ডেঙ্গু জ্বরের কারণ ।। সংক্রমণ ।। লক্ষণ ।। চিকিৎসা ।। প্রতিরোধ
আফ্রিকার স্বহিলি শব্দ Dinga থেকে স্প্যানিশ শব্দ Dengue এর উৎপত্তি। Dengue শব্দের প্রকৃত অর্থ হলো মেরুদন্ডের ব্যথা। একে হাড় ভাঙ্গা জ¦র বা ড্যান্ডি ফিভার বলা হয়। ডেঙ্গু একটি ভাইরাসঘটিত সংক্রামক রোগ। বিশ^ব্যাপি প্রতি বছর ১০০ মিলিয়ন লোক ডেঙ্গু জ¦রে আক্রান্ত হয়। দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ চীন, প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ, তাইওয়ান, আফ্রিকা, ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ, মেক্সিকো, মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার দেশসমুহে এই রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়।
ডেঙ্গু জ্বরের কারণ
Flavi virus নামক এক ধরনের RNA ভাইরাসের কারণে মানুষের ডেঙ্গু জ্বর হয়। এর চারটি প্রকরণ রয়েছে। DENV-1, DENV-2, DENV-3 ও DENV-4। ২–৭ দিন পর জ্বর দেখা দেয়।
ডেঙ্গু জ্বরের সংক্রমণ
Aedes aegypt, Aedes albopictus, Aedes polynesiensis, Aedes scutellaris প্রভৃতি মশা দ্বারা ডেঙ্গু রোগের ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটে। ডেঙ্গু মশা দিনের বেলায় মানুষকে কামড়ায়। এই মশা সকাল ও সন্ধ্যায় কামড়ায়। রক্তদান ও অঙ্গদানের মাধ্যমে ডেঙ্গ সংক্রমণ ঘটে। গর্ভবতী মা হতে সন্তানে জীবাণুর সংক্রমণ ঘটে। মানুষের রক্ত গ্রহণের সময় মশার লালার মাধ্যমে জীবাণু মানুষের দেহে প্রবেশ করে। মানুষের দেহে ৮–১০ দিনের মধ্যে সংখ্যা বৃদ্ধি করে।
ডেঙ্গু রোগ নির্ণয়
১। সেরোলজিঃ রক্ত পরীক্ষায় IgM অ্যান্টিবডি উপস্থিত থাকতে পারে। তীব্র সংক্রমিত রক্তে অ্যান্টিবডির পরিমাণ বেড়ে চার গুণ পর্যন্ত হতে পারে। রক্তে বিশেষ অ্যান্টিবডির উপস্থিতি নির্ণয় করে ডেঙ্গু শনাক্ত করা হয়।
২। প্লেটলেট টেস্টঃ রক্তে অণুচক্রিকার সংখ্যা ১,৫০,০০০/ mm3 এর অনেক নিচে নেমে যায়। রক্তের অণুচক্রিকা গণনা বা প্লেটলেট কাউন্ট করে ডেঙ্গু সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা নেয়া হয়।
৩। সেল কালচারঃ সংক্রমিত দেহ থেকে রক্ত সংগ্রহ করা হয়। রক্তকণিকা কালচার করে ভাইরাস শনাক্ত করা যায়।
ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ
১। সাধারণ ডেঙ্গু জ¦রের লক্ষণ
(i) প্রথমে শীত শীত ভাব এবং হঠাৎ প্রচন্ড জ্বর আসে।
(ii) মাথা, গলা ও কপালে তীব্র ব্যথা হয়।
(iii) চোখের পিছনে ব্যথা করে এবং রক্ত জমাট বাধে।
(iv) মেরুদন্ড, কোমর, মাংসপেশী ও জয়েন্টে তীব্র ব্যথা হয়। অস্থিসন্ধিতে তীব্র ব্যথা হয় বলে একে হাড়ভাঙ্গ জ¦র বলে।
