কোষ ঝিল্লির রুপান্তর-  প্লাজমা মেমব্রেণের গুরুত্ব প্রয়োজনীয়তা

কোষ ঝিল্লির রুপান্তর (Modification of cell membrane)

১। মাইক্রোভিলাই (Microvilli)ঃ প্রাণিদেহে শোষণকারী নালির প্রাচীরে যে অভিক্ষেপ থাকে তাকে মাইক্রোভিলাই বলে। অন্ত্র ও নেফ্রণের প্রতিটি কোষে প্রায় ৩০০০ মাইক্রোভিলাই থাকে। ইহা শোষণতল বৃদ্ধি করে।

২। পিনোসাইটিক ভেসিকল (Pinocytic vesicle)ঃ কোষ ঝিল্লি হতে সৃষ্ট তরল খাদ্যকণা যুক্ত গহ্বরকে পিনোসাইটিক ভেসিকল বলে। যে প্রক্রিয়ায় পিনোসাইটিক ভেসিকল সৃষ্টি হয় তাকে পিনোসাইটোসিস বলে।

৩। ফ্যাগোসাইটিক ভেসিকল (Phagocytic vesicle)ঃ কোষ ঝিল্লি হতে সৃষ্ট কঠিন খাদ্যকণা যুক্ত গহ্বরকে ফ্যাগোসাইটিক ভেসিকল বলে। যে প্রক্রিয়ায় ফ্যাগোসাইটিক ভেসিকল সৃষ্টি হয় তাকে ফ্যাগোসাইটোসিস বলে। শ্বেত রক্তকণিকায় ফ্যাগোসাইটিক ভেসিকল থাকে।

৪। ডেসমোসোম (Desmosome)ঃ ঘনিষ্টভাবে সংলগ্ন দুইটি কোষের কোষ ঝিল্লি রুপান্তরিত হয়ে পাতের মতো যে গঠন সৃষ্টি করে তাকে ডেসমোসোম বলে। ডেসমোসোমের সাথে টনোফাইব্রিল তন্তু থাকে। ইহা কোষ দু’টিকে দৃঢ়ভাবে যুক্ত রাখে।

৫। নিরেট সংযোগ (Tight junction)ঃ ঘনিষ্টভাবে সংলগ্ন দুইটি কোষের কোষ ঝিল্লি যুক্ত হয়ে যে নিরেট গঠন সৃষ্টি করে তাকে নিরেট সংযোগ বা টাইট জাংশন বলে। এ অঞ্চলের মধ্য দিয়ে কোন পদার্থ চলাচল করতে পারে না। মস্তিস্কের নিউরনে টাইট জাংশন থাকে।

 

প্লাজমা মেমব্রেণের গুরুত্ব / প্রয়োজনীয়তা

১। আকৃতি দানঃ  প্লাজমা ঝিল্লি প্রতিটি কোষকে নির্দিষ্ট আকৃতি প্রদান করে। উদ্ভিদ কোষে প্লাজমা পর্দার বাইরে কোষ প্রাচীর থাকলেও প্রাণী কোষে শুধু মাত্র প্লাজমা পর্দা থাকে। এ কারণে প্রাণী কোষের নির্দিষ্ট আকৃতি প্রদানে কোষ ঝিল্লি মুখ্য ভুমিকা পালন করে।

২। সজীব অংশকে রক্ষাঃ  প্লাজমা পর্দা সর্বদা কোষের সজীব প্রোটোপ্লাজমকে আবৃত করে রাখে এবং বাইরের তাপ, চাপ ও আঘাত থেকে রক্ষা করে।

৩। খাদ্য গ্রহণঃ  ইহা ফ্যাগোসাইটোসিস প্রক্রিয়ায় কঠিন খাদ্য এবং পিনোসাইটোসিস প্রক্রিয়ায় তরল খাদ্য গ্রহণ করে।

৪। অঙ্গাণু সৃষ্টিঃ   ইহা কোষের অতি প্রয়োজনীয় কয়েকটি অঙ্গাণু মাইটোকন্ড্রিয়া, ক্লোরোপ্লাস্ট, গলগি বডি, নিউক্লিয়ার মেমব্রেণ প্রভৃতি সৃষ্টিতে সহায়তা করে।

৫। রাসায়নিক দ্রুত হিসেবেঃ  প্লাজমা পর্দা কোষের বাহির থেকে নিউরোট্রান্সমিটার, হরমোন প্রভৃতির সাহায্যে রাসায়নিক উপায়ে তথ্য সংগ্রহ করে।

৬। রাসায়নিক ক্ষরণঃ  ইহা কোষের জন্য এনজাইম ও অ্যান্টিজেন ক্ষরণ করে।

৭। শারীরবৃত্তীয় কাজঃ  প্লাজমা মেমব্রেন জীবদেহে শ্বসন ও অন্যান্য শারীরবৃত্তীয় কাজে অংশ গ্রহণ করে।

৮। উদ্দীপনা পরিবহনঃ  ইহা কোষের বাহির হতে ভিতরে এবং এক কোষ হতে অন্য কোষে স্নায়ু উদ্দীপনা পরিবহন করে।

৯। পরিবহনঃ  প্লাজমা পর্দার ভিতর দিয়ে কোষের প্রয়োজনীয় অ্যামাইনো এসিড, গ্লুুকোজ, আয়ন প্রভৃতি কোষের বাহির হতে ভিতরে প্রবেশ করে। অপরদিকে, কোষে সৃষ্ট কার্বন ডাই অক্সাইড, অ্যামোনিয়া, ইউরিক এসিড প্রভৃতি কোষের ভিতর হতে বাইরে বেরিয়ে যায়।

১০। অভিস্রবনীয় প্রতিবন্ধকঃ ইহা কোষের বহি ও অন্তঃমাধ্যমের মধ্যে প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করে।

১১। আণবিক সচলতাঃ ইহা কোষের আণবিক সচলতা নিয়ন্ত্রণ করে।

১২। শক্তি উৎপাদনঃ ব্যাকটেরিয়ার কোষ ঝিল্লি ভাঁজ হয়ে মেসোজোম সৃষ্টি করে। মেসোজোম শ্বসন ঘটায় এবং শক্তি উৎপন্ন করে।

