সরল প্রোটিন ।। Simple protin

যে সব প্রোটিনকে এসিড বা এনজাইম দ্বারা আর্দ্র বিশ্লেষণ করলে শুধু মাত্র অ্যামাইনো এসিড পাওয়া যায় তাকে সরল প্রোটিন বলে। দ্রবণীয়তার উপর ভিত্তি করে সরল প্রোটিনকে সাত ভাগে ভাগ করা হয়েছে।
১। অ্যালবিউমিন (Albumin )ঃ যে সব প্রোটিন পানিতে সহজে দ্রবীভুত হয়ে ঘোলাটে দ্রবণ তৈরী করে তাকে অ্যালবিউমিন বলে। ইহা পানি ও লঘু লবণের দ্রবণে দ্রবীভুত হয়। তাপ প্রয়োগে ইহা জমাট বাঁধে। প্রকৃতিতে ইহা ব্যাপক পরিমাণে পাওয়া যায়। এদের আণবিক ওজন ৪৫০০০-৬৫০০০ ডাল্টন। ডিমের সাদা অংশে, রক্তরসে, দুধে, পাতায় ও বীজে এই প্রোটিন পাওয়া যায়। যেমন- ওভালবুমিন (ডিমের সাদা অংশ, ১০-১২%), বিটা-অ্যামাইলেজ (যব, বার্লি), ল্যাক্টোঅ্যালবুমিন (দুধ), সিরাম-অ্যালবুমিন (রক্তরস ও লসিকা ৪-৫%), লিগুমিন (মটর), লিউকোসিন (গম, শৈবাল), লিগুমেলিন (শিম), মায়ো-অ্যালবুমিন (মাংসপেশী), মায়োসিন (পেশি) প্রভৃতি।
২। গ্লোবিউলিন (Globulin)ঃ গ্লোবিউলিন পানিতে অদ্রবণীয় কিন্তু লঘু লবণের দ্রবণে দ্রবণীয়। ইহা তাপে জমাট বাঁধে। ইহা বীজে সঞ্চিত খাদ্য হিসেবে জমা থাকে। তবে প্রাণীদেহেও এ প্রোটিন পাওয়া যায়। এদের আণবিক ওজন ৩৫০০ ডাল্টন। ডিমের কুসুম, রক্তরসে ও বীজে ইহা বিদ্যমান। যেমন- ফসভাইটিন (কুসুম), ওভোগ্লোবিন (ডিমের কুসুম), টিউবেরিন (গোল আলু), ল্যাক্টোগ্লোবিন (দুধ), ওভোগ্লোবিন (বীজ), আলফাগ্লোবিন (রক্তরস), সিরামগ্লোবিন (রক্তরস), মায়োসিনোজেন (মাংসপেশী), সিউডোগ্লোবিউলিন (ছানা/ঘোল), গ্লাইসিন (সয়াবিন), পোমেলিন (কমলালেবু), এরাচিন (চীনাবাদাম), লিগুমিন (মটরবীজ), এডেস্টিন (তুলা/শন), ক্রিস্টালিন (চোখের লেন্স) প্রভৃতি।
৩। গ্লুটেলিন (Glutelin) ঃ গ্লুটেলিন পানিতে অদ্রবণীয়, কিন্তু লঘু এসিড ও ক্ষারকে দ্রবণীয়। ইহা তাপে জমাট বাঁধে না। ইহা উদ্ভিদের শস্য দানায় থাকে। প্রাণীদেহে গ্লুটেলিন থাকে না। যেমন- গ্লুটেনিন (গম/ভূট্রা), অরাইজেনিন (চাল) প্রভৃতি।
৪। প্রোটামিন (Protamine)ঃ প্রোটামিন হলো সবচেয়ে ক্ষুদ্র প্রোটিন। ইহা পানি, লঘু এসিড ও অ্যামোনিয়াম হাইড্রোক্সাইডে দ্রবণীয়। ইহা তাপে জমাট বাঁধে না। এদের আণবিক ওজন ৫,০০০ ডাল্টন। কতিপয় মাছের শুক্রাণুর নিউক্লিয়াসে এই প্রোটিন পাওয়া যায়। যেমন- ক্লুপিন (হেরিং), আরজিনিন (চাল), স্যালমিন (স্যামন), সাইপ্রিনিন (কার্প), স্টারাইন (স্টার্জন) প্রভৃতি।
৫। প্রোলামিন (Prolamine)ঃ যে প্রোটিনকে হাইড্রোলাইসিস করলে প্রচুর পরিমাণে প্রোলিন ও অ্যামোনিয়া উৎপন্ন হয় তাকে প্রোলামিন বলে। ইহা পানিতে অদ্রবণীয়। তবে ৭০-৮০% ইথাইল অ্যালকোহলে দ্রবণীয়। এরা তাপে জমাট বাঁধে না। ইহা শুধু মাত্র উদ্ভিদের বীজে থাকে। প্রাণীদেহে প্রোলামিন থাকে না। যেমন- গ্লিয়াডিন (ধান/রাই/গম), জেইন (ভূট্রা), হর্ডিন (যব/বার্লি) প্রভৃতি।
৬। হিস্টোন (Histone)ঃ একাধিক ক্ষারীয় অ্যামাইনো এসিড দ্বারা হিস্টোন প্রোটিন গঠিত। ইহা পানিতে দ্রবণীয়, কিন্তু অ্যামোনিয়াম হাইড্রোক্সাইডে অদ্রবণীয়। এরা তাপে জমাট বাঁধে না। ইহা নিউক্লিয়াস বা ক্রোমোজোমে অবস্থান করে। ক্রোমোজোমে H1, H2, H3, H4 ইত্যাদি হিস্টোন প্রোটিন থাকে। জিনের বৈশিষ্ট্য প্রকাশের জন্য হিস্টোন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যেমন- আরজিনিন, লাইসিন, নিউক্লিওহিস্টোন, গ্লোবিন প্রভৃতি।
৭। স্কে¬রোপ্রোটিন (Scleroprotein)ঃ এই প্রোটিন পানি, লবণ, এসিড ও ক্ষারীয় দ্রবণে অদ্রবণীয়। একে ‘প্রাণীর কঙ্কাল প্রোটিন’ বলা হয়। উদ্ভিদদেহে এ প্রোটিন থাকে না। শুধুমাত্র প্রাণীদেহে থাকে। ইহা এনজাইমের উপর কোন ক্রিয়া করে না। প্রাণীর হাড়, চুল, নখ, শিং, ত্বক, খুর প্রভৃতিতে ইহা পাওয়া যায়। যেমন- কেরাটিন (ত্বক, নখ, চুল), কোলাজেন (চামড়া), টেনডন (হাড়), ইলাস্টিন (লিগামেন্ট), ফাইব্রয়িন (রেশম) প্রভৃতি।

