মানুষের দেহে ম্যালেরিয়া পরজীবীর ক্ষতিকর প্রভাব ।। Harmful Effect of Malaria Parasite

১। ম্যালেরিয়া জ্বরঃ মানুষের লোহিত রক্তকণিকায় এরিথ্রোসাইটিক সাইজোগনি চক্রে হিমোজয়েন নামক বিষাক্ত পদার্থ নিঃসৃত হয়। হিমোজয়েন-এর কারণে মানুষের শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যায় এবং কাঁপুনীসহ জ্বর আসে। একে ম্যালেরিয়া জ্বর বলে। ইহা একটি মারাত্বক রোগ। এতে রোগীর মৃত্যু ঘটতে পারে।

২। যকৃত কোষ ধ্বংস সাধনঃ ম্যালেরিয়া পরজীবীর স্পোরোজয়েট মশকীর লালার মাধ্যমে মানুষের যকৃত কোষে প্রবেশ করে। যকৃত কোষে প্রবেশের পর স্পোরোজয়েট গুলো খাদ্য গ্রহণ করে আকারে বড় হয় এবং ক্রিপ্টোজয়েটে পরিনত হয়। ক্রিপ্টোজয়েটের নিউক্লিয়াসটি বিভাজিত হয়ে অসংখ্য নিউক্লিয়াসে পরিনত হয়। একে সাইজন্ট বলে। সাইজন্টের প্রতিটি নিউক্লিয়াসের চারিদিকে সাইটোপ্লাজম জমা হয়ে ক্রিপ্টোমেরোজয়েটে পরিনত হয়। ক্রিপ্টোমেরোজয়েট গুলো যকৃত কোষের প্রাচীর ভেঙ্গে যকৃত কোষকে ধ্বংস সাধনের মাধ্যমে বাইরে বেরিয়ে আসে।

সৃষ্ট প্রতিটি ক্রিপ্টোমেরোজয়েট আবার নতুন যকৃত কোষকে আক্রমণ করে এবং খাদ্য গ্রহণ করে আকারে বড় হয়। উহার নিউক্লিয়াসটি বিভাজিত হয়ে অসংখ্য নিউক্লিয়াস সৃষ্টি করে। একে সাইজন্ট বলে। সাইজন্টের প্রতিটি নিউক্লিয়াসের চারিদিকে সাইটোপ¬াজম জমা হয়ে মেটাক্রিপ্টোমেরোজয়েটে পরিনত হয়। মেটাক্রিপ্টোমেরোজয়েট গুলো পরিনত হলে যকৃত কোষের প্রাচীর ভেঙ্গে যকৃত কোষকে ধ্বংস সাধনের মাধ্যমে বাইরে বেরিয়ে আসে। এভাবে একের পর এক যকৃত ধ্বংস প্রাপ্ত হয়।

৩। লোহিত রক্তকণিকা ধ্বংস সাধনঃ ম্যালেরিয়া পরজীবীর মেরোজয়েট রক্তরসের মাধ্যমে মানুষের লোহিত রক্তকণিকায় প্রবেশ করে। লোহিত রক্তকণিকায় প্রবেশের পর মেরোজয়েট গুলো খাদ্য গ্রহণ করে আকারে বড় হয় এবং ট্রফোজয়েটে পরিনত হয়। ট্রফোজয়েট থেকে সিগনেট রিং সৃষ্টি হয়। সিগনেট রিং এর আকৃতি পরিবর্তন হয় এবং অ্যামিবার ন্যায় অনির্দিষ্ট আকৃতি ধারণ করে। একে অ্যামিবয়েড ট্রফোজয়েট বলে। এরপর অ্যামিবয়েড ট্রফোজয়েট আকৃতি পরিবর্তন করে গোলাকার ধারণ করে। উহার নিউক্লিয়াসটি বিভাজিত হয়ে অসংখ্য নিউক্লিয়াসে পরিনত হয়। এ অবস্থাকে সাইজন্ট বলে। সাইজন্টের প্রতিটি নিউক্লিয়াসের চারিদিকে সাইটোপ্লাজম জমা হয়ে মেরোজয়েটে পরিনত হয়। মেরোজয়েট গুলো লোহিত রক্তকণিকার প্রাচীর ভেঙ্গে লোহিত রক্তকণিকাকে ধ্বংস সাধনের মাধ্যমে বাইরে বেরিয়ে আসে। সৃষ্ট প্রতিটি মেরোজয়েট পুনরায় লোহিত রক্তকণিকাকে আক্রমণ করে ধ্বংস করে। এভাবে লোহিত রক্তকণিকা ধ্বংস হতে থাকে।

