লাইসোজোমকে ‘আত্মঘাতি থলী’ (suicidal bag) বলা হয়

লাইসোজোমকে ‘আত্মঘাতি থলী’ (suicidal bag) বলা হয়
প্রতিকূল পরিবেশে তীব্র খাদ্যাভাব দেখা দেয়। এসময় লাইসোজাইমের প্রাচীর ফেটে যায় এবং এনজাইম বাইরে বেরিয়ে আসে। এই এনজাইম কোষের অন্যান্য ক্ষুদ্রাঙ্গ গুলোকে নষ্ট করে দেয়। এ কাজকে স্ব-গ্রাস বা অটোফেগী বলে। এভাবে সমস্ত কোষও পরিপাক হয়ে যেতে পারে। একে অটোলাইসিস বলে। একারণে লাইসোজোমকে ‘সুইসাইডাল স্কোয়ড’ বা আতœঘাতী থলী বলে।

 লাইসোজোমের কাজ/গুরুত্ব

লাইসোজোমের কাজ/গুরুত্ব
১। লাইসোজোমে ৪০-৫০ ধরণের এনজাইম থাকে। এনজাইমগুলো অম্লীয় পরিবেশে কর্মক্ষম হয়
২। ইহা অন্তঃকোষীয় পরিপাকে সাহায্য করে
৩। বিগলনকারী এনজাইমকে আবদ্ধ করে রাখে যাতে অন্যান্য অঙ্গাণু রক্ষা পায়
৪। পিনোসাইটোসিস ও ফ্যাগোসাইটোসিস প্রক্রিয়ায় জীবাণু ভক্ষণ করে
৫। তীব্র খাদ্যাভাবের সময় এর প্রাচীর ফেটে যায় এবং এনজাইম বের হয়ে অন্যান্য অঙ্গাণুকে ধ্বংস করে দেয়। একে অটোলাইসিস বলে
৬। Autolysis প্রক্রিয়ায় দেহের অকেজো কোষ গুলোকে ধ্বংস করে। তাই একে suicidal bag বা squad বলা হয়
৭। কোষ বিভাজনে উদ্দীপনা যোগায় এবং নিউক্লিয়ার পর্দা ভাঙ্গতে সাহায্য করে
৮। ইহা হরমোন নিঃসরণে সাহায্য করে
৯। এরা কোষের জন্য কেরাটিন প্রস্তুত করে
১০। ইহা ক্যানসার সৃষ্টি করতে পারে
১১। রুপান্তরের সময় ইহা দেহের অংশ বিশেষের (ব্যাঙাচির লেজ) অবলুপ্তি ঘটায়

লাইসোজোমের ভৌত ও রাসায়নিক গঠন

লাইসোজোমের ভৌত গঠন (Physical structure)
লাইসোজোম ক্ষুদ্র গোলাকার বা বৃত্তাকার অঙ্গাণু। বহু সংখ্যক হাইড্রোলাইটিক এনজাইম আবরণী দ্বারা আবৃত হয়ে লাইসোজোম গঠন করে। প্রতিটি লাইসোজোম দুই স্তরবিশিষ্ট আবরণী দ্বারা আবৃত থাকে। তবে Spherosome বা Oleosome  এর আবরণী এক স্তরবিশিষ্ট। আবরণীটি লিপোপ্রোটিন দ্বারা গঠিত। বৃক্ক কোষের লাইসোজোম সবচেয়ে বড় হয়। এদের ব্যাস ০.২-০.৮ মিলিমাইক্রন। এর ভ্যাকুওল বা গহ্বর তরলে পূর্ণ থাকে। যে সব বস্তু লাইসোজোম হতে এনজাইম বের হতে দেয় না তাদেরকে স্ট্যাবিলাইজার (Stabilizer) বলে। যে সব বস্তু লাইসোজোম হতে এনজাইম বের হতে দেয় তাদেরকে ল্যাবিলাইজার (Labilizer) বলে।

লাইসোজোমের রাসায়নিক গঠন (Chemical structure)
১। লাইসোজোমে ৪০-৫০ ধরনের এনজাইম থাকে। প্রধান এনজাইম হলো- DNA-ase, RNA-ase, ফসফাটেজ, লাইপেজ, এস্টারেজ, স্যাকারেজ, সালফাটেজ, ডেক্সট্রোনেজ, লাইসোজাইম প্রভৃতি
২। এর আবরণী লিপিড ও প্রোটিন দ্বারা গঠিত
৩। এতে অল্প পরিমাণ শর্করা থাকে

