কার্বোহাইড্রেটের নামকরণ

ফরাসি শব্দ Hydrate de carbon থেকে কার্বোহাইড্রেট শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে। এর অর্থ কার্বনের হাইড্রেট বা কার্বনের জলায়ন। কার্বোহাইড্রেটকে কার্বস বা স্যাকারাইডস বা staff of life বলা হয়।

কার্বোহাইড্রেট ।। শর্করা ।। Carbohydrates ।। শ্বেতসার

কার্বন, হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন দ্বারা গঠিত যে সব জৈব যৌগে কার্বন, হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনের অনুপাত ১:২:১ হয় তাদেরকে কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা বলে। আবার অনেক যৌগ আছে যেখানে ১:২:১ অনুপাত নাই সেটাও কার্বোহাইড্রেট। আধুনিক সংজ্ঞানুযায়ী, যে সব অ্যালডিহাইড ও কিটোন যৌগে হাইড্রোক্সিল গ্রæপ থাকে তাদেরকে কার্বোহাইড্রেট বলে। অথবা, পলিহাইড্রোক্সি অ্যালডিহাইডস্, পলিহাইড্রোক্সিকিটোনস্ এবং এদের ডেরিভেটিভস্কে একত্রে কার্বোহাইড্রেট বলে।

অ্যামাইনো এসিডের সংজ্ঞা

প্রোটিনের গাঠনিক একক হলো অ্যামাইনো এসিড। অ্যামাইনো গ্রæপ ((-NH2-) ও কার্বোক্সিল গ্রæপ ((-COOH) যুক্ত জৈব যৌগকে অ্যামাইনো এসিড বলে। ১৯০২ সালে ইমেল ফিসার এবং ফ্রাঞ্চ হোফমেস্টার (Emil Fischer, Franz Hofmeister) ইহা আবিষ্কার করেন। মানবদেহে প্রোটিন অ্যামাইনো এসিডের সংখ্যা ২০টি। লিউসিন, আইসোলিউসিন, লাইসিন, মেথিওনিন, সেরিন, ভ্যালিন, প্রোলিন, অ্যালানিন, থ্রিওনিন, টাইরোসিন, হিস্টিডিন, সিস্টিন, অ্যাসপারজিন, গ্লাইসিন, আরজিনিন, ট্রিপটোফ্যান,গ্লুটামিক এসিড, গ্লুটামিন, অ্যাসপারটিক এসিড ও ফিনাইল অ্যালানিন।

অ্যামাইনো এসিডের বৈশিষ্ট্য ।। Characteristics of amino acid

১। ইহা পানিতে দ্রবণীয়, কিন্তু অ্যালকোহলে অদ্রবণীয়।
২। ইহা স্বাদহীন, মিষ্টি বা তিক্ত পদার্থ।
৩। ইহা মৃদু এসিড বা ক্ষারে লবণ গঠন করে।
৪। এরা উচ্চ গলনাঙ্ক বিশিষ্ট।
৫। ইহা উভধর্মী।
৬। এর মূলককে জুইটার আয়ন (Zuitter Ions) বলে।
৭। ইহা পেপটাইড বন্ধনী দ্বারা যুক্ত হয়ে প্রোটিন গঠন করে।
৮। মানবদেহে আলফা অ্যামাইনো এসিড থাকে।
৯। এতে কমপক্ষে একটি অ্যামাইনো গ্রæপ ও একটি কার্বোক্সিল গ্রæপ থাকে।
১০। বিশুদ্ধ প্রোটিনকে হাইড্রোলাইসিস করলে অ্যামাইনো এসিড পাওয়া যায়।

