প্রাণীর শ্রেণীবিন্যাসের ভিত্তি আলোচনা।। Base of Animal Classification ।। ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

যে সব বৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করে জীবের শ্রেণীবিন্যাস করা হয় তাকে শ্রেণীবিন্যাসের ভিত্তি বলা হয়। গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল লাল রক্তযুক্ত প্রাণীদেরকে ইনাইমা (Enaima) এবং লাল রক্তবিহীন প্রাণীদেরকে  অ্যানাইমা (Anaima) নামে দুইটি দলে ভাগ করেছেন। Enaima-কে দুই ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। ডিম্বজ এবং জরায়ুজ।

শ্রেণীবিন্যাসের প্রধান ভিত্তি হলো-

১। কোষের সংখ্যা (Number of Cell)

(i) এককোষী প্রাণী (Unicellular Animal)ঃ এরা আদি কোষী এবং এদের দেহ একটি মাত্র কোষ দ্বারা গঠিত। Protozoa পর্বের প্রাণীরা এককোষী। যেমন- অ্যামিবা (Amoeba proteus), ম্যালেরিয়া পরজীবী (Plasmodium vivax), অ্যান্টামিবা (Entamoeba histolytica) প্রভৃতি।

(ii) বহুকোষী প্রাণী (Multicellular Animal)ঃ এরা প্রকৃত কোষী এবং এদের দেহ একাধিক কোষ দ্বারা গঠিত। Metazoa, Porifera ও Chordata  পর্বের প্রাণীরা বহুকোষী। যেমন- হাইড্রা- (Hydra vulgaris), ইঁলিশ (Tenualosa ilisha), দোয়েল (Copsychus saularis) প্রভৃতি।

২। দেহের আকার (Body Shape)

(i) আণুবীক্ষণিক প্রাণী (Micro animal)ঃ যে সব প্রাণী অত্যন্ত ক্ষুদ্রাকার ও আণুবীক্ষনিক তাদেরকে Micro animal বলে। যেমন- ম্যালেরিয়ার জীবাণু (Plasmodium vivax), আমাশয় জীবাণু (Entamoeba histolytica) প্রভৃতি।

(ii) বৃহৎ প্রাণী (Macro animal)ঃ  যে সব প্রাণী আকারে বড় এবং খালি চোখে দেখা যায় তাদেরকে Macro animal বলে। যেমন- গিনিপিগ (Cavia porcellus), ভারতীয় হাতি (Elephas indicus), নীল তিমি (Balaenoptera musculus) প্রভৃতি।

 

৩। সংগঠন মাত্রা (Levels of organization)

(i) কোষীয় মাত্রার গঠনঃ যে দেহগঠনে কিছু কোষ সম্মিলিত হয়ে নির্দিষ্ট কাজ সম্পন্ন করে তাকে কোষীয় মাত্রার গঠন বলে। কোষগুলো জনন কাজ, পুষ্টি সংগ্রহ, বিপাক প্রভৃতি কাজ করে। যেমন- Porifera পর্বের প্রাণী।

(ii) কোষ-কলা মাত্রার গঠনঃ যে দেহগঠনে সদৃশ কিছু কোষ সুনির্দিষ্ট স্তরে বিন্যস্ত হয়ে টিস্যু গঠন করে তাকে কোষ-কলা মাত্রার গঠন বলে। যেমন- Cnidaria পর্বের প্রাণী।

(iii) কলা-অঙ্গ মাত্রার গঠনঃ যে দেহগঠনে একাধিক টিস্যু মিলে অঙ্গ গঠন করে তাকে কলা-অঙ্গ মাত্রার গঠন বলে। যেমন- Platyhelminthes পর্বের প্রাণী।

(iv) অঙ্গ-তন্ত্র মাত্রার গঠনঃ যে দেহগঠনে একাধিক অঙ্গ মিলে তন্ত্র গঠন করে তাকে অঙ্গ-তন্ত্র মাত্রার গঠন বলে। এধরনের গঠন সর্বপ্রথম আবির্ভূত হয়েছে নিমারটিয়ান (Nemertean) নামক সামুদ্রিক প্রাণীতে। যেমন-Nematoda, Annelida, Mollusca, Arthropoda, Echinodermata ও Chordata পর্বের প্রাণী।

 

৪। জীবন পদ্ধতি (Way of living)

(i) স্বাধীনজীবী বা মুক্তজীবী (Free living)ঃ যে সব প্রাণী স্বাধীনভাবে চলাফেরা করে তাদেরকে । যেমন- কবুতর, গরু

