ধানের লিফ ব্লাইট মহামারী হলে কী কী বিপর্যয় হবে ।। Epidemic Disaster of leaf blight

১। খাদ্য অভাবঃ ধানের লিফ ব্লাইট রোগ মহামারী আকারে দেখা দিলে ধানের ফলন কমে যাবে। ধান চাষ অনেক কমে যাবে। ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর খাদ্য চাহিদা পূরণ হবে না। দেশে চরম খাদ্য অভাব দেখা দিবে।

২। অর্থনৈতিক ধ্বসঃ দেশে ধানের রোগ মহামারী রুপ নিলে অন্যান্য ফসল উৎপাদনে ব্যাপক প্রভাব পড়বে। ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা দেখা দিবে। পারিবারিক এবং জাতীয় অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব পড়বে। ফলে অর্থনীতি ধ্বসে যাবে।

৩। কৃষি বিপর্যয়ঃ ধানের লিফ ব্লাইট রোগ মহামারী আকার ধারণ করলে ধান এবং অন্যান্য ফসল চাষে ব্যাপক প্রভাব পড়বে। নির্দিষ্ট এলাকায় ১-৩ বছর ধানের চাষ বন্ধ রাখা হবে। ফলে কৃষি বিপর্যয় দেখা দিবে।

৪। কৃষি পরিবারের অসন্তোষঃ ধানের রোগ মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়লে ধানের ফলন কমে যাবে। ধানের উৎপাদন কমে যাবে। ধান চাষ বন্ধ রাখা হবে। এতে কৃষি পরিবার গুলো আর্থিক সংকটে পড়বে। ফলে জনবহুল কৃষি পরিবার গুলোতে ব্যাপক অসন্তোষ দেখা দিবে।

৫। বনায়ন বিপর্যয়ঃ ধানের রোগের সাথে অন্যান্য উদ্ভিদের রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিভিন্ন উদ্ভিদ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। রোগ সংক্রমণের কারণে বৃক্ষ রোপন অভিযান বাঁধাগ্রস্ত হবে। বৃক্ষ রোপন কর্মসূচী বন্ধ হতে পারে। ফলে বনায়ন বিপর্যয় ঘটবে।

৬। বিদেশে থেকে খাদ্য আমদানীঃ মহামারীর কারণে ধানের উৎপাদন কমে যাবে। ধান চাষ বন্ধ হয়ে যাবে। দেশে খাদ্য অভাব দেখা দিবে। খাদ্য চাহিদা পূরণের জন্য বিদেশ থেকে খাদ্য আমদানী করতে হবে।

৭। পণ্য রপ্তানী বন্ধঃ মহামারীর কারণে দেশে এবং পাশর্^বর্তী দেশে আতঙ্ক সৃষ্টি হবে। বিভিন্ন পণ্যের সাথে রোগ-জীবাণু ছড়িয়ে পড়তে পারে। এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় এবং এক দেশ থেকে অন্য দেশে রোগ ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই বিদেশে পণ্য রপ্তানী বন্ধ হয়ে যাবে।

৮। শিল্প উৎপাদন বন্ধঃ শিল্পের কাঁচামাল হলো কৃষি পণ্য। ধানের মহামারীর কারণে শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহ ব্যাপক ভাবে বাঁধাগ্রস্ত হবে। ফলে কাঁচামালের অভাবে শিল্প উৎপাদন বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

৯। বেকারত্ব বৃদ্ধিঃ মহামারীর কারণে ধান উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাবে। অন্যান্য কৃষি উৎপাদন কমে যাবে। দেশী এবং বৈদেশিক বাণিজ্যে মন্দা দেখা দিবে। শিল্প উৎপাদন কমে যাবে। ফলে বেকারত্ব বেড়ে যাবে।

১০। আগাছার প্রাদুর্ভাবঃ মহামারীর কারণে ফসল উৎপাদন বন্ধ হয়ে যেতে পারে। আগাছাগুলো স্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকবে। আগাছা প্রচুর পরিমাণ বীজ উৎপন্ন করবে। এতে আগাছার প্রাদুর্ভাব ব্যাপক ভাবে বেড়ে যাবে।

 

 ধানের লিফ ব্লাইট রোগের প্রতিকার ।। Protect of Rice leaf blight

১। সুস্থ, সবল, রোগমুক্ত ও রোগ প্রতিরোধী জাত ব্যবহার করতে হবে। লিফ ব্লাইট প্রতিরোধী উচ্চ ফলনশীল জাত হলো Xa4, Xa5, Xa13, Xa21, Xa33, Xa38 প্রভৃতি।

২। বীজ বপনের পূর্বে ছত্রাকনাশক দ্বারা শোধন করে নিতে হবে। বিøচিং পাউডার (100 mg/ml) এবং জিঙ্ক সালফেট (২%) দিয়ে বীজ শোধন করে নিতে হবে।

৩। রোগাক্রান্ত পাতায় স্ট্রেপটোসাইক্লিন স্প্রে করলে সুফল পাওয়া যায়।

৪। জমির আগাছা এবং আবর্জনা ধ্বংস বা পুড়িয়ে ফেলতে হবে। ধানের খড় এবং গজানো অন্য চারা সরিয়ে ফেলতে হবে।

৫। বীজ বপনের পূর্বে জমি ভালভাবে শুকিয়ে নিতে হবে।

৬। রোগাক্রান্ত জমিতে ফিনাইল সালফিউরিক এসিটেট এবং এম. ক্লোরামফেনিকল ১০-২০ লিটার পরিমাণ প্রয়োগ করতে হবে।

৭। পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে।

৮। উচু জমিতে বীজতলা তৈরী করতে হবে। চারা থেকে চারার দূরত্ব এবং লাইন থেকে লাইনের দুরত্ব বিজ্ঞানসম্মত হতে হবে।