লাইসোজোম কী ? লাইসোজোমের বিস্তৃতি ও উৎপত্তি

লাইসোজোম (Lysosome)
গ্রীক শব্দ Lyso অর্থ হজমকারী এবংsoma অর্থ বস্তু নিয়ে Lysosme শব্দটি গঠিত। এর অর্থ হলো বস্তু হজমকারী। কোষের সাইটোপ্লাজমে অবস্থিত অতি ক্ষুদ্র কোষীয় অঙ্গাণু যা পাচনকারী এনজাইম ধারণ করে ও খাদ্যকে পাচিত করে তাকে লাইসোজোম বলে। একে কোষের পাকস্থলী বলা হয়। ১৯৫৫ সালে বেলজিয়ান কোষবিজ্ঞানী দ্য দু’বে এর নামকরণ করেন লাইসোজোম।

বিস্তৃতিঃ  প্রায় সব প্রাণিকোষে লাইসোজোম থাকে। শ্বেত রক্তকণিকা, যকৃতকোষ, স্নায়ুকোষ, বৃক্ককোষ প্রভৃতিতে লাইসোজোম সবচেয়ে বেশি থাকে। লোহিত রক্তকণিকায় (RBC), ঈস্ট এবং অধিকাংশ উদ্ভিদ কোষে লাইসোজোম থাকে না। সম্প্রতি উদ্ভিদ কোষে লাইসোজোম আবিষ্কৃত হয়েছে। উদ্ভিদ কোষের লাইসোজোমকে Spherosome বা Oleosome বলা হয়। পিঁয়াজের বীজ, ভূট্রা এবং তামাকের কোষে লাইসোসোম পাওয়া যায়।

উৎপত্তিঃ  লাইসোজোম এন্ডোপ্লাজমিক রেটিকুলাম হতে উৎপত্তি লাভ করে।

গলজিবডির গুরুত্ব

গলজিবডির গুরুত্ব
১। গলজিবডি কোষ প্রাচীর গঠন করে।
২। কোষ ঝিল্লি গঠনে সাহায্য করে।
৩। কোষ বিভাজনের সময় কোষ প্লেট তৈরী করে।
৪। প্রোটিনকে শর্করার সাথে যুক্ত করে গ্লাইকল (glycol) উৎপন্ন করে। যে প্রক্রিয়ায় গ্লাইকল উৎপন্ন হয় তাকে গ্লাইকোস্যালেশন বলে।
৫। ইহা শুক্রাণুর অ্যাক্রোজোম সৃষ্টি করে।
৬। লাইসোজোম গঠনে সাহায্য করে।
৭। ইহা প্রোটিন এবং ভিটামিন-সি সঞ্চয় করে।
৮। খাদ্য দ্রব্য জমা রাখে।
৯। এনজাইম ও হরমোন নিঃসরণে সাহায্য করে।
১০। স্তন্যপায়ীর ক্যান্সার ও টিউমার কোষের গলজিবডি থেকে মেলানিন উৎপন্ন হয়।
১১। কোষের বিপাকীয় দ্রব্য ক্ষরণ করে।
১২। কোষকে ATP উৎপাদনে সাহায্য করে।
১৩। শর্করা থেকে গ্যালাকটোজ, সাইলিক এসিড, পেকটিন প্রভৃতি উৎপন্ন হয়।

উদ্ভিদ কোষে গলজি বডির গ্লাইকোপ্রোটিনের অলিগোস্যাকারাইডে পার্শ্ব শিকল যুক্ত করে। তাই উদ্ভিদ কোষে গলজিবডিকে কার্বোহাইড্রেট ফ্যাক্টরী বলা হয়।

গলজিবডিকে কোষের ট্রাফিক পুলিশ বলা হয় কেন

গলজিবডিকে কোষের ট্রাফিক পুলিশ বলা হয় কেন
গলজিবডি কোষে উৎপন্ন প্রোটিন ও লিপিডকে লিপোপ্রোটিনে পরিনত করে। এরপর লিপোপ্রোটিনকে আবরণী দ্বারা আবদ্ধ করে বাইরে নির্গত করে। একারণে গলজিবডিকে কোষের ট্রাফিক পুলিশ বলা হয়।