(ii) পরজীবী (Parasite)ঃ যে সব প্রাণী অন্য প্রাণীর দেহে বাস করে এবং সেখান থেকে খাদ্য গ্রহণ করে তাদেরকে পরজীবী বলে। যেমন- কৃমি, উকুন প্রভৃতি।

(iii) মিথোজীবী (Symbiont)ঃ দুইটি ভিন্ন প্রজাতির জীব একত্রে বসবাস করে উভয়ে উপকৃত হলে তাকে মিথোজীবী  বলে। যেমন- Chlorohydra viridissima ও Zoochlorella।

(iv) সহজীবী (Commensal)ঃ দুইটি ভিন্ন প্রজাতির জীব একত্রে বসবাস করে কেউ কারো দ্বারা উপকৃত না হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হয় না তাকে সহজীবী বলে। যেমন- Remora নামক চোষক মাছ Shark বা অন্য কোনো মাছের দেহে সংযুক্ত থেকে সহজীবীতা প্রদর্শন করে।

৫। ভ্রুণস্তর (Embryo layer)

নিষেকের পর জাইগোট ক্লিভেজ (cleavage) প্রক্রিয়ায় বিভাজিত হয়ে ব্লাস্টোমিয়ার (blastomere) সৃষ্টি করে। ব্লাস্টোমিয়ার কোষগুলো সজ্জিত হয়ে নিরেট মরুলা (morula) দশা গঠন করে। পরে মরুলা দশার কোষগুলো ফাঁপা ব্লাস্টুলা (blastula) সৃষ্টি করে। ব্লাস্টুলা কোষগুলো দ্বিস্তরী বা ত্রিস্তরী গ্যাস্ট্রুলায় (gastrula) পরিনত হয়।

বিজ্ঞানী Heinz Christian Pander ভ্রুণস্তর আবিষ্কার করেন। ভ্রুণস্তরের উপর ভিত্তি করে বহুকোষী প্রাণীদেরকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে।

(i) দ্বিস্তরী  প্রাণী (Diploblastic animal)ঃ যে সব প্রাণীদের ভ্রুণে দুইটি স্তর থাকে তাদেরকে দ্বিস্তরী প্রাণী বলে। এদের ভ্রুণে এক্টোডার্ম ও এন্ডোডার্ম নামক দুটি স্তর থাকে।  এক্টোডার্ম ও এন্ডোডার্মের মাঝে মেসোগিøয়া নামক অকোষীয় স্তর থাকে।  Cnidaria পর্বের প্রাণীরা দ্বিস্তরী। যেমন- হাইড্রা (Hydra vulgaris), জেলি ফিস (Aurelia aurita), ওবেলিয়া (Obelia geniculata) প্রভৃতি।

(ii) ত্রিস্তরী  প্রাণী (Triploblastic animal)ঃ যে সব প্রাণীদের ভ্রুণে তিনটি স্তর থাকে তাদেরকে ত্রিস্তরী প্রাণী বলে। বাইরের স্তরটি এক্টোডার্ম, মাঝের স্তরটি মেসোডার্ম এবং ভিতরের স্তরটি এন্ডোডার্ম। Platyhelminthes, Nematoda, Mollusca, Annelida, Arthropoda, Echinodermata ও Chordata পর্বের প্রাণীরা ত্রিস্তরী।

৬। নটোকর্ড (Notochord)

(i) নন-কর্ডাটা (None chordata)ঃ যে সব প্রাণীদের নটোকর্ড থাকে না তাদেরকে নন-কর্ডাটা বলে। Protozoa, Metazoa, Porifera, Cnidaria, Platyhelminthes, Nematoda, Mollusca, Annelida, Arthropoda I Echinodermata পর্বের প্রাণীরা নন-কর্ডাটা। যেমন- হাইড্রা (Hydra vulgaris), তেলাপোকা (Periplaneta americana), ফিতা কৃমি (Taenia solium), শামুক (Pila globosa), সমুদ্রতারা (Asterias rubens) প্রভৃতি।

(ii) কর্ডাটা (Chordata)ঃ যে সব প্রাণীদের দেহে নটোকর্ড থাকে তাদেরকে কর্ডাটা বলে। Chordata পর্বের সকল প্রাণীদের নটোকর্ড থাকে। কর্ডাটা পর্বের প্রাণীদেরকে তিনটি উপপর্বে ভাগ করা হয়েছে।

