ম্যালেরিয়া পরজীবীর জনুঃক্রম ।। Alternation of generation

কোনো জীবের জীবনচক্রে হ্যাপ্লয়েড ও ডিপ্লয়েড দশার পর্যায়ক্রমিক আবর্তনকে জনুঃক্রম বলে। ম্যালেরিয়া পরজীবীর জনুঃক্রম আলোচনা করা হলো।

১। হ্যাপ্লয়েড দশা

(i) স্পোরোজয়েটঃ ম্যালেরিয়া জীবাণু বহনকারী কোন Anopheles মশকী সুস্থ মানুষকে দংশন করলে মশকীর লালারসের মাধ্যমে স্পোরোজয়েট মানুষের দেহে প্রবেশ করে। স্পোরোজয়েট গুলো সঞ্চালনক্ষম, সামান্য বাঁকানো এবং দেহের উভয় প্রান্ত সুচালো। স্পোরোজয়েট গুলো ৩০-৪৫ মিনিটের মধ্যে মানুষের যকৃত কোষে প্রবেশ করে  এবং বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়।

(ii) মেটাক্রিপ্টোমেরোজয়েটঃ স্পোরোজয়েট থেকে পর্যায়ক্রমে মেটাক্রিপ্টোমেরোজয়েট সৃষ্টি হয়। মেটাক্রিপ্টোমেরোজয়েট গুলো দুই ধরনের। মাইক্রোমেটাক্রিপ্টোমেরোজয়েট এবং ম্যাক্রোমেটাক্রিপ্টোমেরোজয়েট। মাইক্রোমেটাক্রিপ্টোমেরোজয়েট গুলো আকারে ছোট এবং নিউক্লিয়াস বড়। ম্যাক্রোমেটাক্রিপ্টোমেরোজয়েট গুলো আকারে বড় এবং নিউক্লিয়াস ছোট। ম্যাক্রোমেটাক্রিপ্টোমেরোজয়েট গুলো নতুন যকৃত কোষকে আক্রমণ করে। মাইক্রোমেটাক্রিপ্টোমেরোজয়েট গুলো রক্তস্রোতে চলে আসে এবং লোহিত রক্তকণিকাকে আক্রমণ করে।

(iii) মেরোজয়েটঃ জীবাণুর সাইটোপ্লাজমে ১২-১৮টি ক্ষুদ্র অংশ দেখা যায়। প্রতিটি অংশে একটি করে নিউক্লিয়াস প্রবেশ করে। এ গুলো পাপড়ির মতো দু’টি স্তরে সাজানো থাকে। এই অবস্থাকে রোজেট বলে। নিউক্লিয়াসসহ প্রতিটি অংশ এক একটি মেরোজয়েটে পরিনত হয়।

(iv) গ্যামিটোসাইটঃ কিছু মেরোজয়েট গ্যামিটোসাইটে পরিনত হয়। গ্যামিটোসাইট গুলো দুই ধরনের। মাইক্রোগ্যামিটোসাইট এবং ম্যাক্রোগ্যামিটোসাইট। মাইক্রোগ্যামিটোসাইট গুলো আকারে ছোট এবং এর নিউক্লিয়াস বড়। ম্যাক্রোগ্যামিটোসাইট গুলো আকারে বড় এবং এর নিউক্লিয়াস ছোট।

(v) গ্যামিটঃ এক্সফ্ল্যাজেলেশন প্রক্রিয়ায় প্রতিটি মাইক্রোগ্যামিটোসাইটের নিউক্লিয়াস বিভাজিত হয়ে ৪-৮টি পুংগ্যামিট বা মাইক্রোগ্যামিটে পরিনত হয়। প্রতিটি ম্যাক্রোগ্যামিটোসাইট হতে একটি করে স্ত্রীগ্যামিট বা ম্যাক্রোগ্যামিট সৃষ্টি হয়।

২। ডিপ্লয়েড দশা

(i) জাইগোটঃ মাইক্রোগ্যামিটটি নিষেক কোণের মধ্য দিয়ে ম্যাক্রোগ্যামিটোসাইটে প্রবেশ করে। পরে এদের নিউক্লিয়াস মিলিত হয়ে জাইগোট সৃষ্টি করে।

(ii) উওকিনেটঃ ১২-১৪ ঘন্টা পর নিশ্চল গোলাকার জাইগোটটি লম্বা ও সচল হয়। একে উওকিনেট বা ভারমিকিউল বলা হয়। উওকিনেটের দৈর্ঘ্য ১৮-২৮ মাইক্রন এবং প্রস্থ ৩-৫ মাইক্রন।

(iii) উওসিস্টঃ ২৪ ঘন্টার মধ্যে উওকিনেট গুলো মশকীর ক্রপের প্রাচীর ভেদ করে বাইরে বেরিয়ে আসে এবং গোলাকার ধারণ করে। এরপর পাতলা আবরণী দ্বারা আবৃত হয়। একে উওসিস্ট বলে। উওসিস্ট পরে স্পোরোজয়েটে পরিনত হয়।

 উওকিনেটের গঠন ।। Structure of Ookinete

১। উওকিনেটের পেলিকল দ্বিস্তরবিশিষ্ট। বহিঃআবরণী কুঞ্চিত এবং অন্তঃআবরণী মসৃণ।

২। দেহের অগ্রভাগে সাইটোস্টোম নামক অতিক্ষুদ্র ছিদ্র থাকে। এই ছিদ্রের মধ্য দিয়ে প্রোটিন বিশ্লেষী এনজাইম ক্ষরিত হয়ে মশকীর ক্রপে ক্ষত সৃষ্টি করে।

৩। অন্তঃআবরণীর নিচে ৫৫-৫৬টি অণুনালিকা রয়েছে। এগুলো সঙ্কোচন-প্রসারণশীল এবং চলনে সাহায্য করে।