অ্যামাইনো এসিডের শ্রেণীবিভাগ ।। Clasification of amino acid

উদ্ভিদ ও প্রাণী দেহে ২৮টি অ্যামাইনো এসিড রয়েছে। এগুলোকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে।
১। অ্যালিফ্যাটিক অ্যামাইনো এসিডঃ অ্যামাইনো এসিডের পার্শ্বশিকল গ্রুপটি (R) অ্যালিফ্যাটিক যৌগ হলে তাকে অ্যালিফ্যাটিক অ্যামাইনো এসিড বলে। অ্যালিফ্যাটিক অ্যামাইনো এসিডকে পাঁচ ভাগে ভাগ করা হয়েছে।
(i) মনোঅ্যামিনো মনোকার্বক্সিলিক এসিডঃ যে অ্যামাইনো এসিডে একটি অ্যামিনো গ্রুপ এবং একটি কার্বক্সিল গ্রুপ থাকে তাকে মনোঅ্যামিনো মনোকার্বক্সিলিক এসিড বলে। যেমন- অ্যালানিন, লিউসিন, আইসোলিউসিন, গ্লাইসিন, ভ্যালিন প্রভৃতি
(ii) মনোঅ্যামিনো ডাইকার্বক্সিলিক এসিডঃ যে অ্যামাইনো এসিডে একটি অ্যামিনো গ্রুপ এবং দুইটি কার্বক্সিল গ্রুপ থাকে তাকে মনোঅ্যামিনো ডাইকার্বক্সিলিক এসিড বলে। যেমন- গ্লুটামিক এসিড, অ্যাসপারটিক এসিড প্রভৃতি।
(iii) ডাইঅ্যামিনো মনোকার্বক্সিলিক এসিডঃ যে অ্যামাইনো এসিডে দুইটি অ্যামিনো গ্রুপ এবং একটি কার্বক্সিল গ্রুপ থাকে তাকে ডাইঅ্যামিনো মনোকার্বক্সিলিক এসিড বলে। যেমন- লাইসিন, আরজিনিন প্রভৃতি।
(iv) মনোঅ্যামিনো মনোহাইড্রক্সিলিক এসিডঃ যে অ্যামাইনো এসিডে একটি অ্যামিনো গ্রুপ এবং একটি হাইড্রক্সিল গ্রুপ থাকে তাকে মনোঅ্যামিনো মনোহাইড্রক্সিলিক এসিড বলে। যেমন- সেরিন, থ্রিওনিন প্রভৃতি।
(v) সালফারযুক্ত অ্যামাইনো এসিডঃ যে অ্যামাইনো এসিডে অ্যামিনো গ্রুপ, হাইড্রোক্সিল গ্রুপ ও সালফার থাকে তাকে সালফারযুক্ত অ্যামাইনো এসিড বলে। যেমন- মিথিওনিন, সিস্টিন প্রভৃতি।
২। অ্যারোমেটিক অ্যামাইনো এসিডঃ অ্যামাইনো এসিডের পার্শ্বশিকল গ্রুপটি (R) অ্যারোমেটিক যৌগ হলে তাকে অ্যারোমেটিক অ্যামাইনো এসিড বলে। যেমন-ফিনাইল অ্যালানিন, টাইরোসিন ইত্যাদি।
৩। হেটারোসাইক্লিক অ্যামাইনো এসিডঃ অ্যামাইনো এসিডে অ্যালিফ্যাটিক ও অ্যারোমেটিক এর বিপরীত ধর্ম পরিলক্ষিত হলে তাকে হেটারোসাইক্লিক অ্যামাইনো এসিড বলে। যেমন- ট্রিপটোফ্যান, হিস্টিডিন, প্রোলিন প্রভৃতি।

প্রোটিন গঠনের ভিত্তিতে অ্যামাইনো এসিড

প্রোটিন গঠনের উপর ভিত্তি করে অ্যামাইনো এসিডকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে।
১। প্রোটিন অ্যামাইনো এসিড (Protein amino acid) যে সব অ্যামাইনো এসিড প্রোটিন গঠন করে তাকে প্রোটিন অ্যামাইনো এসিড বলে। প্রোটিন অ্যামাইনো এসিড ২০টি। গ্লাইসিন, লাইসিন, ভ্যালিন, অ্যালানিন, টাইরোসিন, লিউসিন, আইসোলিউসিন, অ্যাসপারটিক এসিড, গ্লুটামিক এসিড, অ্যাসপারজিন, গ্লুটামিন, আরজিনিন, সিস্টিন, সেরিন, মিথিওনিন, থ্রিওনিন, ফিনাইল অ্যালানিন, হিস্টিডিন, ট্রিপ্টোফেন ও প্রোলিন।
২। নন-প্রোটিন অ্যামাইনো এসিড (Non-protein amino acid)ঃ যে সব অ্যামাইনো এসিড প্রোটিন গঠনে অংশ গ্রহণ করে না তাকে নন-প্রোটিন অ্যামাইনো এসিড বলে। নন-প্রোটিন অ্যামাইনো এসিড ৭০০ এর বেশি। এর মধ্যে ৩০০টি উদ্ভিদে পাওয়া যায়। যেমন- অরনিথিন, হোমোসেরিন, হোমোসিস্টাইন, সাইট্রুলিন ইত্যাদি।

প্রয়োজনীয়তার ভিত্তিতে অ্যামাইনো এসিড

প্রয়োজনীয়তার ভিত্তিতে অ্যামাইনো এসিড দুই ধরনের।
১। অত্যাবশ্যকীয় অ্যামাইনো এসিড (Essentioal amino acid)ঃ যে সব অ্যামাইনো এসিড দেহে সংশ্লেষিত হয় না তাকে অত্যাবশ্যকীয় অ্যামাইনো এসিড বলে। যেমন- লিউসিন, আইসোলিউসিন, লাইসিন, ট্রিপটোফেন, ফিনাইল অ্যালানিন, থ্রিওনিন, ভ্যালিন, মেথিওনিন ইত্যাদি। শিশুদের অত্যাবশ্যকীয় অ্যামাইনো এসিড ১০টি।
২। অনাবশ্যকীয় অ্যামাইনো এসিড (Non-essentioal amino acid) ঃ যে সব অ্যামাইনো এসিড দেহে সংশ্লেষিত হয় তাকে অনাবশ্যকীয় অ্যামাইনো এসিড বলে। অনাবশ্যকীয় অ্যামাইনো এসিড ১২টি।

