শ্বেত রক্তকণিকার বৈশিষ্ট্য, প্রকারভেদ, গঠন ও কাজ । Leucocytes-WBC । ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

গ্রীক শব্দ Leucos অর্থ বর্ণহীন এবং kytos অর্থ কোষ নিয়ে leucocyte শব্দটি গঠিত। রক্তের বর্ণহীন অনিয়তাকার নিউক্লিয়াসবিশিষ্ট কণিকাকে শ্বেত রক্তকণিকা বলে। লিম্ফোসাইট ও ফ্যাগোসাইট হলো সতর্ক প্রহরী এবং এরা জীবাণু মোকাবেলা করে। যকৃতের কাপফার কোষ হলো এক ধরনের শ্বেত রক্তকণিকা। শ্বেত রক্তকণিকার সংখ্যা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকলে তাকে লিউকোসাইটোসিস এবং কম থাকলে তাকে লিউকোপেনিয়া বলে। এর সংখ্যা কমে গেলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। শ্বেত রক্তকণিকার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে ক্যানসার হলে তাকে লিউকোমিয়া বলে।

 

শ্বেত রক্তকণিকার বৈশিষ্ট্য

১। এতে হিমোগ্লোবিন থাকে না বলে বর্ণহীন হয়।

২। ইহা অনিয়তাকার এবং অপেক্ষাকৃত বড়।

৩। এর ব্যাস প্রায় ৭.৫-২০.০০ µm।

৪। এর আকার পরিবর্তিত হতে পারে।

৫। ইহা নিউক্লিয়াসযুক্ত এবং নিউক্লিয়াস এক প্রান্তে অবস্থান করে।

৬। এর নিউক্লিয়াস প্রথমে গোলাকার, ডিম্বাকার বা বৃত্তাকার হয় এবং বয়োবৃদ্ধির সাথে সাথে বৃক্কাকার

অথবা অশ্বখুরাকৃতির হয়।

৭। এর গড় আয়ু ১-১৫ দিন।

৮। ইহা অ্যামিবয়েড চলন প্রদর্শন করে। এ পদ্ধতিতে ইহা সংক্রমিত স্থানে পৌঁছে এ¦বং জীবাণু ধ্বংস করে।

 

শ্বেত রক্তকণিকার উৎপত্তি (WBC)

ইহা অস্থিমজ্জা, প্লীহা ও লসিকা গ্রন্থি হতে উৎপন্ন হয়। শ্বেত রক্তকণিকা উৎপাদন প্রক্রিয়াকে মায়েলোপয়সিস (myelopoiesis) বলে।

 

শ্বেত রক্তকণিকার পরিমাণ (WBC)

প্রতি ঘনমিলিলিটার রক্তে নবজাতকে ৯,০০০-৩০,০০০; দুই বছরের কম বয়সে ৬,২০০-১৭,০০০ এবং প্রাপ্ত বয়স্ক ৪,০০০-১০,০০০ শ্বেত রক্তকণিকা থাকে। এর গড় সংখ্যা ৭,০০০। শিশু ও অসুস্থ ব্যক্তির দেহে এর সংখ্যা বেশি। লোহিত ও শ্বেত রক্তকণিকার অনুপাত ৬০০ঃ ১।

 

শ্বেত রক্তকণিকার রাসায়নিক উপাদান (WBC)

নিউক্লিওপ্রোটিন, গ্লাইকোজেন, লিপিড, কোলেস্টেরল, অ্যাসকরবিক এসিড ও প্রোটিওলাইটিক এনজাইম থাকে।

 

শ্বেত রক্তকণিকার প্রকারভেদ

শ্বেত রক্তকণিকাকে প্রধানত দুভাগে ভাগ করা যায়।

১। গ্রানুলোসাইট বা দানাদার

২। অ্যাগ্রানুলোসাইট বা অদানাদার

 

গ্র্যানিউলোসাইট (Granulocytes)

যে সব শ্বেত রক্তকণিকার সাইটোপ্লাজম দানাদার তাদেরকে গ্র্যানিউলোসাইট বলে। দানাগুলো লিইশম্যান রঞ্জকে রঞ্জিত হয়। এর নিউক্লিয়াস ২-৭ খন্ডবিশিষ্ট। শ্বেত রক্তকণিকার ৭২% হলো গ্র্যানুলোসাইট। এদের আয়ুষ্কাল ৪-৮ ঘন্টা। এরা অস্থিমজ্জার মায়েলোব্লাস্ট কোষ থেকে উৎপন্ন হয়। রঞ্জক ধারণ ক্ষমতা ও নিউক্লিয়াসের গঠনের উপর ভিত্তি করে এদেরকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়।