     প্লাজমা মেমকব্রণ-প্লাজমা মেমব্রেনের ফ্লুইড-মোজাইক মডেল- রাসায়নিক গঠন

প্লাজমা মেমব্রেনের ফ্লুইড-মোজাইক মডেল (Fluid Mosaic Model)

১৯৭২ সালে বিজ্ঞানী সিঙ্গার ও নিকলসন কোষ ঝিল্লির গঠন সম্পর্কে সর্বজন স্বীকৃত যে মডেল বর্ণনা করেন তাকে ‘ফ্লুইড-মোজাইক মডেল’ বলে। লিপিড স্তরে প্রোটিন অণুকে সমুদ্রে ভাসমান হিমশৈল এর সাথে তুলনা করা হয়েছে। একে হিমশৈল বা ‘আইসবার্গ মডেল’ বলা হয়। ‘ফ্লুইড-মোজাইক মডেল’ অনুযায়ী কোষ ঝিল্লির গঠন নিচে আলোচনা করা হলো-

১। ফসফোলিপিড (Phospholipid)ঃ কোষ ঝিল্লিতে পাঁচ ধরনের ফসফোলিপিড থাকে। লেসিথিন, সেফালিন, গ্লাইকোলিপিড, গ্লাইকোফসফোটাইড ও ফসফোটাইডিক এসিড। ফসফোলিপিড দু’টি স্তরে সজ্জিত থাকে। প্রতিটি লিপিড অণুর দু’টি অংশ থাকে। মাথা ও লেজ। বাইরের দিকের বড় অংশকে মস্তক বলে। ইহা গোলাকার বা ডিম্বাকার এবং ফসফেট দ্বারা গঠিত। ইহা পোলার অংশ এবং পানি গ্রাহী (হাইড্রোফিলিক)। মস্তকের সাথে সুক্ষ্ম তন্তুর মতো যে দু’টি অংশ থাকে তাকে লেজ বলে। ইহা ফ্যাটি এসিড দ্বারা গঠিত। লেজ হলো নন পোলার এবং পানি বিদ্বেষী (হাইড্রোফোবিক)। মস্তক ও লেজের মাঝখানে গ্লিাসারল থাকে। লিপিড অণু গুলো সর্বদা সচল থাকে, কাঁপে এবং পরস্পরের সাথে ঠোকাঠুকি করে লাফিয়ে চলে। এ ধরনের চলনকে flip flop movement বলে। Flip flop ভষড়ঢ় চলনের কারণে স্তর দু’টির মধ্যে স্থান পরিবর্তন হয়, তখন ঝিল্লিকে তরল পদার্থের মতো মনে হয়।

২। প্রোটিন (Protein)ঃ  প্লাজমা মেমব্রেনে তিন ধরনের প্রোটিন থাকে। এ গুলো নিম্নরুপ-

(i) প্রান্তীয় প্রোটিন (Peripheral protein)ঃ  যে প্রোটিন লিপিড স্তরের প্রান্তে অবস্থান করে তাকে প্রান্তীয় প্রোটিন বলে। ইহা দেখতে  গোলাকার। ইহা এনজাইম প্রকৃতির।

(ii) অন্তর্নিহিত প্রোটিন (Integral protein)ঃ যে প্রোটিন লিপিড স্তরের ভিতরে অন্তর্নিহিত অবস্থায় থাকে তাকে অন্তর্নিহিত প্রোটিন বলে। ইহা দেখতে ডিম্বাকার। ইহা বাহক হিসেবে কাজ করে এবং প্রয়োজনীয় পদার্থের আদান প্রদান ঘটায়

(iii) আন্তঃঝিল্লি প্রোটিন (Inter membrane protein)ঃ যে প্রোটিন লিপিড স্তরের এক প্রান্ত হতে অপর প্রান্ত পর্যন্ত বি¯তৃত থাকে তাকে আন্তঃঝিল্লি প্রোটিন বলে। ইহা সবচেয়ে বড় প্রোটিন। ইহা ATP থেকে শক্তি নিয়ে নিজের গঠনের পরিবর্তন ঘটায়। ফলে এর মধ্য দিয়ে একটি ছিদ্র সৃষ্টি হয়। এই ছিদ্রের মধ্য দিয়ে প্রয়োজনীয় পদার্থ চলাচল করে।

৩। গ্লাইকোক্যালিক্স (Glycocalyx)ঃ কোষ ঝিল্লির বাইরের দিকে কার্বোহাইড্রেট চেইন থাকে। কার্বোহাইড্রেট চেইন লিপিডের সাথে যুক্ত হয়ে গ্লাইকোলিপিড এবং প্রোটিনের সাথে যুক্ত হয়ে গ্লাইকোপ্রোটিন গঠন করে। গ্লাইকোপ্রোটিন ও গ্লাইকোলিপিডকে একত্রে গ্লাইকোক্যালিক্স বলে। ইহা কোষের চিহ্নিত কারক (Recognizer) হিসেবে কাজ করে। ইহা প্রয়োজনীয় পদার্থের যাতায়াতে সহায়তা করে।

৪। কোলেস্টেরল (Cholesterol) ঃ ফসফোলিপিড অণুর ফাঁকে ফাঁকে কোলেস্টেরল থাকে। ইহা অনিয়মিত ভাবে বিন্যস্ত থাকে। কোলেস্টেরল প্রাণী কোষে বেশি এবং উদ্ভিদ কোষে কম থাকে। ইহা দু’ধরনের। লো ডেনসিটি লিপোপ্রোটিন এবং হাই ডেনসিটি লিপোপ্রোটিন।

কোষ ঝিল্লিতে ফসফোলিপিডের মাঝে প্রোটিন অণু বিক্ষিপ্ত ভাবে অবস্থান করে। এ কারণে কোষ ঝিল্লিকে পৃষ্ঠতল থেকে দেখলে প্রোটিন অণু গুলো মোজাইকের মতো দেখায়। এ অবস্থাকে এক কথায় বোঝানোর জন্য ঝিল্লির মডেলের নাম হয়েছে ‘ফ্লুইড মোজাইক মডেল’।

 