পোলার ও নন-পোলার অ্যামাইনো এসিড ।। Polar & non-polar amino acid

১। নন-পোলার অ্যামাইনো এসিড। ১০টি (অ্যালানিন, ভ্যালিন, গ্লাইসিন, প্রোলিন, লিউসিন, আইসোলিউসিন, মেথিওনিন,
ট্রিপট্রোফেন ও ফেনিল অ্যালানিন।
২। পোলার আন-চার্জ অ্যামাইনো এসিড । ৫টি (সেরিন, থ্রিওনিন)।
৩। পোলার পজিটিভ চার্জ অ্যামাইনো এসিড । ৩টি (লাইসিন, হিস্টিডিন)।
৪। পোলার নেগেটিভ চার্জ অ্যামাইনো এসিড । ২টি (গ্লুটামিক)

অ্যামাইনো এসিডের গুরুত্ব ।। Importance of amino acid

১। প্রোটিন সংশ্লেষণঃ অ্যামাইনো এসিড পেপটাইড বন্ধনী দ্বারা যুক্ত হয়ে প্রোটিন গঠন করে।
২। প্লাজমা প্রোটিন তৈরীঃ ইহা রক্তের প্লাজমাপ্রোটিন তৈরী করে।
৩। রাসায়নিক পদার্থ সংশ্লেষণঃ এনজাইম, ভিটামিন, অ্যান্টিবডি, ইউরিয়া প্রভৃতি
সংশ্লেষণে অ্যামাইনো এসিড সাহায্য করে।
৪। হরমোন উৎপাদনঃ অন্তঃক্ষরা গ্রন্থিতে অ্যামাইনো এসিড সংশ্লেষিত হয়ে হরমোন উৎপন্ন
করে। উদ্ভিদ হরমোন ইন্ডোল অ্যাসিটিক এসিড গঠনে অংশ গ্রহণ করে।
৫। মেলানিন তৈরীঃ ইহা দেহে মেলানিন তৈরী করে।
৬। দুগ্ধপ্রোটিন উৎপন্নঃ ইহা দুগ্ধপ্রোটিন কেসিনোজেন উৎপন্ন করে।
৭। দেহ কাঠামো গঠনঃ অ্যামাইনো এসিড জীবের দেহ কাঠামো গঠন করে।
৮। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিঃ অ্যামাইনো এসিড দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।
৯। pH নিয়ন্ত্রণঃ অ্যামাইনো এসিড দেহে ঢ়ঐ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।
১০। এনজাইম সংশ্লেষণঃ অ্যামাইনো এসিড থেকে সব ধরনের এনজাইম সৃষ্টি হয়।
১১। ইউরিয়া সংশ্লেষঃ অ্যামাইনো এসিড ইউরিয়া সংশ্লেষে সাহায্য করে।
১২। গ্লুকোজ গঠনঃ অ্যামাইনো গ্রুপের অপসারণে বিভিন্ন অ্যামাইনো এসিডের কার্বন শৃঙ্খল গ্লুকোজ গঠন করে।

পেপটাইড বন্ধনী ।। Peptide bond

যে বন্ধনী দ্বারা অ্যামাইনো এসিড যুক্ত হয়ে প্রোটিন গঠন করে তাকে পেপটাইড বন্ধনী বলে।
১। ডাইপেপটাইড বন্ধনী (Dipeptide bond)ঃ যে পেপটাইড বন্ধনী দুইটি অ্যামাইনো এসিডকে যুক্ত করে তাকে ডাইপেপটাইড বন্ধনী বলে।
২। ট্রাইপেপটাইড বন্ধনী (Tripeptide bond)ঃ যে পেপটাইড বন্ধনী তিনটি অ্যামাইনো এসিডকে যুক্ত করে তাকে ট্রাইপেপটাইড বন্ধনী বলে।
৩। অলিগোপেপটাইড বন্ধনী (Oligopeptide bond) ঃ যে পেপটাইড বন্ধনী কয়েকটি (৪-১০) অ্যামাইনো এসিডকে যুক্ত করে তাকে অলিগোপেপটাইড বন্ধনী বলে।
৪। পলিপেপটাইড বন্ধনী (Polypeptide bond) ঃ যে পেপটাইড বন্ধনী অনেকগুলো (৫০) অ্যামাইনো এসিডকে যুক্ত করে তাকে পলিপেপটাইড বন্ধনী বলে।