যৌগিক বা কনজুগেটেড প্রোটিন ।। Conjugated Protein

যে সব প্রোটিনকে আর্দ্র বিশ্লেষণ করলে অ্যামাইনো এসিড ও অন্যান্য উপাদান পাওয়া যায় তাকে কনজুগেটেড প্রোটিন বলে। কনজুগেটেড প্রোটিনের দু’টি অংশ থাকে। প্রোটিন অংশ ও অপ্রোটিন অংশ। প্রোটিন অংশকে অ্যাপো এনজাইম এবং অপ্রোটিন অংশকে প্রোসথেটিক গ্রুপ বলে। প্রোসথেটিক গ্রুপের উপর নির্ভর করে কনজুগেটেড প্রোটিনগুলো হলো-
১। নিউক্লিওপ্রোটিন (Nucleoprotein)ঃ যে সব প্রোটিন অ্যামাইনো এসিড ও নিউক্লিক এসিড দ্বারা গঠিত হয় তাদেরকে নিউক্লিওপ্রোটিন বলে। এ সব প্রোটিন ক্রোমোজোমে অবস্থান করে। ইহা পানিতে দ্রবণীয়। কোষের নিউক্লিয়াস, ভাইরাস ও রাইবোজোমে এ প্রোটিন পাওয়া যায়। যেমন- ক্রোমাটিন।
২। গ্লাইকোপ্রোটিন বা মিউকোপ্রোটিন (Glycoprotein)ঃ যে সব প্রোটিন অ্যামাইনো এসিড ও শর্করা বা গ্লুকোজ দ্বারা গঠিত হয় তাদেরকে গ্লাইকোপ্রোটিন বলে। এই প্রোটিনে গ্লুকোজের পরিবর্তে ফ্রুক্টোজ থাকলে মিউকোপ্রোটিন এবং গ্যালাকটোজ থাকলে গ্যালাক্টোপ্রোটিন বলে। ইহা ক্ষারে দ্রবণীয়। কোষপর্দা, জেলীফিস ও লালারসে এ প্রোটিন থাকে। যেমন- থাইরোগ্লোবিন (থাইরয়েড), প্লাজমা গ্লাইকোপ্রোটিন (যকৃত), ইমিউনোগ্লোবিন (রক্তকণিকা), রাইবোনিউক্লিয়েজ (RNA), ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিয়েজ (DNA), মিউসিন, পেপটাইডোগ্লাইকান (ব্যাকটেরিয়া), ওভোঅ্যালবুমিন (ডিম্বনালি)।
৩। লিপোপ্রোটিন (Lipoprotein)ঃ প্রোটিন এবং লিপিড মিলিত হয়ে যে জৈব যৌগ গঠন করে তাকে লিপোপ্রোটিন বলে। ইহা পানিতে দ্রবণীয়, কিন্তু জৈব দ্রাবকে অদ্রবণীয়। ইহা বিভিন্ন ধরনের অঙ্গাণুর ঝিল্লি বা মেমব্রেন গঠন করে। লিপোপ্রোটিন ৫ ধরনের হয়। Chylomicrons, VLDL, LDL, IDL ও HDL।
৪। ফসফোপ্রোটিন (Phosphoprotein)ঃ যে সব প্রোটিন অ্যামাইনো এসিড ও ফসফেট বা ফসফোরাস দ্বারা গঠিত হয় তাদেরকে ফসফোপ্রোটিন বলে। ইহা পানিতে অদ্রবণীয়, কিন্তু জৈব দ্রাবকে দ্রবণীয়। যেমন- কেসিন (দুধ), ওভোভাইটেলিন (ডিম) প্রভৃতি।
৫। ক্রোমোপ্রোটিন (Chromoprotein)ঃ যে প্রোটিনের প্রোসথেটিক গ্রুপটি রঞ্জক পদার্থ দ্বারা গঠিত তাকে ক্রোমোপ্রোটিন বলে। যেমন- বিলিরুবিন, ক্লোরোফিল, হিমোগ্লোবিন, ক্যারোটিনয়েড, ফ্ল্যাভোপ্রোটিন, রডোপসিন, বিলিপ্রোটিন, মায়োগ্লোবিন, সাইটোক্রোম, হিমোসায়ানিন প্রভৃতি।
৬। মেটালোপ্রোটিন (Metalloprotein)ঃ যে প্রোটিনের প্রোসথেটিক গ্রুপটি কোন ধাতু (Fe, Mn, Mg, Zn, Cu, Co, Mo) দ্বারা গঠিত তাকে মেটালোপ্রোটিন বলে। যেমন- সিডারোফিলিন, সেরুলোপ্লাজমিন, ফেরিডক্সিন, সাইটোক্রোম, অক্সিডেজ, ফেরিটিন, নাইট্রোজিনেজ, হিমোগ্লোবিন প্রভৃতি।
৭। ফ্ল্যাভোপ্রোটিন (Flavoprotein)ঃ যে প্রোটিন ফ্ল্যাভিন যৌগের (FAD) সাথে যুক্ত থাকে তাকে ফ্ল্যাভোপ্রোটিন বলে। যেমন- সালফাইড রিডাক্টেজ, সাকসিনেট ডিহাইড্রোজিনেজ, NADH-ডিহাইড্রোজিনেজ প্রভৃতি।
৮। পোরফাইরিন বা সাইটোক্রোম প্রোটিন (Porphyrine) ঃ যে প্রোটিন পোরফাইরিন লৌহ বা সাইটোক্রোমের সাথে যুক্ত থাকে তাকে পোরফাইরিন বা সাইটোক্রোম প্রোটিন বলে। যেমন- সাইটোক্রোম- b।