  • ইউরোকর্ডাটাঃ ইউরোকর্ডাটাদের শুধুমাত্রা লার্ভা দশায় লেজ অঞ্চলে নটোকর্ড থাকে। যেমন- অ্যাসিডিয়া।
  • সেফালোকর্ডাটাঃ সেফালোকর্ডাটাদের নটোকর্ড মাথার শীর্ষ থেকে পুচ্ছ অঞ্চল পর্যন্ত থাকে। এদের নটোকর্ড সারাজীবন থাকে। যেমন- ব্রাঙ্কিওস্টোমা (Branchiostoma)।
  • ভার্টিব্রাটাঃ ভার্টিব্রাটাদের নটোকর্ড মেরুদন্ড দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়। যেমন- অ্যাসিডিয়া।

৭। মেরুদন্ড (Vertebral column)

(i) অমেরুদন্ডী প্রাণী (Invertebrate)ঃ যে সব প্রাণীর দেহে মেরুদন্ড নাই তাদেরকে অমেরুদন্ডী প্রাণী বলে। Protozoa, Metazoa, Porifera, Cnidaria, Platyhelminthes, Nematoda, Mollusca, Annelida, Arthropoda I Echinodermata পর্বের প্রাণীরা অমেরুদন্ডী। যেমন- শামুক (Pila globosa), মাছি (Musca domestica), কেঁচো (Metaphire posthuma) প্রভৃতি।

(ii)  মেরুদন্ডী প্রাণী (Vertebrate)ঃ যে সব প্রাণীর দেহে মেরুদন্ড আছে তাদেরকে মেরুদন্ডী প্রাণী বলে। Chordata পর্বের প্রাণীরা মেরুদন্ডী। যেমন- সিংহ (Panthera leo), বাঘ (Panthera tigris), গোখরা (Naja naja), গরু (Bos indicus) প্রভৃতি।

৮। প্রতিসাম্যতা (Symmetry)

জীবদেহের বিভিন্ন অঙ্গের সুষম বন্টনকে প্রতিসাম্যতা বলে।

(i) অপ্রতিসম্য (Asymmetry)ঃ কোন প্রাণীর দেহকে কেন্দ্র বা অক্ষ বরাবর ভাগ করে দু’টি সমান অংশ পাওয়া না গেলে তাকে অপ্রতিসম্য বলে। যেমন- শামুক (Pila globosa), অ্যামিবা (Amoeba proteus), স্পঞ্জিলা (Spongilla proliferens), স্পঞ্জ (Cliona celata) প্রভৃতি।

(ii) দ্বি-পার্শ্বীয় প্রতিসম্য (Bilaterally symmetrical)ঃ কোন প্রাণীর দেহকে কেন্দ্র বরাবর ভাগ করে দু’টি সমান অংশ পাওয়া গেলে তাকে দ্বিপার্শ্বীয় প্রতিসম্য বলে। এদের শ্রেণীতাত্তি¡ক ধাপ হলো বাইলেটারিয়া। Platyhelminthes, Arthropoda I Chordata পর্বের প্রাণীরা দ্বিপার্শ্বীয় প্রতিসম্য। যেমন- মানুষ (Homo sapiens), তেলাপোকা (Periplaneta americana), ব্যাঙ (Duttaphrynus melanostictus), প্রজাপতি (Pieris brassicae), ইঁলিশ  (Tenualosa ilisha), কবুতর (Columba livia),  যকৃত কৃমি (Fasciola hepatica) প্রভৃতি।

(iii)  দ্বি-অরীয় প্রতিসম্য (Biradial symmetrical)ঃ কোন প্রাণীর দেহকে অক্ষ বরাবর লম্বালম্বি ভাবে ভাগ করে দু’টি সমান অংশ পাওয়া গেলে তাকে দ্বিঅরীয় প্রতিসম্য বলে। এক্ষেত্রে ছেদন তল দু’টি সমকোণে থাকে বলে চারটি সমান অংশ পাওয়া যায়। এরুপ প্রতিসম্যকে Tetramerous symmetry বলে। যেমন-  Anthozoa, Ctenophora, Ceoloplana প্রভৃতি।

(iv) অরীয় প্রতিসম্য (Radial symmetrical)ঃ কোন প্রাণীর দেহকে কেন্দ্র বরাবর ভাগ করে দুইয়ের বেশি সমান অংশ পাওয়া গেলে তাকে অরীয় প্রতিসম্য বলে। এদের শ্রেণীতাত্তি¡ক ধাপ হলো রেডিয়াটা। যেমন-হাইড্রা (Hydra vulgaris), জেলি ফিস (Aurelia aurita), সী অ্যানিমন (Metridium dianthus), সমুদ্র তাঁরা (Astropecten auranciacus).