৪। এর নিউক্লিয়াস বেশ বড়, দানাদার এবং অনিয়তাকার।

৫। সাইটোপ্লাজম ঘন এবং বাদামী রঞ্জক দানা যুক্ত।

৬। এতে মাইটোকন্ড্রিয়া ও রাইবোসোম থাকে।

ট্রফোজয়েটের গঠন ।। Structure of Trophozoite

১। ট্রফোজয়েট দ্বি-ঝিল্লি বিশিষ্ট আবরণী দ্বারা আবৃত থাকে।

২। এর সাইটোপ্লাজমে রাইবোনিউক্লিওপ্রোটিন যুক্ত ঘন দানাদার বস্তু থাকে।

৩। সাইটোপ্লাজমে কতকগুলো খাদ্যগহŸর থাকে। ইহা হিমোজয়েন দ্বারা পূর্ণ থাকে।

৪। এর নিউক্লিয়াস বেশ বড় এবং পাশের দিকে অবস্থান করে।

৫। সাইটোপ্লাজমে মাইটোকন্ডিয়া, এন্ডোপ্লাজমিক রেটিকুলাম, গলজিবডি প্রভৃতি থাকে।

স্পোরোজয়েটের গঠন ।। Structure of Sporozoite

১। স্পোরোজয়েট অতি ক্ষুদ্র, সামান্য বাঁকানো এবং উভয় প্রান্ত সুঁচালো।

২। ইহা লম্বা 10-14µm এবং চওড়া 0.05-1.00µm

৩। এর দেহ আবরণীকে পেলিকল বলে। পেলিক্ল সুদৃঢ় নমনীয়। ইহা অনুলম্ব সঙ্কোচনশীল অণুনালিকা দ্বারা গঠিত।

৪। এর অগ্রপ্রান্তে পেয়ালা আকৃতির অ্যাপিকাল কাপ (apical cup) রয়েছে। অ্যাপিকাল কাপ তিনটি রিং এর মতো অংশ দ্বারা গঠিত।

৫। এতে রপট্রাই (rhoptry) নামক একটি জোড় অঙ্গাণু উন্মুক্ত হয়। ইহা থেকে যকৃতের কোষঝিল্লি বিগলনকারী এনজাইম ক্ষরিত হয়।

ম্যালেরিয়া পরজীবীর জীবনচক্র ।। Life cycle malaria parasite

Plasmodium vivax এর জীবনচক্র দুইটি ভেক্টর বা পোষকের দেহে সম্পন্ন হয়। মানুষ এবং মশকী। মানুষের যকৃত ও লোহিত রক্তকণিকায় অযৌনজনন এবং মশকীর ক্রপে যৌনজনন সম্পন্ন হয়। তাই মানুষ হলো মুখ্য পোষক এবং মশকী হলো গৌণ পোষক।

 

মানুষের দেহে ম্যালেরিয়া পরজীবীর অযৌন চক্র

মানুষের যকৃত কোষে হেপাটিক সাইজোগনি এবং লোহিত রক্তকণিকায় এরিথ্রোসাইটিক সাইজোগনি সংঘটিত হয়। পর্যায় দু’টি আলোচনা করা হলো।

 

হেপাটিক সাইজোগনি বা যকৃত সাইজোগনি

মানুষের যকৃত কোষে ম্যালেরিয়া পরজীবীর বহুবিভাজনের মাধ্যমে অযৌন জননকে হেপাটিক সাইজোগনি বলে। ১৯৪৮ সালে বিজ্ঞানী Shortt এবং Garnham মানুষের যকৃতে ম্যালেরিয়া পরজীবীর হেপাটিক সাইজোগনি বর্ণনা করেন। এই চক্র দুইটি পর্যায়ের মাধ্যমে সংঘটিত হয়।

১। প্রি-এরিথ্রোসাইটিক সাইজোগনি (Pre-erythrocytic schizogony)

২। এক্স-এরিথ্রোসাইটিক সাইজোগনি (Ex-erythrocytic schizogony)

 

 ১। প্রি-এরিথ্রোসাইটিক সাইজোগনি

(i) স্পোরোজয়েট (Sporozoite)ঃ স্পোরোজয়েট গুলো সঞ্চালনক্ষম, অতি ক্ষুদ্র, সামান্য বাঁকানো এবং দেহের উভয় প্রান্ত সুচালো। এদের দেহ স্থিতিস্থাপক পর্দা দ্বারা আবৃত থাকে। ম্যালেরিয়া জীবাণু বহনকারী কোন অ্যানোফিলিস (Anopheles) মশকী সুস্থ মানুষকে দংশন করলে মশকীর লালারসের মাধ্যমে স্পোরোজয়েট মানুষের দেহে প্রবেশ করে। স্পোরোজয়েট গুলো ৩০-৪৫ মিনিটের মধ্যে মানুষের যকৃত কোষে প্রবেশ করে। কেমোট্যাক্সিসের কারণে রক্ত দ্বারা বাহিত হয়ে যকৃতে প্রবেশ করে এবং বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়।

(ii) ক্রিপ্টোজয়েট (Cryptozoite)ঃ স্পোরোজয়েট গুলো খাদ্য গ্রহণ করে স্ফীত ও গোলাকৃতি ধারণ করে। একে ক্রিপ্টোজয়েট বলে।

(iii) সাইজন্ট (Schizont)ঃ ক্রিপ্টোজয়েটের নিউক্লিয়াসটি বার বার বিভাজিত হয়ে অসংখ্য (প্রায় ১২০০) ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নিউক্লিয়াস গঠন করে। এই বহু নিউক্লিয়াস যুক্ত অবস্থাকে সাইজন্ট বলে।