ম্যালেরিয়া পরজীবী দ্বারা যকৃত কোষ ও লোহিত রক্তকণিকা একের পর এক ধ্বংস হতে থাকলে পোষকের রক্ত শুন্যতা দেখা দেয় এবং সবশেষে পোষক মারা যেতে পারে।

ম্যালেরিয়া রোগের লক্ষণ ।। Symptoms of malaria fever ।। প্রতিকার ।। Protect

ম্যালেরিয়া রোগের লক্ষণ (Symptoms of malaria fever)

১। রোগের প্রাথমিক লক্ষণ

(i)  বমি বমি ভাব হয়। অনেক সময় বমি হয়।

(ii) মাথা ব্যথা এবং অনিদ্রা হয়।

(iii) ক্ষুধামন্দা এবং খাবারে অনিহা বা অরুচি।

(iv) পেশির ব্যথা এবং অস্থিসন্ধিতে ব্যথা হয়।

(v) দেহে শীত শীত ভাব হয়।

(vi) প্রচন্ড পিপাসা লাগে।

(vii) রোগী কম পরিমাণ খাদ্য গ্রহণ করে এবং দুর্বল হয়ে পড়ে।

(viii) নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসে অসুবিধা হয়।

(ix) রোগীর কোষ্ঠকাঠিন্য হয়।

২। রোগের মাধ্যমিক লক্ষণ

(i) কাঁপুনিসহ জ্বর আসে এবং ৪৮ ঘন্টা পর পর জ¦র আসে।

(ii) নির্দিষ্ট সময় পর পর জ্বর আসে এবং ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ে।

(iii) ২-৩ দিন পরপর জ¦র আসে।

(iv) জ¦রের প্রকোপ সাধারণত পূর্বহ্নে ও অপরাহ্নে হয়।

(v) ম্যালোরিয়া জ¦রের তিনটি অবস্থা লক্ষণীয়। শীত অবস্থা, উত্তাপ অবস্থা এবং ঘাম অবস্থা।

(vi) জ্বর ছেড়ে গেলে দেহের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে কম হয়। এটি শীত অবস্থা। শীত অবস্থা ২০ মিনিট থেকে ১ ঘন্টা স্থায়ী হয়।

(vii) উত্তাপ অবস্থায় শরীরের তাপমাত্রা খুব বেশি থাকে এবং তাপমাত্রা ১০৪-১০৫ ডিগ্রী ফারেনহাইট পর্যন্ত হয়। এই অবস্থা ২-৪ ঘন্টা স্থায়ী হয়।

(viii) ঘাম দিয়ে জ¦র ছেড়ে যায়। ঘাম অবস্থা ২-৩ ঘন্টা স্থায়ী হয়।

৩। রোগের চুড়ান্ত লক্ষণ

(i) লোহিত রক্তকণিকা ধ্বংস হয়ে যায়। রক্ত শুন্যতা দেখা দেয়। এ অবস্থায় হিমোলাইটিক অ্যানিমিয়া (Anaemia) দেখা দেয়।

(ii) রোগীর প্লীহা ও যকৃত ফুলে যায় এবং দিন দিন বড় হতে থাকে। প্লীহা থেকে লাইসোলেসিথিন (Lysolecithin) পদার্থ নিঃসৃত হয়।

(iii) পরজীবী হিমোলাইসিন (Haemolysin) নামক অ্যান্টিবডি উৎপন্ন করে লোহিত রক্তকণিকা ধ্বংস করে।

(iv) রোগীর খাদ্য পরিপাকে ব্যাঘাত ঘটে।

(v) মস্তিষ্ক আক্রান্ত হয়ে রোগী মারা যেতে পারে।

 

ম্যালেরিয়া রোগ প্রতিরোধ

১। মশা ধ্বংস সাধন

(i) মশার প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস করা। মশকী ডিম পাড়ে এবং লার্ভা বৃদ্ধি লাভ করে এরুপ ক্ষেত্র ধ্বংস করতে হবে।

