ম্যালেরিয়া রোগের লক্ষণ ।। Symptoms of malaria fever

১। রোগের প্রাথমিক লক্ষণ

(i)  বমি বমি ভাব হয়। অনেক সময় বমি হয়।

(ii) মাথা ব্যথা এবং অনিদ্রা হয়।

(iii) ক্ষুধামন্দা এবং খাবারে অনিহা বা অরুচি।

(iv) পেশির ব্যথা এবং অস্থিসন্ধিতে ব্যথা হয়।

(v) দেহে শীত শীত ভাব হয়।

(vi) প্রচন্ড পিপাসা লাগে।

(vii) রোগী কম পরিমাণ খাদ্য গ্রহণ করে এবং দুর্বল হয়ে পড়ে।

(viii) নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসে অসুবিধা হয়।

(ix) রোগীর কোষ্ঠকাঠিন্য হয়।

২। রোগের মাধ্যমিক লক্ষণ

(i) কাঁপুনিসহ জ্বর আসে এবং ৪৮ ঘন্টা পর পর জ¦র আসে।

(ii) নির্দিষ্ট সময় পর পর জ্বর আসে এবং ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ে।

(iii) ২-৩ দিন পরপর জ¦র আসে।

(iv) জ¦রের প্রকোপ সাধারণত পূর্বহ্নে ও অপরাহ্নে হয়।

(v) ম্যালোরিয়া জ¦রের তিনটি অবস্থা লক্ষণীয়। শীত অবস্থা, উত্তাপ অবস্থা এবং ঘাম অবস্থা।

(vi) জ্বর ছেড়ে গেলে দেহের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে কম হয়। এটি শীত অবস্থা। শীত অবস্থা ২০ মিনিট থেকে ১ ঘন্টা স্থায়ী হয়।

(vii) উত্তাপ অবস্থায় শরীরের তাপমাত্রা খুব বেশি থাকে এবং তাপমাত্রা ১০৪-১০৫ ডিগ্রী ফারেনহাইট পর্যন্ত হয়। এই অবস্থা ২-৪ ঘন্টা স্থায়ী হয়।

(viii) ঘাম দিয়ে জ¦র ছেড়ে যায়। ঘাম অবস্থা ২-৩ ঘন্টা স্থায়ী হয়।

৩। রোগের চুড়ান্ত লক্ষণ

(i) লোহিত রক্তকণিকা ধ্বংস হয়ে যায়। রক্ত শুন্যতা দেখা দেয়। এ অবস্থায় হিমোলাইটিক অ্যানিমিয়া (Anaemia) দেখা দেয়।

(ii) রোগীর প্লীহা ও যকৃত ফুলে যায় এবং দিন দিন বড় হতে থাকে। প্লীহা থেকে লাইসোলেসিথিন (Lysolecithin) পদার্থ নিঃসৃত হয়।

(iii) পরজীবী হিমোলাইসিন (Haemolysin) নামক অ্যান্টিবডি উৎপন্ন করে লোহিত রক্তকণিকা ধ্বংস করে।

(iv) রোগীর খাদ্য পরিপাকে ব্যাঘাত ঘটে।

(v) মস্তিষ্ক আক্রান্ত হয়ে রোগী মারা যেতে পারে।

পরজীবী ।। Parasite

যে সব জীব জীবন ধারণের জন্য আংশিক বা সম্পুর্ণ ভাবে অন্য জীবের উপর নির্ভরশীল তাদেরকে পরজীবী বলে। যেমন- Plasmodium vivax, Plasmodium ovale, Plasmodium falciparum, Plasmodium malariae প্রভৃতি।

ভেক্টর  ।। বাহক ।। Vector

যে সব জীব রোগের জীবাণু বহন করে তাদেরকে ভেক্টর  বা বাহক বলে। ম্যালেরিয়া পরজীবীর বাহক হলো মানুষ ও মশকী। পৃথিবীতে Anopheles গণের প্রায় ৪৩০ প্রজাতির মশা  রয়েছে। এর মধ্যে ১৯ প্রজাতির মশা ম্যালেরিয়া রোগের ভেক্টর। বাংলাদেশে মোট মশা প্রজাতির সংখ্যা ১১৩টি, Anopheles মশা প্রজাতির সংখ্যা ৩৪টি এবং ম্যালেরিয়া রোগের ভেক্টর প্রজাতির মশার সংখ্যা ৮টি। উল্লেখযোগ্য অ্যানোফিলিস মশা হলো- Anopheles dirus, Anopheles annularis, Anopheles aconitus, Anopheles sundaicus, Anopheles philippnensis,, Anopheles minimus, Anopheles vagus প্রভৃতি।

