বায়োটেকনোলজি ।। টিস্যু কালচার প্রযুক্তির ধাপসমুহ

১। এক্সপ্লান্ট নির্বাচন (Ex-plant selection)ঃ  টিস্যু কালচার প্রযুক্তির প্রথম ও গুরুত্বপুর্ণ পদক্ষেপ হলো এক্সপ্লান্ট নির্বাচন ও পৃথকীকরণ। প্রথমে এক্সপ্লান্ট নির্বাচন করা হয়। এক্সপ্লান্ট নির্বাচনের সময় লক্ষ্য রাখতে হবে উহা যেন সুস্থ, সবল, রোগমুক্ত ও উন্নত জাতের হয়। এছাড়া কাক্সিক্ষত বৈশিষ্ট্য যেন উহাতে বিদ্যমান থাকে সেদিকে খেয়াল রাখা হয়। পরে এক্সপ্লান্ট থেকে প্রয়োজনীয় অংশ যেমন- শীর্ষমুকুল, পার্শ্বমুকুল বা পাতার অংশ, বিভাজনক্ষম কোষ, মেরিস্টেম, পরাগরেণু, ডিম্বক, ভ্রæণ, নিউসেলাস, প্রোটোপ্লাস্ট প্রভৃতি পৃথক করে নেয়া হয়।

২। কালচার মিডিয়া তৈরী (prepare of culture media)ঃ টিস্যু কালচার প্রযুক্তির আর একটি গুরুত্বপুর্ণ পদক্ষেপ হলো কালচার মিডিয়া তৈরী করা। সাধারণত উদ্ভিদের অতি প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান দ্বারা এই কালচার মিডিয়া তৈরী করা হয়। উদ্ভিদের মুখ্য ও গৌণ পুষ্টি উপাদান, ভিটামিন, ফাইটোহরমোন, অ্যাগার অ্যাগার, গøুকোজ, সুক্রোজ (২-৪%), ফ্রুক্টোজ, মল্টোজ প্রভৃতি একটি পাত্রে নিয়ে কালচার মিডিয়া তৈরী করা হয়। মৌলিক পুষ্টি উপাদান দ্বারা প্রস্তুতকৃত এই কালচার মিডিয়ামকে ব্যাসাল মিডিয়াম বলা হয়। আবাদ মাধ্যমের p­H ৫.৫Ñ৬.০ এর মধ্যে রাখা হয়। সর্বাধিক ব্যবহৃত কালচার মিডিয়া হলো MS মাধ্যম (Murashige & Skoog, 1962) এবং B5 (Gamborg et al, 1968) মাধ্যম।

৩। জীবাণু মুক্তকরণ (Sterilization)ঃ টিস্যু কালচার প্রযুক্তিতে ব্যবহৃত কালচার মিডিয়া ও এক্সপ্লান্ট উভয়ই জীবাণু মুক্ত হওয়া আবশ্যক। কালচার মিডিয়াকে একটি কনিক্যাল ফ্ল্যাক্স বা বড় টেস্ট টিউবে নেয়া হয়। এরপর আবাদ মাধ্যম ও এক্সপ্লান্ট উভয়ই অটোক্লেভ যন্ত্রের মধ্যে ১২১¬¬¬¬ ডিগ্রী সে তাপমাত্রায় ১৫ পাউন্ড চাপে ২০ মিনিট সময় রেখে দেওয়া হয়। ফলে উহা জীবাণু মুক্ত হয়ে যায়।

৪। এক্সপ্লান্টকে কালচার মিডিয়ামে স্থাপন ঃ জীবাণু মুক্ত এক্সপ্লান্ট জীবাণু মুক্ত কালচার মিডিয়ামে স্থাপন করা হয়। এ সময় ব্যবহৃত ছুরি, চিমটা ও হাত ইথাইল অ্যালকোহল দিয়ে জীবাণু মুক্ত করে নেওয়া হয়। এই কাজটি একটি লেমিনার এয়ার ফ্লো (Laminer air flow) নামক যন্ত্রের নিচে জীবাণু মুক্ত পরিবেশে করা হয়।

৫। ক্যালাস সৃষ্টি ও সংখ্যা বৃদ্ধি (Callus create)ঃ কালচার মিডিয়ামে এক্সপ্লান্ট স্থাপন করার পর পাত্রটিকে একটি নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে রেখে দেয়া হয়। কক্ষটির তাপমাত্রা ১৭-২০ ডিগ্রী সে, আলোর তীব্রতা ৩,০০০- ৫,০০০ লাক্স বা ১০০০-৩০০০ লাক্স এবং আপেক্ষিক আর্দ্রতা ৭০-৭৫% এর মধ্যে রাখা হয়। কয়েক দিনের মধ্যে কোষটি বার বার বিভাজনের মাধ্যমে একটি বহুকোষী মন্ডে পরিনত হয়। এই বহুকোষী মন্ডকে ক্যালাস বলে। ৫-৭ দিন পর ক্যালাসে অসংখ্য মুকুল বা অণুচারা উৎপন্ন হয়। কোষের টটিপোটেন্সি ক্ষমতা থাকায় মুকুল গুলো বৃদ্ধি পায়। মুকুল থেকে পরে নতুন চারা তৈরী করা হয়।

৬। চারা উৎপাদন (Plantlets production)ঃ জীবাণু মুক্ত ছুরি দিয়ে ক্যালাস থেকে মুকুল কেটে নেয়া হয়। এরপর মুকুল গুলো চারা উৎপাদনকারী কালচার মিডিয়ামে স্থাপন করা হয়। মুল সৃষ্টির জন্য কালচার মিডিয়ামে পরিমাণ মত অক্সিন প্রয়োগ করা হয়। ফলে কয়েক দিনের মধ্যে চারা উৎপন্ন হয়ে যায়। কৃত্রিম আবাদ মাধ্যমে এক্সপ্লান্ট থেকে চারা তৈরীর পদ্ধতিই হলো ইন-ভিট্রো কালচার।

৭।  চারা টবে স্থানান্তর (Plant transfer on Tub)ঃ চারার মুল গুলো সুগঠিত হলে খুব সাবধানে চারা গুলোকে টবের অ্যাগার যুক্ত মাটিতে স্থাপন করা হয়। টবটিকে আলো ও বাতাস পুর্ণ স্থানে রাখা হয়। টবে মাঝে মাঝে পানি দেয়া হয়। কিছু দিনের মধ্যেই চারা গুলো বৃদ্ধি পেয়ে মাঠে রোপনের উপযুক্ত হয়ে ওঠে।

৮। চারা মাঠে স্থানান্তর (Plant transfer in field)ঃ চারাসহ টব গুলোকে মাঝে মাঝে প্রাকৃতিক পরিবেশে রাখা হয়। এতে চারা গুলো প্রাকৃতিক পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারে।  পরে সুস্থ, সবল ও রোগমুক্ত চারা গুলো মাঠে স্থপন করা হয়।

জীবাণুমুক্ত পরিবেশ কী ।। Sterilize of environment

টিস্যু কালচারের জন্য পরিবেশ অবশ্যই জীবাণু মুক্ত হতে হবে। কালচার মিডিয়ামের পাত্র এবং অন্যান্য কাচের জিনিসপত্র ওভেনে ১৬০-১৮০ ডিগ্রী সে তাপমাত্রায় ১-২ ঘন্টা রেখে জীবাণুমুক্ত করা হয়। ফরসেপস, নিডল, স্কারপেল প্রভৃতি ৯৫% অ্যালকোহলে ডুবিয়ে জীবাণুমুক্ত করা হয়।

টিস্যু কালচার ।। টিস্যু কালচারের প্রকারভেদ

১। মেরিস্টেম কালচারঃ উদ্ভিদের মেরিস্টেম কালচার করে উদ্ভিদ সৃষ্টি করা হয়।

২। পরাগধানী কালচারঃ উদ্ভিদের পরাগধানী এবং পরাগরেণু কালচার করে পূর্ণাঙ্গ উদ্ভিদ উৎপন্ন করা হয়।

৩। কক্ষ মুকুল কালচারঃ উদ্ভিদের মুকুল থেকে উদ্ভিদ সৃষ্টি করা হয়।

৪। ক্যালাস কালচারঃ উদ্ভিদের বহুকোষী মন্ড বা ক্যালাস থেকে অসংখ্য চারা উৎপাদন করা হয়।

৫। মাইক্রোপ্রোপাগেশনঃ উদ্ভিদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশ ব্যবহার করে পূর্ণাঙ্গ উদ্ভিদ সৃষ্টি করা হয়।

৬। দেহকোষ কালচারঃ উদ্ভিদের বিভাজনক্ষম দেহকোষ কালচার করে নতুন চারা সৃষ্টি করা হয়।

টিস্যু কালচার কাকে বলে ।। Plant tissue culture

যে প্রক্রিয়ায় উদ্ভিদের বিভাজনক্ষম কোন কোষ বা অঙ্গ সম্পুর্ণ জীবাণু মুক্ত আবাদ মাধ্যমে চাষ করে নতুন চারা বা উদ্ভিদ সৃষ্টি করা হয় তাকে টিস্যু কালচার বলে। উদ্ভিদের বিভাজনক্ষম কোষ, মেরিস্টেম, পরাগরেণু, ডিম্বক, ভ্রæণ, নিউসেলাস, প্রোটোপ্লাস্ট প্রভৃতি কালচার করে পূর্ণাঙ্গ উদ্ভিদ সৃষ্টি করা হয়। এ প্রক্রিয়ায় উদ্ভিদের ক্ষুদ্র অংশ ব্যবহার করে পূর্ণাঙ্গ উদ্ভিদ সৃষ্টি করা হয় বলে একে মাইক্রোপ্রোপাগেশন বলা হয়। উদ্ভিদের সমগুণসম্পন্ন ক্লোন তৈরী করা হয় বলে একে ক্লোনিং প্রযুক্তিও বলা হয়। বর্তমানে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরী করা হচ্ছে ভাইরাসের টিকা, হরমোন, ইনসুলিন, অ্যালকালয়েড প্রভৃতি। টিস্যু কালচারে ভিটামিন, এনজাইম, হরমোন, সুগার, খনিজ লবণ প্রভৃতি ব্যবহার হয়।
১৯০১ সালে আমেরিকান বিজ্ঞানী মরগান (Morgan) সর্বপ্রথম প্রতিটি সজীব উদ্ভিদ কোষের সম্পূর্ণ উদ্ভিদে পরিনত হওয়ার ক্ষমতা আছে বলে ধারণা করেন এবং এ ক্ষমতাকে টটিপটেন্সি বলে। ১৯২০ সালে গোটলিয়েব হ্যাবারল্যান্ডট (Gottlieb Haberlandt) সর্বপ্রথম টিস্যু কালচার প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেন। এজন্য তাকে টিস্যু কালচারের জনক বলা হয়। ১৯৩৯ সালে গাইথারেট (Gautheret) ও নাবিকোর্ট (Nabercourt) সর্বপ্রথম উদ্ভিদের টিস্যু কালচার করেন।

বায়োটেকনোলজি ।। জীবপ্রযুক্তির সাথে সম্পর্কিত শাখাসমুহ

১। জিনতত্ত¡- Genetics

২। আণবিক জীববিজ্ঞান- Molecular Biology

৩। অণুজীববিজ্ঞান- Microbiology

৪। জৈব রসায়ন- Biochemistry

৫। শারীরবিদ্যা- Physiology

৬। শ্রেণীবিন্যাসবিদ্যা- Taxonomy

৭। চিকিৎসাবিজ্ঞান- Medical Science

৮। জৈব রাসায়নিক প্রযুক্তি- Biochemical Engineering

৯। কৃষিবিজ্ঞান- Agriculture

১০। গণিত ও কম্পিউটার বিজ্ঞান- Mathematics & Computer Science

১১। অর্থনীতি- Economics

১২। রিকম্বিন্যান্ট ডিএনএ টেকনোলজি- Recombinant DNA Technology

১৩। জিনোমিক্স- Genomics

১৪। বায়োমাইনিং- Biomining

১৫। ইনভায়রনমেন্টাল বায়োটেকনোলজি- Environmental Biotechnology

১৬। ফুড টেকনোলজি- Food Technology

১৭। ফার্মেন্টেশন টেকনোলজি- Fermentation Technology

১৮। বায়োমলিকুলার ইঞ্জিনিয়ারিং-Biomolecular Engineering

১৯। অ্যাপ্লায়েড ইমিউনোলজি- Applied Immunology

২০। ওয়েস্ট ইউটিলাইজেশন টেকনোলজি- Waste Utilization Technology

২১। টিস্যু কালচার- Tissue Culture

বায়োটেকনোলজি ।। বায়োইনফরমেটিক্স কী ।। Bioinformatics কী

জীববিজ্ঞানের বিভিন্ন সমস্যাকে কম্পিউটার দ্বারা সমাধান ও বিশ্লেষণ করাকে বায়োইনফরমেটিক্স বলে।

বায়োটেকনোলজি ।। চিকিৎসাভিত্তিক জীবপ্রযুক্তি কী ।। Medical biotechnology কী

বংশগত রোগ নিরাময়, ইনসুলিন প্রয়োগ, ইন্টারফেরনের কৌশল, বৃদ্ধি  বা গ্রোথ হরমোন প্রয়োগ, ফুসফুসের এমফাইসেমা প্রতিরোধ, জিন থেরাপি, গর্ভের শিশু পরীক্ষা, মলিকুলার ফার্মিং, হিমোফিলিয়া, বংশগত রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা, হেপাটাইটিস-বি নিয়ন্ত্রণ প্রভৃতি ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তির অবদান রয়েছে।

বায়োটেকনোলজি ।। শিল্পভিত্তিক জীবপ্রযুক্তি কী ।। Industrial biotechnology

টিকা বা ভেক্সিন তৈরী, ইন্টারফেরন উৎপাদন, ইনসুলিন উৎপাদন, বৃদ্ধি  বা গ্রোথ হরমোন উৎপাদন, এনজাইম উৎপন্ন, মলিকুলার ফার্মিং, বায়োফার্মিং, জৈব শক্তি উৎপাদন, বায়োগ্যাস, ডিটারজেন্ট, চামড়া, দুগ্ধশিল্প প্রভৃতি ক্ষেত্রে জীবপ্রযুক্তির অবদান রয়েছে।

বায়োটেকনোলজি ।। ওষুধভিত্তিক জীবপ্রযুক্তি কী ।। Pharmaceutical biotechnology কী

পেনিসিলিন, স্ট্রেপটোমাইসিন, ইরাইথ্রোমাইসিন, বায়োমলিকুলার ফার্মিং, ইনসুলিন প্রভৃতি ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তির অবদান রয়েছে।

বায়োটেকনোলজি ।। কৃষিভিত্তিক জীবপ্রযুক্তি কী ।। Agricultural biotechnology কী

রোগ মুক্ত উদ্ভিদ উৎপাদন, উচ্চ ফলনশীল জাত উদ্ভাবন, মাইক্রোপ্রোপাগেশন, সোমাটিক হাইব্রিডাইজেশন, পরাগধানী কালচার, সোমাক্লোনাল ভেরিয়েশন, ট্রান্সজেনিক উদ্ভিদ সৃষ্টি, টিস্যু কালচার প্রভৃতি ক্ষেত্রে কৃষিভিত্তিক জীবপ্রযুক্তির অবদান রয়েছে।