(iv) ক্রিপ্টোমেরোজয়েট (Cryptomerozoite)ঃ সাইজন্টের প্রতিটি নিউক্লিয়াসের চারিদিকে সাইটোপ্লাজম জমা হয়ে নতুন কোষ সৃষ্টি করে। এগুলোকে ক্রিপ্টোমেরোজয়েট বলে। ক্রিপ্টোমেরোজয়েট গুলো যকৃত কোষের প্রাচীর ভেঙ্গে বাইরে বেরিয়ে আসে এবং সাইনুসয়েডে অবস্থান করে। এরপর নতুন যকৃত কোষকে আক্রমণ করে হেপাটিক সাইজোগনির পুনরাবৃত্তি ঘটায়। মোট ৮০০০-২০,০০০ মেরোজয়েট সৃষ্টি হয়।

 

 ২। এক্স-এরিথ্রোসাইটিক সাইজোগনি

(i) সাইজন্ট (Schizont)ক্রিপ্টোমেরোজয়েট গুলো নতুন যকৃত কোষকে আক্রমণ করে। খাদ্য গ্রহণ করে আকারে বড় হয় এবং বার বার বিভাজিত হয়ে অসংখ্য নিউক্লিয়াস সৃষ্টি করে। এই বহু নিউক্লিয়াস যুক্ত অবস্থাকে সাইজন্ট বলে।

(ii) মেটাক্রিপ্টোমেরোজয়েট (Metacryptomerozoite)সাইজন্টের প্রতিটি নিউক্লিয়াসের চারিদিকে সাইটোপ্লাজম জমা হয়ে নতুন কোষ সৃষ্টি করে। কোষগুলোকে মেটাক্রিপ্টোমেরোজয়েট বলে। মেটাক্রিপ্টোমেরোজয়েট গুলো দুই ধরনের। মাইক্রোমেটাক্রিপ্টোমেরোজয়েট এবং ম্যাক্রোমেটাক্রিপ্টোমেরোজয়েট। মাইক্রোমেটাক্রিপ্টোমেরোজয়েট গুলো আকারে ছোট এবং নিউক্লিয়াস বড়। ম্যাক্রোমেটাক্রিপ্টোমেরোজয়েট গুলো আকারে বড় এবং নিউক্লিয়াস ছোট। ম্যাক্রোমেটাক্রিপ্টোমেরোজয়েট গুলো নতুন যকৃত কোষকে আক্রমণ করে। মাইক্রোমেটাক্রিপ্টোমেরোজয়েট গুলো রক্ত স্রোতে চলে আসে এবং লোহিত রক্তকণিকাকে আক্রমণ করে। স্পোরোজয়েট থেকে মেটাক্রিপ্টোমেরোজয়েট অবস্থায় পৌছাতে সময় লাগে ৭-১০ দিন। মেরোজয়েট গুলো ম্যালেরিয়ার কোন লক্ষণ প্রকাশ করা ছাড়াই বছরের পর বছর যকৃত কোষে সাইজোগনি ঘটাতে পারে।

 

 এরিথ্রোসাইটিক সাইজোগনি (Erythrocytic schizogony)

মানুষের লোহিত রক্তকণিকায় ম্যালেরিয়া পরজীবীর অযৌন জননকে এরিথ্রোসাইটিক সাইজোগনি বলে। স্পোরোজয়েট দশার পর থেকে মানুষের রক্তে আত্মপ্রকাশ করতে ম্যালেরিয়া পরজীবীর ৭-৮ দিন সময় লাগে। এ সময়কে প্রি-পেটেন্ট কাল বলে। অনেক সময় স্পোরোজয়েট যকৃত কোষে প্রবেশের পর কয়েক মাস বা বছর সুপ্তাবস্থায় থাকে। স্পোরোজয়েটের এরুপ সুপ্তাবস্থাকে হিপনোজয়েট বলে। এরিথ্রোসাইটিক সাইজোগনির ধাপগুলো নিম্নরুপ-

১। ট্রফোজয়েটঃ মেরোজয়েট গুলো লোহিত রক্তকণিকায় প্রবেশ করে এবং খাদ্য গ্রহণ করে স্ফীত, বড় ও গোলাকার হয়। এ দশাকে ট্রফোজয়েট বলে। ট্রফোজয়েটের ব্যাস ২.৫-৩.০ µm। এটি একটি ক্ষণস্থায়ী দশা।

২। সিগনেট রিংঃ ট্রফোজয়েটের ভিতরে একটি গহŸর সৃষ্টি হয়। এর সাইটোপ্লাজম পরিধির দিকে সরে যায় এবং নিউক্লিয়াস একপাশে অবস্থান করে। এ অবস্থায় জীবাণুটিকে পাথর বসানো আংটির মতো মনে হয়। একে সিগনেট রিং বলে।

৩। অ্যামিবয়েড ট্রফোজয়েটঃ ৮ ঘন্টার মধ্যে সিগনেট রিং এর গহ্বরটি অদৃশ্য হয়ে যায়। পরজীবীটি অনিয়ত আকার ধারণ করে, অ্যামিবার মতো ক্ষণপদ সৃষ্টি করে এবং চলনক্ষম হয়। এ দশাকে অ্যামিবয়েড ট্রফোজয়েট বলে। অ্যামিবয়েড ট্রফোজয়েট হিমোগ্লোবিনের প্রোটিন উপাদানকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে। হিমোগ্লোবিনের হিমাটিন বিষাক্ত হিমোজয়েন-এ পরিনত হয়। এ সময় লোহিত রক্তকণিকাটি আকারে  বড় হয় এবং এর সাইটোপ্লাজমে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দানা দেখা যায়। এ দানা গুলোকে সাফনার্স কণা (Schiffner’s dots) বলে। রক্তকণিকায় সাফনার্স দানার উপস্থিতি দেখে ম্যালেরিয়া রোগ শনাক্ত করা হয়।  আবিষ্কারক উইলহেলম সাফনার্স (Wilhelm Schiffner, 1904) এর নামানুসারে সাফনার্স দানা (Schiffner’s dots) নামকরণ করা হয়েছে।