সুপ্তাবস্থা ।। Dorman state

জীবাণু পোষকদেহে প্রবেশের পর থেকে রোগের লক্ষণ প্রকাশের আগ পর্যন্ত সময়কে সুপ্তাবস্থা বলে। Plasmodium প্রজাতির সুপ্তাবস্থা হলো
Plasmodium vivax ১২-২০ দিন
Plasmodium ovale ১১-১৬ দিন
Plasmodium falciparum ০৮-১৫ দিন
Plasmodium malariae ১৮-৪০ দিন

কেবল মাত্র স্ত্রী Anopheles মশকী ম্যালেরিয়ার জীবাণু বাহক কেন

ম্যালেরিয়া জ¦রের জীবাণু হলো Plasmodium। শুধুমাত্র Anopheles গণের সকল প্রজাতির মশকী Plasmodium বহন করে। জীবনকাল, পারিপার্শ্বিক অবস্থা, তাপমাত্রা এবং দংশনের সময়কাল হিসেবে Plasmodium এর একমাত্র বাহক Anopheles মশকী। Plasmodium এর গ্যামিট সৃষ্টি, নিষেক, জাইগোট, উওকিনেট এবং স্পোরোগনির জন্য Anopheles মশকী উত্তম। জীবাণুর পরিস্ফুটনের জন্য Anopheles মশকীর ক্রপ হলো অনুকূল পরিবেশ।

অন্য প্রজাতির মশকীর দেহে বিষাক্ত পদার্থ থাকে। এসব বিষাক্ত পদার্থ Plasmodium-এর জন্য ক্ষতিকর। ঐ সব মশকীর অন্ত্রে ট্রিপসিন সদৃশ উপাদান থাকে। এসব উপাদান Plasmodium-এর উওকিনেটের পরিস্ফুটন বন্ধ করে দেয়। ফলে স্পোরোজয়েট সৃষ্টি হয় না। কিন্তু Anopheles মশকীতে Plasmodium-এর জন্য কোন ক্ষতিকর উপাদান নাই। Anopheles মশকীর ক্রপ জীবাণুর যৌনজননের  জন্য উপযুক্ত পরিবেশ। তাই কেবল মাত্র স্ত্রী Anopheles মশকী ম্যালেরিয়ার জীবাণু বহন করে।

ম্যালেরিয়া পরজীবীর জীবনচক্রে দুইটি পোষকের প্রয়োজনীয়তা ।। Two host for Malaria

১। মেরুদন্ডী পোষকের (মানুষ) প্রয়োজনীয়তা

(i) নতুন পোষকঃ ম্যালেরিয়া পরজীবীর স্পোরোজয়েট গুলোর জন্য নতুন পোষক হিসেবে মানুষের প্রয়োজন হয়।

(ii) মেরোজয়েট সৃষ্টিঃ মেরুদন্ডী পোষক ছাড়া মেরোজয়েট সৃষ্টি হয় না। তাই মেরোজয়েট সৃষ্টির জন্য মেরুদন্ডী পোষক প্রয়োজন হয়।

(iii) সাইজোগনিঃ মানুষ বা মেরুদন্ডী পোষকে ম্যালেরিয়া পরজীবীর হেপাটিক ও এরিথ্রোসাইটিক সাইজোগনি সম্পন্ন হয়।

(iv) সহজ লভ্যতাঃ মেরুদন্ডী পোষক হিসেবে মানুষ সহজেই পাওয়া যায়।

(v) প্রজাতির ধারাবাহিকতাঃ প্রজাতির ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য পুরুষ ও স্ত্রীগ্যামিটোফাইটের উৎপাদন প্রয়োজন। মানুষের রক্তে গ্যামিটোফাইট সৃষ্টি হয়। তাই প্রজাতির বিলুপ্তি রোধে মেরুদন্ডী পোষক একান্ত প্রয়োজন।