প্লাজমা মেমব্রেনের রাসায়নিক গঠন

১। কোষ ঝিল্লিতে প্রোটিন থাকে ৬০-৮০%।

২। কোষ ঝিল্লিতে লিপিড থাকে ২০-৪০%।

৩। কোন কোন ক্ষেত্রে পলিস্যাকারাইড থাকে ৪-৫%।

৪। কোষ ঝিল্লির শুষ্ক ওজনের প্রায় ৭৫% লিপিড।

৫। কোন কোন ক্ষেত্রে ATP থাকে (পিঁয়াজের কোষ)।

৬। সামান্য পরিমাণ পানি ও লবণ থাকে।

কোষ ঝিল্লি বা প্লাজমা মেমব্রেন-স্যান্ডউইচ মডেল-একক পর্দা হাইপোথিসিস

কোষ ঝিল্লি বা প্লাজমা মেমব্রেন (Plasma Membrane)

প্রোটোপ্লাজমকে আবৃত করে যে সুক্ষ্ম, পাতলা, স্থিতিস্থাপক ও বৈষম্যভেদ্য পর্দা থাকে তাকে প্লাজমা মেমব্রেন বলে। ইহা লিপিড ও প্রোটিন দ্বারা গঠিত। একে সাইটোপ্লাজমিক মেমব্রেন, সাইটোমেমব্রেন, সেল মেমব্রেন, প্লাজমালেমা, বায়োমেমব্রেন প্রভৃতি নামে অভিহিত করা হয়েছে। ইহা উদ্ভিদ ও প্রাণীদেহে অর্থাৎ সকল জীব কোষে থাকে বলে একে বায়োমেমব্রেণ বলা হয়। রাসায়নিক দিক দিয়ে ইহা প্রোটিন-লিপিড-প্রোটিন এই তিনটি স্তর নিয়ে গঠিত। কার্ল নাগেলী (Nageli ও Cramer, ১৮৫৫) সর্বপ্রথম কোষঝিল্লিকে প্লাজমামেমব্রেন নামকরণ করেন। J. Q. Plower (১৯৩১) একে প্লাজমালেমা শব্দটি ব্যবহার করেন।

 

প্লাজমা মেমব্রেনের ভৌত গঠন

১। লিপিড মেমব্রেন মডেল- Gorter & grendel (১৯২৫)

২। স্যান্ডউইচ মডেল বা দ্বিস্তরবিশিষ্ট মডেল- Danielli এবং Davson (১৯৩৫)

৩। মাইসেলার মডেল- Hiller এবং Hoffman (১৯৫৩)

৪। একক পর্দা হাইপোথিসিস- Robertson (১৯৫৯)

৫। বেনসন মডেল- Benson’s model (১৯৬৬)

৬। লেনার্ড ও সিঙ্গার মডেল- Lenard & Singer’s model (১৯৬৬)

৭। প্রোটিন ক্রিস্টাল মডেল – Venderkoff  এবং Green (১৯৭০)

৮। ফ্লুইড-মোজাইক মডেল – Singer এবং Nicholson (১৯৭২)

 

 

স্যান্ডউইচ মডেল বা দ্বিস্তরবিশিষ্ট মডেল

Danielli  এবং Davson (১৯৩৫) সর্বপ্রথম কোষঝিল্লির গঠন সম্পর্কে একটি সুনির্দিষ্ট মডেল প্রস্তাব করেন। একে স্যান্ডউইচ মডেল বলে। এই মডেল অনুযায়ী কোষঝিল্লি দ্বি-স্তরবিশিষ্ট। প্রতিটি স্তরে প্রোটিন ও লিপিড উপস্তর থাকে। উপর ও নিচের স্তরে প্রোটিন এবং মাঝখানের স্তরে লিপিড থাকে।

 

একক পর্দা হাইপোথিসিস (Unit membrane)

১৯৫৯ সালে বিজ্ঞানী Robertson ইউনিট মেমব্রেন মডেলটি প্রস্তাব করেন। তাঁর মতে, সব বায়োলজিক্যাল মেমব্রেনের আণবিক গঠন একই ধরণের। ইহা তিনটি স্তর নিয়ে গঠিত। স্তর তিনটিকে একত্রে ইউনিট বা একক বলা হয়। ইহা ফসফোলিপিড বাইলেয়ার দ্বারা গঠিত। এর স্থানে স্থানে প্রোটিন গ্রোথিত থাকে। প্রোটিনসহ ফসফোলিপিড বাইলেয়ারকে ইউনিট মেমব্রেন বলা হয়। এর গঠন হলো প্রোটিন-লিপিড-প্রোটিন (P-L-P) এর মোট পুরুত্ব ৭৫ঞ্ Å । বাইরের স্তর দু’টির পুরুত্ব ২০ Å করে এবং ভিতরের স্তরটির পুরুত্ব ৩৫ Å ।

প্রোটোপ্লাস্ট কী । প্রোটোপ্লাজমের বৈশিষ্ট্য । প্রাটোপ্লাজমের রাসায়নিক উপাদান ও গঠন । চলন, কাজ বা গুরুত্ব । ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

 

প্রোটোপ্লাস্ট (Protoplast)

গ্রীক শব্দ Protoplastos  অর্থ first formed হতে Protoplast শব্দটি গঠিত। কোষপ্রাচীর ব্যতীত কোষের সকল অংশকে প্রোটোপ্লাস্ট বলে। ১৮৮০ সালে Hanstein সর্বপ্রথম প্রোটোপ্লাস্ট শব্দটি ব্যবহার করেন। কৃত্রিম উপায়ে যে প্রোটোপ্লাস্ট তৈরী করা হয় তাকে আইসোলেটেড প্রোটোপ্লাস্ট বলে।

 

প্রোটোপ্লাজম (Protoplasm)