৪। সাইজন্টঃ অ্যামিবয়েড ট্রফোজয়েটের ক্ষণপদ বিলিন হয়ে যায় এবং পরজীবীটি গোলাকার বা লম্বাকার হয়। এর নিউক্লিয়াসটি বিভাজিত হয়ে ১২-২৪টি অপত্য নিউক্লিয়াস সৃষ্টি করে। এই বহু নিউক্লিয়াস যুক্ত অবস্থাকে সাইজন্ট বলে। ৩৬-৪০ ঘন্টা পর এটি লোহিত রক্তকণিকার সবটুকু স্থান দখল করে নেয়। এ সময় পরজীবীর সাইটোপ্লাজমে হিমোজয়েন নামক বর্জ্য পদার্থ জমা হয়।

৫। মেরোজয়েটঃ ৪৫ ঘন্টা পর সাইজন্টের সাইটোপ্লাজমে ১২-১৮টি ক্ষুদ্র অংশ দেখা যায়। প্রতিটি অংশে একটি করে নিউক্লিয়াস প্রবেশ করে। এ গুলো পাপড়ির মতো দুটি স্তরে সাজানো থাকে। এই অবস্থাকে রোজেট বলে। নিউক্লিয়াসসহ প্রতিটি অংশ এক একটি মেরোজয়েটে পরিনত হয়। মেরোজয়েট গুলো নতুন লোহিত রক্তকণিকাকে আক্রমণ করে। এ সময রক্তে প্রচুর পরিমাণে পাইরোজেন নামক রাসায়নিক পদার্থ জমা হয় এবং এর প্রভাবেই দেহে জ্বর আসে।

৬। গ্যামিটোসাইটঃ কিছু মেরোজয়েট যকৃত কোষ থেকে বের হওয়ার পর গ্যামিটোসাইটে পরিনত হয়। গ্যামিটোসাইট গুলো দুই ধরনের। মাইক্রোগ্যামিটোসাইট এবং ম্যাক্রোগ্যামিটোসাইট।

(i) মাইক্রোগ্যামিটোসাইটঃ মাইক্রোগ্যামিটোসাইট আকারে ছোট। এর ব্যাস ৯-১০ µm এবং সাইটোপ্লাজম হালকা নীল বর্ণের। এর কেন্দ্রস্থলে বৃহদাকার গোলাপী বর্ণের নিউক্লিয়াস অবস্থিত। এর নিউক্লিয়াস ছোট, ঘন এবং প্রান্তভাগে অবস্থিত।

(ii) ম্যাক্রোগ্যামিটোসাইটঃ ম্যাক্রোগ্যামিটোসাইট আকারে বড়। এর ব্যাস ১০-১২ µm এবং সাইটোপ্লাজম ঘন নীল বর্ণের।

পরিনত গ্যামিটোসাইট সৃষ্টি হতে ৯৬ ঘন্টা সময় লাগে। এ চক্রটি সম্পন্ন হতে ৪৮-৭২ ঘন্টা সময় লাগে।

 

 মশকীর দেহে ম্যালেরিয়া পরজীবীর যৌনজনন চক্র

ম্যালেরিয়া রোগাক্রান্ত ব্যক্তিকে Anopheles মশকী দংশন করলে মশকীর লালারসে গ্যামিটোসাইট চলে আসে। মশকীর দেহে ম্যালেরিয়া পরজীবীর যৌনচক্র দুটি পর্যায়ে সম্পন্ন হয়।  ১। গ্যামিটোগনি ২। স্পোরোগনি।

 

১। গ্যামিটোগনি (Gametogony)

গ্যামিট সৃষ্টির প্রক্রিয়াকে গ্যামিটোগনি বলে। গ্যামিটোগনির পর্যায় গুলো হলো

(i) পুংগ্যামিট সৃষ্টিঃ পুংগ্যামিট বা শুক্রাণু সৃষ্টির প্রক্রিয়াকে স্পার্মাটোজেনেসিস বলে। এক্সফ্ল্যাজেলেশন প্রক্রিয়ায় প্রতিটি মাইক্রোগ্যামিটোসাইটের নিউক্লিয়াস বিভাজিত হয়ে ৮টি নিউক্লিয়াস উৎপন্ন হয়। সময় সাইটোপ্লাজমে ৮টি অভিক্ষেপ সৃষ্টি হয়। একে সাইটোপ্লাজমীয় অভিক্ষেপ বলে। প্রতিটি অভিক্ষেপে একটি করে  নিউক্লিয়াস প্রবেশ করে। নিউক্লিয়াসসহ প্রতিটি অভিক্ষেপ পুংগ্যামিট বা মাইক্রোগ্যামিটে পরিনত হয়। পুংগ্যামিটগুলো নিষেকের জন্য সাঁতার কাটতে থাকে।

(ii) স্ত্রীগ্যামিট সৃষ্টিঃ স্ত্রীগ্যামিট বা ডিম্বাণু সৃষ্টির প্রক্রিয়াকে উওজেনেসিস বলে। প্রতিটি ম্যাক্রোগ্যামিটোসাইট হতে একটি করে স্ত্রীগ্যামিট বা ম্যাক্রোগ্যামিট সৃষ্টি হয়। ম্যাক্রোগ্যামিটের এক প্রান্ত স্ফীত হয়ে নিষেক কোণ্ গঠন করে। কোণ্ অঞ্চলকে নিষেক শঙ্কু বা অভ্যর্থনা শঙ্কু বলে। ডিম্বাণুর নিউক্লিয়াস শঙ্কুর নিকট অবস্থান করে।

(iii) নিষেকঃ পুংগ্যামিটগুলো পৃথক পৃথক ভাবে ডিম্বাণুর নিষেক শঙ্কুর দিকে অগ্রসর হয়। প্রতিটি ডিম্বাণুতে একটি করে শুক্রাণু প্রবেশ করে। পরে এদের নিউক্লিয়াস মিলিত হয়ে জাইগোট সৃষ্টি করে। প্রক্রিয়াকে নিষেক বলে। ২০২২ ঘন্টার মধ্যে নিষেক সম্পন্ন হয়।