৯। জমিতে কপার অক্সিক্লোরাইড ছড়ায়ে জীবাণু মুক্ত করতে হবে।

১০। সেচের পানির সাথে ক্লোরিন বা বিø¬চিং পাউডার প্রয়োগ করতে হবে।

১১। নাইট্রোজেন সার সময় মতো সঠিক পরিমাণে প্রয়োগ করতে হবে। বেশি মাত্রায় ব্যবহার করা যাবে না।

১২। রোগাক্রান্ত ধান গাছ তুলে পুড়িয়ে ফেলতে হবে।

১৩। বীজ বপনের আগে ০.১% সিরিসান (Sirisan) দ্রবণে ৮ ঘন্টা ভিজিয়ে বীজবাহিত সংক্রমণ রোধ করা হয়।

১৪। কোয়ারেন্টাইন পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে।

ধানের লিফ ব্লাইট রোগের লক্ষণ ।। ‍Symptoms of Rice leaf blight

ধানের লিফ ব্লাইট রোগের লক্ষণ রোগাক্রমণের ৫-৬ সপ্তাহ পর প্রকাশিত হয়। লক্ষণ গুলো হলো-

১। ধানের পাতায় রোগের লক্ষণ

(i) প্রাথমিক অবস্থায় পাতায় ভেজা, অর্ধস্বচ্ছ ও লম্বা লম্বা দাগ সৃষ্টি হয়।

(ii) পাতার বোটায়, প্রধান শিরায় ও কিনারায় ৫-১০ মিমি লম্বা ভেজা দাগ দেখা যায়।

(iii) দাগ গুলো যুক্ত হয়ে সাদা অথবা হলদে ডোরা দাগ সৃষ্টি করে।

(iv) দাগ গুলো ক্রমান্বয়ে হলুদ ও ধুসর হয় এবং বৃহৎ আকার ধারণ করে। একে ক্রেসেক বলে।

(v) রোগাক্রান্ত পাতা ধীরে ধীরে শুকিয়ে মুড়িয়ে যায়।

(vi) আক্রান্ত অংশ ঢেউ খেলানোর মতো দেখায়।

(vii) পাতার উপরে সাদা বর্ণের আঠালো রস জমতে থাকে।

(viii) ভোরের দিকে পাতায় দুধ বর্ণের আঠালো ফোঁটা জমে এবং পরে উহা শুকিয়ে কমলা বর্ণের ছোট ছোট পুতির দানার মতো আকার ধারণ করে।

(ix) রোগাক্রান্ত পাতা দ্রæত শুকিয়ে যায় এবং গাছ মারা যায়।

 

২। ধানের বীজে রোগের লক্ষণ

(i) ধানের শীষ বের হওয়ার সময় এই রোগের আক্রমণ ঘটে।

(ii) ধানের গ্লুমে পানি জমে ঝলসে যায় এবং শুকিয়ে খড়ের মতো রং ধারণ করে।

(iii) আক্রান্ত ধানের ছড়াতে পানি ভেজা ক্ষুদ্র ও গোলাকার ক্ষত দেখা যায়।

(iv) রোগাক্রান্ত ধানের ছড়া বন্ধ্যা হয়, ধান চিটা হয় এবং ফলন ৬০% কমে যায়।

(v) রোগাক্রান্ত ধানের শীষে কোন ফল হয় না।

ধানের লিফ ব্লাইট রোগের সংক্রমণ বা বিস্তার ।। Infection of Rice leaf blight

১। অনুকূল পরিবেশে এই ব্যাকটেরিয়ার বীজ অনেক দিন পর্যন্ত মাটিতে বেঁচে থাকে।

২। ধানের মুথা ও আগাছার মাধ্যমে এই রোগ পরবর্তী ফসলকে আক্রমণ করে। ঘাস এবং বন্য ধানকে বিকল্প পোষক হিসেবে গ্রহণ করে বেঁচে থাকে।

৩। গ্রীষ্মকালে খাল-বিলের পানিতে এই ব্যাকটেরিয়ার বীজ টিকে থাকতে পারে।

৪। গাছের ক্ষত ও হাইডাথোডের মাধ্যমে ব্যাকটেরিয়া পোষক দেহে প্রবেশ করে। পরে পাতার শিরায় প্রবেশ করে।

৫। বাতাস ও বৃষ্টির পানির সাহায্যে এই জীবাণু ছড়িয়ে পড়ে।

৬। জমির পানির মাধ্যমে এই জীবাণু মাঠে বিস্তার লাভ করে।

৭। উচ্চ তাপমাত্রা (২৫-৩০ ডিগ্রী সে.), উচ্চ জলীয় বাষ্প ও বৃষ্টিপাত রোগ সংক্রমণের সহায়ক।

৮। বায়ু প্রবাহ এবং জমিতে নাইট্রোজেনের আধিক্যতায় এ রোগ বিস্তার লাভ করে।

ধানের ব্লাইট রোগের কারণ ।। Causes of Blight disease

গাছের পাতা, ফুল, ফল ও কান্ডের টিস্যু ক্ষয়প্রাপ্ত হওয়া বা মারা যাওয়া বা শুকিয়ে যাওয়াকে ব্লাইট বলে। ধানের ব্লাইট রোগকে পাতা পোড়া রোগ বা ধসা রোগ বলা হয়। জাপানের কৃষকেরা সর্বপ্রথম এই রোগের সন্ধান পান। জাপানে এ রোগটি ধানের সাদা শুষ্ক রোগ নামে পরিচিত। বাংলাদেশে ১৯৮৬ সালে রোপা আমন ধানে এই রোগের অস্তিত্ব ধরা পড়ে। ১৯০৮ সালে জাপানি বিজ্ঞানী টাকায়েসি (Takaeshi) প্রমাণ করেন এটি ব্যাকটেরিয়াঘটিত রোগ। এ রোগে জাপানে প্রতি বছর ২২,০০০-১১০,০০০ টন ধান উৎপাদন কম হয়।