গ্রীক শব্দ Protos অর্থ আদি এবং plasma নিয়ে Protoplasm  শব্দটি গঠিত। কোষ ঝিল্লির ভিতরে অবস্থিত  অর্ধস্বচ্ছ, আঠালো, বর্ণহীন ও জেলির ন্যায় কলয়েডধর্মী সজীব অংশকে প্রোটোপ্লাজম বলে। ইহা জীবের সকল কার্যাবলি সম্পন্ন করে বলে একে জীবনের ভৌত ভিত্তি বা vivum fluidum বলা হয়। ১৮৪০ সালে পারকিনজে (Purkinje) সর্বপ্রথম Protoplasm  শব্দটি ব্যবহার করেন। ১৮৬৮ সালে Huxley  প্রোটোপ্লাজমকে জীবনের ভৌত ভিত্তি নামে অভিহিত করেন। Wilson এর মতে, প্রোটোপ্লাজম হলো রাসায়নিক পদার্থের সমষ্টি মাত্র। প্রোটোপ্লাজমের প্রধান অংশ তিনটি। কোষঝিল্লি, সাইটোপ্লাজম ও নিউক্লিয়াস।

 

প্রোটোপ্লাজমের বৈশিষ্ট্য (Characters of Protoplasm)

১। প্রোটোপ্লাজম হলো অর্ধস্বচ্ছ, বর্ণহীন, জেলির ন্যায় এবং আঠালো।

২। ইহা দানাদার ও কলয়েডধর্মী।

৩। এর কলয়েড বস্তুকণা সমধর্মী বৈদ্যুতিক চার্জ বহন করে।

৪। এর আপেক্ষিক গুরুত্ব পানির চেয়ে বেশি।

৫। ইহা দেহের সকল মৌলিক জৈবিক কাজ সম্পন্ন করে (শ্বসন, চলন, রেচন, প্রজনন)।

৬। ইহা তাপ, এসিড ও অ্যালকোহলের প্রভাবে জমাট বাঁধে

৭। ইহা সর্বদা গতিশীল এবং এর গতিময় চলনকে সাইক্লোসিস বলে (যেমন- Tradescantia)।

৮। ইহা আঁকাবাঁকা (zig zag) বিচলন প্রদর্শন করে। একে ব্রাউনিয়ান বিচলন (Brownian movement) বলে।

৯। সল থেকে জেল এবং জেল থেকে সল হয়।

১০। মিলিপোর ফিল্টার পেপার দ্বারা প্রোটোপ্লাজমের কণাকে আলাদা করা যায়।

১১। এর মৃত্যু ঘটে।

 

প্রোটোপ্লাজমের রাসায়নিক উপাদান
১। প্রোটোপ্লাজমের প্রধান রাসায়নিক উপাদান পানি। এতে পানির পরিমাণ ৭০%-৯০%।
২। শুষ্ক প্রোটোপ্লাজমের ৪৫% প্রোটিন, ২৫% লিপিড, ২৫% কার্বোহাইড্রেট এবং ৫% অন্যান্য বস্তু থাকে।
৩। প্রোটোপ্লাজমের প্রধান জৈব উপাদান হলো প্রোটিন ও নাইট্রোজেন যৌগ।
৪। এতে অল্প পরিমাণ তরল চর্বি ও তৈল থাকে।
৫। এর খনিজ উপাদান হলো ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, পটাশিয়াম, সোডিয়াম, আয়রন ইত্যাদি।

 

প্রোটোপ্লাজমের গঠন সম্পর্কে মতবাদ
১। রেটিক্যুলার মতবাদঃ বিজ্ঞানী Frommann (১৮৬৫) এর মতে, ভিত্তি পদার্থের উপর জালিকাময় তন্তু দ্বারা প্রোটোপ্লাজম গঠিত।
২। গ্র্যানুলার মতবাদঃ বিজ্ঞানী Altman (১৮৮৬) এর মতে, প্রোটোপ্লাজম হলো অসংখ্য ক্ষুদ্র ও বৃহদাকার বায়োব্লাস্ট যুক্ত দানাদার তরল পদার্থ।
৩। অ্যালভিওলার মতবাদঃ বিজ্ঞানী Butschli (১৮৯২) এর মতে, প্রোটোপ্লাজম হলো সাবানের ফেনার মতো অসংখ্য অ্যালভিওলাই যুক্ত কিংবা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বুদবুদ যুক্ত।
৪। কোলয়েড মতবাদঃ বিজ্ঞানী Wilson ও Fishar (১৮৯৪) এর মতে, প্রোটোপ্লাজম আংশিক ভাবে তরল এবং আংশিক ভাবে কোলয়েডধর্মী।

 

প্রোটোপ্লাজমের চলন

প্রোটোপ্লাজম সর্বদা গতিময় চলন প্রদর্শন করে। প্রোটোপ্লাজমের গতিময় চলনকে আবর্তন বা সাইক্লোসিস বলে। ইহা আঁকাবাঁকা (zig zag) বিচলন প্রদর্শন করে, একে ব্রাউনিয়ান বিচলন বলে। ইহা দুই ধরণের চলন প্রদর্শন করে।
১। একমুখী সাইক্লোসিসঃ যে চলনে প্রোটোপ্লাজম একটি গহ্বরকে কেন্দ্র করে নির্দিষ্ট পথে একদিকে ঘুরতে থাকে তাকে একমুখী সাইক্লোসিস বলে। পাতা ঝাঁঝির প্রোটোপ্লাজমের চলন একমুখী।
২। বহুমুখী সাইক্লোসিসঃ যে চলনে প্রোটোপ্লাজম কয়েকটি গহ্বরকে কেন্দ্র করে অনিয়মিত ভাবে বিভিন্ন দিকে ঘুরতে থাকে তাকে বহুমুখী সাইক্লোসিস বলে। Tradescantia-র প্রোটোপ্লাজমের চলন একমুখী।

প্রোটোপ্লাজমের কাজ/গুরুত্ব
১। প্রোটোপ্লাজম হলো জীবনের ভৌত ভিত্তি।
২। ইহা কোষের মূল উপাদান। কোষের সকল অঙ্গাণু ধারণ করে।
৩। ইহা কোষের জন্য পানি ধারণ করে।
৪। ইহা বংশবিস্তার ঘটায়।
৫। ইহা দৈহিক বৃদ্ধি ঘটায়।
৬। কোষে আয়নিক ভারসাম্য রক্ষা করে।

কোষতত্ত্ব-কোষের প্রকারভেদ-উদ্ভিদ কোষ-প্রাণী কোষ

কোষতত্ত্ব (Cell theory)