(iv) উওকিনেট/ভার্মিকিউলঃ ১২১৪ ঘন্টা পর নিশ্চল গোলাকার জাইগোটটি লম্বা সচল হয়। একে উওকিনেট বা ভারমিকিউল বলা হয়। উওকিনেটের দৈর্ঘ্য ১৮২৪ মাইক্রন এবং প্রস্থ মাইক্রন।

(v) উওসিস্টঃ ২৪ ঘন্টার মধ্যে উওকিনেট গুলো মশকীর ক্রপের প্রাচীর ভেদ করে বাইরে বেরিয়ে আসে এবং গোলাকৃতি ধারণ করে। এরপর ৪০ ঘন্টার মধ্যে উহা পাতলা আবরণী দ্বারা আবৃত হয়। একে উওসিস্ট বলে। উওসিস্টের নিউক্লিয়াসটি প্রথমে মায়োসিস এবং পরে মাইটোসিস প্রক্রিয়ায় বিভাজিত হয়। উওসিস্টের মায়োসিসকে পোস্ট জাইগোটিক মায়োসিস বলে। মশকীর ক্রপে ৫০৫০০টি উওসিস্ট থাকতে পারে। পরিনত উওসিস্ট স্পঞ্জের মতো দেখায় এবং আকারে ৫গুণ বড় হয় (৫০৬০ µ)

২। স্পোরোগনি (Sporogony)

স্পোরোজয়েট সৃষ্টির প্রক্রিয়াকে স্পোরোগনি বলে। উওসিস্ট খাদ্য গ্রহণ করে  বৃদ্ধি পায়। এর নিউক্লিয়াস প্রথমে মাইটোসিস এবং পরে মায়োসিস প্রক্রিয়ায় বার বার বিভাজিত হয়ে অনেক গুলো হ্যাপ্লয়েড নিউক্লিয়াস সৃষ্টি করে। প্রতিটি নিউক্লিয়াসের চারিদিকে সাইটোপ্লাজম জমা হয়ে গোলাকার কোষে পরিনত হয়। পরে গোলাকার কোষ গুলো কাস্তে বা মাকু আকৃতির স্পোরোজয়েটে পরিনত হয়। প্রতিটি উওসিস্ট থেকে প্রায় ১০,০০০ স্পোরোজয়েট সৃষ্টি হয়। স্পোরোজয়েট গুলো মশকীর হিমোসিলে অবস্থান করে। সময় মশকী সুস্থ মানুষকে দংশন করলে ব্যক্তির দেহে স্পোরোজয়েট প্রবেশ করে। একবার দংশনের সময় প্রায় ১০% স্পোরোজয়েট মানুষের দেহে প্রবেশ করে। মশকীর লালাগ্রন্থিতে ,২৬,০০০ স্পোরোজয়েট থাকতে পারে। মশকীর লালাগ্রন্থিতে স্পোরোজয়েটগুলো প্রায় ৬০ দিন অবস্থান করে। দংশনকাল থেকে স্পোরোজয়েট সৃষ্টিতে সময় লাগে প্রায় ১০২০ দিন।

মশকীর দেহে ম্যালেরিয়া পরজীবীর যৌনজনন চক্র ।। Sexual Reproduction of Malaria parasite

ম্যালেরিয়া রোগাক্রান্ত ব্যক্তিকে Anopheles মশকী দংশন করলে মশকীর লালারসে গ্যামিটোসাইট চলে আসে। মশকীর দেহে ম্যালেরিয়া পরজীবীর যৌনচক্র দুটি পর্যায়ে সম্পন্ন হয়।  ১। গ্যামিটোগনি ২। স্পোরোগনি।

 

১। গ্যামিটোগনি (Gametogony) গ্যামিট সৃষ্টির প্রক্রিয়াকে গ্যামিটোগনি বলে। গ্যামিটোগনির পর্যায় গুলো হলো

(i) পুংগ্যামিট সৃষ্টিঃ পুংগ্যামিট বা শুক্রাণু সৃষ্টির প্রক্রিয়াকে স্পার্মাটোজেনেসিস বলে। এক্সফ্ল্যাজেলেশন প্রক্রিয়ায় প্রতিটি মাইক্রোগ্যামিটোসাইটের নিউক্লিয়াস বিভাজিত হয়ে ৮টি নিউক্লিয়াস উৎপন্ন হয়। সময় সাইটোপ্লাজমে ৮টি অভিক্ষেপ সৃষ্টি হয়। একে সাইটোপ্লাজমীয় অভিক্ষেপ বলে। প্রতিটি অভিক্ষেপে একটি করে  নিউক্লিয়াস প্রবেশ করে। নিউক্লিয়াসসহ প্রতিটি অভিক্ষেপ পুংগ্যামিট বা মাইক্রোগ্যামিটে পরিনত হয়। পুংগ্যামিটগুলো নিষেকের জন্য সাঁতার কাটতে থাকে।

(ii) স্ত্রীগ্যামিট সৃষ্টিঃ স্ত্রীগ্যামিট বা ডিম্বাণু সৃষ্টির প্রক্রিয়াকে উওজেনেসিস বলে। প্রতিটি ম্যাক্রোগ্যামিটোসাইট হতে একটি করে স্ত্রীগ্যামিট বা ম্যাক্রোগ্যামিট সৃষ্টি হয়। ম্যাক্রোগ্যামিটের এক প্রান্ত স্ফীত হয়ে নিষেক কোণ্ গঠন করে। কোণ্ অঞ্চলকে নিষেক শঙ্কু বা অভ্যর্থনা শঙ্কু বলে। ডিম্বাণুর নিউক্লিয়াস শঙ্কুর নিকট অবস্থান করে।