১। নিউট্রোফিল (Neutrophil)

নিউট্রোফিলের সাইটোপ্লাজম বর্ণ নিরপেক্ষ এবং দানাযুক্ত। এরা গোলাকার এবং নিউক্লিয়াস ২-৫ খন্ড বিশিষ্ট। এদের ব্যাস ১২-১৫ µm। এদের সংখ্যা প্রতি ঘনমিলিলিটারে ৪৯০০টি। অর্থাৎ সবচেয়ে বেশি যা ৭০%। আয়ুকাল ২-৫ দিন। ইহা লাল অস্থিমজ্জায় উৎপন্ন হয়। এরা অ্যামিবয়েড চলন প্রদর্শন করে এবং কৌশিক জালিকার ছিদ্র দিয়ে সংক্রমণস্থলে উপস্থিত হয়। এ প্রক্রিয়াকে ডায়াপেডেসিস বলে। এরা ফ্যাগোসাইটোসিস প্রক্রিয়ায় জীবাণু ধ্বংস করে।

নিউট্রোফিলের কাজ

(i) এরা জীবাণু সম্পর্কে রাসায়নিক বার্তা প্রেরণ করে

(ii) লিপিড জাতীয় পদার্থ ক্ষরণ করে রক্তনালির ভেদ্যতা বৃদ্ধি করে

(iii) ফ্যাগোসাইটোসিস প্রক্রিয়ায় জীবাণু গ্রাস করে

২। ইওসিনোফিল (Eosinophil)

এদের সাইটোপ্লাজম নীলাভ ও অম্লধর্মী এবং দানাগুলো ইওসিন রঞ্জকে লালচে-কমলা বর্ণ ধারণ করে। এরা গোলাকার এবং নিউক্লিয়াস ২-৩ খন্ডবিশিষ্ট। এদের ব্যাস ১২-১৭ µm। এদের সংখ্যা প্রতি ঘনমিলিলিটারে ১৫০-৪০০। অর্থাৎ শ্বেত রক্তকণিকার ১.৫%। আয়ুকাল ৮-১২ দিন। ইহা লাল অস্থিমজ্জায় উৎপন্ন হয়। এরা পৌষ্টিকনালিতে বেশি থাকে।

ইওসিনোফিলের কাজ

(i) এরা লার্ভানাশক পলিপেপটাইড ক্ষরণ করে এবং কৃমির লার্ভা ধ্বংস করে

(ii) ইহা এলার্জিক অ্যান্টিবডি ধ্বংস করে।

(iii) ফ্যাগোসাইটোসিস প্রক্রিয়ায় জীবাণু গ্রাস করে

(iv) হাইড্রোলাইটিক এনজাইম ক্ষরণ করে।

(iv) SchistosomaTrichinella পরজীবীর মৃত্যু ঘটায়।

৩। বেসোফিল (Basophil)

এদের সাইটোপ্লাজম ক্ষারধর্মী এবং দানাগুলো রঞ্জকে নীলচে-কালো বর্ণ ধারণ করে। এরা গোলাকার, নিউক্লিয়াস বৃক্কাকার ও দুই খন্ডযুক্ত। এদের ব্যাস ১২-১৫ µm। এদের সংখ্যা প্রতি ঘনমিলিলিটারে ৩৫টি। অর্থাৎ সবচেয়ে কম যা ০.৫%। আয়ুকাল ১২-১৫ দিন। ইহা লাল অস্থিমজ্জায় উৎপন্ন হয়।

বেসোফিলের কাজ

(i) হিস্টামিন উৎপন্ন করে রক্তনালিকে প্রসারিত করে।

(ii) হেপারিন উৎপন্ন করে রক্ত জমাট বাঁধা রোধ করে।

 

অ্যাগ্র্যানুলোসাইট (Agranulocytes)

যে সব শ্বেত রক্তকণিকার সাইটোপ্লাজম দানাবিহীন তাদেরকে অ্যাগ্র্যানিউলোসাইট বলে। এদের নিউক্লিয়াস বড়, অখন্ড ও স্বচ্ছ । শ্বেত রক্তকণিকার ২৮% হলো অ্যাগ্র্যানুলোসাইট। এরা অস্থিমজ্জা ও লিম্ফয়েড কলা থেকে উৎপত্তি লাভ করে। এদেরকে দুভাগে ভাগ করা যায়।

১। লিম্ফোসাইট (Lymphocytes)