উপজাত বা উদ্ভুত প্রোটিন ।। Derivates Protin

যে সব প্রোটিন যৌগিক প্রোটিন থেকে উৎপন্ন হয় তাদেরকে উৎপাদিত প্রোটিন বলে। এনজাইম, এসিড, ক্ষারক বা তাপের কারণে প্রাকৃতিক প্রোটিন থেকে এ সব প্রোটিন উৎপন্ন হয়। উৎিপাদিত প্রোটিন দুই ধরনের। প্রাথমিক উৎপাদিত প্রোটিন এবং সেকেন্ডারী উৎপাদিত প্রোটিন।
১। প্রাথমিক উৎপাদিত প্রোটিনঃ যে প্রোটিন এসিড বা এনজাইমের প্রভাবে সৃষ্টি হয় তাকে প্রাথমিক উৎপাদিত প্রোটিন বলে। প্রাথমিক উৎপাদিত প্রোটিনগুলো হলো-
(i) প্রোটিয়ানঃ প্রোটিয়ান পাতলা এসিড, এনজাইম ও পানির বিক্রিয়ায় সৃষ্টি হয়। ইহা পানিতে অদ্রবণীয়। এডেস্টিন থেকে এডেস্টান, মায়োসান থেকে মায়োসিন, ফাইব্রিনোজেন থেকে ফাইব্রিন প্রভৃতি সৃষ্টি হয়।
(ii) মেটাপ্রোটিনঃ মেটাপ্রোটিন পানিতে অদ্রবণীয়। তবে লঘু এসিড ও ক্ষারে দ্রবণীয়। যেমন- এসিড মেটাপ্রোটিন, ক্ষারীয় মেটাপ্রোটিন প্রভৃতি।
(iii) তঞ্চিত প্রোটিনঃ প্রোটিনের উপর তাপ বা অ্যালকোহলের প্রভাবে তঞ্চিত প্রোটিন উৎপন্ন হয়। ইহা পানিতে অদ্রবণীয়। যেমন- ডিমের জমাট বাধা সাদা অংশ।
২। সেকেন্ডারী উৎপাদিত প্রোটিনঃ প্রোটিনকে আর্দ্র বিশ্লেষণ করলে যে প্রোটিন সৃষ্টি হয় তাকে সেকেন্ডারী উৎপাদিত প্রোটিন বলে। সেকেন্ডারী উৎপাদিত প্রোটিনগুলো হলো-
(i) প্রোটিয়েজঃ পেপসিন ও ট্রিপসিনের ক্রিয়ায় প্রোটিওজ সৃষ্টি হয়। ইহা পানিতে অদ্রবণীয়। তবে তাপে সঞ্চিত হয়। অ্যালবিউলিন থেকে অ্যালবুমোজ এবং গ্লোবিউলিন থেকে গ্লোবিউলোজ উৎপন্ন হয়।
(ii) পেপটোনঃ লঘু এসিড ও এনজাইমের ক্রিয়ায় পেপটোন সৃষ্টি হয়। ইহা পানিতে অদ্রবণীয়। তাপে জমাট বাঁধে না। অ্যামোনিয়াম সালফেট দ্রবণে অধঃক্ষেপ সৃষ্টি করে না।
(iii) পেপটাইডঃ অল্প সংখ্যক অ্যামাইনো এসিড নিয়ে পেপটাইড গঠিত। অ্যামাইনো এসিড যুক্ত হয়ে ডাইপেপটাইড, ট্রাইপেপটাইড ও পলিপেপটাইড গঠন করে। ইহা পানিতে দ্রবণীয়। যেমন- গ্লাইসিন-অ্যালানিন, লিউসিন-গ্লুটামিক এসিড।
(iv) ইনফ্রাপ্রোটিনঃ ইহা ধাতব প্রোটিন। যেমন- মেটাপ্রোটিন।
(v) কোয়াগুলেটেড প্রোটিনঃ রক্ত জমাট বাঁধলে এই প্রোটিন উৎপন্ন হয়।