(iii) নিষেকঃ পুংগ্যামিটগুলো পৃথক পৃথক ভাবে ডিম্বাণুর নিষেক শঙ্কুর দিকে অগ্রসর হয়। প্রতিটি ডিম্বাণুতে একটি করে শুক্রাণু প্রবেশ করে। পরে এদের নিউক্লিয়াস মিলিত হয়ে জাইগোট সৃষ্টি করে। প্রক্রিয়াকে নিষেক বলে। ২০২২ ঘন্টার মধ্যে নিষেক সম্পন্ন হয়।

(iv) উওকিনেট/ভার্মিকিউলঃ ১২১৪ ঘন্টা পর নিশ্চল গোলাকার জাইগোটটি লম্বা সচল হয়। একে উওকিনেট বা ভারমিকিউল বলা হয়। উওকিনেটের দৈর্ঘ্য ১৮২৪ মাইক্রন এবং প্রস্থ মাইক্রন।

(v) উওসিস্টঃ ২৪ ঘন্টার মধ্যে উওকিনেট গুলো মশকীর ক্রপের প্রাচীর ভেদ করে বাইরে বেরিয়ে আসে এবং গোলাকৃতি ধারণ করে। এরপর ৪০ ঘন্টার মধ্যে উহা পাতলা আবরণী দ্বারা আবৃত হয়। একে উওসিস্ট বলে। উওসিস্টের নিউক্লিয়াসটি প্রথমে মায়োসিস এবং পরে মাইটোসিস প্রক্রিয়ায় বিভাজিত হয়। উওসিস্টের মায়োসিসকে পোস্ট জাইগোটিক মায়োসিস বলে। মশকীর ক্রপে ৫০৫০০টি উওসিস্ট থাকতে পারে। পরিনত উওসিস্ট স্পঞ্জের মতো দেখায় এবং আকারে ৫গুণ বড় হয় (৫০৬০ µ)

২। স্পোরোগনি (Sporogony)

স্পোরোজয়েট সৃষ্টির প্রক্রিয়াকে স্পোরোগনি বলে। উওসিস্ট খাদ্য গ্রহণ করে  বৃদ্ধি পায়। এর নিউক্লিয়াস প্রথমে মাইটোসিস এবং পরে মায়োসিস প্রক্রিয়ায় বার বার বিভাজিত হয়ে অনেক গুলো হ্যাপ্লয়েড নিউক্লিয়াস সৃষ্টি করে। প্রতিটি নিউক্লিয়াসের চারিদিকে সাইটোপ্লাজম জমা হয়ে গোলাকার কোষে পরিনত হয়। পরে গোলাকার কোষ গুলো কাস্তে বা মাকু আকৃতির স্পোরোজয়েটে পরিনত হয়। প্রতিটি উওসিস্ট থেকে প্রায় ১০,০০০ স্পোরোজয়েট সৃষ্টি হয়। স্পোরোজয়েট গুলো মশকীর হিমোসিলে অবস্থান করে। সময় মশকী সুস্থ মানুষকে দংশন করলে ব্যক্তির দেহে স্পোরোজয়েট প্রবেশ করে। একবার দংশনের সময় প্রায় ১০% স্পোরোজয়েট মানুষের দেহে প্রবেশ করে। মশকীর লালাগ্রন্থিতে ,২৬,০০০ স্পোরোজয়েট থাকতে পারে। মশকীর লালাগ্রন্থিতে স্পোরোজয়েটগুলো প্রায় ৬০ দিন অবস্থান করে। দংশনকাল থেকে স্পোরোজয়েট সৃষ্টিতে সময় লাগে প্রায় ১০২০ দিন।

এরিথ্রোসাইটিক সাইজোগনি ।। Erythrocytic schizogony

মানুষের লোহিত রক্তকণিকায় ম্যালেরিয়া পরজীবীর অযৌন জননকে এরিথ্রোসাইটিক সাইজোগনি বলে। স্পোরোজয়েট দশার পর থেকে মানুষের রক্তে আত্মপ্রকাশ করতে ম্যালেরিয়া পরজীবীর ৭-৮ দিন সময় লাগে। এ সময়কে প্রি-পেটেন্ট কাল বলে। অনেক সময় স্পোরোজয়েট যকৃত কোষে প্রবেশের পর কয়েক মাস বা বছর সুপ্তাবস্থায় থাকে। স্পোরোজয়েটের এরুপ সুপ্তাবস্থাকে হিপনোজয়েট বলে। এরিথ্রোসাইটিক সাইজোগনির ধাপগুলো নিম্নরুপ-

১। ট্রফোজয়েটঃ মেরোজয়েট গুলো লোহিত রক্তকণিকায় প্রবেশ করে এবং খাদ্য গ্রহণ করে স্ফীত, বড় ও গোলাকার হয়। এ দশাকে ট্রফোজয়েট বলে। ট্রফোজয়েটের ব্যাস ২.৫-৩.০ µm। এটি একটি ক্ষণস্থায়ী দশা।

২। সিগনেট রিংঃ ট্রফোজয়েটের ভিতরে একটি গহŸর সৃষ্টি হয়। এর সাইটোপ্লাজম পরিধির দিকে সরে যায় এবং নিউক্লিয়াস একপাশে অবস্থান করে। এ অবস্থায় জীবাণুটিকে পাথর বসানো আংটির মতো মনে হয়। একে সিগনেট রিং বলে।