লিম্ফোসাইট আকারে ছোট, গোলাকার এবং নিউক্লিয়াস বড়। ইহা সমসত্ত¡ ও ক্ষারধর্মী। এর ব্যাস ৬-১৬ µm। এদের সংখ্যা প্রতি ঘনমিলিলিটারে ১৬৮০টি। শ্বেত রক্তকণিকার ২৪% হলো লিম্ফোসাইট। আয়ুকাল ৭ দিন। ইহা লাল অস্থিমজ্জা, যকৃত, প্লিহা ও লসিকা গ্রন্থি হতে উৎপন্ন হয়। লিম্ফোসাইট তিন ধরনের হয়।

(i) B-লিম্ফোসাইটঃ B-লিম্ফোসাইট থাইমাস গ্রন্থির থাইমোসাইটস থেকে সৃষ্টি হয়।

(ii) T-লিম্ফোসাইটঃ T-লিম্ফোসাইট অস্থিমজ্জার হিমাটোপয়টিক মাতৃকোষ থেকে উৎপন্ন হয়।

(iii) NK কোষঃ  NK কোষ অন্য কোষের জন্য বিষাক্ত এবং অনাক্রম্যতার জন্য বিপদজনক।

লিম্ফোসাইটের কাজ

(i) অ্যান্টিবডি উৎপন্ন করে জীবাণু ধ্বংস করে

(ii) স্মৃতি কোষ হিসেবে কাজ করে

(iii) ভাইরাসকে সরাসরি আক্রমণ করে

(iv) ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করে।

২। মনোসাইট (Monocytes)

মনোসাইট সবচেয়ে বড় শ্বেত রক্তকণিকা। এর নিউক্লিয়াস বৃক্কাকার বা অশ্বখুরাকৃতির। এর ব্যাস ১২-২০ µm। এদের সংখ্যা প্রতি ঘনমিলিলিটারে ২৮০টি। শ্বেত রক্তকণিকার ৪% হলো মনোসাইট। আয়ুকাল ২-৫ দিন। ইহা লাল অস্থিমজ্জা (মনোব্লাস্ট কোষ), যকৃত, প্লীহা ও লসিকা গ্রন্থি হতে উৎপন্ন হয়। উৎপন্ন হওয়ার ৩০-৪০ ঘন্টা পর ইহা ম্যাক্রোফাজে পরিনত হয়।

মনোসাইটের কাজ

(i) প্রাকৃতিক ধাওর হিসেবে কাজ করে

(ii) ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়াকে গ্রাস করে

(iii) ফ্যাগোসাইটোসিস ঘটায়।

 

শ্বেত রক্তকণিকার কাজ (Functions of WBC)

১। ফ্যাগোসাইটোসিসঃ  মনোসাইট ও নিউট্রোফিল ফ্যাগোসাইটোসিস প্রক্রিয়ায় জীবাণু ধ্বংস করে।

২। জীবাণু ধ্বংসঃ নিউট্রোফিলে বিষাক্ত দানা থাকে যা জীবাণুকে ধ্বংস করে।

৩। রোগ প্রতিরোধঃ  লিম্ফোসাইট অ্যান্টিবডি সৃষ্টি করে দেহকে রোগ প্রতিরোধী করে।

৪। মৃত কোষ অপসারণঃ এরা দেহ থেকে মৃত কোষকে অপসারণ করে।

৫। রক্ত জমাট বাঁধা রোধঃ বেসোফিল হেপারিন সৃষ্টি করে রক্ত জমাট বাঁধা রোধ করে।

৬। হিস্টামিনঃ দানাদার শ্বেত রক্তকণিকা হিস্টামিন তৈরী করে দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।

শ্বেত রক্তকণিকাকে আণুবীক্ষনিক সৈনিক বলা হয়

শ্বেত রক্তকণিকা হলো দেহ রক্ষাকারী অতন্ত্র প্রহরী ও বিশ্বস্ত সৈনিক। মনোসাইট ও নিউটোফিল ফ্যাগোসাইটোসিস প্রক্রিয়ায় জীবাণু ধ্বংস করে দেহকে রক্ষা করে। লিম্ফোসাইট অ্যান্টিবডি সৃষ্টি করে দেহকে রোগ প্রতিরোধী করে। এ ছাড়া শ্বেত রক্তকণিকা হিস্টামিন তৈরী করে দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। এ সব কারণে শ্বেত রক্তকণিকাকে আণুবীক্ষনিক সৈনিক বলা হয়।

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Dr. Abu Bakkar Siddiq