(ii) অগভীর ও বদ্ধ জলাশয় মশকীর জন্য উত্তম প্রজননক্ষেত্র। তাই বদ্ধ জলাশয় ভরাট বা সংস্কার করতে হবে।

(iii) পতঙ্গ বারক স্প্রে করে  মশা ধ্বংস করতে হবে। মশকীর সংখ্যা কমে গেলে রোগ বিস্তার কমে যাবে।

(iv) জলাশয়ে কেরোসিন বা পেট্রোলিয়াম বা প্যারাফিন তেল স্প্রে করে পানির উপরে আস্তরণ তৈরী করতে হবে। এতে মশকীর লার্ভা ও পিউপা অক্সিজেনের অভাবে মারা যাবে।

(v) ঝোপ-ঝাড় ও কচুরীপানায় মশকী ডিম পারে, তাই এসব স্থান পরিষ্কার করতে হবে।

(vi) জলাশয়ে মশার লার্ভা খেকো টাকি মাছ, শিং মাছ, গাপ্পি মাছ, মাগুর, তেলাপিয়া, খলিসা, পুটি, কই ইত্যাদি মাছ চাষ করতে হবে। এ সব মাছ মশকীর লার্ভা খেয়ে সাবাড় করে দেয়।

(vii) স্বহস্তে এবং ট্র্যাপ সৃষ্টি করে মশা মারতে হবে।

(viii) পানিতে জুভেনাইন হরমোন মিশিয়ে লার্ভাকে আজীবন লার্ভা করে রাখা।

(ix) জিন প্রকৌশল প্রক্রিয়ায় Bacillus thuringiensis H-14 ও Bacillus sphaericus ব্যাকটেরিয়া থেকে মারণ জিন নিয়ে বায়োপেস্টিসাইড তৈরী করা হয়। এই বায়োপেস্টিসাইড জলাশয়ে প্রয়োগ করে মশার লার্ভা ব্যাপকভাবে ধ্বংস করা যায়।

(x) গামা বিকিরণ, রাসায়নিক পদার্থ এবং হাইব্রিডাইজেশনের মাধ্যমে বন্ধ্যা মশা সৃষ্টি করে প্রকৃতিতে অবমুক্ত করলে মশার পপুলেশন হ্রাস পায়।

(xi) শহর এলাকায় মশা নিয়ন্ত্রণের জন্য অনুমোদিত কীটনাশক ব্যবহার করতে হবে।

২। মশার  দংশন থেকে রক্ষা

(i) উচু স্থানে বসতবাড়ী নির্মাণ করা।

(ii) ঘুমানোর সময় মশারী ব্যবহার করতে হবে।

(iii) ঘরের দরজা, জানালা ও ভেন্টিলেটে মশা রোধক জাল ব্যবহার করতে হবে।

(iv) শরীরের অনাবৃত অংশে রেপিলেন্ট বা ক্রিম ব্যবহার করতে হবে।

(v) সন্ধ্যায় ঘরে ধোঁয়া দিয়ে মশকী তাড়াতে হবে।

(vi) ম্যালেরিয়া রোগীকে মশারীর মধ্যে রাখতে হবে।

(vii) মশার কয়েল, এরোসেল ও ধুপ ব্যবহার করতে হবে।

(viii) মশারী ও বিছানায় পাইরিথ্রয়েড জাতীয় পদার্থ ব্যবহার করতে হবে।

৩। চিকিৎসাঃ বিগত ৩০০ বছর ধরে সিনকোনা (Cinchona officinalis) গাছের বাকল থেকে সৃষ্ট কুইনাইন জাতীয় ওষুধ ম্যালেরিয়া রোগের একমাত্র ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ম্যালেরিয়া রোগে কার্যকরী সিনথেটিক এলোপ্যাথিক ওষুধ হলো- নিভাকুইন, ক্লোরোকুইন, কেমোকুইন, প্যালাড্রিন, অ্যাভেলোক্লোর, সেফলোকুইন, হ্যালোফ্যানট্রিন, প্রিইমাকুইন, ফ্যানমিডার, ম্যাপাক্রিন, প্রোগানিল, ম্যাফ্লোকুইন, ডাক্সসাইক্লিন, ম্যালারোন প্রভৃতি।