ধানের ব্লাইট রোগের কারণঃ Xanthomonas oryzae নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে ধানের লিফ ব্লাইট রোগ হয়।
ইহা একটি দন্ডাকার ব্যাকটেরিয়া। এরা গ্রাম নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়া। এরা স্পোর উৎপন্ন করে না। এদের কোষে ক্যাপসুল থাকে না। এদের একটি মাত্র ফ্ল্যাজেলাম থাকে।

ব্যাকটেরিয়ার অর্থনৈতিক গুরুত্ব ।। Economical importance of Bacteria

ব্যাকটেরিয়ার উপকারী ভুমিকা

১। চিকিৎসা ক্ষেত্রে ভূমিকা

(i) অ্যান্টিবায়োটিক তৈরীঃ ব্যাকটেরিয়া থেকে সাবটিলিন (Bacillus subtilisi), পলিমিক্সিন (Bacillus polymyxa), স্ট্রেপটোমাইসিন (Actinomycetes), টেরামাইসিন, কলিসিন বা কলিব্যাকটেরিন (E. coli) প্রভৃতি জীবন রক্ষাকারী অ্যান্টিবায়োটিক তৈরী করা হয়¬।

(ii) প্রতিষেধক টিকা তৈরীঃ ব্যাকটেরিয়া থেকে কলেরা, টাইফয়েড, যক্ষ্মা, ধনুষ্টংকার, হুপিংকাশি, ডিপথেরিয়া প্রভৃতি রোগের প্রতিষেধক টিকা তৈরী করা হয়¬। DPT রোগের প্রতিষেধক টিকা ব্যাকটেরিয়া থেকে তৈরী করা হয়¬। Corynebacterium dipthae (D), Bordetalla pertussis (P) এবং Clostridium tetani (T) থেকে DPT নামকরণ করা হয়েছে।

(iii) স্টেরয়েড তৈরীঃ জৈব প্রযুক্তির মাধ্যমে ব্যাকটেরিয়া থেকে স্টেরয়েড উৎপাদন করা হয়। স্টেরয়েড চিকিৎসা ক্ষেত্রে ব্যবহার হয়। যেমন- টেস্টোস্টেরন, পেডনিসোন, ইস্ট্রাডিওল, ইস্ট্রোন প্রভৃতি।

(iv) হরমোন তৈরীঃ জৈব প্রযুক্তির মাধ্যমে ব্যাকটেরিয়া থেকে মূল্যবান হরমোন তৈরী করা হয়। এ সব হরমোন ওষুধ হিসেবে ব্যবহার হয়। যেমন- ইনসুলিন, এরিথ্রোপোইটিন, ইন্টারফেরন, টিপিএ প্রভৃতি।

২। কৃষিক্ষেত্রে ভূমিকা

(i) মাটির উর্বরতা বৃদ্ধিঃ ব্যাকটেরিয়া উদ্ভিদ ও প্রাণীর মৃতদেহকে পচিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়। ফলে মাটির জৈব উপাদান বেড়ে যায় এবং উর্বরতা বৃদ্ধি পায়।

(ii) নাইট্রোজেন সংবন্ধনঃ Azotobacter, Pseudomonas, Clostridium প্রভৃতি ব্যাকটেরিয়া বায়ু থেকে নাইট্রোজেন ধরে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়। Rhizobium শিম জাতীয় উদ্ভিদের মূলে বায়ু থেকে নাইট্রোজেন সংবন্ধন করে। বর্তমানে Rhizobium-কে জীবাণু সার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। মসুর ডালের মূলে Rhizobium এর তিনটি প্রজাতি নডিউল সৃষ্টি করে। এগুলো হলো- Rhizobium bangladashense, Rhizobium bine এবং Rhizobium lentis। বাংলাদেশী বিজ্ঞানী ড. হারুন অর রশিদ এই তিনটি প্রজাতি আবিষ্কার করেছেন।

(iii) নাইট্রিফিকেশনঃ নাইট্রিফিকেশন প্রক্রিয়ায় নাইট্রিফাইং ব্যাকটেরিয়ার প্রভাবে অ্যামোনিয়া থেকে নাইট্রাইট উৎপন্ন হয়। পরে নাইট্রাইট থেকে নাইট্রেট উৎপন্ন হয়। নাইট্রেট মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করে।

(iv) পতঙ্গ নাশক হিসেবেঃ কোন কোন ব্যাকটেরিয়া জমিতে পতঙ্গ নাশক হিসেবে ব্যবহার হয়। যেমন- Bacillus thuringiensis।

(v) ফলন বৃদ্ধিতেঃ কিছু ব্যাকটেরিয়া জমিতে প্রয়োগ করে ধানের ফলন ৩১.৮% এবং গমের ফলন ২০.৮% বৃদ্ধি করা সম্ভব হয়েছে।

(vi) ফসলের উন্নত জাত সৃষ্টিঃ ব্যাকটেরিয়ার সাহায্যে জিনের স্থানান্তর ঘটিয়ে ট্রান্সজেনিক ফসল সৃষ্টি করা হয়েছে। এসব ট্রান্সজেনিক ফসল উন্নত মানের।

(vii) জৈব সার উৎপাদনঃ বর্তমানে ব্যাকটেরিয়ার সাহায্যে গোবর ও ময়লা আবর্জনা পচিয়ে জৈব সার তৈরী করা হচ্ছে। জমিতে রাসায়নিক সারের পরিবর্তে জৈব সার ব্যবহার হচ্ছে।

(viii) পশুখাদ্য বা সিলেজ তৈরীঃ ধানের খড়, ঘাস এবং লিগিউম জাতীয় উদ্ভিদের কান্ড কেটে টুকরা টুকরা করা হয়। টুকরা গুলো চিটাগুড়ের সাথে মিশিয়ে আবদ্ধ পাত্রে রাখা হয়। গাঁজন প্রক্রিয়ায় Lactobacillus ব্যাকটেরিয়া এগুলোকে উন্নতমানের গো-খাদ্যে পরিনত করে। এই গো-খাদ্যকে সিলেজ বলে।

(ix) পাট শিল্পেঃ Clostridium butricum জাতীয় ব্যাকটেরিয়ার সাহায্যে পাট পচিয়ে আঁশ পৃথক করা হয়।