রাইবোজোমের গুরুত্ব কী কী । ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

রাইবোজোমের গুরুত্ব
১। ইহা প্রোটিন সংশ্লেষণ/ট্রান্সলেশন ঘটায়।
২। ইহা সাইটোক্রোম উৎপাদনে সাহায্য করে।
৩। ইহা স্নেহ বিপাকে সাহায্য করে।
৪। গ্লুকোজের ফসফোরাইলেশন ঘটায়।
৫। ইহা পলিপেপটাইডকে প্রোটিওলাইটিক এনজাইমের ক্ষতিকর ক্রিয়া হতে রক্ষা করে।
৬। ইহা mRNA-কে নিউক্লিয়েজ এনজাইমের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা করে।
৭। প্রোটিন সংশ্লেষণকারী এনজাইম ধারণ করে।
৮। ইহা জেনেটিক কোডের অর্থ নিশ্চিত করে।

[আদি কোষের রাইবোজোম রাসায়নিক ভাবে ভিন্ন ধরণের। তাই টেট্রাসাইক্লিন বা স্ট্রেপ্টোমাইসিন ওষুধ রোগীর দেহে প্রয়োগ করলে ব্যাকটেরিয়ার প্রোটিন সংশ্লেষণ বন্ধ হয়ে যায় এবং ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস হয়ে যায়। কিন্তু রোগীর কোন ক্ষতি হয় না]

ভেদবার্গ একক (Svedberg unit)

ভেদবার্গ একক (Svedberg unit)

সেন্ট্রিফিউজ যন্ত্রে দ্রুত ঘুর্ণনের সময় বিভিন্ন ভর বিশিষ্ট বস্তুর অধঃক্ষেপণের হারকে ভেদবার্গ একক বলে। একে S দ্বারা প্রকাশ করা হয়। সুইডিশ প্রাণরসায়ন বিজ্ঞানী Theodor Svedberg  এর নামের প্রথম অক্ষর S দ্বারা উহা বুঝানো হয়েছে। কলয়েড বস্তুর আলট্রাসেন্ট্রিফিউজ কৌশল আবিষ্কারের জন্য তাঁকে ১৯২৬ সালে রসায়নে নোবেল পুরষ্কার দেয়া হয়।

গ্লাইঅক্সিজোম (Glyoxisome)

গ্লাইঅক্সিজোম (Glyoxisome)
যে সব অঙ্গাণু বিটা-অক্সিডেশন প্রক্রিয়া ঘটায় তাদেরকে গ্লাইঅক্সিজোম বলে। ইহা আবরণী বিশিষ্ট অঙ্গাণু। ইহা বীজের লিপিড সঞ্চয়ী কোষে থাকে। বীজের অংকুরোদগমের সময় লিপিডকে ভেঙ্গে চিনিতে পরিনত করে। এতে চারার বৃদ্ধি অব্যাহত থাকে।

 

        রাইবোজোম কাকে বলে ? এর প্রকারভেদ

রাইবোজোম (Ribosome)

প্রোটিন ও RNA দ্বারা গঠিত আবরণীবিহীন প্রোটিন সংশ্লেষণকারী অতিআণুবীক্ষনিক কণাকে রাইবোজোম বলে। একে প্রোটিন ফ্যাক্টরী বলা হয়। ১৯৫৪ সালে আলবার্ট ক্লড যকৃত কোষ হতে ইহা আবিষ্কার করেন এবং নাম দেন মাইক্রোসোম। পরবর্তীতে ১৯৫৮ সালে রিচার্ড বি. রবার্ট এর নাম দেন রাইবোজোম।

 

প্রকারভেদ (Types)ঃ রাইবোজোম দুই প্রকার।

১। ৭০ S রাইবোজোম ঃ আদিকোষে ৭০ S রাইবোজোম থাকে। এরা ছোট, ব্যাস ১৫০ Å এবং আণবিক ওজন ২.৭ х ১০৬ ডালটন। এর দু’টি সাব ইউনিট হলো ৫০S ও ৩০S । ব্যাকটেরিয়া, মাইটোকন্ড্রিয়া ও ক্লোরোপ্লাস্টে ৭০ঝ থাকে।

২। ৮০ S রাইবোজোম ঃ প্রকৃত কোষে ৮০ S রাইবোজোম থাকে। ৮০ S রাইবোজোমের দু’টি উপএকক ৬০ S ও ৪০ S । এর আণবিক ওজন 40 х 106 ডালটন।