৩। অ্যামিবয়েড ট্রফোজয়েটঃ ৮ ঘন্টার মধ্যে সিগনেট রিং এর গহ্বরটি অদৃশ্য হয়ে যায়। পরজীবীটি অনিয়ত আকার ধারণ করে, অ্যামিবার মতো ক্ষণপদ সৃষ্টি করে এবং চলনক্ষম হয়। এ দশাকে অ্যামিবয়েড ট্রফোজয়েট বলে। অ্যামিবয়েড ট্রফোজয়েট হিমোগ্লোবিনের প্রোটিন উপাদানকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে। হিমোগ্লোবিনের হিমাটিন বিষাক্ত হিমোজয়েন-এ পরিনত হয়। এ সময় লোহিত রক্তকণিকাটি আকারে  বড় হয় এবং এর সাইটোপ্লাজমে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দানা দেখা যায়। এ দানা গুলোকে সাফনার্স কণা (Schiffner’s dots) বলে। রক্তকণিকায় সাফনার্স দানার উপস্থিতি দেখে ম্যালেরিয়া রোগ শনাক্ত করা হয়।  আবিষ্কারক উইলহেলম সাফনার্স (Wilhelm Schiffner, 1904) এর নামানুসারে সাফনার্স দানা (Schiffner’s dots) নামকরণ করা হয়েছে।

৪। সাইজন্টঃ অ্যামিবয়েড ট্রফোজয়েটের ক্ষণপদ বিলিন হয়ে যায় এবং পরজীবীটি গোলাকার বা লম্বাকার হয়। এর নিউক্লিয়াসটি বিভাজিত হয়ে ১২-২৪টি অপত্য নিউক্লিয়াস সৃষ্টি করে। এই বহু নিউক্লিয়াস যুক্ত অবস্থাকে সাইজন্ট বলে। ৩৬-৪০ ঘন্টা পর এটি লোহিত রক্তকণিকার সবটুকু স্থান দখল করে নেয়। এ সময় পরজীবীর সাইটোপ্লাজমে হিমোজয়েন নামক বর্জ্য পদার্থ জমা হয়।

৫। মেরোজয়েটঃ ৪৫ ঘন্টা পর সাইজন্টের সাইটোপ্লাজমে ১২-১৮টি ক্ষুদ্র অংশ দেখা যায়। প্রতিটি অংশে একটি করে নিউক্লিয়াস প্রবেশ করে। এ গুলো পাপড়ির মতো দুটি স্তরে সাজানো থাকে। এই অবস্থাকে রোজেট বলে। নিউক্লিয়াসসহ প্রতিটি অংশ এক একটি মেরোজয়েটে পরিনত হয়। মেরোজয়েট গুলো নতুন লোহিত রক্তকণিকাকে আক্রমণ করে। এ সময রক্তে প্রচুর পরিমাণে পাইরোজেন নামক রাসায়নিক পদার্থ জমা হয় এবং এর প্রভাবেই দেহে জ্বর আসে।

৬। গ্যামিটোসাইটঃ কিছু মেরোজয়েট যকৃত কোষ থেকে বের হওয়ার পর গ্যামিটোসাইটে পরিনত হয়। গ্যামিটোসাইট গুলো দুই ধরনের। মাইক্রোগ্যামিটোসাইট এবং ম্যাক্রোগ্যামিটোসাইট।

(i) মাইক্রোগ্যামিটোসাইটঃ মাইক্রোগ্যামিটোসাইট আকারে ছোট। এর ব্যাস ৯-১০ µm এবং সাইটোপ্লাজম হালকা নীল বর্ণের। এর কেন্দ্রস্থলে বৃহদাকার গোলাপী বর্ণের নিউক্লিয়াস অবস্থিত। এর নিউক্লিয়াস ছোট, ঘন এবং প্রান্তভাগে অবস্থিত।

(ii) ম্যাক্রোগ্যামিটোসাইটঃ ম্যাক্রোগ্যামিটোসাইট আকারে বড়। এর ব্যাস ১০-১২ µm এবং সাইটোপ্লাজম ঘন নীল বর্ণের।

পরিনত গ্যামিটোসাইট সৃষ্টি হতে ৯৬ ঘন্টা সময় লাগে। এ চক্রটি সম্পন্ন হতে ৪৮-৭২ ঘন্টা সময় লাগে।