(x) সেলুলোজ পরিপাকঃ গবাদিপশুর পাকস্থলীতে Ruminococcus albus ও Ruminococcus flavefaciens ব্যাকটেরিয়া বাস করে। এ সব ব্যাকটেরিয়া সেলুলেজ এনজাইম উৎপন্ন করে। সেলুলেজ এনজাইম কাঁচা ঘাস ও উদ্ভিদ হজমে সাহায্য করে।

৩। শিল্পক্ষেত্রে ভূমিকা

(i) ভিটামিন তৈরীঃ মানুষের পরিপাকতন্ত্রে বসবাসকারী E. coli ব্যাকটেরিয়া ভিটামিন- B, ভিটামিন- K2, থায়ামিন, রিবোফ্ল্যাভিন, ফলিক এসিড, বায়োটিন প্রভৃতি সংশ্লেষণ করে। বর্তমানে গাঁজন প্রক্রিয়ায় ভিটামিন তৈরীতে কয়েক প্রজাতির ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার হচ্ছে।

(ii) দুগ্ধ শিল্পেঃ Lactobacillus ও Streptococcus ব্যাকটেরিয়ার সাহায্যে দুধ থেকে ছানা, পনির, মাখন, ঘি, ঘোল প্রভৃতি তৈরী করা হয়।

(iii) চামড়া শিল্পেঃ টেনিন প্রক্রিয়ায় চামড়া থেকে লোম ছাড়ানো হয়। এরপর ব্যাকটেরিয়ার প্রোটিয়েজ এনজাইম ব্যবহার করে কাঁচা চামড়া পাঁকানো ও নমনীয় করা হয়।

(iv) প্রক্রিয়াজাতকরণেঃ চা, কফি, তামাক প্রভৃতি প্রক্রিয়াজাতকরণে ব্যাকটেরিয়া নিঃসৃত এনজাইম দরকার হয়। এর ফলে স্বাদ ও গন্ধের উৎপত্তি ঘটে। এ ক্ষেত্রে Bacillus megaterium ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার হয়।

(v) জৈব গ্যাস তৈরীঃ বর্তমানে ব্যাকটেরিয়ার সাহায্যে গোবর ও ময়লা আবর্জনা পচিয়ে মিথেন, বিউটেন প্রভৃতি জৈব গ্যাস তৈরী করা হচ্ছে। Bacillus, E. coli, Clostridium, Methanococcus প্রভৃতি ব্যাকটেরিয়া বায়োগ্যাস উৎপন্ন করে।

(vi ) লবণ তৈরীঃ টেস্টিং লবণ তৈরীতে ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার হয়।

(vii) রসায়ন শিল্পেঃ ভিনেগার (Acetobacter xylinum), ল্যাকটিক এসিড (Bacillus lacticacidi), অ্যাসিটোন (Clostridium acetobutylicum), অ্যালকোহল, এনজাইম, ভিটামিন প্রভৃতি রাসায়নিক পদার্থ তৈরী করতে ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার হয়।

(viii) এনজাইম তৈরীঃ Bacillus subtilis, Clostridium histolyticum, Trichoderma konigi প্রভৃতি প্রজাতির ব্যাকটেরিয়া থেকে এনজাইম উৎপাদন করা হয়।

(ix) অ্যালকোহল ও এসিড উৎপাদনঃ Clostridium ও Bacillus ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার করে স্টার্চ থেকে বিভিন্ন এসিড ও অ্যালকোহল উৎপন্ন করা হয়।

৪। মানব জীবনে ভূমিকা

(i) খাদ্য পরিপাকঃ E. coli ও Bacillus মানুষের খাদ্য পরিপাকে সাহায্য করে।

(ii) সেলুলোজ হজমঃ গবাদি পশুর অন্ত্রে এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া থাকে। উহা সেলুলোজ হজমকারী এনজাইম সেলুলেজ উৎপন্ন করে। সেলুলেজ খড়, ঘাস, পাতা, কোষপ্রাচীর প্রভৃতি হজমে সাহায্য করে।

(iii) ভিটামিন তৈরীঃ মানুষের অন্ত্রে E. coli এবং অন্যান্য ব্যাকটেরিয়া ভিটামিন B1, B2, K, বায়োটিন প্রভৃতি উৎপাদন ও সরবরাহ করে।

(iv) ইনসুলিন তৈরীঃ ইনসুলিন হরমোন তৈরীতে E. coli ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার হয়। ইহা ডায়াবেটিস রোগ নিয়ন্ত্রণ করে।

(v) জিন প্রকৌশলঃ জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং-এ Agrobacterium tumefaciens এবং E. coli ব্যাকটেরিয়ার গুরুত্ব অপরিসীম।

(vi) দুগ্ধজাত খাদ্য তৈরীঃ দুধ থেকে দই, পনীর, মাখন প্রভৃতি তৈরী করা হয়। এ সব খাদ্য তৈরীতে Streptococcus lactis, Lactobacillus প্রভৃতি ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার হয়।

(vii) প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়াঃ মানুষের পরিপাকতন্ত্রে প্রায় ৫০০ প্রজাতির ব্যাকটেরিয়া মিথোজীবী হিসেবে বাস করে। এ সব ব্যাকটেরিয়াকে প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়া বলে। প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়া মানুষের খাদ্য পরিপাকে সাহায্য করে। তাই এদেরকে মানুষের বন্ধু ও সাহায্যকারী ব্যাকটেরিয়া হিসেবে গণ্য করা হয়।

৫। পরিবেশ উন্নয়নে ভূমিকা

(i) পরিবেশ দূষণ প্রতিরোধঃ ব্যাকটেরিয়া পরিবেশের জৈব বর্জ্যকে ভেঙ্গে সরল উপাদানে পরিনত করে। জটিল উপাদানকে জারিত করে পুনঃব্যবহার উপযোগী করে তুলে। এ কারণে ব্যাকটেরিয়াকে প্রাকৃতিক ঝাড়–দার বলা হয়। Pseudomonas, Nocardia, Mycobacterium প্রভৃতি ব্যাকটেরিয়া পেট্রোলিয়াম বর্জ্যকে অক্সিজেনের উপস্থিতিতে সরল উপাদানে পরিনত করে।