(v) গোলীয় প্রতিসম্য (Spherical symmetry)ঃ কোন প্রাণীর দেহকে কেন্দ্র বরাবর বার বার ভাগ করলে প্রতিবারই সমান দু’টি অংশ পাওয়া গেলে তাকে গোলীয় প্রতিসম্য বলে। যেমন- Volvox globactor, Radiolaria (Acrosphaera trepanata), Haliozoa (Gymnosphaera albida) প্রভৃতি।

৯। খন্ডায়ন (Segmentation/Metamerism)

কোন জীবের দেহ একই রকম খন্ডাংশ দ্বারা গঠিত হলে তাকে খন্ডায়ন বা মেটামেরিজম বলে। প্রতিটি খন্ডককে মেটামিয়ার বা সোমাইট বলে।

(i) খন্ডায়নবিহীন (Asegment)ঃ যে সব প্রাণীর দেহে কোন খন্ডায়ন নাই তাদেরকে খন্ডায়নবিহীন প্রাণী বলে। Chordata পর্বের প্রাণীরা খন্ডায়নবিহীন। যেমন- মানুষ (Homo sapiens), সমুদ্র তারা (Asterias ruben) প্রভৃতি।

(ii) সমখন্ডায়ন (Homonomous metamere)ঃ যে সব প্রাণীর দেহ একই রকম খন্ডক দ্বারা গঠিত তাদেরকে সম-খন্ডায়ন প্রাণী বলে। Annelida পর্বের প্রাণীরা সমখন্ডায়ন। যেমন- কেঁচো (Metaphire posthuma), জোক (Hirudinaria medicinalis) প্রভৃতি।

(iii) অসম খন্ডায়ন (Heteronomous metamere)ঃ যে সব প্রাণীর দেহ অসম বা ভিন্ন ভিন্ন রকম খন্ডক দ্বারা গঠিত তাদেরকে অসমখন্ডায়ন প্রাণী বলে। Arthropoda পর্বের প্রাণীরা অসমখন্ডায়ন। যেমন- তেলাপোকা (Periplaneta americana), প্রজাপ্রতি (Pieris brassicaePalilio krishna) প্রভৃতি।

১০। সিলোম (Coelom)

প্রাণীদেহে পৌষ্টিক নালী ও দেহ প্রাচীরের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত পেরিটোনিয়াম নামক আবরণী দ্বারা আবৃত এবং সিলোমিক রস দ্বারা পুর্ণ দেহগহ্বরকে সিলোম বলে। ইহা ভ্রুণীয় মেসোডার্ম হতে সৃষ্টি হয়। সিলোমের প্রকৃতি অনুসারে প্রাণীদেরকে ৪ ভাগে ভাগ করা যায়।

(i) অ্যাসিলোমেট (Acoelomate)ঃ যে সব প্রাণীদের সিলোম থাকে না তাদেরকে অ্যাসিলোমেট বলে। এদের ফাঁকা স্থানটি স্পঞ্জি প্যারেনকাইমা কোষ দ্বারা পুর্ণ থাকে। Porifera, Platyhelminthes, Cnidaria ও Ctenophora পর্বের প্রাণীরা অ্যাসিলোমেট। যেমন- ফিতা কৃমি (Taenia solium), হাইড্রা (Hydra viridis), যকৃত কৃমি (Fasciola hepatica) প্রভৃতি।

(ii) সিউডোসিলোমেট (Pseudocoelomate)ঃ যে সব প্রাণীদের পৌষ্টিক নালী ও দেহ প্রাচীরের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত দেহ গহ্বর পেরিটোনিয়ামের আবরণী দ্বারা আবৃত নয় তাদেরকে সিউডোসিলোমেট বলে। Nematoda, Rotifera, Acanthocephola, Ectoprocta ও Kinorhyncha পর্বের প্রাণীরা সিউডোসিলোমেট। যেমন- গোল কৃমি (Ascaris lumbricoides), চোখের কৃমি (Loa loa), হুক কৃমি (Ancylostoma duodenale) প্রভৃতি।