হেপাটিক সাইজোগনি ।। যকৃত সাইজোগনি ।। Hepatic Schizogony

ম্যালেরিয়া পরজীবীর জীবনচক্র (Life cycle)
Plasmodium vivax এর জীবনচক্র দুইটি ভেক্টর বা পোষকের দেহে সম্পন্ন হয়। মানুষ এবং মশকী। মানুষের যকৃত ও লোহিত রক্তকণিকায় অযৌনজনন এবং মশকীর ক্রপে যৌনজনন সম্পন্ন হয়। তাই মানুষ হলো মুখ্য পোষক এবং মশকী হলো গৌণ পোষক।
মানুষের দেহে ম্যালেরিয়া পরজীবীর অযৌন চক্র
মানুষের যকৃত কোষে হেপাটিক সাইজোগনি এবং লোহিত রক্তকণিকায় এরিথ্রোসাইটিক সাইজোগনি সংঘটিত হয়। পর্যায় দু’টি আলোচনা করা হলো।
হেপাটিক সাইজোগনি বা যকৃত সাইজোগনি
মানুষের যকৃত কোষে ম্যালেরিয়া পরজীবীর বহুবিভাজনের মাধ্যমে অযৌন জননকে হেপাটিক সাইজোগনি বলে। ১৯৪৮ সালে বিজ্ঞানী Shortt এবং Garnham মানুষের যকৃতে ম্যালেরিয়া পরজীবীর হেপাটিক সাইজোগনি বর্ণনা করেন। এই চক্র দুইটি পর্যায়ের মাধ্যমে সংঘটিত হয়।
১। প্রি-এরিথ্রোসাইটিক সাইজোগনি (Pre-erythrocytic schizogony)
২। এক্স-এরিথ্রোসাইটিক সাইজোগনি (Ex-erythrocytic schizogony)
১। প্রি-এরিথ্রোসাইটিক সাইজোগনি
(i) স্পোরোজয়েট (Sporozoite)ঃ স্পোরোজয়েট গুলো সঞ্চালনক্ষম, অতি ক্ষুদ্র, সামান্য বাঁকানো এবং দেহের উভয় প্রান্ত সুচালো। এদের দেহ স্থিতিস্থাপক পর্দা দ্বারা আবৃত থাকে। ম্যালেরিয়া জীবাণু বহনকারী কোন অ্যানোফিলিস (Anopheles) মশকী সুস্থ মানুষকে দংশন করলে মশকীর লালারসের মাধ্যমে স্পোরোজয়েট মানুষের দেহে প্রবেশ করে। স্পোরোজয়েট গুলো ৩০-৪৫ মিনিটের মধ্যে মানুষের যকৃত কোষে প্রবেশ করে। কেমোট্যাক্সিসের কারণে রক্ত দ্বারা বাহিত হয়ে যকৃতে প্রবেশ করে এবং বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়।
(ii) ক্রিপ্টোজয়েট (Cryptozoite)ঃ স্পোরোজয়েট গুলো খাদ্য গ্রহণ করে স্ফীত ও গোলাকৃতি ধারণ করে। একে ক্রিপ্টোজয়েট বলে।
(iii) সাইজন্ট (Schizont)ঃ ক্রিপ্টোজয়েটের নিউক্লিয়াসটি বার বার বিভাজিত হয়ে অসংখ্য (প্রায় ১২০০) ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নিউক্লিয়াস গঠন করে। এই বহু নিউক্লিয়াস যুক্ত অবস্থাকে সাইজন্ট বলে।
(iv) ক্রিপ্টোমেরোজয়েট (Cryptomerozoite)ঃ সাইজন্টের প্রতিটি নিউক্লিয়াসের চারিদিকে সাইটোপ্লাজম জমা হয়ে নতুন কোষ সৃষ্টি করে। এগুলোকে ক্রিপ্টোমেরোজয়েট বলে। ক্রিপ্টোমেরোজয়েট গুলো যকৃত কোষের প্রাচীর ভেঙ্গে বাইরে বেরিয়ে আসে এবং সাইনুসয়েডে অবস্থান করে। এরপর নতুন যকৃত কোষকে আক্রমণ করে হেপাটিক সাইজোগনির পুনরাবৃত্তি ঘটায়। মোট ৮০০০-২০,০০০ মেরোজয়েট সৃষ্টি হয়।

২। এক্স-এরিথ্রোসাইটিক সাইজোগনি

(i) সাইজন্ট (Schizont)ক্রিপ্টোমেরোজয়েট গুলো নতুন যকৃত কোষকে আক্রমণ করে। খাদ্য গ্রহণ করে আকারে বড় হয় এবং বার বার বিভাজিত হয়ে অসংখ্য নিউক্লিয়াস সৃষ্টি করে। এই বহু নিউক্লিয়াস যুক্ত অবস্থাকে সাইজন্ট বলে।

(ii) মেটাক্রিপ্টোমেরোজয়েট (Metacryptomerozoite)সাইজন্টের প্রতিটি নিউক্লিয়াসের চারিদিকে সাইটোপ্লাজম জমা হয়ে নতুন কোষ সৃষ্টি করে। কোষগুলোকে মেটাক্রিপ্টোমেরোজয়েট বলে। মেটাক্রিপ্টোমেরোজয়েট গুলো দুই ধরনের। মাইক্রোমেটাক্রিপ্টোমেরোজয়েট এবং ম্যাক্রোমেটাক্রিপ্টোমেরোজয়েট। মাইক্রোমেটাক্রিপ্টোমেরোজয়েট গুলো আকারে ছোট এবং নিউক্লিয়াস বড়। ম্যাক্রোমেটাক্রিপ্টোমেরোজয়েট গুলো আকারে বড় এবং নিউক্লিয়াস ছোট। ম্যাক্রোমেটাক্রিপ্টোমেরোজয়েট গুলো নতুন যকৃত কোষকে আক্রমণ করে। মাইক্রোমেটাক্রিপ্টোমেরোজয়েট গুলো রক্ত স্রোতে চলে আসে এবং লোহিত রক্তকণিকাকে আক্রমণ করে। স্পোরোজয়েট থেকে মেটাক্রিপ্টোমেরোজয়েট অবস্থায় পৌছাতে সময় লাগে ৭-১০ দিন। মেরোজয়েট গুলো ম্যালেরিয়ার কোন লক্ষণ প্রকাশ করা ছাড়াই বছরের পর বছর যকৃত কোষে সাইজোগনি ঘটাতে পারে।

ম্যালেরিয়া রোগ সৃষ্টিকারী প্রজাতি ।। Malaria species

Plasmodium গণের অধীনে প্রায় ৬০টি প্রজাতি রয়েছে। এই প্রজাতি গুলোকে এক সাথে ম্যালেরিয়া পরজীবী বলে। এদের মধ্যে ৪টি প্রজাতি মানুষের দেহে  ম্যালেরিয়া রোগ সৃষ্টি করে। Plasmodium vivax প্রজাতি ৯৫% ম্যালেরিয়া রোগ সৃষ্টি করে।

Plasmodium vivax

Plasmodium ovale

Plasmodium falciparum

Plasmodium malariae

স্বভাব ও বাসস্থান ।। Habit and Habitat

Plasmodium হলো অন্তঃকোষীয় রক্তপরজীবী। মানুষসহ বিভিন্ন মেরুদন্ডী প্রাণীর যকৃত কোষ ও লোহিত রক্তকণিকায় এবং অ্যানোফিলিস মশকীর পৌষ্টিক নালি ও লালাগ্রন্থিতে বাস করে। ম্যালেরিয়া হলো বিশ^জনীন পরজীবী। এই জীবাণু পৃথিবীর সর্বত্র বসবাস করে। মেরু অঞ্চল, মরু অঞ্চল, তুন্দ্রা অঞ্চল, গ্রীষ্ম প্রধান অঞ্চল, শীত প্রধান অঞ্চল ও নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে Plasmodium বাস করে।