(ii) পয়ঃপ্রণালীর সুষ্ঠ ব্যবস্থাঃ ব্যাকটেরিয়া জৈব বর্জ্যকে দ্রæত তরলে রুপান্তরিত করে পয়ঃপ্রণালীকে সুষ্ঠ রাখে। Zooglea ramigera ব্যাকটেরিয়া জৈব বর্জ্য রুপান্তরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

(iii) তেল নিস্কাশনঃ সমুদ্রের পানিতে ভাসমান তেল অপসারণে তেল খাদক ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার হয়। Pseudomonas aeruginosa হলো তেল খাদক ব্যাকটেরিয়া।

(iv) জৈবিক নিয়ন্ত্রণেঃ ক্ষতিকর কীটপতঙ্গের শূককীট দমনে ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার হয়।

৬। মাটির উর্বরতা বৃদ্ধিতে ব্যাকটেরিয়ার ভূমিকা

(i) ব্যাকটেরিয়া উদ্ভিদ ও প্রাণীর মৃতদেহকে পচিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়। ফলে মাটির জৈব উপাদান বেড়ে যায় এবং উর্বরতা বৃদ্ধি পায়।

(ii) Azotobacter, Pseudomonas, Clostridium প্রভৃতি ব্যাকটেরিয়া বায়ু থেকে নাইট্রোজেন ধরে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়। Rhizobium ব্যাকটেরিয়া শিম জাতীয় উদ্ভিদের মূলে বায়ু থেকে নাইট্রোজেন সংবন্ধন করে। বর্তমানে Rhizobium কে জীবাণুসার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। মসুর ডালের মূলে Rhizobium এর তিনটি প্রজাতি নডিউল সৃষ্টি করে। এগুলো হলো- Rhizobium bangladashense, Rhizobium bine এবং Rhizobium lentis। বাংলাদেশী বিজ্ঞানী ড. হারুন অর রশিদ এই তিনটি প্রজাতি আবিষ্কার করেছেন।

(iii) নাইট্রিফিকেশন প্রক্রিয়ায় নাইট্রিফাইং ব্যাকটেরিয়ার প্রভাবে অ্যামোনিয়া থেকে নাইট্রাইট উৎপন্ন হয়। পরে নাইট্রাইট থেকে নাইট্রেট উৎপন্ন হয়। নাইট্রেট মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করে।

(iv) ব্যাকটেরিয়া পরিবেশের জৈব বর্জ্যকে ভেঙ্গে সরল উপাদানে পরিনত করে। জটিল উপাদানকে জারিত করে পুনঃব্যবহার উপযোগী করে তোলে। এ কারণে ব্যাকটেরিয়াকে প্রাকৃতিক ঝাড়–দার বলা হয়। Pseudomonas, Nocardia, Mycobacterium প্রভৃতি ব্যাকটেরিয়া পেট্রোলিয়াম বর্জ্যকে অক্সিজেনের উপস্থিতিতে সরল উপাদানে পরিনত করে।

(v) বর্তমানে ব্যাকটেরিয়ার সাহায্যে গোবর ও ময়লা আবর্জনা পচিয়ে জৈব সার তৈরী করা হচ্ছে।

(vi) জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং-এ Agrobacterium tumefaciens ও E. coli ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার করে রোগ প্রতিরোধী উচ্চ ফলনশীল ফসল উদ্ভাবন করা হয়েছে। এসব ফসলে কীটনাশক, ছত্রাকনাশক ও রাসায়নিক সার প্রয়োগ করতে হয় না। ফলে জমির উর্বরতা নষ্ট হয় না।

 

ব্যাকটেরিয়ার অপকারী ভুমিকা

১। মানুষের রোগঃ মানুষের কলেরা (Vibrio cholerae), আমাশয় (Bacillus dysenteti), যক্ষ্মা (Mycobacterium tuberculosis), টাইফয়েড (Salmonella typhosa), হুপিংকাশি (Bordetalla pertussis), নিউমোনিয়া (Diplococcus pneumoniae), ডিপথেরিয়া (Corynebacterium diptheriae), সিফিলিস (Treponema pallidum), গনোরিয়া (Neisseria gonorrhoeae), মেনিনজাইটিস (Neisseria meningitidis), প্লেগ (Yersinia pestis), ধনুষ্টাংকার/টিটেনাস (Clostridium tetani), কুষ্ঠ (Mycobacterium leprae), অ্যানথ্রাক্স, আনডিউলেটেড জ্বর প্রভৃতি রোগ ব্যাকটেরিয়ার কারণে হয়।

২। মানুষের যৌনবাহিত রোগ (STD)ঃ যে সব রোগ যৌন মিলনের মাধ্যমে এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তিতে ছড়িয়ে পড়ে তাকে যৌনবাহিত রোগ বা Sexually transmitted diseases-STD বলে। যৌনবাহিত রোগ হলো গনোরিয়া ও সিফিলিস।

(i) গনোরিয়াঃ Neisseria gonorrhoeae ব্যাকটেরিয়ার কারণে গনোরিয়া রোগ হয়। নারী ও পুরুষের যৌন মিলনের মাধ্যমে রোগটি ছড়ায়। যোনি, মুখ ও পায়ুপথ দিয়ে যৌন মিলন করলে এই রোগ এক দেহ থেকে অন্য দেহে সংক্রমিত হয়। বহিঃযৌনাঙ্গের সংস্পর্শে রোগটি ছড়ায়। রোগাক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত, ক্ষত অথবা চুম্বনের মাধ্যমে রোগের বিস্তার ঘটে। সংক্রমিত বিছানা, চাদর, পোষাক প্রভৃতি থেকে শিশুরা রোগাক্রান্ত হতে পারে। ঘনবসতি ও অপরিচ্ছন্নতা থেকে শিশুদের গনোরিয়া হতে পারে। এতে নারী এবং পুরুষ উভয়ই বন্ধ্যা হয়ে যেতে পারে।