প্রোটিওম ।। Proteomes

জীবের কোষ, কলা ও অঙ্গ কর্তৃক উৎপাদিত সকল প্রোটিনকে একত্রে প্রোটিওম বলে। জীবের বিভিন্ন কোষ, কলা ও অঙ্গ থেকে বিভিন্ন ধরনের প্রোটিন উৎপন্ন হতে পারে। তাই প্রোটিওম পরিবর্তনশীল, কিন্তু জিনোম পরিবর্তনশীল নয়।

আদর্শ প্রোটিন ।। Ideal protein

ডিম ও দুধে আদর্শ প্রোটিন থাকে। তাই ডিম ও দুধ আদর্শ প্রোটিন হিসেবে বিবেচিত হয়। মাছ ও মাংসে ট্রিপ্টোফ্যান আদর্শ মাত্রার চেয়ে কম থাকে। ডালে মিথিওনিন ও ট্রিপ্টোফ্যান আদর্শ মাত্রার চেয়ে কম থাকে। ডালে প্রোটিনের পরিমাণ আরো কম।

সুপার ম্যালেরিয়া ।। Super malaria

সুপার ম্যালেরিয়া হলো উচ্চমাত্রার ওষুধ প্রতিরোধী ম্যালেরিয়ার একটি প্রকরণ। এটি খুব দ্রæত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়েছে। ম্যালেরিয়ার এই জীবাণুটি কোন ওষুধ দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। ২০০৮ সালে সর্বপ্রথম কম্বোডিয়ায় জীবাণুটি শনাক্ত করা হয়। পরবর্তীতে জীবাণুটি মশার মাধ্যমে ভিয়েতনাম, লাওস ও থাইল্যান্ডে ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশে ম্যালেরিয়া জীবাণু ক্লোরোকুইন প্রতিরোধী হয়ে উঠেছে। Plasmodium falciparum জীবাণুটি আরটিমিসিনিন প্রতিরোধী হয়ে উঠেছে।

ব্যাংককের অক্সফোর্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিন রিসার্চ ইউনিট এর গবেষণা দল লিখিত ভাবে এবং Lancet Infectious Diseases জার্নালে প্রকাশিত হয় যে, দ্রুত ছড়িয়ে পড়া সুপার ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল করা বর্তমান বিশে^র মানুষের একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

ম্যালেরিয়ার এই সুপারবাগ প্রকরণ সকল ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। ইহা বিশ^ব্যাপি জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় হুমকী। বর্তমান বিশে^ ওষুধ প্রতিরোধী জীবাণু দ্বারা প্রায় ৭,০০,০০০ মানুষ মারা গিয়েছে। উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে ২০৫০ সালের মধ্যে মৃত্যুর সংখ্যা কয়েক মিলিয়ন ছাড়িয়ে যাবে।

ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত রোগীর রক্তশুন্যতার কারণ কী ।। Anemia of Malaria patient

১। সাইজোগনি শেষে মেরোজয়েটগুলো লোহিত রক্তকণিকার প্রাচীর ভেঙ্গে বাইরে বেরিয়ে আসে। এতে লোহিত রক্তকণিকা ধ্বংস প্রাপ্ত হয় এবং রক্তশুন্যতা দেখা দেয়।

২। ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত রোগীর যকৃত ও প্লীহা স্ফীত হয় বা ফুলে যায়। এ অবস্থায় রোগীর দেহে লোহিত রক্তকণিকা উৎপাদন বাধপ্রাপ্ত হয়। এ কারণে রোগীর রক্তশুন্যতা দেখা দেয়।

৩। ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত রোগীর প্লীহা থেকে লাইসোলেসিথিন (Lysolecithin) নামক বিশ্লেষী পদার্থ নিঃসৃত হয়। এ সব পদার্থ লোহিত রক্তকণিকাকে ধ্বংস করে। এতে রক্তশুন্যতা দেখা দেয়।

৪। ম্যালেরিয়া পরজীবী হেমোলাইসিন (Heamolysin)  নামক এক ধরনের অ্যান্টিবডি উৎপন্ন করে। এই অ্যান্টিবডি সুস্থ RBC-কে ধ্বংস করে দেয়। এতে রোগী রক্তশুন্য হয়ে পড়ে।

৫। রোগীর খাবার গ্রহণে বিস্বাদ ও অরুচি দেখা দেয়। এতে পুষ্টির অভাব হয় এবং রক্তকণিকা সৃষ্টি হয় না।

মানুষের দেহে ম্যালেরিয়া পরজীবীর ক্ষতিকর প্রভাব ।। Harmful Effect of Malaria Parasite

১। ম্যালেরিয়া জ্বরঃ মানুষের লোহিত রক্তকণিকায় এরিথ্রোসাইটিক সাইজোগনি চক্রে হিমোজয়েন নামক বিষাক্ত পদার্থ নিঃসৃত হয়। হিমোজয়েন-এর কারণে মানুষের শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যায় এবং কাঁপুনীসহ জ্বর আসে। একে ম্যালেরিয়া জ্বর বলে। ইহা একটি মারাত্বক রোগ। এতে রোগীর মৃত্যু ঘটতে পারে।