৪। ম্যালেরিয়ার টিকাঃ বিশে^র প্রথম ম্যালেরিয়া প্রতিষেধক টিকা মসকুইরিক্স (Mosquirix) আবিষ্কৃত হয়েছে। ইহা RTSS নামে পরিচিত। চার ডোজের এই টিকা Plasmodium falciparum জীবাণুর বিরুদ্ধে কার্যকরী অ্যান্টিবডি উৎপাদনে সক্ষম। ৩০ বছর গবেষণার পর ২০১৯ সালে ভ্যাক্সিনটির স্বীকৃতি দেওয়া হয়। আগামী তিন বছরের জন্য ভ্যাক্সিনটি আফ্রিকার তিনটি দেশে পাইলটিং করা হচ্ছে। Bill and Melinda Gates Foundation-এর সহায়তায় Malaria Vaccine Initiative -এর সাথে যৌথভাবে GlaxoSmithKline কোম্পানি এই ভ্যাক্সিনটি তৈরী করেছে।

৫। ম্যালেরিয়ার ভেষজ ওষুধঃ ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে ভেষজ ওষুধ হিসেবে আর্টিমিসিয়া (Artemisia) উদ্ভিদের ব্যবহার সফলতা আনে বলে বিজ্ঞানীরা দাবি করেছেন।

৬। ম্যালেরিয়ার হোমিওপ্যাথিক ওষুধঃ ম্যালেরিয়ার চিকিৎসায় সফল হোমিওপ্যাথিক ওষুধ হলো- আর্সেনিক অ্যালবাম (Arsenic Album), চিন সালফ্ (Chin-sulph), রাসট্রক্স (Rhustox), চায়না (China), হিপার সালফ্ (Heper sulph), সালফার (Sulpher), ব্রায়োনিয়া (Bryonia) প্রভৃতি।

৭। জুভেনাইন হরমোনঃ যে হরমোন পতঙ্গের লার্ভাকে রুপান্তরের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ পতঙ্গে পরিনত করে তাকে জুভেনাইন হরমোন বলে। ইহা পতঙ্গের মস্তিষ্কের কর্পোরা অ্যালাট্রা থেকে উৎপন্ন হয়। এই হরমোনের অভাব হলে লার্ভা থেকে পূর্ণাঙ্গ পতঙ্গ সৃষ্টি হয় না।

৮। জনসচেতনতা সৃষ্টিঃ ম্যালেরিয়া রোগের ক্ষতিকর দিক, এর বাহক ও প্রতিরোধ সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করতে হবে। রেডিও, টেলিভিশন, ফেসবুক, ইউটিউব, টুইটার, সংবাদপত্র প্রভৃতির মাধ্যমে ব্যাপক প্রচার করতে হবে। সরকারী ও বেসরকারী ভাবে লিফলেট, পোস্টার, ব্যানার প্রভৃতি বিলি করতে হবে।

ম্যালেরিয়া রোগ প্রতিরোধ ।। Protect of malaria fever

১। মশা ধ্বংস সাধন

(i) মশার প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস করা। মশকী ডিম পাড়ে এবং লার্ভা বৃদ্ধি লাভ করে এরুপ ক্ষেত্র ধ্বংস করতে হবে।

(ii) অগভীর ও বদ্ধ জলাশয় মশকীর জন্য উত্তম প্রজননক্ষেত্র। তাই বদ্ধ জলাশয় ভরাট বা সংস্কার করতে হবে।

(iii) পতঙ্গ বারক স্প্রে করে  মশা ধ্বংস করতে হবে। মশকীর সংখ্যা কমে গেলে রোগ বিস্তার কমে যাবে।

(iv) জলাশয়ে কেরোসিন বা পেট্রোলিয়াম বা প্যারাফিন তেল স্প্রে করে পানির উপরে আস্তরণ তৈরী করতে হবে। এতে মশকীর লার্ভা ও পিউপা অক্সিজেনের অভাবে মারা যাবে।