(v) বমি বমি ভাব হয়।
(vi) চামড়ায় ছোট ছোট লাল ফুসকুড়ি বা র্যাশ দেখা যায়।
(vii) দাঁতের মাড়ি ও নাক দিয়ে রক্ত ক্ষরণ হয়।
(viii) লিভার বড় হয় এবং সংবহনতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
(ix) জ্বরের মাত্রা ১০৩–১০৫ ডিগ্রী ফারেনহাইট হয়।
(x) খাবারে অরুচি হয়। ক্ষুধামন্দা হয়।
(xi) রক্তে অণুচক্রিকার (প্লে¬টলেট) সংখ্যা হ্রাস পায়। এ অবস্থাকে থ্রম্বোসাইটোপেনিয়া বলে। রক্ত জমাট বাঁধতে পারে না।
(xii) হৃৎস্পন্দন ও রক্তচাপ কমে যায়।
(xiii) গ্রীবা ও কুঁচকির গ্রন্থিগুলো ফুলে যায়।
(xiv) হাত ও পায়ের তালু ফুলে যায় এবং উজ্জ্বল লাল বর্ণ ধারণ করে।
২। হেমোরেজিক ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ
রোগী দ্বিতীয়বার ডেঙ্গু জ¦রে আক্রান্ত হলে তাকে হেমোরেজিক ডেঙ্গু বলে। ডেঙ্গু হেমোরেজিক হলে রোগীর খুব খারাপ অবস্থা সৃষ্টি হয়। শিশুরা অধিক আক্রান্ত হয়। এতে রোগীর মৃত্যু হতে পারে।
(i) চোখের কোণে রক্ত জমাট বাধে।
(ii) রক্ত বমি হতে পারে।
(iii) নাক, মুখ, দাঁতের মাড়ি ও ত্বক দিয়ে রক্ত ক্ষরণ হয়।
(iv) পায়খানার সাথে রক্ত বের হতে পারে।
(v) রক্তের প্লে¬টলেট হ্রাস পায় এবং রক্ত জমাট বাঁধতে পারে না।
(vi) অত্যাধিক জ¦রের কারণে দেহে পানি শুন্যতা দেখা দেয়।
(vii) হেমোকনসেন্ট্রেশন ঘটতে পারে।
(viii) দেহে তরলের পরিমাণ কমে যায় এবং রক্তনালিতে চাপ পড়ে।
(ix) রক্তক্ষরণ বা ইন্টারনাল বিøডিং এর পরিমাণ বেড়ে যায়। এ অবস্থাকে ডেঙ্গু শক সিনড্রম বলে।
(x) শরীরের অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায় এবং রোগীর মৃত্যু হতে পারে।
৩। ডেঙ্গু শক সিনড্রোম
রক্তের ঘনত্ব বেড়ে গিয়ে হিমোকনসেনট্রেশন হলে তাকে ডেঙ্গু শক সিনড্রোম বলে।
(i) রক্তে ফ্লুইড বা তরলের পরিমাণ কমে যায়।
(ii) রক্তের ঘনত্ব বেড়ে যায়।
(iii) রক্ত চলাচলে ব্যাঘাত ঘটে।
(iv) রোগীর মৃত্যু হতে পারে।
ডেঙ্গু জ্বর প্রতিকার/চিকিৎসা
১। প্রচুর পরিমাণে ফুটানো ঠান্ডা পানি পান করতে হবে।
২। রোগীকে স্যুপ, দুধ, ফলের রস ও তরল খাবার খাওয়াতে হবে।
৩। মাথায় পানি ঢালতে হবে।
৪। গায়ের ঘাম মুছে ফেলতে হবে।
৫। ভেজা কাপড় দিয়ে শরীর স্পঞ্জ করতে হবে।
৬। শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়ানো।
৭। প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ খাওয়ানো।
৮। রক্তের ভারসাম্য রক্ষার জন্য প্লেটলেট ট্রান্সফিউশন বা রক্তদানের প্রয়োজন হতে পারে।
ডেঙ্গু জ্বর প্রতিরোধ
১। ডেঙ্গু মশা নিধন করতে হবে।