(ii) সিফিলিসঃ Treponema pallidum ব্যাকটেরিয়ার কারণে সিফিলিস রোগ হয়। নারী ও পুরুষের যৌন মিলনের মাধ্যমে রোগটি ছড়ায়। যোনি, মুখ ও পায়ুপথ দিয়ে যৌন মিলন করলে এই রোগ এক দেহ থেকে অন্য দেহে সংক্রমিত হয়। রোগাক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত, ক্ষত অথবা চুম্বনের মাধ্যমে রোগ ছড়ায়। রোগীর টয়লেট, বাথট্যাব, পোষাক, খাবার পত্র এবং সুইমিং পুল ব্যবহার করলে সিফিলিস হতে পারে। রোগাক্রান্ত মায়ের সন্তানের সিফিলিস হয়। ২১ দিনের মধ্যে রোগ লক্ষণ প্রকাশ পায়। তবে ব্যক্তি বিশেষে ১০-৯০ দিনে প্রকাশ পেতে পারে।

৩। গবাদি পশুর রোগঃ গরু-মহিষের যক্ষ্মা (Mycobacterium bovis), অ্যানডিউলেটেড জ্বর, ভেড়ার এনথ্রাক্স (Bacillus anthracis), ছাগলের ব্রুসিলোসিস (Brucella suis), ইঁদুরের প্লেগ (Yersinia pestis), হাঁস-মুরগীর কলেরা (Bacillus avisepticus) প্রভৃতি রোগ ব্যাকটেরিয়ার কারণে হয়। ব্যাকটেরিয়া গবাদিপশুর ক্ষয়রোগ, হাঁস-মুরগীর রাণীক্ষেত এবং ঘোড়া, গাধা, ভেড়া ও ছাগলের রোগ সৃষ্টি করে।

 ৪। উদ্ভিদের রোগঃ গমের টুন্ডু রোগ (Agrobacterium tritici), ধানের ব্লাইট (Xanthomonas oryzae), আখের আঠাঝরা রোগ (Xanthomonas vasculorum), টমেটোর ক্যাংকার রোগ (Corynebacterium michiganese),  টমেটো ও গোলাপের ক্রাউন গল (Agrobacterium tumefaciens), লেবুর ক্যাংকার রোগ (Xanthomonas citri), আলুর স্ক্যাব রোগ (Steptomyces scabies), আপেলের ফায়ার ব্লাইট (Erwinia amylovora), ভুট্রার বোটা পচা ও আলুর নরম পচা রোগ (Erwinia carotovora), তামাকের ব্লাইট (Pseudomonas tabacci), তুলার লিফ স্পট রোগ (Xanthomonas mavacearum), শিমের লিফ স্পট (Xanthomonus malvacearum) প্রভৃতি রোগ ব্যাকটেরিয়ার কারণে হয়। এতে শস্যের  ফলন অনেক কমে যায়।

৫। মাটির উর্বরা শক্তি হ্রাস/ ডিনাইট্রিফিকেশনঃ Thiobacillus, Bacillus denitrificansMicrobacillus ব্যাকটেরিয়া ডিনাইট্রিফিকেশন প্রক্রিয়ায় মাটির নাইট্রেটকে ভেঙ্গে নাইট্রোজেন মুক্ত করে। এতে মাটিতে উদ্ভিদের পুষ্টি উপাদানের অভাব হয়। মাটির উর্বরতা শক্তি হ্রাস পায় এবং ফসল উৎপাদন কমে যায়।

৬। খাদ্যদ্রব্য পচন ও বিষক্রিয়াঃ Clostridium botulinum, Staphylococcus, Pseudomonas, Acinetobacter, Bacillus প্রভৃতি ব্যাকটেরিয়া শাক-সবজি, ফলমুল, মাছ, মাংস, দুগ্ধজাত দ্রব্য এবং অন্যান্য খাদ্যদ্রব্য নষ্ট করে দেয়। Clostridium botulinum ব্যাকটেরিয়া খাদ্যে বটিউলিন নামক বিষাক্ত পদার্থ সৃষ্টি করে। বটিউলিন মানুষের দেহে বটুলিজম নামের বিষক্রিয়া সৃষ্টি করে। এতে মানুষের মৃত্যু হতে পারে।

৭। পানি দূষণঃ কলেরা, আমাশয় ও টাইফয়েড সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া গুলো রোগীর মলের মাধ্যমে পানির দূষণ ঘটায়। E. coli, Salmonella, Vibrio প্রভৃতি ব্যাকটেরিয়া পানি দূষণ করে।

৮। বায়োটেরোরিজমঃ আধুনিক যুগে ব্যাকটেরিয়াকে ক্ষতিকারক জীবাণু যুদ্ধে ব্যবহার করার সম্ভাবনা থাকতে পারে। একে বায়োটেরোরিজম বলে। এটি মানবজাতির জন্য হুমকিস্বরুপ।

৯। যানবাহনে দুর্ঘটনাঃ বিমানের জ্বালানিতে Clostridium জন্মালে মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

১০। গৃহস্থলী বস্তুর ক্ষতিঃ Spirochete cytophaga ব্যাকটেরিয়া ঘরে ব্যবহৃত কাপড়, চামড়াজাত দ্রব্য ও আসবাবপত্রের ক্ষতিসাধন করে। Desulfovibrio লোহার পাইপে ক্ষত সৃষ্টি করে পানি সরবরাহে বিঘœ ঘটায়।

১১। ডিসালফিউরিকেশনঃ Desulfovibrio ব্যাকটেরিয়া ডিসালফিউরিকেশন প্রক্রিয়ায় মাটির সালফেট লবণকে ভেঙ্গে হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস মুক্ত করে। এতে উদ্ভিদের পুষ্টি গ্রহণে ব্যাপক ক্ষতি হয়।