(v) ঝোপ-ঝাড় ও কচুরীপানায় মশকী ডিম পারে, তাই এসব স্থান পরিষ্কার করতে হবে।

(vi) জলাশয়ে মশার লার্ভা খেকো টাকি মাছ, শিং মাছ, গাপ্পি মাছ, মাগুর, তেলাপিয়া, খলিসা, পুটি, কই ইত্যাদি মাছ চাষ করতে হবে। এ সব মাছ মশকীর লার্ভা খেয়ে সাবাড় করে দেয়।

(vii) স্বহস্তে এবং ট্র্যাপ সৃষ্টি করে মশা মারতে হবে।

(viii) পানিতে জুভেনাইন হরমোন মিশিয়ে লার্ভাকে আজীবন লার্ভা করে রাখা।

(ix) জিন প্রকৌশল প্রক্রিয়ায় Bacillus thuringiensis H-14 ও Bacillus sphaericus ব্যাকটেরিয়া থেকে মারণ জিন নিয়ে বায়োপেস্টিসাইড তৈরী করা হয়। এই বায়োপেস্টিসাইড জলাশয়ে প্রয়োগ করে মশার লার্ভা ব্যাপকভাবে ধ্বংস করা যায়।

(x) গামা বিকিরণ, রাসায়নিক পদার্থ এবং হাইব্রিডাইজেশনের মাধ্যমে বন্ধ্যা মশা সৃষ্টি করে প্রকৃতিতে অবমুক্ত করলে মশার পপুলেশন হ্রাস পায়।

(xi) শহর এলাকায় মশা নিয়ন্ত্রণের জন্য অনুমোদিত কীটনাশক ব্যবহার করতে হবে।

২। মশার  দংশন থেকে রক্ষা

(i) উচু স্থানে বসতবাড়ী নির্মাণ করা।

(ii) ঘুমানোর সময় মশারী ব্যবহার করতে হবে।

(iii) ঘরের দরজা, জানালা ও ভেন্টিলেটে মশা রোধক জাল ব্যবহার করতে হবে।

(iv) শরীরের অনাবৃত অংশে রেপিলেন্ট বা ক্রিম ব্যবহার করতে হবে।

(v) সন্ধ্যায় ঘরে ধোঁয়া দিয়ে মশকী তাড়াতে হবে।

(vi) ম্যালেরিয়া রোগীকে মশারীর মধ্যে রাখতে হবে।

(vii) মশার কয়েল, এরোসেল ও ধুপ ব্যবহার করতে হবে।

(viii) মশারী ও বিছানায় পাইরিথ্রয়েড জাতীয় পদার্থ ব্যবহার করতে হবে।

৩। চিকিৎসাঃ বিগত ৩০০ বছর ধরে সিনকোনা (Cinchona officinalis) গাছের বাকল থেকে সৃষ্ট কুইনাইন জাতীয় ওষুধ ম্যালেরিয়া রোগের একমাত্র ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ম্যালেরিয়া রোগে কার্যকরী সিনথেটিক এলোপ্যাথিক ওষুধ হলো- নিভাকুইন, ক্লোরোকুইন, কেমোকুইন, প্যালাড্রিন, অ্যাভেলোক্লোর, সেফলোকুইন, হ্যালোফ্যানট্রিন, প্রিইমাকুইন, ফ্যানমিডার, ম্যাপাক্রিন, প্রোগানিল, ম্যাফ্লোকুইন, ডাক্সসাইক্লিন, ম্যালারোন প্রভৃতি।

৪। ম্যালেরিয়ার টিকাঃ বিশে^র প্রথম ম্যালেরিয়া প্রতিষেধক টিকা মসকুইরিক্স (Mosquirix) আবিষ্কৃত হয়েছে। ইহা RTSS নামে পরিচিত। চার ডোজের এই টিকা Plasmodium falciparum জীবাণুর বিরুদ্ধে কার্যকরী অ্যান্টিবডি উৎপাদনে সক্ষম। ৩০ বছর গবেষণার পর ২০১৯ সালে ভ্যাক্সিনটির স্বীকৃতি দেওয়া হয়। আগামী তিন বছরের জন্য ভ্যাক্সিনটি আফ্রিকার তিনটি দেশে পাইলটিং করা হচ্ছে। Bill and Melinda Gates Foundation-এর সহায়তায় Malaria Vaccine Initiative -এর সাথে যৌথভাবে GlaxoSmithKline কোম্পানি এই ভ্যাক্সিনটি তৈরী করেছে।