২। ডেঙ্গু মশা দিনের বেলায় কামড়ায়। তাই দিনের বেলা সাবধান থাকতে হবে।
৩। দিনের বেলা মশারী টানিয়ে ঘুমাতে হবে।
৪। মশার কয়েল অথবা ইলেকট্রিক ভ্যাপার ম্যাট ব্যবহার করতে হবে।
৫। বাড়ির আশেপাশের ঝোপঝাড় ও ময়লা আবর্জনা পরিষ্কার করতে হবে।
৬। আশেপাশে পানি জমতে না দেওয়া। বদ্ধ জলাশয় ভরাট করা।
৭। আক্রান্ত রোগীর সাথে ওঠাবসা, মেলামেশা, খাওয়া দাওয়া, ঘনিষ্ট ও ব্যক্তিগত সাহচার্যে না আসা।
৮। মদ ও অ্যালকোহল পান না করা।
৯। পতঙ্গনাশক স্প্রে করা।
১০। ফুল শার্ট, ফুল প্যান্ট এবং মোজা পড়তে হবে।
১১। বাড়ির আশেপাশে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা ক্যান, টিনের কৌটা, মাটির পাত্র, বোতল, নারকেলের মালা প্রভৃতি ধ্বংস করতে হবে।
১২। গোসলখানার বালতি, ড্রাম, প্লাস্টিক ও সিমেন্টের ট্যাংকে পাঁচ দিনের বেশি পানি জমতে না দেওয়া।
১৩। অব্যবহৃত গাড়ির টায়ারে যাতে পানি জমতে না পারে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।
১৪। ফ্রিজের নিচে, এসির নিচে, ফুলের টবে এবং মাটির পাত্রে সামান্য পরিমাণ পানি জমতে না দেওয়া।
১৫। এডিস মশা গড়ে ২১ দিন বাঁচে। তাই পতঙ্গনাশক স্প্রে করে একই সাথে লার্ভা ও পূর্ণাঙ্গ মশা নিধন করে রোগ প্রতিরোধ করা যায়।
১৬। সম্প্রতি আমেরিকার ফ্লোরিডাতে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং প্রযুক্তিতে পতঙ্গনাশক ছাড়াই এডিস মশা নিধনের ব্যবস্থা আবিষ্কৃত হয়েছে।
ডেঙ্গু জ্বর বিস্তারে পরিবেশীয় গুরুত্ব
১। ডেঙ্গুজ¦রের বাহক হলো ডেঙ্গু মশা। পরিবেশে ডেঙ্গু মশার প্রাদুর্ভাব বেড়ে গেলে ডেঙ্গু রোগ দ্রæত বিস্তার লাভ করবে।
২। ডেঙ্গু মশা দিনের বেলায় কামড়ায়। দিনের বেলা মশার কামড় থেকে সাবধান না হলে ডেঙ্গু সহজেই বিস্তার লাভ করবে। দিনের বেলা মশারী না টানিয়ে ঘুমালে রোগের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি পাবে।
৩। ডেঙ্গু মশা বাড়ির আশেপাশের ঝোপঝাড় ও ময়লা আবর্জনায় ডিম পাড়ে। তাই বাড়ির আশেপাশে ঝোপঝাড় ও ময়লা আবর্জনা থাকলে ডেঙ্গু রোগ বেড়ে যায়।
৪। আশেপাশে পানি জমলে সেখানে ডেঙ্গু মশা ডিম পাড়ে। বাড়ির আশেপাশে বদ্ধ পানি থাকলে ডেঙ্গু বেড়ে যায়।
৫। আক্রান্ত রোগীর সাথে ওঠাবসা, মেলামেশা, খাওয়া দাওয়া, ঘনিষ্ট ও ব্যক্তিগত সাহচার্যে আসলে ডেঙ্গু হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
৬। যে পরিবেশের মানুষ মদ ও অ্যালকোহল পান করে সেখানে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বেশি।
৭। ডেঙ্গু রোগীকে মশারীর ভিতরে না রাখলে রোগের বিস্তার হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।