২। যকৃত কোষ ধ্বংস সাধনঃ ম্যালেরিয়া পরজীবীর স্পোরোজয়েট মশকীর লালার মাধ্যমে মানুষের যকৃত কোষে প্রবেশ করে। যকৃত কোষে প্রবেশের পর স্পোরোজয়েট গুলো খাদ্য গ্রহণ করে আকারে বড় হয় এবং ক্রিপ্টোজয়েটে পরিনত হয়। ক্রিপ্টোজয়েটের নিউক্লিয়াসটি বিভাজিত হয়ে অসংখ্য নিউক্লিয়াসে পরিনত হয়। একে সাইজন্ট বলে। সাইজন্টের প্রতিটি নিউক্লিয়াসের চারিদিকে সাইটোপ্লাজম জমা হয়ে ক্রিপ্টোমেরোজয়েটে পরিনত হয়। ক্রিপ্টোমেরোজয়েট গুলো যকৃত কোষের প্রাচীর ভেঙ্গে যকৃত কোষকে ধ্বংস সাধনের মাধ্যমে বাইরে বেরিয়ে আসে।

সৃষ্ট প্রতিটি ক্রিপ্টোমেরোজয়েট আবার নতুন যকৃত কোষকে আক্রমণ করে এবং খাদ্য গ্রহণ করে আকারে বড় হয়। উহার নিউক্লিয়াসটি বিভাজিত হয়ে অসংখ্য নিউক্লিয়াস সৃষ্টি করে। একে সাইজন্ট বলে। সাইজন্টের প্রতিটি নিউক্লিয়াসের চারিদিকে সাইটোপ¬াজম জমা হয়ে মেটাক্রিপ্টোমেরোজয়েটে পরিনত হয়। মেটাক্রিপ্টোমেরোজয়েট গুলো পরিনত হলে যকৃত কোষের প্রাচীর ভেঙ্গে যকৃত কোষকে ধ্বংস সাধনের মাধ্যমে বাইরে বেরিয়ে আসে। এভাবে একের পর এক যকৃত ধ্বংস প্রাপ্ত হয়।

৩। লোহিত রক্তকণিকা ধ্বংস সাধনঃ ম্যালেরিয়া পরজীবীর মেরোজয়েট রক্তরসের মাধ্যমে মানুষের লোহিত রক্তকণিকায় প্রবেশ করে। লোহিত রক্তকণিকায় প্রবেশের পর মেরোজয়েট গুলো খাদ্য গ্রহণ করে আকারে বড় হয় এবং ট্রফোজয়েটে পরিনত হয়। ট্রফোজয়েট থেকে সিগনেট রিং সৃষ্টি হয়। সিগনেট রিং এর আকৃতি পরিবর্তন হয় এবং অ্যামিবার ন্যায় অনির্দিষ্ট আকৃতি ধারণ করে। একে অ্যামিবয়েড ট্রফোজয়েট বলে। এরপর অ্যামিবয়েড ট্রফোজয়েট আকৃতি পরিবর্তন করে গোলাকার ধারণ করে। উহার নিউক্লিয়াসটি বিভাজিত হয়ে অসংখ্য নিউক্লিয়াসে পরিনত হয়। এ অবস্থাকে সাইজন্ট বলে। সাইজন্টের প্রতিটি নিউক্লিয়াসের চারিদিকে সাইটোপ্লাজম জমা হয়ে মেরোজয়েটে পরিনত হয়। মেরোজয়েট গুলো লোহিত রক্তকণিকার প্রাচীর ভেঙ্গে লোহিত রক্তকণিকাকে ধ্বংস সাধনের মাধ্যমে বাইরে বেরিয়ে আসে। সৃষ্ট প্রতিটি মেরোজয়েট পুনরায় লোহিত রক্তকণিকাকে আক্রমণ করে ধ্বংস করে। এভাবে লোহিত রক্তকণিকা ধ্বংস হতে থাকে।

ম্যালেরিয়া পরজীবী দ্বারা যকৃত কোষ ও লোহিত রক্তকণিকা একের পর এক ধ্বংস হতে থাকলে পোষকের রক্ত শুন্যতা দেখা দেয় এবং সবশেষে পোষক মারা যেতে পারে।

ম্যালেরিয়া রোগের লক্ষণ ।। Symptoms of malaria fever ।। প্রতিকার ।। Protect

ম্যালেরিয়া রোগের লক্ষণ (Symptoms of malaria fever)

১। রোগের প্রাথমিক লক্ষণ

(i)  বমি বমি ভাব হয়। অনেক সময় বমি হয়।

(ii) মাথা ব্যথা এবং অনিদ্রা হয়।

(iii) ক্ষুধামন্দা এবং খাবারে অনিহা বা অরুচি।

(iv) পেশির ব্যথা এবং অস্থিসন্ধিতে ব্যথা হয়।

(v) দেহে শীত শীত ভাব হয়।

(vi) প্রচন্ড পিপাসা লাগে।

(vii) রোগী কম পরিমাণ খাদ্য গ্রহণ করে এবং দুর্বল হয়ে পড়ে।

(viii) নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসে অসুবিধা হয়।

(ix) রোগীর কোষ্ঠকাঠিন্য হয়।

২। রোগের মাধ্যমিক লক্ষণ

(i) কাঁপুনিসহ জ্বর আসে এবং ৪৮ ঘন্টা পর পর জ¦র আসে।

(ii) নির্দিষ্ট সময় পর পর জ্বর আসে এবং ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ে।

(iii) ২-৩ দিন পরপর জ¦র আসে।

(iv) জ¦রের প্রকোপ সাধারণত পূর্বহ্নে ও অপরাহ্নে হয়।

(v) ম্যালোরিয়া জ¦রের তিনটি অবস্থা লক্ষণীয়। শীত অবস্থা, উত্তাপ অবস্থা এবং ঘাম অবস্থা।