২। যৌনচক্রের জন্য অমেরুদন্ডী পোষকের (মশকী) প্রয়োজনীয়তা

(i) যৌনচক্রঃ ম্যালেরিয়া পরজীবীর যৌনচক্রের জন্য মশকী প্রয়োজন হয়।

(ii) স্পোরোজয়েটের বাহকঃ যৌনজনন শেষে মশকী স্পোরোজয়েট গুলোকে বহন করে।

(iii) সহজ লভ্যতাঃ অমেরুদন্ডী পোষক হিসেবে মশকী বসতির আশে পাশে সহজেই পাওয়া যায়।

(iv) পুষ্টিদানঃ স্পোরোজয়েট গুলো মশকীর দেহ থেকে পুষ্টি লাভ করে।

(v) জীবনকালঃ ম্যালেরিয়া পরজীবীর যৌনচক্র ঘটার জন্য যে সময় প্রয়োজন মশকী তার চেয়ে বেশি সময় বাঁচে।

ম্যালেরিয়া জ্বরের কারণ ।। Cause of Malarial fever

ম্যালেরিয়া পরজীবীর মেরোজয়েটগুলো যকৃত থেকে বাইরে বেরিয় আসে এবং রক্ত রসে মিশে যায়। এতে রক্তের স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হয়। এদেরকে ধ্বংস করার জন্য শ্বেত রক্তকণিকা পাইরোজেন নিঃসরণ করে। রক্তে অতিরিক্ত পাইরোজেনের কারণে মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাস উদ্দীপ্ত হয়। কারণে মস্তিষ্ক থেকে প্রোস্টাগ্লান্ডিন, মনোঅ্যামাইন প্রভৃতি রাসায়নিক পদার্থ ক্ষরিত হয়। এই সংবাদ বা উদ্দীপনা ভেসোমোটর স্নায়ুর মাধ্যমে দেহের প্রান্তীয় অঞ্চলে পৌঁছায়। প্রান্তীয় অঞ্চলের রক্তনালিকা গুলো সংকুচিত হয়। তাই দেহ থেকে অতিরিক্ত তাপ বের হতে পারে না। ফলে দেহের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেড়ে যায় এবং ¦ আসে। 

ম্যালেরিয়া পরজীবীর জনুঃক্রম ।। Alternation of generation

কোনো জীবের জীবনচক্রে হ্যাপ্লয়েড ও ডিপ্লয়েড দশার পর্যায়ক্রমিক আবর্তনকে জনুঃক্রম বলে। ম্যালেরিয়া পরজীবীর জনুঃক্রম আলোচনা করা হলো।

১। হ্যাপ্লয়েড দশা

(i) স্পোরোজয়েটঃ ম্যালেরিয়া জীবাণু বহনকারী কোন Anopheles মশকী সুস্থ মানুষকে দংশন করলে মশকীর লালারসের মাধ্যমে স্পোরোজয়েট মানুষের দেহে প্রবেশ করে। স্পোরোজয়েট গুলো সঞ্চালনক্ষম, সামান্য বাঁকানো এবং দেহের উভয় প্রান্ত সুচালো। স্পোরোজয়েট গুলো ৩০-৪৫ মিনিটের মধ্যে মানুষের যকৃত কোষে প্রবেশ করে  এবং বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়।

(ii) মেটাক্রিপ্টোমেরোজয়েটঃ স্পোরোজয়েট থেকে পর্যায়ক্রমে মেটাক্রিপ্টোমেরোজয়েট সৃষ্টি হয়। মেটাক্রিপ্টোমেরোজয়েট গুলো দুই ধরনের। মাইক্রোমেটাক্রিপ্টোমেরোজয়েট এবং ম্যাক্রোমেটাক্রিপ্টোমেরোজয়েট। মাইক্রোমেটাক্রিপ্টোমেরোজয়েট গুলো আকারে ছোট এবং নিউক্লিয়াস বড়। ম্যাক্রোমেটাক্রিপ্টোমেরোজয়েট গুলো আকারে বড় এবং নিউক্লিয়াস ছোট। ম্যাক্রোমেটাক্রিপ্টোমেরোজয়েট গুলো নতুন যকৃত কোষকে আক্রমণ করে। মাইক্রোমেটাক্রিপ্টোমেরোজয়েট গুলো রক্তস্রোতে চলে আসে এবং লোহিত রক্তকণিকাকে আক্রমণ করে।

(iii) মেরোজয়েটঃ জীবাণুর সাইটোপ্লাজমে ১২-১৮টি ক্ষুদ্র অংশ দেখা যায়। প্রতিটি অংশে একটি করে নিউক্লিয়াস প্রবেশ করে। এ গুলো পাপড়ির মতো দু’টি স্তরে সাজানো থাকে। এই অবস্থাকে রোজেট বলে। নিউক্লিয়াসসহ প্রতিটি অংশ এক একটি মেরোজয়েটে পরিনত হয়।