৫। ম্যালেরিয়ার ভেষজ ওষুধঃ ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে ভেষজ ওষুধ হিসেবে আর্টিমিসিয়া (Artemisia) উদ্ভিদের ব্যবহার সফলতা আনে বলে বিজ্ঞানীরা দাবি করেছেন।

৬। ম্যালেরিয়ার হোমিওপ্যাথিক ওষুধঃ ম্যালেরিয়ার চিকিৎসায় সফল হোমিওপ্যাথিক ওষুধ হলো- আর্সেনিক অ্যালবাম (Arsenic Album), চিন সালফ্ (Chin-sulph), রাসট্রক্স (Rhustox), চায়না (China), হিপার সালফ্ (Heper sulph), সালফার (Sulpher), ব্রায়োনিয়া (Bryonia) প্রভৃতি।

৭। জুভেনাইন হরমোনঃ যে হরমোন পতঙ্গের লার্ভাকে রুপান্তরের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ পতঙ্গে পরিনত করে তাকে জুভেনাইন হরমোন বলে। ইহা পতঙ্গের মস্তিষ্কের কর্পোরা অ্যালাট্রা থেকে উৎপন্ন হয়। এই হরমোনের অভাব হলে লার্ভা থেকে পূর্ণাঙ্গ পতঙ্গ সৃষ্টি হয় না।

৮। জনসচেতনতা সৃষ্টিঃ ম্যালেরিয়া রোগের ক্ষতিকর দিক, এর বাহক ও প্রতিরোধ সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করতে হবে। রেডিও, টেলিভিশন, ফেসবুক, ইউটিউব, টুইটার, সংবাদপত্র প্রভৃতির মাধ্যমে ব্যাপক প্রচার করতে হবে। সরকারী ও বেসরকারী ভাবে লিফলেট, পোস্টার, ব্যানার প্রভৃতি বিলি করতে হবে।

ম্যালেরিয়া রোগের লক্ষণ ।। Symptoms of malaria fever

১। রোগের প্রাথমিক লক্ষণ

(i)  বমি বমি ভাব হয়। অনেক সময় বমি হয়।

(ii) মাথা ব্যথা এবং অনিদ্রা হয়।

(iii) ক্ষুধামন্দা এবং খাবারে অনিহা বা অরুচি।

(iv) পেশির ব্যথা এবং অস্থিসন্ধিতে ব্যথা হয়।

(v) দেহে শীত শীত ভাব হয়।

(vi) প্রচন্ড পিপাসা লাগে।

(vii) রোগী কম পরিমাণ খাদ্য গ্রহণ করে এবং দুর্বল হয়ে পড়ে।

(viii) নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসে অসুবিধা হয়।

(ix) রোগীর কোষ্ঠকাঠিন্য হয়।

২। রোগের মাধ্যমিক লক্ষণ

(i) কাঁপুনিসহ জ্বর আসে এবং ৪৮ ঘন্টা পর পর জ¦র আসে।

(ii) নির্দিষ্ট সময় পর পর জ্বর আসে এবং ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ে।

(iii) ২-৩ দিন পরপর জ¦র আসে।

(iv) জ¦রের প্রকোপ সাধারণত পূর্বহ্নে ও অপরাহ্নে হয়।

(v) ম্যালোরিয়া জ¦রের তিনটি অবস্থা লক্ষণীয়। শীত অবস্থা, উত্তাপ অবস্থা এবং ঘাম অবস্থা।

(vi) জ্বর ছেড়ে গেলে দেহের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে কম হয়। এটি শীত অবস্থা। শীত অবস্থা ২০ মিনিট থেকে ১ ঘন্টা স্থায়ী হয়।

(vii) উত্তাপ অবস্থায় শরীরের তাপমাত্রা খুব বেশি থাকে এবং তাপমাত্রা ১০৪-১০৫ ডিগ্রী ফারেনহাইট পর্যন্ত হয়। এই অবস্থা ২-৪ ঘন্টা স্থায়ী হয়।