১৮৩৮-৩৯ সালে জার্মান উদ্ভিদবিজ্ঞানী স্লেইডেন, প্রাণিবিজ্ঞানী থিওডোর সোয়ান এবং রবার্ট ভারচু কোষ সম্পর্কে যে তত্ত্ব প্রদান করেন তাকে কোষতত্ত্ব বলে। কোষতত্ত্বের মূল বিষয় হলো-

১। সকল জীবই কোষ দ্বারা গঠিত।

২। কোষ হলো জীবনের মৌলিক একক।

৩। কোষ হলো জীবের গাঠনিক, সাংগঠনিক ও শারীরবৃত্তীয় একক।

৪। ইহা বংশগতির একক।

৫। পূর্বতন কোষ থেকে নতুন কোষের সৃষ্টি হয়।

৬। দেহের সকল কার্যাবলী কোষের ভিতরে সংঘটিত হয়।

৭। দেহের জৈবিক কার্যক্রম সকল কোষের কার্যাবলীর উপর নির্ভর করে।

৮। একই প্রজাতির সকল সদস্যের কোষের রাসায়নিক প্রকৃতি সমরুপ।

 

কোষ মতবাদের সীমাবদ্ধতা

১। ভাইরাস, ভিরিয়ন ও প্রিয়ন এর কোষীয় অবস্থান নাই।

২। ব্যাকটেরিয়া ও নিলাভ সবুজ শৈবালের সুগঠিত নিউক্লিয়াস নাই।

৩। অনেক শৈবাল ও ছত্রাকের কোষ বহুনিউক্লিয়াসযুক্ত।

৪। অনেক কোষের প্রোটোপ্লাজম মৃত।

৫। লোহিত রক্তকণিকা ও সিভনল নিউক্লিয়াসবিহীন।

 

কোষের প্রকারভেদ (Type of Cell)

শারীরবৃত্ত্বীয় কাজের উপর ভিত্তি করে কোষকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে।

১। দেহকোষঃ বহুকোষী জীবের যে সব কোষ শুধু মাত্র দেহ গঠন করে তাকে দেহকোষ বলে। ইহা ডিপ্লয়েড প্রকৃতির। যেমন- মূল, কান্ড, পাতা, পেশিকোষ, স্নায়ুকোষ, জাইলেম, ফ্লোয়েম  প্রভৃতি।

২। জননকোষঃ যে সব কোষ জীবের জনন কাজে অংশ গ্রহণ করে তাকে জনন কোষ বলে। যেমন- শুক্রাণু ও ডিম্বাণু।

 

নিউক্লিয়াসের গঠনের উপর ভিত্তি করে Dougherty (১৯৭৫) কোষকে দুই ভাগে ভাগ করেছেন।

১। আদি কোষ (Prokaryotic cell)ঃ গ্রিক pro  শব্দ অর্থ আদি এবং karyon অর্থ নিউক্লিয়াস নিয়ে Prokaryotic শব্দটি গঠিত। Prokaryotic শব্দের অর্থ হলো আদি নিউক্লিয়াস। যে সব কোষে সুগঠিত নিউক্লিয়াস নাই তাদেরকে আদি কোষ বলে। যেমন- ব্যাকটেরিয়া, নীলাভ সবুজ শৈবাল (ইএঅ), মাইকোপ্লাজমা (PPLO)

২। প্রকৃত কোষ (Eukaryotic cell)ঃ গ্রিক eu শব্দ অর্থ প্রকৃত এবং karyon অর্থ নিউক্লিয়াস নিয়ে Eukaryotic শব্দটি গঠিত। Eukaryotic শব্দের অর্থ হলো প্রকৃত নিউক্লিয়াস। যে সব কোষে সুগঠিত নিউক্লিয়াস আছে তাদেরকে প্রকৃত কোষ বলে। যেমন- শৈবাল ও ছত্রাকের কোষ

 

কয়েকটি উদ্ভিদ কোষ (Plant Cell)

ট্রাকিড, ভেসেল, সীভনল, রক্ষীকোষ, স্টোনকোষ, গ্রন্থিকোষ, মূলরোম, ডায়াটম, প্যারেনকাইমা, কোলেনকাইমা।

 

কয়েকটি প্রাণী কোষ (Animal Cell)

শুক্রাণু, ডিম্বাণু, লোহিত রক্তকণিকা, শ্বেত রক্তকণিকা, গবলেট কোষ, যকৃত কোষ, ফাইব্রোব্লাস্ট, সেরাটিয়াম, মেদকোষ, অস্টিওসাইট, কোয়ানোসাইট, ক্রোম্যাটোফোর, পেশিকোষ, স্নায়ুকোষ

কোষবিদ্যার সংজ্ঞা-কোষের আকৃতি-কোষের আয়তন-কোষের সংখ্যা-পরিমাপের একক

কোষবিদ্যার সংজ্ঞা (Definition of Cytology)

দুইটি গ্রীক শব্দ Kytos অর্থ কোষ এবং logos অর্থ আলোচনা নিয়ে Cytology শব্দটি গঠিত। Cytology এর অর্থ কোষ নিয়ে আলোচনা। জীববিজ্ঞানের যে শাখায় কোষের আকার, আকৃতি, গঠন, বৃদ্ধি, বিকাশ কার্যাবলী নিয়ে আলোচনা করা হয় তাকে কোষবিদ্যা বা Cytology বলে। সাইটোলজির জনক হলো Robert Hooke (১৬৩৫১৭০৩) তবে আধুনিক সাইটোলজির জনক হলো Carl P. Swanson (১৯১১১৯৯৬)

 

কোষের আকৃতি (Shape of Cell)

বিভিন্ন কোষের আকৃতি বিভিন্ন রকম হয়। এরা গোলাকার, ডিম্বাকার, আয়তাকার, বৃত্তাকার, লম্বাকার, চ্যাপ্টা, সূঁচালো, মাকু আকৃতির, বহুভূজাকার প্রভৃতি হতে পারে।

 

কোষের আয়তন (Size of Cell)

