যে প্রক্রিয়ায় পরিপাককৃত খাদ্যসার পরিপাক নালি হতে রক্ত ও লসিকায় প্রবেশ করে তাকে খাদ্যসার শোষণ বা শোষণ বলে। ক্ষুদ্রান্ত্র হলো প্রধান শোষণ স্থান। ক্ষুদ্রান্ত্র প্রায় ৯০% খাদ্যসার শোষণ করে। পাকস্থলী ও বৃহদান্ত্র দ্বারা শোষিত হয় ১০%। ক্ষুদ্রান্ত্রের আবরণী ভাঁজ হয়ে আঙ্গুলের মতো অভিক্ষেপ সৃষ্টি করে। একে ভিলাই বলে। ভিলাই অন্ত্রের শোষণ ক্ষমতা ৪০গুণ বৃদ্ধি করে। মানুষের ক্ষুদ্রান্ত্রে প্রায় ৫,০০,০০০ ভিলাই থাকে। ভিলাইয়ের কোষ গুলোতে যে সুক্ষ্ম অভিক্ষেপ থাকে তাকে মাইক্রোভিলাই বলে। মাইক্রোভিলাই গুলো একত্রে ব্রাশ বর্ডার সৃষ্টি করে। ব্রাশ বর্ডার শোষণ প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। মাইক্রোভিলাই অন্ত্রের শোষণ ক্ষমতা ৬০গুণ বৃদ্ধি করে। ভিটামিন, খনিজলবণ ও পানির সাথে খাদ্যসার এন্ডোসাইটোসিস পদ্ধতিতে শোষিত হয়।
১। প্রোটিন শোষণঃ প্রোটিন পরিপাক হয়ে অ্যামাইনো এসিড উৎপন্ন করে। অ্যামাইনো এসিড হিসেবেই ক্ষুদ্রান্ত্রে প্রোটিন শোষিত হয়। তবে পেপটোন, প্রোটিওজ, পেপটাইড প্রভৃতি অর্ধজটিল প্রোটিনও খুব অল্প পরিমাণে শোষিত হয়। ডিমের সাদা অংশ, চিংড়ী, কাকড়া প্রভৃতি অপরিবর্তিত অবস্থায় শোষিত হয়। ডিওডেনাম ও জেজুনামের ভিলাই দ্বারা সক্রিয় শোষণ, ব্যাপন এবং ফ্যাগোসাইটোসিস প্রক্রিয়ায় অ্যামাইনো এসিড শোষিত হয়। সাধারণত L-অ্যামাইনো এসিড সক্রিয় পদ্ধতিতে এবং D–অ্যামাইনো এসিড ব্যাপনের মাধ্যমে শোষিত হয়। ভিলাইয়ের কৌশিক নালিকা প্রোটিন শোষণের কাজ করে। থাইরক্সিন হরমোন প্রোটিন শোষণ নিয়ন্ত্রণ করে।
২। শর্করা শোষণঃ শর্করা পরিপাক হয়ে গ্লুকোজ, ফ্রুক্টোজ, গ্যালাকটোজ, ল্যাকটোজ, সুক্রোজ, জাইলোজ, ম্যানোজ প্রভৃতি মনোস্যাকারাইডে পরিনত হয়। ক্ষুদ্রান্ত্র মনোস্যাকারাইড হিসেবেই শর্করা শোষণ করে। তবে কিছু শর্করা ডাইস্যাকারাইড হিসেবেও শোষিত হয়। মনোস্যাকারাইডের মধ্যে ৮০% গ্লুকোজ এবং ২০% ফ্রুক্টোজ ও গ্যালাকটোজ হিসেবে শোষিত হয়। Na+ এবং ATP এর সহায়তায় জেজুনামের ভিলাইয়ের কৌশিক নালিকা গ্লুকোজ শোষণ করে। ফ্রুক্টোজ শোষিত হয় ব্যাপন প্রক্রিয়ায়। সুক্রোজ ও ল্যাকটোজ ডিওডেনাম ও মধ্য ক্ষুদ্রন্ত্রে শোষিত হয়।
৩। লিপিড শোষণঃ লিপিড পরিপাক হয়ে ফ্যাটি এসিড, গিøসারল, মনোগিøসারাইড ও কোলেস্টেরলে পরিনত হয়। ফ্যাটি এসিড পরিশোষণ একটি জটিল প্রক্রিয়া। ফ্যাটি এসিড, মনোগিøসারাইড ও পিত্ত লবণ একত্রে যুক্ত হয়ে মিসেল কণা গঠন করে। মিসেল কণা ডিওডেনাম ও মধ্য ক্ষুদ্রান্ত্র দ্বারা শোষিত হয়। থায়োকাইনেজ এনজাইমের প্রভাবে ফ্যাটি এসিড সক্রিয় ফ্যাটি এসিডে পরিনত হয়। সক্রিয় ফ্যাটি এসিড, গিøসারল ও প্রোটিন একত্রে যুক্ত হয়ে ট্রাইগিøসারাইড গঠন করে। একে কাইলোমাইক্রন কণা বলে। কাইলোমাইক্রন কণা ক্ষুদ্রান্ত্রের লসিকা নালিতে প্রবেশ করে। লসিকা নালির শাখা সাদা হলে তাকে ল্যাকটিয়েল বলে। লসিকা নালির মধ্য দিয়ে কাইলোমাইক্রন রক্তের প্লাজমায় প্রবেশ করে। প্লাজমায় অবস্থিত এনজাইম কাইলোমাইক্রন বা লিপোপ্রোটিনকে ভেঙ্গে ফ্যাটি এসিড ও গিøসারল সৃষ্টি করে।
৪। পানি শোষণঃ ক্ষুদ্রান্ত্রের ভিলাই–এর এপিথেলিয়াল কোষ দ্বারা পানি শোষিত হয়। সাধারণত প্রতি ঘন্টায় ২০০–৪০০ মিলি পানি শোষিত হয়।
৫। খনিজলবণ শোষণঃ বৃদ্রান্ত্রের ভিলাই–এর এপিথেলিয়াল কোষ দ্বারা খনিজলবণ শোষিত হয়।
৬। ভিটামিন শোষণঃ ক্ষুদ্রান্ত্রের ভিলাই–এর এপিথেলিয়াল কোষ দ্বারা পানি বা চর্বিতে দ্রবীভূত অবস্থায় ভিটামিন শোষিত হয়।
খাদ্যসার শোষণ দেহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রক্রিয়া। পরিপাকের মাধ্যমে প্রোটিন হতে অ্যামাইনো এসিড, শর্করা হতে গ্লুকোজ ও ফ্রুক্টোজ এবং লিপিড হতে ফ্যাটি এসিড ও গিøসারল উৎপন্ন হয়। ক্ষুদ্রান্ত্র এ সব পরিপাককৃত খাদ্যসার শোষণ করে। এরপর রক্তের মাধ্যমে দেহের বিভিন্ন অংশে পৌছে। দেহ কোষ এ সব খাদ্যসার গ্রহণ করে এবং সুস্থ, সবল ও সতেজ থাকে।