(iv) গ্যামিটোসাইটঃ কিছু মেরোজয়েট গ্যামিটোসাইটে পরিনত হয়। গ্যামিটোসাইট গুলো দুই ধরনের। মাইক্রোগ্যামিটোসাইট এবং ম্যাক্রোগ্যামিটোসাইট। মাইক্রোগ্যামিটোসাইট গুলো আকারে ছোট এবং এর নিউক্লিয়াস বড়। ম্যাক্রোগ্যামিটোসাইট গুলো আকারে বড় এবং এর নিউক্লিয়াস ছোট।

(v) গ্যামিটঃ এক্সফ্ল্যাজেলেশন প্রক্রিয়ায় প্রতিটি মাইক্রোগ্যামিটোসাইটের নিউক্লিয়াস বিভাজিত হয়ে ৪-৮টি পুংগ্যামিট বা মাইক্রোগ্যামিটে পরিনত হয়। প্রতিটি ম্যাক্রোগ্যামিটোসাইট হতে একটি করে স্ত্রীগ্যামিট বা ম্যাক্রোগ্যামিট সৃষ্টি হয়।

২। ডিপ্লয়েড দশা

(i) জাইগোটঃ মাইক্রোগ্যামিটটি নিষেক কোণের মধ্য দিয়ে ম্যাক্রোগ্যামিটোসাইটে প্রবেশ করে। পরে এদের নিউক্লিয়াস মিলিত হয়ে জাইগোট সৃষ্টি করে।

(ii) উওকিনেটঃ ১২-১৪ ঘন্টা পর নিশ্চল গোলাকার জাইগোটটি লম্বা ও সচল হয়। একে উওকিনেট বা ভারমিকিউল বলা হয়। উওকিনেটের দৈর্ঘ্য ১৮-২৮ মাইক্রন এবং প্রস্থ ৩-৫ মাইক্রন।

(iii) উওসিস্টঃ ২৪ ঘন্টার মধ্যে উওকিনেট গুলো মশকীর ক্রপের প্রাচীর ভেদ করে বাইরে বেরিয়ে আসে এবং গোলাকার ধারণ করে। এরপর পাতলা আবরণী দ্বারা আবৃত হয়। একে উওসিস্ট বলে। উওসিস্ট পরে স্পোরোজয়েটে পরিনত হয়।

 উওকিনেটের গঠন ।। Structure of Ookinete

১। উওকিনেটের পেলিকল দ্বিস্তরবিশিষ্ট। বহিঃআবরণী কুঞ্চিত এবং অন্তঃআবরণী মসৃণ।

২। দেহের অগ্রভাগে সাইটোস্টোম নামক অতিক্ষুদ্র ছিদ্র থাকে। এই ছিদ্রের মধ্য দিয়ে প্রোটিন বিশ্লেষী এনজাইম ক্ষরিত হয়ে মশকীর ক্রপে ক্ষত সৃষ্টি করে।

৩। অন্তঃআবরণীর নিচে ৫৫-৫৬টি অণুনালিকা রয়েছে। এগুলো সঙ্কোচন-প্রসারণশীল এবং চলনে সাহায্য করে।

৪। এর নিউক্লিয়াস বেশ বড়, দানাদার এবং অনিয়তাকার।

৫। সাইটোপ্লাজম ঘন এবং বাদামী রঞ্জক দানা যুক্ত।

৬। এতে মাইটোকন্ড্রিয়া ও রাইবোসোম থাকে।

ট্রফোজয়েটের গঠন ।। Structure of Trophozoite

১। ট্রফোজয়েট দ্বি-ঝিল্লি বিশিষ্ট আবরণী দ্বারা আবৃত থাকে।

২। এর সাইটোপ্লাজমে রাইবোনিউক্লিওপ্রোটিন যুক্ত ঘন দানাদার বস্তু থাকে।

৩। সাইটোপ্লাজমে কতকগুলো খাদ্যগহŸর থাকে। ইহা হিমোজয়েন দ্বারা পূর্ণ থাকে।

৪। এর নিউক্লিয়াস বেশ বড় এবং পাশের দিকে অবস্থান করে।

৫। সাইটোপ্লাজমে মাইটোকন্ডিয়া, এন্ডোপ্লাজমিক রেটিকুলাম, গলজিবডি প্রভৃতি থাকে।