইটিস-বি ভ্যাক্সিন তৈরী করা হয়েছে। ভ্যাক্সিনের মতো তামাককে রেফ্রিজারেটরে রাখতে হবে না। তামাককে সরাসরি ভ্যাক্সিন হিসেবে খাওয়ানো হবে।
১৬। মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি (Monoclonal antibody)ঃ কোন নির্দিষ্ট অ্যান্টিজেনের প্রভাবে যে অ্যান্টিবডি সৃষ্টি হয় তাকে মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি বলে। মাতৃত্ব নির্ণয়ে, রোগ নির্ণয়ে, রোগ নিরাময়ে এবং প্রতিস্থাপিত অঙ্গের প্রত্যাখ্যান রোধে মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি ব্যবহার হয়।
১৭। তঞ্চনরোধী পদার্থ সৃষ্টিঃ হিরুডিন নামক অ্যান্টিকোয়াগুলেন্ট সৃষ্টিকারী জিন Brassica napus উদ্ভিদে প্রবেশ করিয়ে ট্রান্সজেনিক Brassica napus উদ্ভিদ সৃষ্টি করা হয়েছে। এই উদ্ভিদের বীজে হিরুডিন উৎপন্ন হয় যা নিষ্কাশন করে ব্যবহার করা হয়।