(vi) জ্বর ছেড়ে গেলে দেহের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে কম হয়। এটি শীত অবস্থা। শীত অবস্থা ২০ মিনিট থেকে ১ ঘন্টা স্থায়ী হয়।

(vii) উত্তাপ অবস্থায় শরীরের তাপমাত্রা খুব বেশি থাকে এবং তাপমাত্রা ১০৪-১০৫ ডিগ্রী ফারেনহাইট পর্যন্ত হয়। এই অবস্থা ২-৪ ঘন্টা স্থায়ী হয়।

(viii) ঘাম দিয়ে জ¦র ছেড়ে যায়। ঘাম অবস্থা ২-৩ ঘন্টা স্থায়ী হয়।

৩। রোগের চুড়ান্ত লক্ষণ

(i) লোহিত রক্তকণিকা ধ্বংস হয়ে যায়। রক্ত শুন্যতা দেখা দেয়। এ অবস্থায় হিমোলাইটিক অ্যানিমিয়া (Anaemia) দেখা দেয়।

(ii) রোগীর প্লীহা ও যকৃত ফুলে যায় এবং দিন দিন বড় হতে থাকে। প্লীহা থেকে লাইসোলেসিথিন (Lysolecithin) পদার্থ নিঃসৃত হয়।

(iii) পরজীবী হিমোলাইসিন (Haemolysin) নামক অ্যান্টিবডি উৎপন্ন করে লোহিত রক্তকণিকা ধ্বংস করে।

(iv) রোগীর খাদ্য পরিপাকে ব্যাঘাত ঘটে।

(v) মস্তিষ্ক আক্রান্ত হয়ে রোগী মারা যেতে পারে।

 

ম্যালেরিয়া রোগ প্রতিরোধ

১। মশা ধ্বংস সাধন

(i) মশার প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস করা। মশকী ডিম পাড়ে এবং লার্ভা বৃদ্ধি লাভ করে এরুপ ক্ষেত্র ধ্বংস করতে হবে।

(ii) অগভীর ও বদ্ধ জলাশয় মশকীর জন্য উত্তম প্রজননক্ষেত্র। তাই বদ্ধ জলাশয় ভরাট বা সংস্কার করতে হবে।

(iii) পতঙ্গ বারক স্প্রে করে  মশা ধ্বংস করতে হবে। মশকীর সংখ্যা কমে গেলে রোগ বিস্তার কমে যাবে।

(iv) জলাশয়ে কেরোসিন বা পেট্রোলিয়াম বা প্যারাফিন তেল স্প্রে করে পানির উপরে আস্তরণ তৈরী করতে হবে। এতে মশকীর লার্ভা ও পিউপা অক্সিজেনের অভাবে মারা যাবে।

(v) ঝোপ-ঝাড় ও কচুরীপানায় মশকী ডিম পারে, তাই এসব স্থান পরিষ্কার করতে হবে।

(vi) জলাশয়ে মশার লার্ভা খেকো টাকি মাছ, শিং মাছ, গাপ্পি মাছ, মাগুর, তেলাপিয়া, খলিসা, পুটি, কই ইত্যাদি মাছ চাষ করতে হবে। এ সব মাছ মশকীর লার্ভা খেয়ে সাবাড় করে দেয়।

(vii) স্বহস্তে এবং ট্র্যাপ সৃষ্টি করে মশা মারতে হবে।

(viii) পানিতে জুভেনাইন হরমোন মিশিয়ে লার্ভাকে আজীবন লার্ভা করে রাখা।

(ix) জিন প্রকৌশল প্রক্রিয়ায় Bacillus thuringiensis H-14 ও Bacillus sphaericus ব্যাকটেরিয়া থেকে মারণ জিন নিয়ে বায়োপেস্টিসাইড তৈরী করা হয়। এই বায়োপেস্টিসাইড জলাশয়ে প্রয়োগ করে মশার লার্ভা ব্যাপকভাবে ধ্বংস করা যায়।

(x) গামা বিকিরণ, রাসায়নিক পদার্থ এবং হাইব্রিডাইজেশনের মাধ্যমে বন্ধ্যা মশা সৃষ্টি করে প্রকৃতিতে অবমুক্ত করলে মশার পপুলেশন হ্রাস পায়।

(xi) শহর এলাকায় মশা নিয়ন্ত্রণের জন্য অনুমোদিত কীটনাশক ব্যবহার করতে হবে।

২। মশার  দংশন থেকে রক্ষা

(i) উচু স্থানে বসতবাড়ী নির্মাণ করা।

(ii) ঘুমানোর সময় মশারী ব্যবহার করতে হবে।

(iii) ঘরের দরজা, জানালা ও ভেন্টিলেটে মশা রোধক জাল ব্যবহার করতে হবে।

(iv) শরীরের অনাবৃত অংশে রেপিলেন্ট বা ক্রিম ব্যবহার করতে হবে।

(v) সন্ধ্যায় ঘরে ধোঁয়া দিয়ে মশকী তাড়াতে হবে।

(vi) ম্যালেরিয়া রোগীকে মশারীর মধ্যে রাখতে হবে।

(vii) মশার কয়েল, এরোসেল ও ধুপ ব্যবহার করতে হবে।

(viii) মশারী ও বিছানায় পাইরিথ্রয়েড জাতীয় পদার্থ ব্যবহার করতে হবে।

৩। চিকিৎসাঃ বিগত ৩০০ বছর ধরে সিনকোনা (Cinchona officinalis) গাছের বাকল থেকে সৃষ্ট কুইনাইন জাতীয় ওষুধ ম্যালেরিয়া রোগের একমাত্র ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ম্যালেরিয়া রোগে কার্যকরী সিনথেটিক এলোপ্যাথিক ওষুধ হলো- নিভাকুইন, ক্লোরোকুইন, কেমোকুইন, প্যালাড্রিন, অ্যাভেলোক্লোর, সেফলোকুইন, হ্যালোফ্যানট্রিন, প্রিইমাকুইন, ফ্যানমিডার, ম্যাপাক্রিন, প্রোগানিল, ম্যাফ্লোকুইন, ডাক্সসাইক্লিন, ম্যালারোন প্রভৃতি।