(viii) ঘাম দিয়ে জ¦র ছেড়ে যায়। ঘাম অবস্থা ২-৩ ঘন্টা স্থায়ী হয়।

৩। রোগের চুড়ান্ত লক্ষণ

(i) লোহিত রক্তকণিকা ধ্বংস হয়ে যায়। রক্ত শুন্যতা দেখা দেয়। এ অবস্থায় হিমোলাইটিক অ্যানিমিয়া (Anaemia) দেখা দেয়।

(ii) রোগীর প্লীহা ও যকৃত ফুলে যায় এবং দিন দিন বড় হতে থাকে। প্লীহা থেকে লাইসোলেসিথিন (Lysolecithin) পদার্থ নিঃসৃত হয়।

(iii) পরজীবী হিমোলাইসিন (Haemolysin) নামক অ্যান্টিবডি উৎপন্ন করে লোহিত রক্তকণিকা ধ্বংস করে।

(iv) রোগীর খাদ্য পরিপাকে ব্যাঘাত ঘটে।

(v) মস্তিষ্ক আক্রান্ত হয়ে রোগী মারা যেতে পারে।

পরজীবী ।। Parasite

যে সব জীব জীবন ধারণের জন্য আংশিক বা সম্পুর্ণ ভাবে অন্য জীবের উপর নির্ভরশীল তাদেরকে পরজীবী বলে। যেমন- Plasmodium vivax, Plasmodium ovale, Plasmodium falciparum, Plasmodium malariae প্রভৃতি।

ভেক্টর  ।। বাহক ।। Vector

যে সব জীব রোগের জীবাণু বহন করে তাদেরকে ভেক্টর  বা বাহক বলে। ম্যালেরিয়া পরজীবীর বাহক হলো মানুষ ও মশকী। পৃথিবীতে Anopheles গণের প্রায় ৪৩০ প্রজাতির মশা  রয়েছে। এর মধ্যে ১৯ প্রজাতির মশা ম্যালেরিয়া রোগের ভেক্টর। বাংলাদেশে মোট মশা প্রজাতির সংখ্যা ১১৩টি, Anopheles মশা প্রজাতির সংখ্যা ৩৪টি এবং ম্যালেরিয়া রোগের ভেক্টর প্রজাতির মশার সংখ্যা ৮টি। উল্লেখযোগ্য অ্যানোফিলিস মশা হলো- Anopheles dirus, Anopheles annularis, Anopheles aconitus, Anopheles sundaicus, Anopheles philippnensis,, Anopheles minimus, Anopheles vagus প্রভৃতি।

সুপ্তাবস্থা ।। Dorman state

জীবাণু পোষকদেহে প্রবেশের পর থেকে রোগের লক্ষণ প্রকাশের আগ পর্যন্ত সময়কে সুপ্তাবস্থা বলে। Plasmodium প্রজাতির সুপ্তাবস্থা হলো
Plasmodium vivax ১২-২০ দিন
Plasmodium ovale ১১-১৬ দিন
Plasmodium falciparum ০৮-১৫ দিন
Plasmodium malariae ১৮-৪০ দিন

কেবল মাত্র স্ত্রী Anopheles মশকী ম্যালেরিয়ার জীবাণু বাহক কেন

ম্যালেরিয়া জ¦রের জীবাণু হলো Plasmodium। শুধুমাত্র Anopheles গণের সকল প্রজাতির মশকী Plasmodium বহন করে। জীবনকাল, পারিপার্শ্বিক অবস্থা, তাপমাত্রা এবং দংশনের সময়কাল হিসেবে Plasmodium এর একমাত্র বাহক Anopheles মশকী। Plasmodium এর গ্যামিট সৃষ্টি, নিষেক, জাইগোট, উওকিনেট এবং স্পোরোগনির জন্য Anopheles মশকী উত্তম। জীবাণুর পরিস্ফুটনের জন্য Anopheles মশকীর ক্রপ হলো অনুকূল পরিবেশ।