(iii) সিলোমেট (Coelomate)ঃ যে সব প্রাণীদের পৌষ্টিক নালী ও দেহ প্রাচীরের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত দেহ গহ্বর পেরিটোনিয়ামের আবরণী দ্বারা আবৃত থাকে তাদেরকে সিলোমেট বলে। Annelida, Arthropoda, Echinodermata, Mollusca, Hemichordata ও Chordata পর্বের প্রাণীরা সিলোমেট। যেমন- কেঁচো (Metaphire posthuma), মানুষ (Homo sapiens), মশা (Culex pipiens), সমুদ্র তারা (Asterias vulgare), ইলিশ (Tenualosa ilisha), ঝিনুক (Unio marginalis) প্রভৃতি।

ভ্রুণীয় বিকাশের ভিত্তিতে সিলোমকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে।

(i) সাইজোসিলাস সিলোমঃ ভ্রুণীয় মেসোডার্মাল কলা থেকে যে সিলোম সৃষ্টি হয় তাকে সাইজোসিলাস সিলোম বলে। যেমন- Annelida, Arthropoda ও Mollusca পর্ব।

(ii) এন্টারোসিলাস সিলোমঃ ভ্রুণীয় মেসোডার্মাল থলী থেকে যে সিলোম সৃষ্টি হয় তাকে এন্টারোসিলাস সিলোম বলে। যেমন- Echinodermata ও Chordata পর্ব।

সিলোমের গুরুত্ব (Importance of coelom)

(i) সিলোম বিভিন্ন অঙ্গের স্বাধীনভাবে বৃদ্ধি এবং নড়তে সাহায্য করে।

(ii) ইহা প্রাণীদেহের বিভিন্ন অঙ্গকে ঘর্ষণের হাত থেকে রক্ষা করে।

(iii) সিলোম বর্জ্য পদার্থ, পুষ্টি পদার্থ ও গ্যাসীয় পদার্থকে পরিবহনে সহায়তা করে।

(iv) ইহা প্রাণীর চলনের সময় হাইড্রোস্ট্যাটিক কঙ্কাল হিসেবে কাজ করে।

১১। পৌষ্টিক নালি (Alimentary canal)

পৌষ্টিকনালির উপর ভিত্তি করে প্রাণিদের দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে।

(i) প্যারাজোয়া (Parazoa)ঃ যে সকল প্রাণীর পৌষ্টিক নালী থাকে না তাদেরকে প্যারাজোয়া বলে। Porifera পর্বের প্রাণীরা প্যারাজোয়া। যেমন- সাইকন (Scypha gelatinosum), স্পঞ্জিলা (Spongilla lacustris), ক্লিওনা (Cliona celata) প্রভৃতি।

(ii) এন্টেরোজোয়া (Enterozoa)ঃ যে সব প্রাণীর পৌষ্টিক নালী থাকে তাদেরকে এন্টেরোজোয়া বলে। Annelida, Arthropoda, Nematoda, Platyhelminthes, Echinodermata, Cnidaria, Mollusca ও Chordata পর্বের প্রাণীরা এন্টেরোজোয়া। অযৌন প্রজননকারী এবং যৌন প্রজননকারী।

১২। প্রজননিক বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে (Reproductive characteristics)

প্রজননিক বৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করে প্রাণীদেরকে ২ ভাগে ভাগ করা হয়েছে।

(i) অযৌন প্রজননকারী (Asexual reproducer)ঃ যে সব প্রাণীর দেহে কোন নির্দিষ্ট জনন অঙ্গ থাকে না এবং বিপরীত লিঙ্গের সাহায্য ছাড়াই বংশবৃদ্ধি করে তাদেরকে অযৌন প্রজননকারী বলে। অযৌনজনন তিন ধরনের। এগুলো হলো-

  • দ্বি-বিভাজন (Binary fission)ঃ যে প্রক্রিয়ায় একটি প্রাণী বিভাজিত হয়ে দু’টি অপত্য প্রাণী সৃষ্টি করে তাকে দ্বিবিভাজন বলে। যেমন- ইউগ্লিনা (Euglena viridis), হাইড্রা (Hydra vulgaris) প্রভৃতি।
  • বহুবিভাজন (Multiple division)ঃ যে প্রক্রিয়ায় এক কোষী প্রাণী বার বার বিভাজিত হয়ে অসংখ্য অপত্য প্রাণী সৃষ্টি করে তাকে বহুবিভাজন বলে। যেমন- এন্টামিবা (Entamoeba histolytica), প্যারামেশিয়া (Paramecium caudatum) প্রভৃতি।
  • মুকুলোদ্গম (Budding)ঃ যে প্রক্রিয়ায় মাতৃদেহ হতে মুকুল সৃষ্টির মাধ্যমে নতুন প্রাণী সৃষ্টি হয় তাকে মুকুলোদ্গম বা বাডিং বলে। যেমন- হাইড্রা (Hydray viridis).