৪। ম্যালেরিয়ার টিকাঃ বিশে^র প্রথম ম্যালেরিয়া প্রতিষেধক টিকা মসকুইরিক্স (Mosquirix) আবিষ্কৃত হয়েছে। ইহা RTSS নামে পরিচিত। চার ডোজের এই টিকা Plasmodium falciparum জীবাণুর বিরুদ্ধে কার্যকরী অ্যান্টিবডি উৎপাদনে সক্ষম। ৩০ বছর গবেষণার পর ২০১৯ সালে ভ্যাক্সিনটির স্বীকৃতি দেওয়া হয়। আগামী তিন বছরের জন্য ভ্যাক্সিনটি আফ্রিকার তিনটি দেশে পাইলটিং করা হচ্ছে। Bill and Melinda Gates Foundation-এর সহায়তায় Malaria Vaccine Initiative -এর সাথে যৌথভাবে GlaxoSmithKline কোম্পানি এই ভ্যাক্সিনটি তৈরী করেছে।

৫। ম্যালেরিয়ার ভেষজ ওষুধঃ ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে ভেষজ ওষুধ হিসেবে আর্টিমিসিয়া (Artemisia) উদ্ভিদের ব্যবহার সফলতা আনে বলে বিজ্ঞানীরা দাবি করেছেন।

৬। ম্যালেরিয়ার হোমিওপ্যাথিক ওষুধঃ ম্যালেরিয়ার চিকিৎসায় সফল হোমিওপ্যাথিক ওষুধ হলো- আর্সেনিক অ্যালবাম (Arsenic Album), চিন সালফ্ (Chin-sulph), রাসট্রক্স (Rhustox), চায়না (China), হিপার সালফ্ (Heper sulph), সালফার (Sulpher), ব্রায়োনিয়া (Bryonia) প্রভৃতি।

৭। জুভেনাইন হরমোনঃ যে হরমোন পতঙ্গের লার্ভাকে রুপান্তরের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ পতঙ্গে পরিনত করে তাকে জুভেনাইন হরমোন বলে। ইহা পতঙ্গের মস্তিষ্কের কর্পোরা অ্যালাট্রা থেকে উৎপন্ন হয়। এই হরমোনের অভাব হলে লার্ভা থেকে পূর্ণাঙ্গ পতঙ্গ সৃষ্টি হয় না।

৮। জনসচেতনতা সৃষ্টিঃ ম্যালেরিয়া রোগের ক্ষতিকর দিক, এর বাহক ও প্রতিরোধ সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করতে হবে। রেডিও, টেলিভিশন, ফেসবুক, ইউটিউব, টুইটার, সংবাদপত্র প্রভৃতির মাধ্যমে ব্যাপক প্রচার করতে হবে। সরকারী ও বেসরকারী ভাবে লিফলেট, পোস্টার, ব্যানার প্রভৃতি বিলি করতে হবে।

ম্যালেরিয়া রোগ প্রতিরোধ ।। Protect of malaria fever

১। মশা ধ্বংস সাধন

(i) মশার প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস করা। মশকী ডিম পাড়ে এবং লার্ভা বৃদ্ধি লাভ করে এরুপ ক্ষেত্র ধ্বংস করতে হবে।

(ii) অগভীর ও বদ্ধ জলাশয় মশকীর জন্য উত্তম প্রজননক্ষেত্র। তাই বদ্ধ জলাশয় ভরাট বা সংস্কার করতে হবে।

(iii) পতঙ্গ বারক স্প্রে করে  মশা ধ্বংস করতে হবে। মশকীর সংখ্যা কমে গেলে রোগ বিস্তার কমে যাবে।

(iv) জলাশয়ে কেরোসিন বা পেট্রোলিয়াম বা প্যারাফিন তেল স্প্রে করে পানির উপরে আস্তরণ তৈরী করতে হবে। এতে মশকীর লার্ভা ও পিউপা অক্সিজেনের অভাবে মারা যাবে।

(v) ঝোপ-ঝাড় ও কচুরীপানায় মশকী ডিম পারে, তাই এসব স্থান পরিষ্কার করতে হবে।

(vi) জলাশয়ে মশার লার্ভা খেকো টাকি মাছ, শিং মাছ, গাপ্পি মাছ, মাগুর, তেলাপিয়া, খলিসা, পুটি, কই ইত্যাদি মাছ চাষ করতে হবে। এ সব মাছ মশকীর লার্ভা খেয়ে সাবাড় করে দেয়।