১২। যানবাহনে দুর্ঘটনাঃ Clostridium ব্যাকটেরিয়া বিমানের জ্বালানিতে জন্মে। এতে বিমানের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

 

মাটির উর্বরতা হ্রাসে ভূমিকা

১। Thiobacillus, Bacillus denitrificansMicrobacillus ব্যাকটেরিয়া ডিনাইট্রিফিকেশন প্রক্রিয়ায় মাটির নাইট্রেটকে ভেঙ্গে নাইট্রোজেন মুক্ত করে। এতে মাটিতে উদ্ভিদের পুষ্টি উপাদানের অভাব হয়। মাটির উর্বরতা শক্তি হ্রাস পায় এবং ফসল উৎপাদন কমে যায়।

২। Desulfovibrio ব্যাকটেরিয়া ডিসালফিউরিকেশন প্রক্রিয়ায় মাটির সালফেট লবণকে ভেঙ্গে হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস মুক্ত করে। এতে উদ্ভিদের পুষ্টি গ্রহণে ব্যাপক ক্ষতি হয়।

ব্যাকটেরিয়ার অপকারী ভুমিকা ।। Disadvantage of Bacteria

১। মানুষের রোগঃ মানুষের কলেরা (Vibrio cholerae), আমাশয় (Bacillus dysenteti), যক্ষ্মা (Mycobacterium tuberculosis), টাইফয়েড (Salmonella typhosa), হুপিংকাশি (Bordetalla pertussis), নিউমোনিয়া (Diplococcus pneumoniae), ডিপথেরিয়া (Corynebacterium diptheriae), সিফিলিস (Treponema pallidum), গনোরিয়া (Neisseria gonorrhoeae), মেনিনজাইটিস (Neisseria meningitidis), প্লেগ (Yersinia pestis), ধনুষ্টাংকার/টিটেনাস (Clostridium tetani), কুষ্ঠ (Mycobacterium leprae), অ্যানথ্রাক্স, আনডিউলেটেড জ্বর প্রভৃতি রোগ ব্যাকটেরিয়ার কারণে হয়।

২। মানুষের যৌনবাহিত রোগ (STD)ঃ যে সব রোগ যৌন মিলনের মাধ্যমে এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তিতে ছড়িয়ে পড়ে তাকে যৌনবাহিত রোগ বা Sexually transmitted diseases-STD বলে। যৌনবাহিত রোগ হলো গনোরিয়া ও সিফিলিস।

(i) গনোরিয়াঃ Neisseria gonorrhoeae ব্যাকটেরিয়ার কারণে গনোরিয়া রোগ হয়। নারী ও পুরুষের যৌন মিলনের মাধ্যমে রোগটি ছড়ায়। যোনি, মুখ ও পায়ুপথ দিয়ে যৌন মিলন করলে এই রোগ এক দেহ থেকে অন্য দেহে সংক্রমিত হয়। বহিঃযৌনাঙ্গের সংস্পর্শে রোগটি ছড়ায়। রোগাক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত, ক্ষত অথবা চুম্বনের মাধ্যমে রোগের বিস্তার ঘটে। সংক্রমিত বিছানা, চাদর, পোষাক প্রভৃতি থেকে শিশুরা রোগাক্রান্ত হতে পারে। ঘনবসতি ও অপরিচ্ছন্নতা থেকে শিশুদের গনোরিয়া হতে পারে। এতে নারী এবং পুরুষ উভয়ই বন্ধ্যা হয়ে যেতে পারে।

(ii) সিফিলিসঃ Treponema pallidum ব্যাকটেরিয়ার কারণে সিফিলিস রোগ হয়। নারী ও পুরুষের যৌন মিলনের মাধ্যমে রোগটি ছড়ায়। যোনি, মুখ ও পায়ুপথ দিয়ে যৌন মিলন করলে এই রোগ এক দেহ থেকে অন্য দেহে সংক্রমিত হয়। রোগাক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত, ক্ষত অথবা চুম্বনের মাধ্যমে রোগ ছড়ায়। রোগীর টয়লেট, বাথট্যাব, পোষাক, খাবার পত্র এবং সুইমিং পুল ব্যবহার করলে সিফিলিস হতে পারে। রোগাক্রান্ত মায়ের সন্তানের সিফিলিস হয়। ২১ দিনের মধ্যে রোগ লক্ষণ প্রকাশ পায়। তবে ব্যক্তি বিশেষে ১০-৯০ দিনে প্রকাশ পেতে পারে।

৩। গবাদি পশুর রোগঃ গরু-মহিষের যক্ষ্মা (Mycobacterium bovis), অ্যানডিউলেটেড জ্বর, ভেড়ার এনথ্রাক্স (Bacillus anthracis), ছাগলের ব্রুসিলোসিস (Brucella suis), ইঁদুরের প্লেগ (Yersinia pestis), হাঁস-মুরগীর কলেরা (Bacillus avisepticus) প্রভৃতি রোগ ব্যাকটেরিয়ার কারণে হয়। ব্যাকটেরিয়া গবাদিপশুর ক্ষয়রোগ, হাঁস-মুরগীর রাণীক্ষেত এবং ঘোড়া, গাধা, ভেড়া ও ছাগলের রোগ সৃষ্টি করে।

৪। উদ্ভিদের রোগঃ গমের টুন্ডু রোগ (Agrobacterium tritici), ধানের ব্লাইট (Xanthomonas oryzae), আখের আঠাঝরা রোগ (Xanthomonas vasculorum), টমেটোর ক্যাংকার রোগ (Corynebacterium michiganese),  টমেটো ও গোলাপের ক্রাউন গল (Agrobacterium tumefaciens), লেবুর ক্যাংকার রোগ (Xanthomonas citri), আলুর স্ক্যাব রোগ (Steptomyces scabies), আপেলের ফায়ার ব্লাইট (Erwinia amylovora), ভুট্রার বোটা পচা ও আলুর নরম পচা রোগ (Erwinia carotovora), তামাকের ব্লাইট (Pseudomonas tabacci), তুলার লিফ স্পট রোগ (Xanthomonas mavacearum), শিমের লিফ স্পট (Xanthomonus malvacearum) প্রভৃতি রোগ ব্যাকটেরিয়ার কারণে হয়। এতে শস্যের  ফলন অনেক কমে যায়।