(ii) যৌন প্রজননকারী (Sexual reproducer)ঃ একই প্রজাতির দু’টি বিপরীত লিঙ্গের প্রাণীর শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর মিলনের মাধ্যমে বংশবৃদ্ধির প্রক্রিয়াকে যৌনজনন বলে।

  • অন্ডজ (Oviparous)ঃ যে সব প্রাণী নিষিক্ত বা অনিষিক্ত ডিম পাড়ে এবং ডিম মাতৃদেহের বাইরে পরিস্ফুটিত হয়ে শিশু প্রাণীতে পরিনত হয় তাদেরকে অন্ডজ বলে। যেমন- মাছ, পাখি, সাপ, হাঁস-মুরগী, কচ্ছপ, ব্যাঙ প্রভৃতি।
  • অন্ড-জরায়ুজ (Endo-viviparous)ঃ যে সব প্রাণী ডিম পাড়ে এবং ডিম নিষিক্ত হওয়ার পর মাতৃগর্ভে পরিস্ফুটিত হয়ে শিশুতে পরিনত হয় তাদেরকে অন্ড-জরায়ুজ বলে। যেমন- হাঙ্গর, কিছু উভচর প্রভৃতি।
  • জরায়ুজ প্রাণী (Viviparous)ঃ যে সব প্রাণীর ডিম মাতৃদেহের ভিতরে নিষিক্ত হয় এবং ভ্রæণ অমরার মাধ্যমে মাতৃদেহ হতে পুষ্টি লাভ করে পুর্ণাঙ্গ শিশু প্রাণীতে পরিনত হয় তাদেরকে জরায়ুজ প্রাণী বলে। যেমন- স্তন্যপায়ী প্রাণীরা।

১৩। অঞ্চলায়ন (Tagmatization

যে প্রক্রিয়ায় প্রাণীদেহকে কয়েকটি বড় অংশ বা ট্যাগমায় বিভক্ত করা হয় তাকে অঞ্চলায়ন বা ট্যাগমাটাইজেশন বলে। প্রতিটি অঞ্চলকে ট্যাগমা বলে। যে বিবর্তনিক প্রক্রিয়ায় অঞ্চলায়ন সম্পন্ন হয় তাকে তাকে ট্যাগমোসিস (Tagmosis) বলে। Arthropoda পর্বের Insecta শ্রেণীর প্রাণীদের দেহ তিনটি ট্যাগমায় বিভক্ত। যথামস্তক, বক্ষ উদর। যেমনঘাসফড়িং (Poekilocerux pictus).      ১৪। প্রান্তিকতা (Polarity)

মস্তক ও মুখের অবস্থানের উপর ভিত্তি করে প্রাণী দেহের যে মেরুকরণ করা হয় তাকে প্রান্তিকতা বলে। প্রাণীদেহে পাঁচ ধরনের প্রান্তিকতা বিদ্যমান।

(i) সম্মুখ প্রান্ত (Anterior end)ঃ প্রাণীর যে প্রান্তে মাথা থাকে তাকে সম্মুখ প্রান্ত বলে। একে মৌখিক প্রান্ত বলা হয়।

(ii) পশ্চাৎ প্রান্ত (Posterior end)ঃ প্রাণীর যে প্রান্তে মাথা থাকে তার বিপরীত প্রান্তকে পশ্চাৎ প্রান্ত বলে। পরাঙমৌখিক প্রান্ত বলা হয়।

(iii) পৃষ্ঠীয় প্রান্ত (Dorsal end)ঃ প্রাণীর দেহের উপরের তলকে পৃষ্ঠীয় প্রান্ত বলে।

(iv) অঙ্কীয় প্রান্ত (Ventral end)ঃ প্রাণীর দেহের নিচের তলকে অঙ্কীয় প্রান্ত বলে।

(v) পার্শ্বীয় প্রান্ত (Lateral end)ঃ প্রাণীর দেহের দুই পাশের তলকে পার্শ্বীয় প্রান্ত বলে।

১৫। তল (Planes)