(vii) স্বহস্তে এবং ট্র্যাপ সৃষ্টি করে মশা মারতে হবে।

(viii) পানিতে জুভেনাইন হরমোন মিশিয়ে লার্ভাকে আজীবন লার্ভা করে রাখা।

(ix) জিন প্রকৌশল প্রক্রিয়ায় Bacillus thuringiensis H-14 ও Bacillus sphaericus ব্যাকটেরিয়া থেকে মারণ জিন নিয়ে বায়োপেস্টিসাইড তৈরী করা হয়। এই বায়োপেস্টিসাইড জলাশয়ে প্রয়োগ করে মশার লার্ভা ব্যাপকভাবে ধ্বংস করা যায়।

(x) গামা বিকিরণ, রাসায়নিক পদার্থ এবং হাইব্রিডাইজেশনের মাধ্যমে বন্ধ্যা মশা সৃষ্টি করে প্রকৃতিতে অবমুক্ত করলে মশার পপুলেশন হ্রাস পায়।

(xi) শহর এলাকায় মশা নিয়ন্ত্রণের জন্য অনুমোদিত কীটনাশক ব্যবহার করতে হবে।

২। মশার  দংশন থেকে রক্ষা

(i) উচু স্থানে বসতবাড়ী নির্মাণ করা।

(ii) ঘুমানোর সময় মশারী ব্যবহার করতে হবে।

(iii) ঘরের দরজা, জানালা ও ভেন্টিলেটে মশা রোধক জাল ব্যবহার করতে হবে।

(iv) শরীরের অনাবৃত অংশে রেপিলেন্ট বা ক্রিম ব্যবহার করতে হবে।

(v) সন্ধ্যায় ঘরে ধোঁয়া দিয়ে মশকী তাড়াতে হবে।

(vi) ম্যালেরিয়া রোগীকে মশারীর মধ্যে রাখতে হবে।

(vii) মশার কয়েল, এরোসেল ও ধুপ ব্যবহার করতে হবে।

(viii) মশারী ও বিছানায় পাইরিথ্রয়েড জাতীয় পদার্থ ব্যবহার করতে হবে।

৩। চিকিৎসাঃ বিগত ৩০০ বছর ধরে সিনকোনা (Cinchona officinalis) গাছের বাকল থেকে সৃষ্ট কুইনাইন জাতীয় ওষুধ ম্যালেরিয়া রোগের একমাত্র ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ম্যালেরিয়া রোগে কার্যকরী সিনথেটিক এলোপ্যাথিক ওষুধ হলো- নিভাকুইন, ক্লোরোকুইন, কেমোকুইন, প্যালাড্রিন, অ্যাভেলোক্লোর, সেফলোকুইন, হ্যালোফ্যানট্রিন, প্রিইমাকুইন, ফ্যানমিডার, ম্যাপাক্রিন, প্রোগানিল, ম্যাফ্লোকুইন, ডাক্সসাইক্লিন, ম্যালারোন প্রভৃতি।

৪। ম্যালেরিয়ার টিকাঃ বিশে^র প্রথম ম্যালেরিয়া প্রতিষেধক টিকা মসকুইরিক্স (Mosquirix) আবিষ্কৃত হয়েছে। ইহা RTSS নামে পরিচিত। চার ডোজের এই টিকা Plasmodium falciparum জীবাণুর বিরুদ্ধে কার্যকরী অ্যান্টিবডি উৎপাদনে সক্ষম। ৩০ বছর গবেষণার পর ২০১৯ সালে ভ্যাক্সিনটির স্বীকৃতি দেওয়া হয়। আগামী তিন বছরের জন্য ভ্যাক্সিনটি আফ্রিকার তিনটি দেশে পাইলটিং করা হচ্ছে। Bill and Melinda Gates Foundation-এর সহায়তায় Malaria Vaccine Initiative -এর সাথে যৌথভাবে GlaxoSmithKline কোম্পানি এই ভ্যাক্সিনটি তৈরী করেছে।

৫। ম্যালেরিয়ার ভেষজ ওষুধঃ ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে ভেষজ ওষুধ হিসেবে আর্টিমিসিয়া (Artemisia) উদ্ভিদের ব্যবহার সফলতা আনে বলে বিজ্ঞানীরা দাবি করেছেন।

৬। ম্যালেরিয়ার হোমিওপ্যাথিক ওষুধঃ ম্যালেরিয়ার চিকিৎসায় সফল হোমিওপ্যাথিক ওষুধ হলো- আর্সেনিক অ্যালবাম (Arsenic Album), চিন সালফ্ (Chin-sulph), রাসট্রক্স (Rhustox), চায়না (China), হিপার সালফ্ (Heper sulph), সালফার (Sulpher), ব্রায়োনিয়া (Bryonia) প্রভৃতি।

৭। জুভেনাইন হরমোনঃ যে হরমোন পতঙ্গের লার্ভাকে রুপান্তরের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ পতঙ্গে পরিনত করে তাকে জুভেনাইন হরমোন বলে। ইহা পতঙ্গের মস্তিষ্কের কর্পোরা অ্যালাট্রা থেকে উৎপন্ন হয়। এই হরমোনের অভাব হলে লার্ভা থেকে পূর্ণাঙ্গ পতঙ্গ সৃষ্টি হয় না।

৮। জনসচেতনতা সৃষ্টিঃ ম্যালেরিয়া রোগের ক্ষতিকর দিক, এর বাহক ও প্রতিরোধ সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করতে হবে। রেডিও, টেলিভিশন, ফেসবুক, ইউটিউব, টুইটার, সংবাদপত্র প্রভৃতির মাধ্যমে ব্যাপক প্রচার করতে হবে। সরকারী ও বেসরকারী ভাবে লিফলেট, পোস্টার, ব্যানার প্রভৃতি বিলি করতে হবে।