অধিকাংশ কোষই আণুবীক্ষণিক এবং ২০৩০ মাইক্রোমিটার হয়ে থাকে। সবচেয়ে ছোট কোষ হলো Mycoplasma (PPLO-Pleuro Pneumonia Like Organism ) যার ব্যাস . মাইক্রোমিটার। সবচেয়ে বড় কোষ হলো উট পাখির ডিম হলো (১৭ х ১২. সেমি) মানব দেহের সবচেয়ে ছোট কোষ শুক্রাণু এবং সবচেয়ে বড় কোষ ডিম্বাণু (ব্যাস . মিমি)  মানুষের মটর নিউরন কোষ .৩৭ মিটার লম্বা (স্পাইনাল কর্ডের গোড়া থেকে পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুল পর্যন্ত) উদ্ভিদ জগতের সবচেয়ে বড় কোষ Acetabularia (শৈবাল) (.১০ সেমি) এবং সবচেয়ে লম্বা কোষ রেমি উদ্ভিদের (Bochmeria nivela) তন্তু (৫৫ মিটার)  তুলা, পাট, তালগাছ প্রভৃতির কোষ বেশ লম্বা।

 

কোষের সংখ্যা (Number of cell)

কোন কোন জীব একটি মাত্র কোষ দ্বারা গঠিত (Amoeba, Paramecium) অনেক কোষ দ্বারা গঠিত জীবকে বহুকোষী জীব বলে। মানব দেহে ১০০ ট্রিলিয়ান কোষ থাকে।

 

পরিমাপের একক (Units of measurement)

কোষ পরিমাপের একক হলো মিটার (M), ডেসিমিটার (dm), সেন্টিমিটার (cm), মিলিমিটার (mm), মাইক্রোমিটার বা মাইক্রন (µ), ন্যানোমিটার (nm) এবং অ্যাংস্ট্রম (Å)

মিটার = ,০০০,০০০,০০০ ন্যানোমিটার = ,০০০,০০০ মাইক্রোমিটার = ১০০০ মিমি = ১০০ সেমি

সেমি = ১০ মিমি = /১০০ মিটার

মিমি = /১০ সেমি = /১০০০ মিটার

মাইক্রোমিটার = /১০,০০০ সেমি = /,০০০,০০০ মিটার

ন্যানোমিটার = /১০, ০০০,০০০ সেমি = /,০০০,০০০,০০০ মিটার

nm  = .০০১ μm = ১০ Å

 

কোষ আবিষ্কার- কোষের বৈশিষ্ট্য

কোষ আবিষ্কার

১৬৬৫ সালে ব্রিটিশ প্রকৌশলী রবার্ট হুক নিজের তৈরী অণুবীক্ষণ যন্ত্রে ছিপির একটি পাতলা স্লাইড পর্যবেক্ষণ করে মৌচাকের মতো অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কুঠুরী বা প্রকোষ্ঠ দেখতে পান। তিনি এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রকোষ্ঠগুলোর নাম দেন Cell। তাঁর পর্যবেক্ষণকৃত সকল তথ্য Microgaphia নামক গ্রন্থে প্রকাশ করেন। ১৬৭৪ সালে ডাচ বিজ্ঞানী অ্যান্টনি ভন লিউয়েন হুক সর্বপ্রথম প্রোটোজোয়া, ব্যাকটেরিয়া, লোহিত রক্তকণিকা, শুক্রাণু প্রভৃতি পর্যবেক্ষণ করেন। কোষ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করেন- গ্রু (১৬৮২), উলফ (১৭৫৯), দ্য মিরবেল (১৮০২), ওকেন (১৮০৫), ল্যামার্ক (১৮০৯) এবং ড্রট্রোচেট (১৮২৪)।

১৭৮১ সালে ফেলিস ফন্টানা কোষের ভিতর নিউক্লিয়াসের অস্তিক্ত অনুমান করেন। ১৮৩৩ সালে রবার্ট ব্রাউন সর্বপ্রথম নিউক্লিয়াস আবিষ্কার করেন। ১৮৩৫ সালে ফরাসি কোষবিদ ফেলিক্স ডুজারডিন কোষের জেলির ন্যায় থকথকে পদার্থকে সারকোড নামে অভিহিত করেন। ১৮৪০ সালে পার্কিনজি জেলির ন্যায় তরল সারকোডকে প্রোটোপ্লাজম নামে অভিহিত করেন। বিজ্ঞানীদের ধারণা ৩.৫ বিলিয়ন বছর আগে কোষের আবির্ভাব হয়েছে।

 কোষের বৈশিষ্ট্য (Characters of Cell)

১। কোষ হলো জীবদেহের গাঠনিক ও কার্যিক একক।

২। ইহা জীবনের মৌলিক একক।

৩। ইহা অর্ধভেদ্য পর্দা দ্বারা আবৃত থাকে।

৪। পূর্বতন কোষ থেকে নতুন কোষ সৃষ্টি হয়।

৫।  ইহা সুনিয়ন্ত্রিত ভাবে বেড়ে উঠতে পারে।

৬। ইহা দেহের স্থিতাবস্থা বা homeostatic অবস্থা বজায় রাখে।

৭। কোষ জীবনের জন্য সকল উপাদান ধারণ করে।

৮। এর অভিযোজন ক্ষমতা আছে।

৯। এর ভিতরে প্রয়োজনীয় পদার্থ চলাচল করতে পারে।

১০। ইহা যেকোন উদ্দীপনায় সাড়া দিতে পারে।

১১। কোষের নিজস্ব শক্তি উৎপাদন ব্যবস্থা আছে। উৎপাদিত শক্তি ATP হিসেবে সঞ্চিত থাকে।

১২। কোষে নাইট্রোজেন ক্ষারযুক্ত পলিমার উপাদান থাকে যা রেপলিকেশন ঘটায় ।

১৩। এরা স্বপ্রজননক্ষম।

১৪। উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত কোষে নিজস্ব বংশগতিয় তথ্য থাকে।

১৫। ইহা দেহের বিপাক ঘটায়।

১৬। নির্দিষ্ট সময় পর কোষের মৃত্যু ঘটে।

কোষের সংজ্ঞা-প্রথম কোষের উৎপত্তি

কোষের সংজ্ঞা (Cell definition)