যে অঞ্চল বরাবর প্রাণিদেহকে ডান ও বাম অথবা অনুদৈর্ঘ্য ও অনুপ্রস্থ অথবা সম্মুখ ও পশ্চাৎ বরাবর দুভাগে ভাগ করা যায় তাকে তল বলে। প্রাণিদেহে সাধারণত তিন ধরনের তল থাকে।

(i) মধ্যরেখীয় তল (Sagital plane)ঃ যে তল দ্বারা প্রাণিদেহকে ডানে ও বামে ভাগ করা যায় তাকে মধ্যরেখীয় তল বলে।

(ii) সম্মুখ তল (Frontal plane)ঃ যে তল দ্বারা প্রাণিদেহকে অঙ্কীয় ও পৃষ্ঠীয় ভাগে ভাগ করা যায় তাকে সম্মুখ তল বলে।

(iii) অনুপ্রস্থ তল (Transverse plane)ঃ যে তল দ্বারা প্রাণিদেহকে সম্মুখ ও পশ্চাৎ ভাগে ভাগ করা যায় তাকে অনুপ্রস্থ তল বলে।

১৬। ক্লিভেজ ও ভ্রুণীয় বিকাশ (Cleavage and development)

যে প্রক্রিয়ায় জাইগোট বার বার বিভাজিত হয়ে বহুকোষী ভ্রুণ সৃষ্টি করে তাকে ক্লিভেজ বা সম্ভেদ বলে। ক্লিভেজ সম্পূর্ণ হলে তাকে হলোব্লাস্টিক এবং আংশিক হলে তাকে মেরোবøস্টিক বলে। ক্লিভেজের সময় ডিমের যে প্রান্তে কুসুম থাকে তাকে ভেজিটাল পোল এবং যে প্রান্তে নিউক্লিয়াস থাকে তাকে অ্যানিমেল পোল বলে।

পরিস্ফুটনের ভিত্তিতে ক্লিভেজ দুই ধরনের। এগুলো হলো-

(i) অনির্দিষ্ট ক্লিভেজ (Indeterminate cleavage)ঃ যে ভ্রুণীয় পরিস্ফুটনে ক্লিভেজের প্রাথমিক ধাপে উৎপন্ন প্রতিটি কোষ ভ্রুণ সৃষ্টির ক্ষমতা ধারণ করে তাকে অনির্দিষ্ট ক্লিভেজ বলে।

(ii) নির্দিষ্ট ক্লিভেজ (Determinate cleavage)ঃ যে ভ্রুণীয় পরিস্ফুটনে ক্লিভেজের প্রাথমিক ধাপে উৎপন্ন নির্দিষ্ট কোষ ভ্রুণ সৃষ্টির ক্ষমতা ধারণ করে তাকে নির্দিষ্ট ক্লিভেজ বলে।

বিভাজন তলের ভিত্তিতে ক্লিভেজ তিন ধরনের। এগুলো হলো-

(i) অরীয় ক্লিভেজ (Redial cleavage)ঃ যে ক্লিভেজ প্রক্রিয়ায় জাইগোটের কোষগুলো সুষম ও অরীয়ভাবে বিভক্ত হয় তাকে অরীয় ক্লিভেজ বলে। Arthropoda পর্বের প্রাণীদের অরীয় ক্লিভেজ ঘটে।

(ii) দ্বিপার্শ্বীয় ক্লিভেজ (Bilateral cleavage)ঃ যে প্রক্রিয়ায় জাইগোট দ্বিতীয় বিভাজন পর্যন্ত অরীয় এবং তৃতীয় বিভাজন থেকে মধ্যরেখা বরাবর অনুপ্রস্থভাবে ক্লিভেজ ঘটে তাকে দ্বিপার্শ্বীয় ক্লিভেজ বলে। এর ফলে চারটি করে দুই সারি কোষ সৃষ্টি হয়। Chordata পর্বের প্রাণীদের দ্বিপার্শ্বীয় ক্লিভেজ ঘটে।

(iii) সর্পিল ক্লিভেজ (Spiral cleavage)ঃ জাইগোটের অরীয় ও অনুপ্রস্থ বিভাজনের পর তৃতীয় বিভাজনের সময় অ্যানিমেল পোলের ব্লাস্টোমিয়ার গুলো ভেজিটাল পোলের ব্লাস্টোমিয়ারের সাথে চক্রাকারে সামান্য স্থান পরিবর্তন করলে তাকে সর্পিল ক্লিভেজ বলে। অ্যানিলিডা ও মলাস্কা পর্বের প্রাণীদের সর্পিল ক্লিভেজ ঘটে।