৫। মাটির উর্বরা শক্তি হ্রাস/ ডিনাইট্রিফিকেশনঃ Thiobacillus, Bacillus denitrificansMicrobacillus ব্যাকটেরিয়া ডিনাইট্রিফিকেশন প্রক্রিয়ায় মাটির নাইট্রেটকে ভেঙ্গে নাইট্রোজেন মুক্ত করে। এতে মাটিতে উদ্ভিদের পুষ্টি উপাদানের অভাব হয়। মাটির উর্বরতা শক্তি হ্রাস পায় এবং ফসল উৎপাদন কমে যায়।

৬। খাদ্যদ্রব্য পচন ও বিষক্রিয়াঃ Clostridium botulinum, Staphylococcus, Pseudomonas, Acinetobacter, Bacillus প্রভৃতি ব্যাকটেরিয়া শাক-সবজি, ফলমুল, মাছ, মাংস, দুগ্ধজাত দ্রব্য এবং অন্যান্য খাদ্যদ্রব্য নষ্ট করে দেয়। Clostridium botulinum ব্যাকটেরিয়া খাদ্যে বটিউলিন নামক বিষাক্ত পদার্থ সৃষ্টি করে। বটিউলিন মানুষের দেহে বটুলিজম নামের বিষক্রিয়া সৃষ্টি করে। এতে মানুষের মৃত্যু হতে পারে।

৭। পানি দূষণঃ কলেরা, আমাশয় ও টাইফয়েড সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া গুলো রোগীর মলের মাধ্যমে পানির দূষণ ঘটায়। E. coli, Salmonella, Vibrio প্রভৃতি ব্যাকটেরিয়া পানি দূষণ করে।

৮। বায়োটেরোরিজমঃ আধুনিক যুগে ব্যাকটেরিয়াকে ক্ষতিকারক জীবাণু যুদ্ধে ব্যবহার করার সম্ভাবনা থাকতে পারে। একে বায়োটেরোরিজম বলে। এটি মানবজাতির জন্য হুমকিস্বরুপ।

৯। যানবাহনে দুর্ঘটনাঃ বিমানের জ্বালানিতে Clostridium জন্মালে মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

১০। গৃহস্থলী বস্তুর ক্ষতিঃ Spirochete cytophaga ব্যাকটেরিয়া ঘরে ব্যবহৃত কাপড়, চামড়াজাত দ্রব্য ও আসবাবপত্রের ক্ষতিসাধন করে। Desulfovibrio লোহার পাইপে ক্ষত সৃষ্টি করে পানি সরবরাহে বিঘœ ঘটায়।

১১। ডিসালফিউরিকেশনঃ Desulfovibrio ব্যাকটেরিয়া ডিসালফিউরিকেশন প্রক্রিয়ায় মাটির সালফেট লবণকে ভেঙ্গে হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস মুক্ত করে। এতে উদ্ভিদের পুষ্টি গ্রহণে ব্যাপক ক্ষতি হয়।

১২। যানবাহনে দুর্ঘটনাঃ Clostridium ব্যাকটেরিয়া বিমানের জ্বালানিতে জন্মে। এতে বিমানের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

মাটির উর্বরতা হ্রাসে ব্যাকটেরিয়ার ভূমিকা ।। Bacterial roles of Soil erosion

১। Thiobacillus, Bacillus denitrificans ও Microbacillus ব্যাকটেরিয়া ডিনাইট্রিফিকেশন প্রক্রিয়ায় মাটির নাইট্রেটকে ভেঙ্গে নাইট্রোজেন মুক্ত করে। এতে মাটিতে উদ্ভিদের পুষ্টি উপাদানের অভাব হয়। মাটির উর্বরতা শক্তি হ্রাস পায় এবং ফসল উৎপাদন কমে যায়।
২। Desulfovibrio ব্যাকটেরিয়া ডিসালফিউরিকেশন প্রক্রিয়ায় মাটির সালফেট লবণকে ভেঙ্গে হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস মুক্ত করে। এতে উদ্ভিদের পুষ্টি গ্রহণে ব্যাপক ক্ষতি হয়।

উদ্ভিদের ব্যাকটেরিয়াঘটিত রোগ ।। Bacterial disease of Plants

গমের টুন্ডু রোগ (Agrobacterium tritici)
ধানের ব্লাইট (Xanthomonas oryzae)
আখের আঠাঝরা রোগ (Xanthomonas vasculorum)
টমেটোর ক্যাংকার রোগ (Corynebacterium michiganese)
টমেটো ও গোলাপের ক্রাউন গল (Agrobacterium tumefaciens)
লেবুর ক্যাংকার রোগ (Xanthomonas citri)
আলুর স্ক্যাব রোগ (Steptomyces scabies)
আপেলের ফায়ার ব্লাইট (Erwinia amylovora)
ভুট্রার বোটা পচা ও আলুর নরম পচা রোগ (Erwinia carotovora)
তামাকের ব্লাইট (Pseudomonas tabacci)
তুলার লিফ স্পট রোগ (Xanthomonas mavacearum)
শিমের লিফ স্পট (Xanthomonus malvacearum)

গবাদি পশুর ব্যাকটেরিয়াল রোগ ।। Bacterial Disease of Cattle

গরু-মহিষের যক্ষ্মা (Mycobacterium bovis)
অ্যানডিউলেটেড জ্বর, ভেড়ার এনথ্রাক্স (Bacillus anthracis)
ছাগলের ব্রুসিলোসিস (Brucella suis)
ইঁদুরের প্লেগ (Yersinia pestis)
হাঁস-মুরগীর কলেরা (Bacillus avisepticus)