ল্যাটিন শব্দ Cellula অর্থ little box বা ক্ষুদ্র কুঠুরী নিয়ে Cell শব্দটি গঠিত। Cell এর অর্থ ক্ষুদ্র প্রকোষ্ঠ। জীবদেহের গঠনগত কার্যগত একককে কোষ বা Cell বলে।

 

বিভিন্ন বিজ্ঞানী বিভিন্ন সময়ে কোষের সংজ্ঞা প্রদান করেছেন।

১। Jean Brachet (১৯৬১) এর মতে, কোষ হলো জীবের গঠনগত মৌলিক একক।

২। Lowy এবং Siekevitz (১৯৬১) এর মতে, কোষ হলো জৈবিক কাজের একক যা বৈষম্যভেদ্য পর্দা দ্বারা পরিবেষ্টিত এবং স্বপ্রজননক্ষম।

৩। C. P. Hickman (১৯৭০) এর মতে, কোষ হলো জৈবিক গঠন কার্যের একক এবং এটিই নুন্যতম জৈবিক একক যা নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রজননে সক্ষম।

৪। De Roberties  (১৯৭৯) এর মতে, কোষ হলো জীবের মৌলিক গঠনগত এবং কার্যগত একক।

৫। Merriam Webster  অভিধান অনুযায়ী, কোষ হলো অর্ধভেদ্য পর্দা দ্বারা আবৃত প্রোটোপ্লাজমের একটি আণুবীক্ষণিক পিন্ড যাতে এক বা একাধিক নিউক্লিয়াস এবং অন্যান্য কোষীয় অঙ্গাণু এদের উপাদান থাকে, যা একক ভাবে বা অন্য কোষের সাথে আন্তঃক্রিয়া দ্বারা জীবনের মৌলিক কার্যাবলী সম্পাদন করতে সক্ষম এবং জীবনের স্বাধীন কার্যকরী ক্ষুদ্রতম গাঠনিক একক গঠন করে।

 

প্রথম কোষের উৎপত্তি (Formation of First cell)

Alixander Operio এবং J. B. S. Harold (১৯২০)-এর মতে, আদিকালে বায়ুমন্ডলের মিথেন (CH4), অ্যামোনিয়া (NH3), হাইড্রোজেন (H2) এবং পানির (H2O) ঘর্ষণে জৈব অণু বা অ্যামাইনো এসিড তৈরী হয়।

Stanly Miller এবং Harold Urey (১৯৫৩) গবেষণাগারে মিথেন, অ্যামোনিয়া, হাইড্রোজেন এবং পানির মিশ্রণে বৈদ্যুতিক প্রবাহ চালিয়ে অ্যামাইনো এসিড তৈরী করেছিলেন।

অনেকের ধারণা, আদি জীবন হলো RNA RNA থেকে পরে প্রোটিন তৈরী হয়। এই ধারণা RNA-World হাইপোথেসিস নামে পরিচিত।

১। লাইটেনিং এর করণে বায়ুমন্ডলের মিথেন (CH4), অ্যামোনিয়া (NH3), হাইড্রোজেন (H2) পানির (H2O) ঘর্ষণের ফলে অ্যামাইনো এসিড সৃষ্টি হয়েছিল।

২। গভীর সমুদ্রে অ্যামাইনো এসিড থেকে কার্বন যৌগ পলিমার সৃষ্টি হয়েছিল।

৩। পরবর্তীতে পলিমারের সাথে ফসফোলিপিড বাইলেয়ার তৈরী হয়েছিল।

৪। পলিমার হতে RNA সৃষ্টি হয়েছিল।

৫। RNA থেকে প্রোটিন সৃষ্টি হয়েছিল (RNAWorld হাইপোথেসিস)

৬। প্রোটিন হতে আদি কোষ সৃষ্টি হয়েছিল।

৭। আদি কোষের নিউক্লিয়াস সুগঠিত হয় এবং কোষঝিল্লি দ্বারা আবৃত হয়ে প্রকৃত কোষে পরিনত হয়েছিল

৮। প্রকৃত কোষে ব্যাকটেরিয়াম প্রবেশ করে মাইটোকন্ড্রিয়নে রুপান্তরিত হয় এবং প্রাণী কোষে পরিনত হয়েছিল।

৯। প্রাণী কোষে ফটোসিনথেটিক ব্যাকটেরিয়াম প্রবেশ করে ক্লোরোপ্লাস্টে রুপান্তরিত হয় এবং উদ্ভিদ কোষে পরিনত হয়েছিল।

 

আদি উৎস থেকে সৃষ্টি হয়েছে আদি কোষ। আদি কোষের DNA নিউক্লিয়াসে পরিনত হয় এবং প্রকৃত কোষ সৃষ্টি করে। প্রকৃত কোষে বায়বীয় ব্যাকটেরিয়া প্রবেশ করে মাইটোকন্ড্রিয়নে পরিনত হয় এবং প্রাণী কোষ গঠন করে। প্রাণী কোষে ফটোসিনথেটিক ব্যাকটেরিয়া প্রবেশ করে ক্লোরোপ্লাস্টে পরিনত হয় এবং উদ্ভিদ কোষ গঠন করে। নিউক্লিয়াস যুক্ত কোষে ব্যাকটেরিয়া প্রবেশ করে টিকে থাকার প্রক্রিয়াকে এন্ডাসিমবায়োসিস বলে।

 

লিনিয়াস-এর কৃত্রিম শ্রেণীবিন্যাস

 

লিনিয়াসএর কৃত্রিম শ্রেণীবিন্যাস

 

ক্যারোলাস লিনিয়াস ছিলেন সুইডেন দেশীয় প্রকৃতি বিজ্ঞানী। তাকে শ্রেণীবিন্যাসবিদ্যার জনক বলা হয়। তিনি জীবের দ্বিপদ নামকরণ প্রবর্তন করেন। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ঝঢ়বপরবং চষধহঃধৎঁস হলো। এই গ্রন্থে তিনি সকল উদ্ভিদের জন্য দ্বিপদ নাম ব্যবহার করেন। ঝঢ়বপরবং চষধহঃধৎঁস কে উদ্ভিদের আধুনিক নামকরণের শুরু হিসেবে ধরা হয়।

