জন্ডিস বা হেপাটাইটিস প্রতিরোধ

১। খাবার ও পানীয় দ্রব্য গ্রহণের সময় অবশ্যই সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে।

২। রক্ত দেওয়া বা নেওয়ার আগে অবশ্যই হেপাটাইটিস B ও C এর উপস্থিতি পরীক্ষা করে নিতে হবে।

৩। রোগীর ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে না আসা।

৪। সেলুনে সেভ করার সময় আলাদা ব্লেড ব্যবহার করা। সেলুনে সেভ না করা ভাল।

৫। সিরিঞ্জ এবং ইনজেশনের যন্ত্রপাতি জীবাণু মুক্ত রাখা। সর্বক্ষেত্রে ডিসপোজিবল সিরিঞ্জ ব্যবহার করা।

৬। রোগীর রেজার, টুথব্রাশ, নেল কাটার, ত্বক ফোটানো ও রক্ত গ্রহণের যন্ত্রপাতি ব্যবহার না করা।

৭। ত্বকের কাটাছেঁড়া ও ক্ষত পরিষ্কার রাখা এবং ওয়াটার প্রুভ ব্যান্ডেজ দিয়ে ঢেকে দেওয়া।

৮। রোগাক্রান্ত ব্যক্তির সাথে যৌন মিলন করা যাবে না।

৯। সরকারী ও বেসরকারী ভাবে জনসচেতনতা সৃষ্টি করা।

১০। প্যান্টাভ্যালেন্ট ভ্যাকসিন গ্রহণ করাই হলো প্রতিরোধের একমাত্র উপায়। হেপাটাইটিস-বি এর ভ্যাক্সিন ডোজ ৪টি। প্রথম ৩টি এক মাস পর পর এবং চতুর্থটি প্রথম ডোজ থেকে এক বছর পর নিতে হবে। পাঁচ বছর পর বুস্টার ডোজ নিতে হবে।

জন্ডিস বা হেপাটাইটিস চিকিৎসা

জন্ডিস প্রতিরোধের একমাত্র উপায় হলো প্যান্টাভ্যালেন্ট ভ্যাকসিন গ্রহণ।

১। হেপাটাইটিস-A আক্রান্ত রোগীর নির্দিষ্ট কোন চিকিৎসা দিতে হয় না। স্বতঃস্ফুর্তভাবেই এ রোগ ভাল হয়ে যায়। টিকা নিয়ে হেপাটাইটিস-A প্রতিরোধ করা যায়। হেপাটাইটিস-A এর টিকা হলো Havrix, Avaxim, BIOVAC-A প্রভৃতি।

২। হেপাটাইটিস-B আক্রান্ত রোগীর বিশ্রামের প্রয়োজন হয়। রোগীকে উচ্চমাত্রার প্রোটিন ও শর্করা জাতীয় খাবার দিতে হবে। এতে ক্ষয়প্রাপ্ত যকৃত কোষগুলো পুনঃগঠিত হয়। দীর্ঘস্থায়ী রোগীকে ওষুধ এবং ইন্টরফেরন ইনজেকশন দেওয়া হয়। টিকা নিয়ে হেপাটাইটিস-B প্রতিরোধ করা যায়। হেপাটাইটিস-B এর টিকা হলো Recombivax-HB, Engerix-B, Elovac-B, Genevac-B, Shanvac-B প্রভৃতি। এ সব টিকা পেশিতে প্রয়োগ করা হয়।

৩। এখন পর্যন্ত হেপাটাইটিস-C এর কোন টিকা আবিষ্কার হয় নাই। এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে কার্যকর কয়েকটি ওষুধ হলো- পেগাসিস, ইন্টারফেরন, ল্যামিভুমিন, এডিফোভির প্রভৃতি।

৪। হেপাটাইটিস রোগীকে ১০-১২ দিন পূর্ণ বিশ্রামে রাখতে হবে এবং প্রয়োজনে Amoxycillin, Metronidazole প্রভৃতি ওষুধ খাওয়ানো যেতে পারে।