অন্য প্রজাতির মশকীর দেহে বিষাক্ত পদার্থ থাকে। এসব বিষাক্ত পদার্থ Plasmodium-এর জন্য ক্ষতিকর। ঐ সব মশকীর অন্ত্রে ট্রিপসিন সদৃশ উপাদান থাকে। এসব উপাদান Plasmodium-এর উওকিনেটের পরিস্ফুটন বন্ধ করে দেয়। ফলে স্পোরোজয়েট সৃষ্টি হয় না। কিন্তু Anopheles মশকীতে Plasmodium-এর জন্য কোন ক্ষতিকর উপাদান নাই। Anopheles মশকীর ক্রপ জীবাণুর যৌনজননের  জন্য উপযুক্ত পরিবেশ। তাই কেবল মাত্র স্ত্রী Anopheles মশকী ম্যালেরিয়ার জীবাণু বহন করে।

ম্যালেরিয়া পরজীবীর জীবনচক্রে দুইটি পোষকের প্রয়োজনীয়তা ।। Two host for Malaria

১। মেরুদন্ডী পোষকের (মানুষ) প্রয়োজনীয়তা

(i) নতুন পোষকঃ ম্যালেরিয়া পরজীবীর স্পোরোজয়েট গুলোর জন্য নতুন পোষক হিসেবে মানুষের প্রয়োজন হয়।

(ii) মেরোজয়েট সৃষ্টিঃ মেরুদন্ডী পোষক ছাড়া মেরোজয়েট সৃষ্টি হয় না। তাই মেরোজয়েট সৃষ্টির জন্য মেরুদন্ডী পোষক প্রয়োজন হয়।

(iii) সাইজোগনিঃ মানুষ বা মেরুদন্ডী পোষকে ম্যালেরিয়া পরজীবীর হেপাটিক ও এরিথ্রোসাইটিক সাইজোগনি সম্পন্ন হয়।

(iv) সহজ লভ্যতাঃ মেরুদন্ডী পোষক হিসেবে মানুষ সহজেই পাওয়া যায়।

(v) প্রজাতির ধারাবাহিকতাঃ প্রজাতির ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য পুরুষ ও স্ত্রীগ্যামিটোফাইটের উৎপাদন প্রয়োজন। মানুষের রক্তে গ্যামিটোফাইট সৃষ্টি হয়। তাই প্রজাতির বিলুপ্তি রোধে মেরুদন্ডী পোষক একান্ত প্রয়োজন।

২। যৌনচক্রের জন্য অমেরুদন্ডী পোষকের (মশকী) প্রয়োজনীয়তা

(i) যৌনচক্রঃ ম্যালেরিয়া পরজীবীর যৌনচক্রের জন্য মশকী প্রয়োজন হয়।

(ii) স্পোরোজয়েটের বাহকঃ যৌনজনন শেষে মশকী স্পোরোজয়েট গুলোকে বহন করে।

(iii) সহজ লভ্যতাঃ অমেরুদন্ডী পোষক হিসেবে মশকী বসতির আশে পাশে সহজেই পাওয়া যায়।

(iv) পুষ্টিদানঃ স্পোরোজয়েট গুলো মশকীর দেহ থেকে পুষ্টি লাভ করে।

(v) জীবনকালঃ ম্যালেরিয়া পরজীবীর যৌনচক্র ঘটার জন্য যে সময় প্রয়োজন মশকী তার চেয়ে বেশি সময় বাঁচে।

ম্যালেরিয়া জ্বরের কারণ ।। Cause of Malarial fever

ম্যালেরিয়া পরজীবীর মেরোজয়েটগুলো যকৃত থেকে বাইরে বেরিয় আসে এবং রক্ত রসে মিশে যায়। এতে রক্তের স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হয়। এদেরকে ধ্বংস করার জন্য শ্বেত রক্তকণিকা পাইরোজেন নিঃসরণ করে। রক্তে অতিরিক্ত পাইরোজেনের কারণে মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাস উদ্দীপ্ত হয়। কারণে মস্তিষ্ক থেকে প্রোস্টাগ্লান্ডিন, মনোঅ্যামাইন প্রভৃতি রাসায়নিক পদার্থ ক্ষরিত হয়। এই সংবাদ বা উদ্দীপনা ভেসোমোটর স্নায়ুর মাধ্যমে দেহের প্রান্তীয় অঞ্চলে পৌঁছায়। প্রান্তীয় অঞ্চলের রক্তনালিকা গুলো সংকুচিত হয়। তাই দেহ থেকে অতিরিক্ত তাপ বের হতে পারে না। ফলে দেহের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেড়ে যায় এবং ¦ আসে।