ক্যারোলাস লিনিয়াস এর শ্রেণীবিন্যাসকে যৌন শ্রেণীবিন্যাস পদ্ধতি বলা হয়। এটি একটি কৃত্রিম শ্রেণীবিন্যাস পদ্ধতি। তিনি উদ্ভিদের পুংকেশর স্ত্রীকেশরের বৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করে উদ্ভিদজগতকে ২৪টি শ্রেণী বহু বর্গে বিভক্ত করেন। ২৪টি শ্রেণীর মধ্যে ১টি অপুষ্পক উদ্ভিদের এবং ২৩টি সপুষ্পক উদ্ভিদের শ্রেণী।

থিয়োফ্রাস্টাস-এর কৃত্রিম শ্রেণীবিন্যাস (Classification of Theophrastus)

থিয়োফ্রাস্টাসএর কৃত্রিম শ্রেণীবিন্যাস (Classification of Theophrastus)

Theos অর্থ god এবং to phrase অর্থ devine expression হতে Theophrastus নামটি এসেছে। Theophrastus এর নাম ছিল Tyrtamus। তিনি চমৎকার ভাবে খুব সুন্দর বক্তব্য পেশ করতে পারতেন। তাই তাঁর নাম দেওয়া হয় Theophrastus। প্লেটো অ্যারিস্টোটল এর ছাত্র ছিলেন Theophrastus। তিনি ছিলেন বিখ্যাত গ্রিক উদ্ভিদবিজ্ঞানী এবং লাইসিয়াম গার্ডেনের প্রধান। তাঁকে উদ্ভিদবিজ্ঞানের জনক বলা হয়। তাঁর দুইটি বই অধিক পরিচিত। Enquiry into Plants (Hitoria Plantarum) On the Causes of Plants। তাঁর বইগুলো গ্রিক ভাষায় রচিত। Enquiry into Plants গ্রন্থটি Hitoria Plantarum নামে অধিক পরিচিত।Hitoria Plantarum গ্রন্থটি ১০ খন্ড দ্বারা গঠিত।

() এনাটমি

() বৃক্ষ বংশবিস্তার

 () বন্য বৃক্ষ

() বিদেশী বৃক্ষ গুল্ম

() কাষ্ঠ বৃক্ষ

() উপগুল্ম

() পটহার্বস

() শস্য লিগুম

() উদ্ভিদের ভেষজ ব্যবহার এবং

(১০) যা হারিয়ে গিয়েছে

Hitoria Plantarum  গ্রিক ভাষা থেকে ল্যাটিন অনুবাদ করেন Theodore Gaza এবং ইংরেজি অনুবাদ করেন Arthur Hort।

বিজ্ঞানী থিয়োফ্রাস্টাস উদ্ভিদের কান্ডের প্রকৃতি, বিস্তৃতি কাষ্ঠলতার উপর ভিত্তি করে উদ্ভিদকে চারটি শ্রেণীতে ভাগ করেছেন।

১। ট্রি (Tree)

২। শ্রাব বা গুল্ম (Shrub)

৩। আন্ডারশ্রাব বা উপগুল্ম (Under Shrub)

৪। হার্ব বা বীরুৎ (Herb)

 ১। ট্রি (Tree)ঃ একক কান্ডবিশিষ্ট শক্ত কাষ্ঠল উদ্ভিদকে ট্রি বা বৃক্ষ বলে। ইহা বহুবর্ষজীবী উদ্ভিদ। আমMangifera indica, কাঁঠালArtoccarpus heterophyllus, জামSyzygium cumini ইত্যাদি।

২। শ্রাব বা গুল্ম (Shrub) একক কান্ডবিহীন শক্ত কাষ্ঠল শাখাপ্রশাখাবিশিষ্ট ঝোপ জাতীয় উদ্ভিদকে শ্রাব বা গুল্ম বলে। ইহা বহুবর্ষজীবী উদ্ভিদ। জবাHibiscus rosa sinensis, রঙ্গনIxora coccinea, গন্ধরাজGardenia jasminoides ইত্যাদি।

৩। আন্ডারশ্রাব বা উপগুল্ম (Under Shrub) শ্রাব এর চেয়ে ছোট কাষ্ঠল উদ্ভিকে বলা হয় আন্ডারশ্রাব বা উপগুল্ম বলে। ইহা বহুবর্ষজীবী উদ্ভিদ। কাল্কাসুন্দাCassia sopera, আঁশ শেওড়াGlycosmis arborea, গোলাপRosa sinensis ইত্যাদি। 

৪। হার্ব বা বীরুৎ (Herb) নরম কান্ডবিশিষ্ট উদ্ভিকে হার্ব বা বীরুৎ বলে। ইহা বর্ষজীবী উদ্ভিদ। অধিকাংশ বীরুৎ একবার ফল দিয়ে মারা যায়। কাষ্ঠল কান্ডবিশিষ্ট হার্বকে উডি হার্ব বলে।  ধানOryza sativa, সরিষাBrassica npus, পাট-Corchorus olitorius ইত্যাদি।

আয়ুষ্কালের উপর ভিত্তি করে হার্বকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। যথা

(i) বর্ষজীবী (Annual) এসব উদ্ভিদ এক ঋতু বা এক বছর এর কম সময় বেঁচে থাকে। সরিষাBrassica napus, ছোলা-Cicer arietinum, গম-Triticum aestivum ইত্যাদি।

(ii) দ্বিবর্ষজীবী (Biennual) এসব উদ্ভিদ দুই ঋতু বা বছর এর কম সময় বেঁচে থাকে। প্রথম বছর দৈহিক বৃদ্ধি লাভ করে এবং দ্বিতীয় বছর ফুল ফল হয়। মূলা-Raphanus sativus, ফুলকফপ-Brassica oleracea ইত্যাদি।

(iii) বহুবর্ষজীবী (Perennial ) এসব উদ্ভিদ দুই ঋতু বা বছর এর বেশি সময় বেঁচে থাকে। এদের ভূনি¤œস্থ কান্ড থেকে প্রতিবছর বায়বীয় কান্ড বের হয়। আদাZingiber officinale, হলুদ Curcuma domestica, দুর্বাঘাস-Cynodon dactylon  ইত্যাদি।