৫। লিভার খুব দুর্বল বা অকার্যকর হয়ে গেলে লিভার ট্রান্সপ্লান্টেশন বা প্রতিস্থাপন করা হয়। আমেরিকা, ইউরোপ, চীন, জাপান, ভারত, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর প্রভৃতি দেশে সফল ভাবে লিভার ট্রান্সপ্লান্টেশন করা হচ্ছে। বাংলাদেশে খুব শীঘ্রই লিভার প্রতিস্থাপন শুরু হবে।

জন্ডিস বা হেপাটাইটিস নিয়ন্ত্রণ (Control of Hepatitis)

১। রোগীকে ঘন ঘন পানি খাওয়াতে হবে।

২। গ্লুকোজের সরবত খেতে হবে।

৩। রক্ত দেয়া নেয়ার সময় ভাল ভাবে পরীক্ষা করে নিতে হবে।

৪। পরিমিত বিশ্রাম নিতে হবে এবং শারীরিক পরিশ্রম পরিহার করতে হবে।

৫। ফলের রস, ডাবের পানি ও আখের রস খেতে হবে।

৬। ছোট মাছ ও মুরগীর ঝোল খেতে হবে।

৭। পেঁপে, পটল ও করলার তরকারী খেতে হবে।

৮। অড়হড় ও ভুঁই আমলার পাতার রস পান করতে হবে।

৯। মাদক, তন্দ্রাদায়ক ওষুধ, তৈলাক্ত ও চর্বিযুক্ত খাবার সম্পুর্ণরুপে পরিহার করতে হবে।

১০। বাসি ও খোলা খাবার এবং অফুটানো পানি পান না করা।

১১। রোগীকে ১০-১২ দিন পূর্ণ বিশ্রামে রাখতে হবে।

১২। রোগীর সাথে যৌন মিলন থেকে বিরত থাকতে হবে।

১৩। চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া।

জন্ডিস বা হেপাটাইটিসের লক্ষণ সমুহ 

১। ক্লান্তি লাগে, অস্বস্তি বোধ হয় এবং মৃদু জ¦র অনুভব হয়।

২। লিভার বা যকৃত, প্লীহা ও লসিকাগ্রন্থি বড় হয়ে যায়।

৩। ডান পাঁজরের নিচে চাপ বা ব্যথা অনুভূত হওয়া।

৪। যকৃতে সিরোসিস সৃষ্টি হয়। যকৃতে ক্যান্সার হতে পারে।

৫। রক্তে বিলিরুবিনের মাত্রা বৃদ্ধি পায়।

৬।  দেহের ত্বক, মুখ, চোখ, মিউকাস পর্দা ও থুথু হলুদ বর্ণ ধারণ করে।

৭।  প্রসাবের রং গাঢ় হলুদ বা সরিষার তেলের মতো হয়।

৮। পায়খানা সাদাটে অথবা ধুসর বর্ণের হয়।

৯। বিতৃঞ্চাবোধ, বমি হওয়া, ক্ষুধামন্দা ও খাদ্যের বিস্বাদ অনুভব করা।

১০। মাথা ব্যথা, মাংসপেশী ব্যথা  ও হাড় ব্যথা হয়।

১১। স্নায়ুবিক দুর্বল্যতা দেখা দেয়। ত্বকে র‌্যাশ ওঠে।

১২। পেঁটে ও পায়ে পানি জমে।

১৩। রোগীর শরীর ম্যাজম্যাজ করে, হাত ও পায়ের পাতা গরম থাকে এবং চোখ জ্বলে।

জন্ডিস বা হেপাটাইটিস নির্ণয়

জন্ডিস ও ক্লান্তিবোধ লক্ষণ দেখে হেপাটাইটিসের অবস্থা নির্ণয় করা যায়। হেপাটাইটিস-বি নির্ণয়ের জন্য রক্তে এইচবি সারফেস অ্যান্টিজেন (HBsAg) টেস্ট করা হয়। HBs  অ্যান্টিজেন রোগ সংক্রমণের ৬-১২ সপ্তাহের মধ্যে রক্তে দেখা যায়। হেপাটাইটিস-সি নির্ণয়ের জন্য রক্তের টেস্ট করা হয়। হেপাটাইটিস-সি সংক্রমণের ৮-৯ সপ্তাহের মধ্যে রক্তে Anti-HCV দেখা যায়। রক্তে Anti-HCV পজিটিভ হলে এইচসিভি RNA টেস্ট করা হয়। এইচসিভি RNA টেস্ট পজিটিভ হলে হেপাটাইটিস-সি শনাক্ত হবে। কোন কোন সময় যকৃতের বায়োপসি (liver biopsy) করাতে হয়।

জন্ডিস বা হেপাটাইটিসের বিস্তার

রোগাক্রান্ত মায়ে বুকের দুধ পানের মাধ্যমে শিশু আক্রান্ত হতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত ইনজেশনের সিরিঞ্জের মাধ্যমে সুস্থ ব্যক্তির দেহে এই ভাইরাস প্রবেশ করতে পারে। অনিরাপদ যৌন মিলনের মাধ্যমে এ ভাইরাস সংক্রমিত হতে পারে।  রোগীর নিজস্ব অনাক্রম্যতন্ত্র দ্বারা যকৃত কোষ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে হেপাটাইটিস হতে পারে। একে অটোইমিউন হেপাটাইটিস বলে। জন্মগত বিপাকীয় ক্রটির কারণে উইলসম ডিজিস (কপার বিপাকে ক্রটি) এবং হিমোক্রোমাটোসিস (আয়রন বিপাকে ক্রটি) হেপাটাইটিস হয়ে থাকে। তীব্র ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক ও অ্যামিবোয়িক সংক্রমণের কারণে হেপাটাইটিস হতে পারে। অতিরিক্ত প্যারাসিটামল, হ্যালোথেন এবং অ্যালকোহল সেবনের কারণে হেপাটাইটিস হতে পারে।

জন্ডিস বা হেপাটাইটিস রোগের কারণ

পাঁচ ধরনের ভাইরাসের সংক্রমণে হেপাটাইটিস বা জন্ডিস রোগ হয়। ভাইরাস গুলো হলো- হেপাটাইটিস-এ ভাইরাস (HVA), হেপাটাইটিস-বি ভাইরাস (HVB),  হেপাটাইটিস-সি ভাইরাস (HVC), হেপাটাইটিস-ডি ভাইরাস (HVD) এবং হেপাটাইটিস-ই ভাইরাস (HVE)। এদের মধ্যে হেপাটাইটিস-বি ভাইরাস (HVB) ও হেপাটাইটিস-সি ভাইরাস (HVC) হলো সবচেয়ে মারাত্বক। হেপাটাইটিস-সি ভাইরাসকে বলা হয় তুষের আগুন।

এছাড়া মাইটোমেগালো ভাইরাস, এপিস্টেইন বার ভাইরাস, হার্পিস সিমপ্লেক্স ভাইরাস, হার্পিস জোস্টার ভাইরাস প্রভৃতি শিশুর হেপাটাইটিস সৃষ্টি করতে পারে।

হেপাটাইটিস বা জন্ডিস রোগের ভাইরাস

১। হেপাটাইটিস- A অ ভাইরাস (HVA)
হেপাটাইটিস-এ ভাইরাস হলো RNA ভাইরাস। এর আয়তন ২৭ nm। হেপাটাইটিস- A ভাইরাস রোগীর মলমূত্র, দূষিত খাবার, দুষিত পানি প্রভৃতির মাধ্যমে ছড়ায়। রোগাক্রান্ত ব্যক্তির মাথা ব্যথা, ক্ষুধামন্দা, বমি ভাব, দূর্বলতা, চোখ ও ত্বকের রং পরিবর্তন প্রভৃতি দেখা যায়। এই ভাইরাসের সুপ্তিকাল ১৪-২৮ দিন। এ রোগ বিনা চিকিৎসায় নিরাময় হয়।
২। হেপাটাইটিস- B ভাইরাস (HVB)
হেপাটাইটিস- B ভাইরাস হলো DNA ভাইরাস। এর আয়তন ৪২ nm। হেপাটাইটিস-B ভাইরাস ভয়ঙ্কর এবং অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এই রোগে লিভার সিরোসিসসহ নানা জটিলতা দেখা দেয় এবং রোগী মারা যেতে পারে। রক্ত, বীর্য, ইঞ্জেকশনের সূঁচ ও সিরিঞ্জ, মুখের লালা, শরীরের যে কোন রস প্রভৃতির মাধ্যমে এই রোগ ছড়ায়। রোগাক্রান্ত মা থেকে গর্ভের সন্তানে বিস্তার লাভ করে। এই ভাইরাসের সুপ্তিকাল ৪৫-১৮০ দিন।
৩। হেপাটাইটিস-C ভাইরাস (HVC)
হেপাটাইটিস-C ভাইরাস হলো RNA ভাইরাস। এর আয়তন ৩০ nm। হেপাটাইটিস-C ভাইরাস ভয়ঙ্কর এবং অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। হেপাটাইটিস-C ভাইরাসকে বলা হয় তুষের আগুন। হেপাটাইটিস-C ভাইরাস দূরারোগ্য, লিভার নষ্ট করে নানা জটিলতা সৃষ্টি করে এবং রোগীর মৃত্যু ঘটে। রক্ত, মাদক বা ড্রাগ, ইঞ্জেকশনের সূঁচ ও সিরিঞ্জ প্রভৃতির মাধ্যমে এই ভাইরাস ছড়ায়। ভাইরাস যুক্ত দুষিত রক্ত ত্বকের সংস্পর্শে দেহে বিস্তার লাভ করে। এই ভাইরাসের সুপ্তিকাল ১৪-১৮০ দিন।
৪। হেপাটাইটিস-D ভাইরাস (HVD)
হেপাটাইটিস-D ভাইরাস হলো RNA ভাইরাস। এর আয়তন ৩৫ nm। হেপাটাইটিস-D ভাইরাস অত্যন্ত মারাত্বক। রক্ত, মাদক বা ড্রাগ, ইঞ্জেকশনের সূঁচ ও সিরিঞ্জ প্রভৃতির মাধ্যমে এই ভাইরাস ছড়ায়। রোগীর লিভার সিরোসিস হয় এবং মৃত্যু ঘটে। এই ভাইরাসের সুপ্তিকাল ২১-৪৯ দিন।
৫। হেপাটাইটিস-E ভাইরাস (HVE)
হেপাটাইটিস-E ভাইরাস হলো RNA ভাইরাস। এর আয়তন ২৭ nm। হেপাটাইটিস-E ভাইরাস রোগীর মলমূত্র, দূষিত পানি ও খাবারের মাধ্যমে ছড়ায়। রোগাক্রান্ত ব্যক্তির মাথাব্যথা, ক্ষুধামন্দা, দূর্বলতা, ত্বকের রং পরিবর্তন প্রভৃতি দেখা যায়। এই ভাইরাসের সুপ্তিকাল ২১-৫৬ দিন। এ রোগ বিনা চিকিৎসায় নিরাময় হয়।

হেপাটাইটিস বা জন্ডিস রোগ

গ্রিক শব্দ hepar অর্থ liver বা যকৃত এবং ল্যাটিন শব্দ itis অর্থ information বা প্রদাহ নিয়ে Hepatitis শব্দটি গঠিত। যকৃত বা লিভারের প্রদাহকে হেপাটাইটিস বলে। রোগ লক্ষণ ছয় মাসের কম হলে অ্যাকিউট হেপাটাইটিস এবং ছয় মাসের বেশি হলে ক্রনিক হেপাটাইটিস বলে। পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ৩% হলো হেপাটাইটিস রোগী । বাংলাদেশে এই রোগীর সংখ্যা ৪০ লক্ষ। এ রোগের ক্ষেত্রে ৮৫% ভাইরাস লিভারকে আক্রমণ করে। ১০-১৫ বছরের মধ্যে জন্ডিস রোগের জটিলতা দেখা দেয়।

ডেঙ্গু জ্বরের কারণ ।। সংক্রমণ ।। লক্ষণ ।। চিকিৎসা ।। প্রতিরোধ

আফ্রিকার স্বহিলি শব্দ Dinga থেকে স্প্যানিশ শব্দ Dengue এর উৎপত্তি। Dengue শব্দের প্রকৃত অর্থ হলো মেরুদন্ডের ব্যথা। একে হাড় ভাঙ্গা ¦ বা ড্যান্ডি ফিভার বলা হয়। ডেঙ্গু একটি ভাইরাসঘটিত সংক্রামক রোগ। বিশ^ব্যাপি প্রতি বছর ১০০ মিলিয়ন লোক ডেঙ্গু ¦রে আক্রান্ত হয়। দক্ষিণপূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ চীন, প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ, তাইওয়ান, আফ্রিকা, ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ, মেক্সিকো, মধ্য দক্ষিণ আমেরিকার দেশসমুহে এই রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়।

ডেঙ্গু জ্বরের কারণ

Flavi virus নামক এক ধরনের RNA ভাইরাসের কারণে মানুষের ডেঙ্গু জ্বর হয়। এর চারটি প্রকরণ রয়েছে। DENV-1, DENV-2, DENV-3  DENV-4 দিন পর জ্বর দেখা দেয়।

 

ডেঙ্গু জ্বরের সংক্রমণ

 Aedes aegypt, Aedes albopictus, Aedes polynesiensis, Aedes scutellaris  প্রভৃতি মশা দ্বারা ডেঙ্গু রোগের ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটে। ডেঙ্গু মশা দিনের বেলায় মানুষকে কামড়ায়। এই মশা সকাল সন্ধ্যায় কামড়ায়। রক্তদান অঙ্গদানের মাধ্যমে ডেঙ্গ সংক্রমণ ঘটে। গর্ভবতী মা হতে সন্তানে জীবাণুর সংক্রমণ ঘটে। মানুষের রক্ত গ্রহণের সময় মশার লালার মাধ্যমে জীবাণু মানুষের দেহে প্রবেশ করে। মানুষের দেহে ১০ দিনের মধ্যে সংখ্যা বৃদ্ধি করে।

 

ডেঙ্গু রোগ নির্ণয়

১। সেরোলজিঃ রক্ত পরীক্ষায় IgM অ্যান্টিবডি উপস্থিত থাকতে পারে। তীব্র সংক্রমিত রক্তে অ্যান্টিবডির পরিমাণ বেড়ে চার গুণ পর্যন্ত হতে পারে। রক্তে বিশেষ অ্যান্টিবডির উপস্থিতি নির্ণয় করে ডেঙ্গু শনাক্ত করা হয়।

২। প্লেটলেট টেস্টঃ রক্তে অণুচক্রিকার সংখ্যা ,৫০,০০০/ mm3 এর অনেক নিচে নেমে যায়। রক্তের অণুচক্রিকা গণনা বা প্লেটলেট কাউন্ট করে ডেঙ্গু সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা নেয়া হয়।

৩। সেল কালচারঃ সংক্রমিত দেহ থেকে রক্ত সংগ্রহ করা হয়। রক্তকণিকা কালচার করে ভাইরাস শনাক্ত করা যায়।

 

ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ

১। সাধারণ ডেঙ্গু ¦রের লক্ষণ

(i) প্রথমে শীত শীত ভাব এবং হঠাৎ প্রচন্ড জ্বর আসে।

(ii) মাথা, গলা কপালে তীব্র ব্যথা হয়।

(iii) চোখের পিছনে ব্যথা করে এবং রক্ত জমাট বাধে।

(iv) মেরুদন্ড, কোমর, মাংসপেশী জয়েন্টে তীব্র ব্যথা হয়। অস্থিসন্ধিতে তীব্র ব্যথা হয় বলে একে হাড়ভাঙ্গ ¦ বলে।

(v) বমি বমি ভাব হয়।

(vi) চামড়ায় ছোট ছোট লাল ফুসকুড়ি বা র‌্যাশ দেখা যায়।

(vii) দাঁতের মাড়ি নাক দিয়ে রক্ত ক্ষরণ হয়।

(viii) লিভার বড় হয় এবং সংবহনতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

(ix) জ্বরের মাত্রা ১০৩১০৫ ডিগ্রী ফারেনহাইট হয়।

(x) খাবারে অরুচি হয়। ক্ষুধামন্দা হয়।

(xi) রক্তে অণুচক্রিকার (প্লে¬টলেট) সংখ্যা হ্রাস পায়। অবস্থাকে থ্রম্বোসাইটোপেনিয়া বলে। রক্ত জমাট বাঁধতে পারে না। 

(xii) হৃৎস্পন্দন রক্তচাপ কমে যায়।

(xiii) গ্রীবা কুঁচকির গ্রন্থিগুলো ফুলে যায়।

(xiv) হাত পায়ের তালু ফুলে যায় এবং উজ্জ্বল লাল বর্ণ ধারণ করে।  

 

২। হেমোরেজিক ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ

রোগী দ্বিতীয়বার ডেঙ্গু ¦রে আক্রান্ত হলে তাকে হেমোরেজিক ডেঙ্গু বলে। ডেঙ্গু হেমোরেজিক হলে রোগীর খুব খারাপ অবস্থা সৃষ্টি হয়। শিশুরা অধিক আক্রান্ত হয়। এতে রোগীর মৃত্যু হতে পারে।

(i) চোখের কোণে রক্ত জমাট বাধে।

(ii) রক্ত বমি হতে পারে।

(iii) নাক, মুখ, দাঁতের মাড়ি ত্বক দিয়ে রক্ত ক্ষরণ হয়।

(iv) পায়খানার সাথে রক্ত বের হতে পারে।

(v) রক্তের প্লে¬টলেট হ্রাস পায় এবং রক্ত জমাট বাঁধতে পারে না।   

(vi) অত্যাধিক ¦রের কারণে দেহে পানি শুন্যতা দেখা দেয়।

(vii) হেমোকনসেন্ট্রেশন ঘটতে পারে।

(viii) দেহে তরলের পরিমাণ কমে যায় এবং রক্তনালিতে চাপ পড়ে।

(ix) রক্তক্ষরণ বা ইন্টারনাল বিøডিং এর পরিমাণ বেড়ে যায়। অবস্থাকে ডেঙ্গু শক সিনড্রম বলে।

(x) শরীরের অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায় এবং রোগীর মৃত্যু হতে পারে।

 

৩। ডেঙ্গু শক সিনড্রোম

রক্তের ঘনত্ব বেড়ে গিয়ে হিমোকনসেনট্রেশন হলে তাকে ডেঙ্গু শক সিনড্রোম বলে।

(i) রক্তে ফ্লুইড বা তরলের পরিমাণ কমে যায়।

(ii) রক্তের ঘনত্ব বেড়ে যায়।

(iii) রক্ত চলাচলে ব্যাঘাত ঘটে।

(iv) রোগীর মৃত্যু হতে পারে।

 

ডেঙ্গু জ্বর প্রতিকার/চিকিৎসা

১। প্রচুর পরিমাণে ফুটানো ঠান্ডা পানি পান করতে হবে।

২। রোগীকে স্যুপ, দুধ, ফলের রস তরল খাবার খাওয়াতে হবে।

৩। মাথায় পানি ঢালতে হবে।

৪। গায়ের ঘাম মুছে ফেলতে হবে।

৫। ভেজা কাপড় দিয়ে শরীর স্পঞ্জ করতে হবে।

৬। শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়ানো।

৭। প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ খাওয়ানো।

৮। রক্তের ভারসাম্য রক্ষার জন্য প্লেটলেট ট্রান্সফিউশন বা রক্তদানের প্রয়োজন হতে পারে।

 

ডেঙ্গু জ্বর প্রতিরোধ

১। ডেঙ্গু মশা নিধন করতে হবে।

২। ডেঙ্গু মশা দিনের বেলায় কামড়ায়। তাই দিনের বেলা সাবধান থাকতে হবে।

৩। দিনের বেলা মশারী টানিয়ে ঘুমাতে হবে।

৪। মশার কয়েল অথবা ইলেকট্রিক ভ্যাপার ম্যাট ব্যবহার করতে হবে।

৫। বাড়ির আশেপাশের ঝোপঝাড় ময়লা আবর্জনা পরিষ্কার করতে হবে।

৬। আশেপাশে পানি জমতে না দেওয়া। বদ্ধ জলাশয় ভরাট করা।

৭। আক্রান্ত রোগীর সাথে ওঠাবসা, মেলামেশা, খাওয়া দাওয়া, ঘনিষ্ট ব্যক্তিগত সাহচার্যে না আসা।

৮। মদ অ্যালকোহল পান না করা।

৯। পতঙ্গনাশক স্প্রে করা।

১০। ফুল শার্ট, ফুল প্যান্ট এবং মোজা পড়তে হবে।

১১। বাড়ির আশেপাশে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা ক্যান, টিনের কৌটা, মাটির পাত্র, বোতল, নারকেলের মালা প্রভৃতি ধ্বংস করতে হবে।

১২। গোসলখানার বালতি, ড্রাম, প্লাস্টিক সিমেন্টের ট্যাংকে পাঁচ দিনের বেশি পানি জমতে না দেওয়া।

১৩। অব্যবহৃত গাড়ির টায়ারে যাতে পানি জমতে না পারে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।

১৪। ফ্রিজের নিচে, এসির নিচে, ফুলের টবে এবং মাটির পাত্রে সামান্য পরিমাণ পানি জমতে না দেওয়া।

১৫। এডিস মশা গড়ে ২১ দিন বাঁচে। তাই পতঙ্গনাশক স্প্রে করে একই সাথে লার্ভা পূর্ণাঙ্গ মশা নিধন করে রোগ প্রতিরোধ করা যায়।

১৬। সম্প্রতি আমেরিকার ফ্লোরিডাতে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং প্রযুক্তিতে পতঙ্গনাশক ছাড়াই এডিস মশা নিধনের ব্যবস্থা আবিষ্কৃত হয়েছে।

 

ডেঙ্গু জ্বর বিস্তারে পরিবেশীয় গুরুত্ব

১। ডেঙ্গুজ¦রের বাহক হলো ডেঙ্গু মশা। পরিবেশে ডেঙ্গু মশার প্রাদুর্ভাব বেড়ে গেলে ডেঙ্গু রোগ দ্রæ বিস্তার লাভ করবে।

২। ডেঙ্গু মশা দিনের বেলায় কামড়ায়। দিনের বেলা মশার কামড় থেকে সাবধান না হলে ডেঙ্গু সহজেই বিস্তার লাভ করবে। দিনের বেলা মশারী না টানিয়ে ঘুমালে রোগের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি পাবে।

৩। ডেঙ্গু মশা বাড়ির আশেপাশের ঝোপঝাড় ময়লা আবর্জনায় ডিম পাড়ে। তাই বাড়ির আশেপাশে ঝোপঝাড় ময়লা আবর্জনা থাকলে ডেঙ্গু রোগ বেড়ে যায়।

৪। আশেপাশে পানি জমলে সেখানে ডেঙ্গু মশা ডিম পাড়ে। বাড়ির আশেপাশে বদ্ধ পানি থাকলে ডেঙ্গু বেড়ে যায়।

৫। আক্রান্ত রোগীর সাথে ওঠাবসা, মেলামেশা, খাওয়া দাওয়া, ঘনিষ্ট ব্যক্তিগত সাহচার্যে আসলে ডেঙ্গু হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

৬। যে পরিবেশের মানুষ মদ অ্যালকোহল পান করে সেখানে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বেশি।

৭। ডেঙ্গু রোগীকে মশারীর ভিতরে না রাখলে রোগের বিস্তার হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।