 

ক্লিভেজ ও ভ্রুণীয় বিকাশের উপর ভিত্তি করে দ্বিপার্শ্বীয় প্রতিসম প্রাণীদের দুইটি দলে ভাগ করা হয়।

(i) প্রোটোস্টোমিয়া (Protostomia)ঃ প্রোটোস্টোমিয়া প্রাণীদের ক্লিভেজ সর্পিল ও নির্ধারিত ধরনের। এদের ভ্রুণীয় ব্লাস্টোপোর মুখছিদ্রে পরিনত হয়। যেমন- অ্যানিলিডা, আর্থ্রোপোডা ও মলাস্কা পর্ব।

(ii) ডিউটারোস্টোমিয়া (Deuterostomia)ঃ ডিউটারোস্টোমিয়া প্রাণীদের ক্লিভেজ সর্পিল ও অনির্ধারিত ধরনের। এদের ভ্রুণীয় ব্লাস্টোপোর পায়ুছিদ্রে পরিনত হয়। যেমন- একাইনোডার্মাটা ও কর্ডাটা পর্ব।

১৭। সংবহনতন্ত্র (Vascular system)ঃ যে তন্ত্রের মাধ্যমে পানি ও রক্ত প্রবাহিত হয় তাকে সংবহনতন্ত্র বলে। অনুন্নত প্রাণীদের সংবহনের প্রধান মাধ্যম হলো পানি। পরিফেরা পর্বের প্রাণীদের নালিতন্ত্র এবং একাইনোডার্মাটা পর্বের প্রাণীদের পানি সংবহনতন্ত্র থাকে। উন্নত প্রাণীদের সংবহনের প্রধান মাধ্যম হলো রক্ত বা তরল যোজক কলা। রক্ত সংবহনতন্ত্র দুই ধরনের।

(i) বদ্ধ রক্ত সংবহনতন্ত্র (Closed circulatory system)ঃ যে সংবহনতন্ত্রে রক্ত সর্বদা নালির ভিতর দিয়ে প্রবাহিত হয় তাকে বদ্ধ রক্ত সংবহনতন্ত্র বলে। অ্যানিলিডা ও কর্ডাটা পর্বের প্রাণীদের রক্ত সংবহনতন্ত্র হলো বদ্ধ ধরনের।

(ii) মুক্ত রক্ত সংবহনতন্ত্র (Open circulatory system)ঃ যে সংবহনতন্ত্রে রক্ত দেহের বিভিন্ন অংশ দিয়ে প্রবাহিত হয় তাকে মুক্ত রক্ত সংবহনতন্ত্র বলে। আর্থ্রোপোডা এবং মলাস্কা  পর্বের প্রাণীদের রক্ত সংবহনতন্ত্র হলো মুক্ত ধরনের।

১৮। কঙ্কাল (Skeleton)

যে তন্ত্র দেহগঠন, দেহের ভার বহন ও দেহকে সংরক্ষণ করে তাকে কঙ্কাল বলে। কঙ্কাল দুই ধরনের।

(i) বহিঃকঙ্কাল (Exoskeleton)ঃ যে কঙ্কাল দেহের বাইরের কাঠামো গঠন করে তাকে বহিঃকঙ্কাল বলে। মেরুদন্ডী প্রাণীদের খুর, শিং, নখ, আঁইশ, পালক, চঞ্চু প্রভৃতি বহিঃকঙ্কাল। আর্থ্রোপোডাদের কাইটিনাস প্লেট এবং মলাস্কাদের ক্যালকেরিয়াস খোলক হলো বহিঃকঙ্কাল।

(ii) অন্তঃকঙ্কাল (Endoskeleton)ঃ যে কঙ্কাল দেহের ভিতরের কাঠামো গঠন করে তাকে অন্তঃকঙ্কাল বলে। মেরুদন্ডি প্রাণীদের অস্থি ও তরুণাস্থি হলো অন্তঃকঙ্কাল। অমেরুদন্ডী প্রাণীদের অন্তঃকঙ্কাল থাকে। পরিফেরাদের স্পিকিউল, একাইডার্মাটাদের ক্যালকেরিয়াস প্লেট প্রভৃতি হলো অন্তঃকঙ্কাল। নরমদেহী প্রাণীদের কঙ্কাল থাকে না। কেঁচো, কৃমি, তেলাপোকা, প্রজাপতি প্রভৃতির কঙ্কাল থাকে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *